হেলাল সালাহউদ্দীনের কবিতা

হেলাল সালাহউদ্দীনের কবিতা

ছবি

আহ্লাদ ভাঙা রোদ টোল খাচ্ছে গালে, টলটলে জলে যেমন ঝলমল দোল; বকের ছায়া উড়ছে বুকের ভেতর!
নদী হয়ে যাচ্ছে সব, খলখল নৃত্যে মায়াবী বিভ্রম উছলায়।
পথিক পথ বেয়ে উঠে আসে সন্ধ্যায়, তখন রাস্তায় নীড়ে ফেরা চাতকেরা বিহ্বল;
কোথায় বিড়ালাক্ষী পৃথুলা বিরহ উদাস?
খোলা কবরীতে কাঁপছে উন্মন বাতাস।
হেঁয়ালিতে বাঁধা বিজন বিষাদ, গভীর তন্ত্রীতে জাগে তুমুল স্বাদ! সারারাত ইবাদত প্রত্ন দেউলে।

ছবি-২

জলরং টলটল চোখ : সুরম্য সুডৌল পদ্মদিঘি, নির্জনে আঁকো- নিভে যায় বিজন রাত্রি।
আশ্চর্য যাদুকর, মন্ত্র ছবি অরণ্যে মনে; কুঞ্জে শোভিত বিলোল দোল।
অর্চনা কার? পিঙ্গলা মনিহার! চলকে ওঠে শুভ্র সরাব- পৃথিবী পিপে।
গাঙে- গঙ্গায় অনুপম লহরি, বাঁকা বাঁকে নৃত্য চিরোল; বিরল মুদ্রায় আঁকা।
চপলা সরোদ : সুর মিহির, আত্মার রেশমবনে ওড়ে চঞ্চল প্রজাপতি!
অবাধ্য আঙুল উন্মূল আনন্দে বোনে শ্যাম কুহক,
কুন্তলে দারুণ কোলাহল, শিরায় শিরায় উলোল শিহরণ- তনুমন দুরন্ত জ্বালাতন; ফেনায় ফেনায়।

ময়ূরাক্ষী

নভকুঞ্জের ছায়ায় গিয়ে বসি চলো,
হরিৎ রাতের নাভিতে লুটোয় ত্রয়োদশী চাঁদ,
বুনো জ্যোৎস্নার চঞ্চলতা মেখে- প্রান্তরের গাছগুলো অ্যালকোহলিক নিস্তব্ধতায় টানছে আমাদের!
এসো ধীর পায়ে, এই মাটির শরীরে লেগে আছে ঘ্রাণ, প্রেমের অন্তর্লীন ধ্যানে বুনেছে শ্যামল ঢেউ; স্নিগ্ধ আবেশে ফুটেছে শিউলি, রক্তিম শাপলায় নিশ্চুপ দিঘি- ওখানে হাঁটি পাশাপাশি।
অসীম বিস্ময়ের আদিতে কোথাও নেই কেউ; শুধু তোমার টিপ জ্বলে কালের প্রদীপ!
নেশা নেশা নিশির অতুল রূপে : ও কী আশ্চর্য চোখ- জন্মান্তরের ঘোরে ঘুরছে ত্রিলোক।
তুমি কোন অলোকের মুগ্ধ চকোরী?
অচিন অরণ্যের উদাসী, গভীর কোমলতায় আল্পনা এঁকে, বিরল মুদ্রায় মুঠোতে তুলে মায়া- মাখছো তুলতুলে গালে।
গন্ধম গাছের নিচে, নীল নদীর জলে, চির স্বর্গচ্যুত কবির প্রার্থনায়- মগ্ন হও ময়ূরাক্ষী, ঢেউ ভেঙে মুছে যাক অনন্তকালের চিহ্ন।

ঘর

ঘরময় ঘুরছে উড়ছে একাকী জোনাকি, রাতের দীর্ঘ ক্লান্তিতে ডুবে ডুবে, গলছে জীবন মোমের মতন পুড়ে; আত্মমুগ্ধ সকলে খুঁজছে সুখ ভীষণ অসুখে!
রাত গলছে, বরফ হচ্ছে জল : উধাও বাতাসে!
কামনা নদী বেয়ে আসে প্রেম, টাপেটাপে বোঝাই হেম, ঝিলিক দিয়ে ওঠে রক্ত মদির; মজে নেশা- বাসনার ঢেউ।
মুদ্রায় মুদ্রায় নাক্ষত্রিক রূপকথা, শরীর মন্দিরে বিরাজ আরাধনা, ঘরে তাপস ধ্যানে নশ্বর ঘরখানা! কারিগর ঘরামীর ঘরে ঘরে আনাগোনা।

ঘরের ভেতর ঘর, ঘরে থাকে পরে; পরে কে কলকাঠি নাড়ে ঘরে ঘরে?
সুন্দর কী মনোহর ঘর! রূপে রঙে ঝকমক করে, ঘুরে ঘুরে ঋতু রাতদিন অমলিন; ঘর নড়বড়ে ভেঙেচুরে নিশ্চিহ্ন বিলীন।

ঘরে ছিলো নিরাকার ভাব, ভাবনার গভীর; ও ঘর হতে কে দিলো ছুঁড়ে বিষমাখা তীর?

.