সিদ্ধার্থ সিংহের ধারাবাহিক উপন্যাস: পাতাদের ঘরবাড়ি

সিদ্ধার্থ সিংহের ধারাবাহিক উপন্যাস: পাতাদের ঘরবাড়ি

পাতাদের ঘরবাড়ি
সিদ্ধার্থ সিংহ

ট্রেনটা হু-হু করে ছুটছে। ট্রেনের মাথায় লোক। ট্রেনের দরজায় লোক। ট্রেনের জানালায় লোক। এমনকী, ট্রেনের গায়েও যেন লেপটে আছে হাজার হাজার ছোট বড় মাঝারি মানুষ। ট্রেনটার গা দেখাই যাচ্ছে না। বোঝাই যাচ্ছে ভিতরে যারা আছে, তাদের একেবারে চিঁড়েচ্যাপ্টা অবস্থা। দম বন্ধ হওয়ার জোগাড়। মনে হচ্ছে, দরজা-জানালা ঠিকরে বেরিয়ে আসবে লোক। তবু লোক উঠছে তো উঠছেই। যেন ট্রেন নয়, একটা চুম্বক। আর এ-পাশে ও-পাশে লোক নয়, সব যেন এক-একটা আলপিন। ট্রেন যত জোরে ছুটছে, তার চেয়েও দ্রুত গতিতে সাটাসাট তার গায়ে সেঁটে যাচ্ছে লোকজন। যাকে সামনে পাচ্ছে আঁকড়ে ধরছে। যতক্ষণ পারছে ঝুলে থাকছে। না পারলে টপাটপ খসে পড়ছে। কেউ আবার সামনের রড তো নয়ই, দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা কাউকেও ধরতে পারছে না। ট্রেনের গায়ে আছাড় খেয়েই… কেউ কেউ কোনও মতে ঝুলে থাকলেও, এতটাই ঝুঁকে থাকছে যে, ল্যাম্পপোস্টের গায়ে ধাক্কা খেয়ে… নয়তো ট্রেনের ঝাঁকুনিতে হাত ফসকে কিংবা কেউ কেউ আবার ভিতরের চাপ ঠেকিয়ে রাখতে না পেরে দরজা থেকে গলে একেবারে সোজা…
যারা জানে ট্রেনে উঠে কোন ফাঁকফোকর গলে, ফাঁকফোকর না থাকলে কী ভাবে ফাঁকফোকর তৈরি করে কতটা ভিতরে ঢুকতে হয় এবং কখন কোথায় টুপ করে নেমে পড়তে হয়, তাদের মধ্যে টুম্পা একজন। না। বয়স খুব একটা বেশি নয়। মেরেকেটে বছর আঠাশ-ঊনত্রিশ হবে। ছ’ফুটের উপর লম্বা। তেমনই দশাসই চেহারা। গায়ের রং একটু চাপা হলেও যে কেউ দেখলেই এক কথায় স্বীকার করে নেবে, সুদর্শন পুরুষ বলতে যা বোঝায়, ও তা-ই।
সেই টুম্পা ট্রেন থেকে টুপ করে নেমে হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে পড়ল। এ কী জায়গা রে বাবা! চার দিকে শুধু ধু-ধু মাঠ। কোথাও কোনও কিচ্ছু নেই। না-বাড়িঘর। না-লোকজন। না-কুকুর-বেড়াল। থাকার মধ্যে আছে কেবল মাঝেমধ্যে ঝাঁকড়া মাথাওয়ালা এক-আধটা গাছ। আর কিছু নেই!
কিছুই কি নেই! উপরে তাকাতেই ও চমকে উঠল। আদিগন্ত নীলাভ ঝকঝকে আকাশ। পৃথিবীতে যে এত বড় আকাশ থাকতে পারে, ও কোনও দিন কল্পনাও করতে পারেনি। ও হাঁ করে তাকিয়ে রইল।
হঠাৎ দেখল, একঝাঁক বক ডানা মেলে এক দিক থেকে আর এক দিকে ভেসে যাচ্ছে। ওড়ার ধরনটা ভারী অদ্ভুত। দূর থেকে দেখলে মনে হবে বক নয়, তিরের একটা মস্ত বড় ফলার একটা রেখাচিত্র যেন খুব ধীরে ধীরে মোলায়েম ভাবে এগিয়ে যাচ্ছে।
ও বেশিক্ষণ আকাশের দিকে তাকিয়ে তাকতে পারল না। চোখ নামাল নীচে। নীচে একদম নরম তরতাজা সবুজ ঘাস। ওর মনে হল, কেউ বোধহয় এখান থেকে কোনও দিন ঘাস কাটেনি। ফুরফুর করে হাওয়া বইছে। তিরতির করে কাঁপছে ঘাসের ডগাগুলো, ওর ইচ্ছে করল ওদের গায়ে একটু হাত বুলিয়ে দিতে।
ওদের আদর করতে করতে ওর মনে হল, নাঃ, এখানে এ রকম কচি কচি নরম ঘাসের বিছানা দেখেও যদি তার কোলে দু’দণ্ড মাথা রেখে না শুই, তা হলে সেটা হবে গুরুতর অপরাধ। তাই মাঠের মধ্যে বসে পায়ের জুতো খুলে ও গা এলিয়ে দিল ঘাসের বিছানায়।
হঠাৎ কয়েকটা কুকুরের ঘেউ ঘেউ ডাকে লাফ মেরে উঠল টুম্পা। ও উঠতেই কয়েক হাত দূরে যে কুকুরগুলো তারস্বরে এতক্ষণ ডাকছিল, তারা ভয়ানক চেহারা নিয়ে দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে তেড়ে এল। ভয়ে একদম সিঁটিয়ে গেল ও।
যদিও ও কুকুর ভালবাসে। পাড়ার চায়ের দোকানে মাঝে মাঝে ও যখন চা খেতে যায়, তখন চায়ের দোকানের সামনে ঘুরঘুর করতে থাকা কুকুরগুলোকে আরও অনেকের মতো ও-ও বিস্কুট খাওয়ায়। মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। কিন্তু এই কুকুরগুলো তো ওকে চেনে না। কস্মিনকালেও দেখেনি। ওর ক্ষেত্রেও তাই। ফলে এ রকম জনমানবশূন্য একটা জায়গায় ওর মতো অচেনা অজানা একটা লোককে এ ভাবে শুয়ে থাকতে দেখে ওদের নিশ্চয়ই ভাল লাগেনি। তাই ঘেউ ঘেউ করছে। দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে তেড়ে আসছে।
অবশ্য কুকুরগুলো ওর কাছে এসে নাক ঠেকিয়ে বারকতক শুঁকতেই পুরো ব্যাপারটা মুহূর্তের মধ্যে পাল্টে গেল। কেউ সামনের দু’পা ওর বুকে এমন ভাবে তুলে দিল যেন, বহু দিনের চেনা। কেউ লেজ নেড়ে কুঁইকুঁই করতে লাগল। আর কেউ কেউ বসে পড়ে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
টুম্পা যখন বুঝতে পারল, ওর গায়ের গন্ধ শুঁকে এই কুকুরগুলো নির্ঘাৎ টের পেয়ে গেছে যে, ও-ও ডগ লাভার, তখন এই কুকুরগুলোর গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করতে লাগল। ওর আদর খেতে খেতেই কুকুরগুলো কেমন যেন একদম শান্ত হয়ে গেল। ও তখন এ দিকে তাকাল। ও দিকে তাকাল। সে দিকে তাকাল। কিন্তু বুঝতে পারল না কোন দিকে যাবে। ডান দিকে, না বাঁ দিকে। না কি সামনে একেবরে নাক বরাবর। জুতো জোড়া হাতে নিয়ে খালি পায়ে ঘাসের উপর দিয়ে হাঁটলে লাগল ও। হাঁটতেই লাগল। আর ওর পিছু পিছু লেজ নেড়ে নেড়ে আসতে লাগল সব ক’টা তো নয়ই, অল্প কয়েকটাও নয়, শুধুমাত্র একটা কুকুর।

শেফালিকে বকফুলের বড়া ভাজতে দেখে ভ্রু কুঁচকে গেল প্রতাপের। টুম্পা আসবে নাকি?
শেফালি কোনও উত্তর দিল না। ‘টুম্পা আসবে নাকি?’ জিজ্ঞেস করা মানে তার স্বামী যে তাকে কী ইঙ্গিত করছে, শেফালি সেটা খুব ভাল করেই বুঝতে পারল। তবু কোনও কথা বলল না।
— কী জিজ্ঞেস করছি শুনতে পাচ্ছ না?
না। কোনও উত্তর নেই। একমনে বকফুলের বড়া ভেজে চলেছে সে। তাই আবার একই প্রশ্ন একটু অন্য ভাবে ঘুরিয়ে করল প্রতাপ, আমি বেরিয়ে যাওয়ার পর আসবে, না?
এ বার আর চুপ করে থাকতে পারল না শেফালি। বলল, বেরিও না। এখানে চুপচাপ বসে দ্যাখো, ও কখন আসে। তা হলে তো তোমার সন্দেহটা দূর হবে। নিজের ভাগনে, তাকে নিয়েও এত সন্দেহ?
— হ্যাঁ। তাকে নিয়েই সন্দেহ। কই, আর কাউকে নিয়ে তো সন্দেহ করি না। ওকে নিয়ে করি কেন? নিশ্চয়ই কোনও কারণ আছে। ডুবে ডুবে জল খাবে, ভেবেছ আমি টের পাব না, না?

প্রতাপ যখন বিয়ে করে, টুম্পা তখন খুবই ছোট। সবে ক্লাস সিক্সে পড়ে। বিয়ের পর প্রতাপের প্রথম নাইট ডিউটি। টানা এক সপ্তাহ বউ রাত্রে একা বাড়ি থাকবে! যেহেতু বোনের বিয়ে হয়েছে তাদের কয়েকটা বাড়ির পরেই, তাই ও ভেবেছিল, তার বোনকে বলবে রাত্রে এসে তার বউয়ের কাছে থাকতে। পরমুহূর্তেই ভেবেছিল, এটা বলা ঠিক হবে না। কারণ, তারও তো স্বামী-ছেলেমেয়ে নিয়ে ভরা সংসার। ছেলেটা একটু বড়, এই যা। কিন্তু মেয়েটা তো খুবই ছোট। তাই বোনকে সে বলেছিল, আমি তো নাইট ডিউটিতে যাব। ও একা একা থাকবে। যদি ভয়টয় পায়! তাই বলছিলাম… তুই যদি টুম্পাকে একটু রাত্রিবেলায় আমাদের বাড়িতে দিয়ে যাস, তা হলে খুব ভাল হয়। ও শেফালির কাছে শোবে।
বোন বলেছিল, হ্যাঁ, ও তো মস্তবড় একটা লোক। তোর বউকে গার্ড দেবে।
— না না, তা নয়। গার্ডটার্ড না। আসলে সদ্য বিয়ে হয়ে এসেছে তো! পাশে কেউ থাকলে ও একটু বল পায়, এই আর কী! তাই…
প্রতাপের বোন বলেছিল, ঠিক আছে। তোকে চিন্তা করতে হবে না, আমি ওকে খাইয়েদাইয়ে তোর বউয়ের কাছে দিয়ে আসবখ’ন।
প্রতাপের বোন তার ছেলেকে ওর বউয়ের কাছে সে দিন পৌঁছে দিয়ে এসেছিল। শুধু সে দিনই নয়, পর পর ছ’দিন। যে ক’দিন প্রতাপের নাইট ডিউটি ছিল, সেই ক’দিন। শেফালির কাছেই শুয়েছিল টুম্পা। একেবারে গলা জড়িয়ে। জাপটে। কখনও মামির বুকের ভিতরে মুখ গুঁজে।
টুম্পা যে শুধু রাত্রেই যেত, তা নয়। যেহেতু পাশেই বাড়ি, তাই যখন-তখন চলে যেত। এটা সেটা বায়না করত। শেফালিও ওর বায়না রাখত। টুম্পাও ছিল সে রকম। মামি খেতে ভালবাসে ব’লে মামার বাড়ির পিছন দিকে যে বড় বাগানটা আছে, যেখানে সহজে কেউ যায় না, আগাছায় ভরে থাকে— সেই বাগানে ঢুকে নীচে একটা গামছা পেতে গাছটাকে ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে ফলসা পেড়ে দিত। এখানে-সেখানে কাঁটার খোঁচা খেলেও পেড়ে দিত টোপা টোপা কুল। হাতে বেড় না পেলেও মোটা গুঁড়ি বেয়ে কষ্টেসৃষ্টে উঠে পেড়ে দিত এক-একটা চালতা। গুঁড়ি বেয়ে নামতে গিয়ে কত দিন যে বুক ছড়ে গেছে। কালো ডেঁয়ো পিঁপড়ে কামড়ে ধরেছে। তবু ও দমেনি। আর ওর নিজের, ওই বাগানের সবচেয়ে প্রিয় জিনিস ছিল— বকফুল। বকফুলের সময় ও প্রায় রোজই বকফুল পেড়ে এনে শেফালিকে বলত বেসন দিয়ে ভেজে দিতে। দু’-চারটে নয়, ও কোনও কোনও দিন এত বকফুল ভাজা খেত যে, দুপুরে আর ভাতই খেত না।

এখনও বকফুল খেতে ভীষণ ভালবাসে ও। প্রতাপও সেটা জানে। তাই বউকে বকফুল ভাজতে দেখেই প্রতাপ বুঝতে পেরেছে টুম্পা আসবে।
অথচ সব বুঝতে পারলেও প্রতাপ কিচ্ছু বলতে পারে না। কারণ, এ-ও-সে নানা কথা বললেও, এখনও পর্যন্ত শেফালির সঙ্গে টুম্পাকে সে এমন কোনও আপত্তিকর অবস্থায় দেখেনি, যা নিয়ে কিছু বলতে পারে। বরং সে থাকলে শেফালির কাছেও ঘেঁষে না টুম্পা। সারাক্ষণ ‘মামা মামা’ করে। শেফালির মোবাইলে পারতপক্ষে ফোন করে না ও। করে তার মোবাইলে। প্রথমে মামির খোঁজখবর নিলেও পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে তারও খোঁজখবর নেয়। এবং সব শেষে বলে, মামিকে দাও। সেই বলার মধ্যে এমন একটা সরলতা থাকে যে, কিচ্ছু বলা যায় না। আগে থেকে মনে মনে যতই ঠিক করে রাখুক না কেন, এ বার মামিকে ফোন দিতে বললে বলব, মামি সামনে নেই। কিন্তু ও যখন অমন করে বলে, তখন সে-ও যেন কেমন হয়ে যায়। সুড়সুড় করে শেফালির হাতে ফোন তুলে দেয়। এবং শেফালি ওর সঙ্গে কী কথা বলে শোনার জন্য অন্য সময়ে কান খাড়া করে থাকলেও সেই মুহূর্তে কেমন যেন সম্মোহিত হয়ে যায়। কোনও কাজ না থাকলেও ওখানে আর থাকে না। গুটিগুটি পায়ে সরে যায়।
আবার, তাকে ফোনে না পেয়ে শেফালিকে ফোন করলে, শেফালির সঙ্গে কথা বলার পরে, যদি বাড়িতে সে থাকে, তার সঙ্গে কথা না বলে টুম্পা কখনও ফোন ছাড়ে না। এ রকম একটা ছেলেকে কি শুধুমাত্র বাইরের ক’টা লোকের উল্টোপাল্টা কথা শুনে সন্দেহবশত মুখের উপরে দুম করে বলে দেওয়া যায়, তুই আর এখানে আসিস না?
প্রতাপ আর একটাও কথা না বাড়িয়ে কারখানার দিকে পা বাড়াল।

সমীরণদের একান্নবর্তী পরিবার। দু’বেলা মিলিয়ে বিরাশিটা পাত পড়ে। সর্বক্ষণের চারজন কাজের মাসি আনাজপত্র কাটাকুটি থেকে রান্নাবান্না করতে গিয়ে একেবারে হিমশিম খেয়ে যায়। রান্না হয় বাড়ির চাতালে। আগে কাঠের আঁচে হত। কারণ, সমীরণের ঠাকুর্দার ঠাকুর্দা, মানে বৃদ্ধ প্রপিতামহ, যিনি ও পার বাংলার ময়মনসিংহ থেকে এসে এখানে এই বিশাল বাড়িটা বানিয়েছিলেন— তার বেশ কয়েকটা কয়লার খাদান ছিল। অফুরন্ত কয়লার জোগান থাকলেও উনি মনে করতেন, যে জিনিসটা তাঁর অন্ন জোগাচ্ছে, সেটা পোড়ানোর জিনিস হলেও তাঁর বা তাঁর পরিবারের কারও সেটা পোড়ানো ঠিক নয়। পরে অবশ্য তাঁর অবর্তমানে ওই কয়লার ব্যবসা হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার পরে এবং কাঠের দাম হু-হু করে বাড়ার জন্য রান্না করা শুরু হয় কয়লার উনুনে। তখন তার ধুয়ো ছড়িয়ে পড়ত সারা বাড়িময়। ক্ষতি হত বাড়ির দেওয়াল থেকে মেহগিনি কাঠের আসবাবপত্রের। বড়রা ধুয়ো সহ্য করতে পারলেও কষ্ট হত ছোটদের।
সবচেয়ে বেশি কষ্ট হত সমীরণের বড় জেঠুর মেজ মেয়ের। ওর অ্যাজমা ছিল। উনুনের ধুয়ো তো দূরের কথা, সামান্য ধুপকাঠির ধুয়োও সে সহ্য করতে পারত না। কাশতে কাশতে চোখ-মুখ লাল হয়ে যেত। বমি করে ফেলত। বাচ্চাটাকে সবাই খুব ভালবাসত। তাই যে কোনও ব্যাপারেই ওদের বাড়ির বড়রা সবাই মিলে একসঙ্গে বসে মিটিং করে সিদ্ধান্ত নিত। এ ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। বড় জেঠু বলার আগেই অন্যান্যরাই বলেছিল, না। আর উনুনে নয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমাদেরও একটু বদলাতে হবে। যেমন ঠাকুর্দার আমলের কাঠের উনুন থেকে আমাদের বাপ-কাকারা কয়লার উনুনে এসেছিল, আমাদেরও উচিত কয়লার উনুন থেকে গ্যাস-ওভেনে যাওয়া।
একবাক্যে সবাই মেনে নিয়েছিল সেই সিদ্ধান্ত। কেউ কোনও উচ্চবাচ্য করেনি। প্রতিবাদ তো নয়ই। আর সে দিনই ঠিক হয়েছিল, গ্যাস-ওভেন যখন চালু হচ্ছে, তখন তো আর ধুয়োর কোনও বালাই থাকছে না। চোখ জ্বলারও কোনও ব্যাপার থাকছে না। ফলে ধুয়োর ভয়ে দরজা আটকে বাড়ির আর কোনও বউয়েরই ঘরে বসে থাকা চলবে না। কাজের মাসিদের সঙ্গে হাতে হাতে একটু কাজ করতে হবে। কারণ, বাড়িতে ছেলেমেয়ের সংখ্যা বাড়লেও গত দু’পুরুষ ধরে কিন্তু সাকুল্যে সেই চারজনই কাজের মাসি। মুখ পাল্টালেও সংখ্যাটা সেই চারই রয়ে গেছে। ফলে ওদের রান্না করতে করতে দুপুর গড়িয়ে যায়। বাচ্চাদের খেতে খেতে আরও বেলা। আমাদের কথা নাহয় বাদই দিলাম।
সে দিন এই যুক্তিটাও মেনে নিয়েছিল সবাই। তবে কাজের মাসিদের হাতে হাতে কাজ করলেও এ বাড়ির কোনও মেয়ে বা বউ এখন অবধি তো নয়ই, এদের যা গোঁড়ামি, তাতে মনে হয় আগামী একশো বছরের মধ্যেও বাড়ির বাইরে গিয়ে চাকরি করার কথা কেউ কল্পনাও করতে পারবে না। এর আগের প্রজন্মের ছেলেরা পর্যন্ত কেউ কোথাও চাকরি করেনি। চাকরি করার কথা ভাবেওনি। কেউ কেউ ব্যবসার দিকে ঝুঁকলেও অত্যন্ত আনাড়ি এবং অলস হওয়ায় কারণে কয়েক মাসের মধ্যেই সে সব ব্যবসায় ঝাঁপ পড়ে গেছে। এত দিন ধরে ওরা শুধু বৃদ্ধ প্রপিতামহের রেখে যাওয়া বিপুল ধনসম্পত্তি, জমিজমা, সোনাদানা, হিরে-জহরত যা যা ছিল, সব একটু একটু করে বিক্রি করে খেয়েছে। শুধু খায়ইনি, সেই টাকায় বিলাসিতাও করেছে প্রচুর। এক পয়সা রোজগার না করেও পায়ের উপর পা তুলে জীবন কাটিয়েছে।
এখন এই প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা স্কুল-কলেজে সাধারণ, অতি সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে মিশে খানিকটা সচেতন হয়েছে। বুঝতে শিখেছে, তাদের যাবতীয় বিষয়সম্পত্তি এখন তলানিতে এসে ঠেকেছে। এই ভাবে যদি তারাও বাপ-ঠাকুর্দার মতো গা ছাড়া দিয়ে চলে, তা হলে তাদের জীবনটা হয়তো টেনেটুনে কোনও মতে চলে যাবে ঠিকই, কিন্তু তাদের ছেলেমেয়েদের হাতে বাটি নিয়ে পথে বসতে হবে। তাই বাড়ির বাবা-জ্যাঠাদের প্রবল আপত্তি সত্ত্বেও এদের কেউ কেউ চাকরির দিকে ঝুঁকেছে। ঝুঁকেছে সমীরণও।
সমীরণ যে অফিসে কাজ করে, সেখানেই কাজ করে টুম্পা। শুধু টুম্পাকে নয়, ওর অফিসের অনেককেই ও নিমন্ত্রন্ন করেছিল ওদের বাড়ির একশো পঁচিশ বছরের পুরনো অন্নপূর্ণা পুজোয়। যারা গিয়েছিল, তারা বাইরে থেকে ওদের রাজসিক প্রাসাদোপম বাড়ি দেখে চমকে উঠেছিল। চমকে উঠেছিল, বাড়ি-লাগোয়া ও রকম একটা অন্নপূর্ণা মন্দির দেখে। আরও চমকে উঠেছিল, যখন জেনেছিল, এই কারুকার্যখচিত মন্দির-লাগোয়া দালানে অতগুলো বড় বড় ঘরে তাদের বংশের কেউ থাকে না। থাকে বাড়ির কাজের লোকজন আর ঠাকুরমশাইয়ের পরিবার। তারা নাকি চার পুরুষ ধরে এখানেই বসবাস করছে।
এই সব বৈভব দেখে ওর অফিসের সহকর্মীদের মাথা ঘুরে গিয়েছিল। কেউ কেউ বলেছিল, ‘কলকাতার বুকে যার এ রকম একটা বাড়ি আছে, সে তো রাজা রে! তুই চাকরি করিস কেন?’
সে কথা শুনে ওদের অফিসেরই আরেক সহকর্মী, যে আবার সমীরণ আর টুম্পার খুব ভাল বন্ধুও, সেই রঞ্জিত বলেছিল, ‘দাঁড়া দাঁড়া, তোর বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে তোর সঙ্গে একটা সেলফি তুলি। ক্যাপশানে লিখে দেব, পেছনের বাড়িটি আমার বন্ধুর।’
টুম্পা বলেছিল, এটাকে তো এক্ষুনি হেরিটেজ ঘোষণা করা উচিত। না হলে দেখবি, ক’দিন পর থেকেই প্রোমোটাররা তোদের জ্বালাতে শুরু করবে।
সমীরণ বলেছিল, ক’দিন পর থেকে কী রে! সে তো বহু দিন আগে থেকেই জ্বালাতে শুরু করেছে। শুধু একজন নয়, কত প্রোমোটার যে ছুঁক ছুঁক করছে, কী বলব। চল চল, ভিতরে চল।
বাইরেটা দেখে যতটা চমকিত হয়েছিল, ভিতরে ঢুকে ঠিক ততটাই আশাহত হয়েছিল তারা। বাইরে থেকে বোঝাই যায়নি, এই প্রকাণ্ড বাড়িটার অন্দরে ছোট্ট ছোট্ট এত খুপরি থাকতে পারে।
সহকর্মীদের চাহনি আর চোখমুখ দেখে সমীরণ বুঝতে পেরেছিল সব। বলেছিল, আসলে বাড়িটা আগে এ রকম ছিল না। ইয়া বড় বড় ঘর ছিল। দু’মানুষ উঁচু এক-একটা তলা ছিল। কিন্তু থাকলে হবে কী! যত দিন যাচ্ছে, ততই পরিবার বাড়ছে। বিয়ে-থা করছে। আর ততই ঘরের চাহিদা বাড়ছে। আর যখনই চাহিদা বাড়ছে, বড় ঘরগুলোর মাঝখানে দেওয়াল তুলে আরও একটা ঘর বানিয়ে নিচ্ছে। ফলে ঘরগুলো ছোট হচ্ছে। তারও পরে আবার যখন দরকার পড়ছে, ছোট হয়ে যাওয়া সেই ঘরগুলোর ভিতরেও আবার মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে প্লাইউডের পার্টিশন। এই ঘরগুলো দোতলার সমান উঁচু বলে কেউ কেউ মাঝামাঝি জায়গায় কাঠের পাটাতন দিয়ে দোতলাও করে নিচ্ছে। একজন বানালে তার দেখাদেখি অন্য জনেরাও বানাচ্ছে। এই ভাবে যত দিন যাচ্ছে, বড় বড় ঘরগুলো ভাগ হয়ে হয়ে ছোট থেকে আরও ছোট হয়ে যাচ্ছে। এত ছোট হয়ে যাচ্ছে যে, এগুলোকে আর ঘর বলা যাচ্ছে না, মনে হচ্ছে এক-একটা পায়রার খোপ।
ওই রকম দুটো খোপ নিয়ে সমীরণরা থাকে। একটায় মা-বাবা। একটায় ও। আশপাশে যত্রতত্র অগোছালো, অপরিকল্পিত ভাবে ঘর ওঠায় ওর ঘরে না ঢোকে আলো, না ঢোকে বাতাস। না। সমীরণের সহকর্মীরা ওর ঘরে বেশিক্ষণ বসে থাকতে পারেনি। বেরিয়ে এসেছিল।
ফেরার সময় তারা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করেছিল, ওরা তো ইচ্ছে করলে ওদের মন্দির লাগোয়া ওই দালানে গিয়েও থাকতে পারে। অত বড় দালান। ভিতরে বড় বড় অতগুলো ফাঁকা ঘর। চারিদিকে একেবারে খোলামেলা। ওদের ঘরের মতো তো ও রকম ঘুপচি ঘুপচি নয়। তা হলে এখানে পড়ে আছে কেন!
রঞ্জিত বলেছিল, যদি কোনও দিন এই বাড়ি প্রোমোটিং হয়, চলে গেলে তো আর ভাগ পাবে না। সে জন্যই বোধহয় এই ভাবে কষ্ট করে আছে।
টুম্পা বলেছিল, নাঃ। আমার মনে হয়, তা নয়। এর পেছনে অন্য কোনও কারণ আছে। নিশ্চয়ই অন্য কোনও কারণ আছে।

পে অ্যান্ড ইয়ুজ নয়, রাস্তার ধারে পাতি বাথরুমে ঢুকে টয়লেট করতে গিয়ে তিমির দেখল সামনের দেওয়ালে চোখের সামনে এ-ফোর সাইজের একটা পোস্টার মারা। তাতে বড় বড় হরফে টাইপ করা। প্রথমেই ইংরেজিতে শিরোনাম— কলকাতা কুইন। তার পর লেখা— কলকাতার বড় ঘরের মহিলাদের যৌবনের পিপাসা মিটিয়ে প্রতিষ্ঠিত হোন। ১০০% গ্যারান্টির সাথে আমরাই দেখাই প্রতি ‘কল’-এ ২০ হাজার টাকার আয়। রেজিস্ট্রেশন চার্জ মাত্র ১৫৫০ টাকা। কোনও এক্সট্রা চার্জ লাগে না। বিফলে মূল্য ফেরত।
বিশেষ জানতে যোগাযোগ করুন… লিখেই পর পর দুটো মোবাইল নম্বর। আর তার নীচে লেখা— ফোন করার সময়: সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টে পর্যন্ত। রবিবার বন্ধ।
তারও নীচে ইংরেজিতে লেখা— প্লিস নোট। অল মেম্বারস অব এইট্টিন ইয়ারস অ্যান্ড অ্যাবাভ আর রিকোয়েস্টেড। গভর্নমেন্ট রেজিস্ট্রেশন নং— লিখে চোদ্দো সংখ্যার একটি নম্বর।
বাথরুম করা হয়ে গেলেও প্যান্টের চেন আটকে ও আরও একবার খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে ওটা পড়ল। একেবারে তাজ্জব হয়ে গেল তিমির। এ রকম সংস্থা আবার হয় নাকি! তার ওপর সেটা আবার সরকারি রেজিস্ট্রেশন করা!
টয়লেট থেকে বেরোনোর আগে পোস্টারটার ছবি তুলে নিল মোবাইলে। এ রকম একটা বিজ্ঞাপন যে দেখেছে, কাউকে বললে সে যদি বিশ্বাস না করে, তা হলে তখন এই ছবিটা বের করে তাকে দেখিয়ে দেওয়া যাবে।
কলেজে পড়ার সময় ও তার ক্লাসেরই এক বন্ধুর মুখে শুনেছিল, নিউ আলিপুরের রাস্তা দিয়ে কোনও অচেনা পুরুষ দুপুরবেলায় হেঁটে গেলে নাকি আশপাশের দোতলাতিন তলা বাড়ির জানালা দিয়ে মেয়েরা রুমাল ছুড়ে দেয়। উপর দিকে তাকালে তারা ইশারা করে উপরে ডেকে নেয়।
তিমির থাকত গড়িয়ার ভিতরে দিকে বোড়ালে। সেখানটা তখনও অত জমজমাট হয়ে ওঠেনি। সেও ছিল একটু বোকাসোকা। গোবেচারা মার্কা। তাই অতশত না বুঝে সে বলেছিল, ডেকে নেয়? কেন?
ছেলেটি হাসতে হাসতে বলেছিল, ভাইফোঁটা দেবে বলে…
— ভাইফোঁটা! সে তো কালীপুজোর পরে হয়।
— তুই না সত্যি… বলে, বলেছিল— ওই সব মেয়েরা রাস্তার ছেলেদের কেন ডেকে নেয়, ডেকে নেওয়ার পরে তার সঙ্গে তারা কী কী করে, ঠিকঠাক সব কিছু মন জুগিয়ে করতে পারলে সেই সব ছেলের হাতে তারা এক থোকা টাকা গুঁজে দেয়…
তিমির জিজ্ঞেস করেছিল, টাকা দেয়! কেন?
— যাতে সে আবার আসে।
— ওরা কারা? বাড়ির বউ, না মেয়ে?
ছেলেটি বলেছিল, মেয়েও আছে। বউও আছে।
— মেয়ে! মেয়েগুলোর বাবা-মা বাড়িতে থাকে না?
— নিশ্চয়ই থাকে না। হয়তো চাকরিবাকরি করে। কিংবা ব্যবসা।
— আর যারা বিবাহিত? তাদের স্বামীরা বুঝতে পারে না?
— ধুর বোকা। তোকে নিয়ে না পারা যায় না। ওরা কি স্বামীদের সামনে করে? স্বামীরা যখন অফিসে কিংবা ব্যবসার কাজে বাড়ির বাইরে, যখন স্বামীদের ফেরার বিন্দুমাত্র কোনও সম্ভাবনা নেই, তখনই ওরা এ সব করে…
তিমির বলেছিল, যদি কোনও দিন ধরা পড়ে যায়!
— ওরে, ওরা কি অত বোকা নাকি? যারা এ সব করে, তারা তোর চেয়ে হাজার গুণ বেশি বুদ্ধিমতী। রং-ঢং করে বানিয়ে বানিয়ে এমন কিছু বলবে যে স্বামীরাও কাত হয়ে যাবে!
— তাই? কী বলবে?
ছেলেটি বলেছিল, হয়তো বলবে পাশের পাড়ায় একটা ব্লাড ডোনেশন ক্যাম্প হচ্ছে, সে জন্য ও চাঁদা নিতে এসেছে। কিংবা সেলস বয়। অথবা ও প্লাম্বারের কাজ করে। জল ঠিক মতো আসছে না দেখে খবর দিয়েছিলাম। তাই ও চেক করতে এসেছে। আবার ভাইয়ের বন্ধুও বলতে পারে। কিংবা নিজের কোনও বন্ধুর বয়ফ্রেন্ড বলেও চালিয়ে দিতে পারে। বলতে পারে, ওদের মধ্যে মনেমালিন্য হয়েছে তো, ওর নম্বর দেখে আমার সেই বান্ধবী ফোন ধরছে না। তাই ও আমার কাছে এসেছে, যাতে আমি আমার ফোন থেকে ওর সঙ্গে একটু কথা বলিয়ে দিই। আসলে স্বামী কেমন, সেই অনুযায়ী বউরাও সেই মতো একটা না একটা কিছু বানিয়ে ঠিক বলে দেয়। আবার এমনও হতে পারে, দুপুরবেলায় বাড়ির একমাত্র পুরুষ মানুষটি বেরিয়ে যাওয়ার পরে হয়তো বাড়িতে শুধু মা আর মেয়েই থাকে। তখন দু’জনে মিলে একসঙ্গেই হয়তো…
— যাঃ, এ রকম আবার হয় নাকি?
— ঠিক আছে, তোর যদি এটা বিশ্বাস করতে খারাপ লাগে, তা হলে ভেবে নে না, মা আর মেয়ে আলাদা আলাদা ঘরে ঢুকে যায়।
— কী বলছিস তুই? এটা তো শোনাও পাপ। তিমির থ’ হয়ে গিয়েছিল। মনে মনে বলেছিল, ধরণি তুমি দ্বিধা হও…
তবে এ সব কথা বলার পাশাপাশি সেই ছেলেটি নাকি তিমিরকে বলেছিল তার দুর্ভাগ্যের কথা। এক দিন নয়, দু’দিন নয়, দশ দিনও নয়, দিনের পর দিন ভরদুপুরে নিউ আলিপুরের এই ব্লকে ওই ব্লকে চষে বেড়ালেও সে নাকি কোনও দিনই একটা রুমালও তার সামনে পড়তে দেখেনি। কারও ইশারা পাওয়া তো দূরের কথা। ফলে হতাশ হয়ে সে হাল ছেড়ে দিয়েছিল।

বাথরুমের পোস্টারটা পড়েই সে সব কথা মনে পড়ে গেল তিমিরের। মনে মনে নিজেকেই প্রশ্ন করল, আচ্ছা, তখন কি সত্যিই ও সব হত নিউ আলিপুরে! না কি সবটাই মিথ্যে! কিন্তু মিথ্যে হলে ওর কলেজের সেই সহপাঠী ওকে ওই সব কথা বলতে যাবে কেন? আজেবাজে কথা বানিয়ে বানিয়ে ওকে বলে তার কী লাভ!
যদিও এখন ও জেনেছে, কলকাতা এবং কলকাতা সংলগ্ন মফস্সলেও এমন অনেক বিউটি পার্লার বা ম্যাসাজ পার্লার গজিয়ে উঠেছে, সেখানে ও সব নামের আড়ালে যে কী চলে, তা শুধু পুলিশ নয়, একটা বাচ্চা ছেলেও জানে। শোনা যায়, অনেক অবস্থাপূর্ণ বাড়ির বউরা তো বটেই, শুধু পকেটমানির জন্য বহু কলেজ গার্লও জড়িয়ে আছে এ সবের সঙ্গে। কিন্তু তা বলে একেবারে প্রকাশ্যে এই ভাবে বিজ্ঞাপন দিয়ে… ছিঃ ছিঃ ছিঃ!
আচ্ছা, কী রকম ছেলে চায় ওরা! কী রকম! লম্বা চওড়া হ্যান্ডসাম, দেখতে সুন্দর! একেবারে টুম্পার মতো! হ্যাঁ, আমার মনে হয়, সে রকম ছেলেই চায় ওরা। ঠিক আছে, টুম্পার সঙ্গে একবার দেখা হোক, ওকে বলব।

টুম্পা স্নানটান করে চুলটুল আঁচড়ে একটা সাদা ধুতি আটপৌরে ভাবে পরল। তার পর খাটের উপরে উঠে পদ্মাসন হয়ে বসল। সেখানে খানিকক্ষণ চোখ বন্ধ করে কী যেন করল। তার পরেই হঠাৎ গুরুগম্ভীর গলায় মন্ত্রোচ্চারণের মতো করে বলতে শুরু করল, ওঁ ঝাং ঝাং ঝাং হাং হাং হাং হেং হেং…
যত বার এটা বলল, ডান হাতের কড়ে আঙুল থেকে পরপর চারটে আঙুলের মাঝের দুটো কড় বুড়ো আঙুল দিয়ে গুনতে লাগল।
গঙ্গাসাগর নয়, গঙ্গাসাগর মেলা শুরু হওয়ার ক’দিন আগে থেকেই বাবুঘাটের কাছে বিশাল জায়গা জুড়ে একটা অস্থায়ী শিবির গড়ে ওঠে। সেখানে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন দূর-দূরান্ত থেকে আসা তীর্থযাত্রীদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করে। বিনে পয়সায় চিকিৎসা এবং ওষুধপত্রও দেয়। বিলি করে চা, গ্লাস ভর্তি ভর্তি গরম দুধ, মিষ্টি, এমনকী কম্বলও। কোনও কোনও সংস্থা বিনে পয়সায় যেমন তীর্থযাত্রীদের বাড়িতে ফোন করার আয়োজন করে, কোনও কোনও সংস্থা আবার বারবার মাইকে ঘোষণা করে কোন তীর্থযাত্রীর কে এই ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে গেছে, তার নাম-ধাম, ইত্যাদি ইত্যাদি।
ইংরেজি বোঝার প্রশ্নই নেই, যারা বাংলা বা হিন্দিও বোঝে না, সেই সব খোয়া যাওয়া যাত্রীরা যাতে ঘোষণাটা বুঝতে পারে, সে জন্য যাদের লোক হারিয়েছে, তাদের হাতেই মাইক্রোফোন ধরিয়ে দেয়, যাতে তাদের মতো করে তারা বলতে পারে।
সেখানে ছোট ছোট ডেরা বেঁধে সার দিয়ে পরপর বসে থাকে সাধুবাবারা। কারও শরীরে যেমন একচিলতে নেংটিও থাকে না। আবার কারও কারও শরীরে থাকে চোখে পড়ার মতো রংবেরঙের কাপড়চোপড়। কারও কারও সারা শরীরে মাখা থাকে শুধু ছাই। তবে বেশির ভাগ সাধুবাবার মাথাতেই থাকে নানান রকম ছোট-বড় জটা। সেগুলি বিভিন্ন কায়দা করে বাঁধা। কোনও কোনও সাধুর ডেরায় সন্ধ্যা নামলেই খোল-করতাল নিয়ে শুরু হয়ে যায় গানবাজনা। সে সব ঘিরে বেশ ভিড়ও জমে ওঠে। কেউ কেউ একেবারে বিগলিত হয়ে তাদের কাছে হাত দেখায়। নিজের তো বটেই, কেউ কেউ ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যৎও জানতে চায়। কেউ কেউ আবার অতি উৎসাহী হয়ে সাধুবাবাদের কাছ থেকে শিখে নেয় ছোটখাটো টোটকা। তুকতাক করার কৌশল।
টুম্পা যখন কলেজে পড়ে, সে সময় ওদের ক্লাসের তিমির হঠাৎ একদিন মেতে উঠেছিল ওখানে যাওয়ার জন্য। টুম্পাকে বলতে টুম্পাও রাজি হয়ে গিয়েছিল। তবে ওরা দু’জন নয়, যাওয়ার সময় জুটে গিয়েছিল আরও কয়েক জন। সবাই মিলে দল বেঁধে খুব মজা করে পুরো চত্বরটা ঘুরেছিল। এখান থেকে, ওখান থেকে তীর্থযাত্রীদের মতো বিনে পয়সায় চা খেয়েছিল। সাধুবাবাদের কীর্তিকলাপ দেখেছিল। কিন্তু না। যেহেতু বাকি বন্ধুরা ভিড়ের ঠেলাঠেলি সহ্য করে অনেকক্ষণ ধরে মেলা ঘুরে দেখলেও, টপাটপ মোবাইলে ছবি তুললেও সাধুবাবাদের সামনে যায়নি, ফলে ইচ্ছে থাকলেও টুম্পাও সাধুবাবাদের কাছে যাওয়ার কোনও আগ্রহ দেখাতে পারেনি।
পরদিন কলেজ ছুটির পর ও একা একা সোজা চলে গিয়েছিল বাবুঘাটে। আগের দিন যে সাধুটাকে কাঠকুটো জ্বেলে চোখ বন্ধ করে আগুন পোহাতে দেখেছিল, যাঁর বেশভূষা, চেহারা দেখে ভিতরে ভিতরে কেমন যেন একটা টান অনুভব করেছিল, তাঁর প্রতি একটু সম্ভ্রম জেগেছিল। ও সোজা গিয়ে হাজির হয়েছিল সেই সাধুবাবার কাছে। তখন বিকেল গড়িয়ে সন্ধে হব হব করছে। ও তাঁকে প্রণাম করে গ্যাঁট হয়ে তাঁর পাশে বসেছিল।
— কী চাস তুই? ওই সাধুবাবা জিজ্ঞেস করতেই টুম্পা বলেছিল, সব সব।
— সব চাস?
— হ্যাঁ বাবা, আমি সব চাই। সব। চাই সবাই আমাকে ভালবাসুক। আমি যা বলব, সবাই তা করুক।
— ও, বশ করতে চাস? মানে বশীকরণ?
— হ্যাঁ বাবা, তাই।
সাধুবাবা বলেছিলেন, সবাইকে বশ করার আগে সবচেয়ে কাছের মানুষটাকে আগে বশ কর। তার পর তো বাকিরা।
— কী করে করব বাবা?
— একটা কাজ কর। মন দিয়ে শোন। তোকে একটা মন্ত্র বলে দিচ্ছি। এই মন্ত্র জপ করে যার নাম মনে মনে ভেবে পরপর সাত গ্রাস ভাত খাবি, সে-ই তোর বশ হয়ে যাবে।
টুম্পা অবাক হয়ে বলেছিল, তাই নাকি? কী মন্ত্র বাবা?
— আমি একবারই বলব। মন দিয়ে শোন।
— ঠিক আছে বাবা, বলুন।
— ওঁ নমঃ কটবিকট— ঘোররূপিণী স্বাহা। কী রে, মনে থাকবে?
— থাকবে বাবা, থাকবে। মুখে বললেও একবার শুনে যদি মনে না থাকে, সে জন্য আগে থেকেই মোবাইলের রেকর্ডিং করার সুইচটা ও চালু করে রেখেছিল। সাধুবাবাকে বুঝতে দেয়নি।
বাড়ি এসে ওটা চালিয়ে টুম্পা দেখল, রেকর্ডিং হয়েছে ঠিকই, কিন্তু আশপাশের এত শব্দ, কথাবার্তা, পরপর মাইকের তারস্বরে ঘোষণা ওই মন্ত্রের সঙ্গে মিলেমিশে কেমন যেন একটা জগাখিচুড়ি হয়ে গেছে। অনেক চেষ্টা করেও কিছুতেই উদ্ধার করতে পারেনি সেই মন্ত্র। তখন মনে হয়েছিল, বড় ভুল করে ফেলেছে ও। কী দরকার ছিল অত লুকোছাপার? সাধুবাবার মুখের সামনে ধরলেই তো হত। অবশ্য মুখের সামনে মোবাইল ধরলে তিনি মন্ত্রটা আদৌ বলতেন কি না ওর যথেষ্ট সন্দেহ আছে। সবচেয়ে ভাল হত, লিখে নিলে। কিন্তু এই সব গুপ্তমন্ত্র লিখে নেওয়ার রীতি আছে কি না কে জানে!
আর একদিন যাব! মনে হতেই নিজেকে নিজে বলেছিল, আমাকে যদি চিনে ফেলে! কী ভাববে! ভাববে আমি বুঝি মন্ত্রটা ভুলে গেছি! পরমুহূর্তেই তার মনে হয়েছিল, প্রতিদিন এত লোক আসে। কে তাঁকে কী বলে এবং তিনি কাকে কী বলেন, সে সব কথা কি তাঁর পক্ষে মনে রাখা সম্ভব!
টুম্পা তার দু’দিন পরেই ফের গিয়েছিল ওই সাধুবাবার কাছে। তিনি যে ভাবে বলে দিয়েছিলেন, ঠিক সেই ভাবেই ধোয়া জামাকাপড় পরে হাতে একটা তরতাজা জবা ফুল নিয়ে ‘ওঁ চামুণ্ডে জয় জয় স্তম্ভয় স্তম্ভয় মোহয় মোহয় সর্ব্ব সত্ত্বান নমঃ স্বাহা’ মন্ত্রটা উচ্চারণ করে, শুধুমাত্র ওই মন্ত্রের গুণাগুণ পরীক্ষা করার জন্যই শেফালির হাতে ওই ফুলটা দিয়ে বলেছিল, মামি, এটা একটু তোমার কাছে রাখো তো, আমি পরে এসে নিচ্ছি।
কিন্তু তার চব্বিশ ঘণ্টা কেটে যাওয়ার পরেও শেফালি তার বশীভূত হয়েছে কি না, বুঝতে না পেরে ওই সাধুবাবা এই মন্ত্রের পাশাপাশি আরও যে একটা উপায় বলে দিয়েছিলেন, ও সেটাও করেছিল।
একেবারে তিথি, নক্ষত্র, বার, সময় হিসেব কষে শনিবার দিন ভোরবেলায় সূর্য ওঠার অনেক আগেই টুম্পা বিছানা থেকে উঠেছিল। আগের দিন গোটা এলাকা তন্ন তন্ন করে খুঁজে অবশেষে চিহ্নিত করে আসা সেই বটগাছটার কাছে গিয়েছিল। তার পর ঘড়ি দেখে পঞ্জিকার নির্ঘণ্ট মেনে নিশ্বাস বন্ধ করে নিয়েছিল। ওই বটগাছটায় বেয়ে ওঠা একটা ছোট্ট পরগাছাকে মাহেন্দ্র মণ্ডল আর বারুণী মণ্ডলের মধ্যবর্তী সময়ে এক টানে গোড়া সমেত উপড়ে ফেলেছিল। তার পর হাতের তালুতে সেটা পিষে এ বার আর শেফালিকে নয়, প্রতাপের নাকের কাছে ধরে বলেছিল, মামা, গন্ধটা শুঁকে দেখো তো, কেমন কেমন না!
প্রতাপ ওটার মধ্যে প্রায় নাক ঠেকিয়ে খুব জোরে জোরে বারকতক ঘ্রাণ নিয়েছিল। বলেছিল, হ্যাঁ, কেমন যেন একটা জংলা জংলা গন্ধ!
ওই সাধুবাবা বলেছিলেন, ওটা হাতের তালুতে পিষে প্রথমে যাকে গন্ধ শোঁকাবি, সেই তোর বশীভূত হয়ে যাবে। কিন্তু সত্যি সত্যি বশীভূত হয়েছে কি না সেটা বুঝব কেমন করে! মামিও কি তার বশীভূত হয়েছে! সাধুবাবা তো বলেছিলেন, ওই মন্ত্রপূত ফুল যার হাতে তুলে দিবি, সেই বশীভূত হয়ে যাবে। কিন্তু…
সে দিন নয়, তার পরদিনও নয়, তারও বেশ কিছু দিন পরে ঘটেছিল সেই ঘটনাটা। দীর্ঘ দিন লক আউট থাকার পরে সবেমাত্র কারখানা খুলেছে। প্রতাপ তাই কাজে গিয়েছিল। ঘরে ছিল শুধু শেফালি আর টুম্পা। শেফালি তার চেয়ে বয়সে অন্তত পনেরো বছরের বড় হলেও তার কাছে সেটা কোনও বাধাই হয়ে ওঠেনি। আর পাঁচটা গড়পরতা বাঙালি মেয়ের মতো একটু হাইটে ছোট গোলগাল ফর্সা মামিকে সে দিন একেবারে নতুন করে যেন আবিষ্কার করেছিল ও। ওর বারবার মনে হচ্ছিল, যাকে ও ছোটবেলা থেকে দেখে এসেছে, এ যেন সে নয়। একেবারে অন্য কেউ। নতুন কেউ। আর তখনই ও বুঝতে পেরেছিল, সময় লাগলেও তাবিজ-মাদুলি, মন্ত্রতন্ত্র এবং তুকতাকে সত্যিই কাজ হয়।
কাজ যে হয়, তার আর একটা জলজ্যান্ত প্রমাণ তার মামা। তার বউয়ের সঙ্গে ওর সম্পর্কটা যে অন্য দিকে বাঁক নিচ্ছে, সেটার খণ্ড খণ্ড চিত্র মাঝে মধ্যেই তার চোখের সামনে পড়ে গেলেও সে দেখতে পেত না। অবলীলায় পাশ দিয়ে চলে যেত। ওদের দু’জনের মেলামেশা নিয়ে কেউ কিছু বলতে গেলেও সে শুনত না। বরং হেসে উড়িয়ে দিত।
একবার তো ওর নিজের বোন রিচিই পাশের বাড়ির কার মুখে ওর আর মামির ব্যাপারটা শুনে বাড়িতে এসে তুলকালাম কাণ্ড বাধিয়েছিল। তার আঁচ গিয়ে পড়েছিল মামার বাড়িতেও। তখন স্বয়ং প্রতাপই ওর পক্ষ নিয়ে রিচিকে বুঝিয়েছিল। বলেছিল, কে কী বলছে সেটা নিয়ে তুই মাথা ঘামাবি? না, যেটা সত্যি সেটা বোঝার চেষ্টা করবি? ওর মামি তো পরে। আগে তো আমার বউ। ওদের মধ্যে সত্যিই যদি তেমন কোনও সম্পর্ক গড়ে উঠত, আমি টের পেতাম না! চুপচাপ বসে থাকতাম? আমাকেও তো অনেক লোক অনেক কিছু বলে। আমি কি তাতে কান দিই? সত্যিই যদি কিছু হত, তা হলে তো সবার আগে আমিই আপত্তি করতাম। তাই না? আসলে এগুলো কি জানিস তো, প্রত্যেক এলাকায় এ রকম কিছু লোক থাকে। যারা নিজেরা ভাল থাকতে জানে না, অন্যকেও ভাল থাকতে দেয় না। এর-তার নামে কুৎসা রটিয়ে আনন্দ পায়। একটু খোঁজ করলেই দেখবি, আসলে এদের নিজেদের ভিতরেই গলদ রয়েছে। তোকে যারা এ সব বলেছে, তারা হচ্ছে ওই প্রকৃতির লোক। মন থেকে এগুলো একদম ঝেড়ে ফেল। আমি বলছি, তোদের কোনও চিন্তা নেই। আমি তো আছি। লজ্জায় কাউকে মুখ দেখাতে পারবি না মানে? তোর কি মনে হয়, তোর দাদা ও রকম? তবে? ছাড় এ সব। কী খাবি বল?
এই সব দেখেই টুম্পার মনে হল, তালুতে পেষা ওই ছোট্ট পরগাছার গন্ধটাই বুঝি তার মামার চোখে পট্টি পরিয়ে দিয়েছে। কিন্তু চিরটা কাল রাখবে কি!
এই ‘কিন্তু’টা মনের মধ্যে খচখচ করতেই ও আবার গিয়েছিল সেই সাধুবাবার কাছে। তার পরের দিনই ছিল মকরসংক্রান্তির পুণ্যস্নানের শেষ দিন। তাই বাবুঘাটের তীর্থযাত্রীদের অস্থায়ী শিবিরে তখন চলছিল তল্পিতল্পা গোটানোর তোড়জোড়।
তিনি ওকে চিনতে পেরেছিলেন কি না অনেকক্ষণ কথা বলেও টুম্পা তা বুঝতে পারেনি। তাই সংগঠকদের বাসে চেপে গঙ্গাসাগরের উদ্দেশে রওনা হওয়ার আগে শেষ যে উপায়টা তিনি বাতলে দিয়েছিলেন, সেটা সে দিনই বাড়ি ফিরে এসে রাত জেগে করলেও তাতে কোনও ফল হয়েছিল কি না, ও টের পায়নি। এমনও হতে পারে, ওর সেই তুকতাক করার কৌশলের মধ্যেই হয়তো কোনও গলদ থেকে গিয়েছিল। কিংবা মন্ত্রোচ্চারণের মধ্যে ছিল সামান্য কোনও ত্রুটি। হতেই পারে। আচ্ছা আচ্ছা লোকের ভুল হয়, আর সে তো কোন ছাড়! আবার এমনও হতে পারে, ও যে পদ্ধতিতে করেছিল, সেটার কার্যকাল ছিল এত অল্প সময়ের যে, তার গুণাগুণ টের পাওয়ার অনেক আগেই ওই মন্ত্রের ক্ষমতা বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। তাই আজ, এত বছর পরে আবার সেটা করতে বসেছে ও।
সাধুবাবা বলেছিলেন, তোকে সাধারণ বশীকরণ বা বিশেষ বশীকরণের মন্ত্র বলিনি। এটা হচ্ছে পুরশ্চরণসিদ্ধ বশীকরণ মন্ত্র। এমন ভাবে ‘পুরশ্চরণসিদ্ধ’ উচ্চারণ করেছিলেন, টুম্পার মনে হয়েছিল, এটাই বশীকরণের সবচেয়ে মোক্ষম মন্ত্র। সবচেয়ে।
তিনিই বলে দিয়েছিলেন, মন্ত্রটা একেবারে একটানা পাঁচশো বার উচ্চারণ করতে হবে। একবার বেশিও না। একবার কমও না। একেবারে গুনে গুনে পাঁচশো বার। আগেকার দিনে মন্ত্র গোনার জন্য মারবেলের মতো ছোট্ট ছোট্ট সোনার বল ব্যবহার করা হত। সোনার বল না পেলে ব্যবহার করা হত রুপোর বল, মণি, মুক্তো, পলা, রুদ্রাক্ষ বা স্ফটিক। তবে আমি বলি কি, সবচেয়ে ভাল হল আঙুলের কড় গোনা। এর চেয়ে ভাল এবং নিরাপদ আর হয় না। তবে আঙুলের প্রথম কড় আর ডগা ধরা যাবে না। ওটা করলেই মন্ত্রটা নিষ্ফলা হয়ে যাবে। আর যত বার মন্ত্রটা জপ করবি, প্রতিবার মন্ত্র উচ্চারণের আগে একটা ‘ওঁ’ বলে নিবি। ওটা হচ্ছে সুতলির মতো। একটা মন্ত্রের সঙ্গে আর একটা মন্ত্রকে জুড়ে দেয়। ‘ওঁ’ উচ্চারণ না করলেই, যতই মন্ত্র পড় না কেন, মন্ত্রগুলো টপ টপ করে খসে পড়বে। ফলে সারা রাত ধরে মন্ত্র জপ করলেও কোনও কাজ হবে না। আর যদি নিয়ম-নিষ্ঠা মেনে একেবারে ঠিকঠাক মতো করতে পারিস, তা হলে শুধু মানুষই না, এই মন্ত্রের জোরে অসুর, দেবতা, যক্ষ, নাগ, রাক্ষস, স্থাবর এবং জঙ্গম— সবাই, সবাইকে বশীভূত করতে পারবি।
টুম্পা বলেছিল, আজ তো এখান থেকে চলে যাচ্ছেন। এর পর যদি আপনার সঙ্গে দেখা করতে চাই, তা হলে কোথায় যাব? মানে, আপনি কোথায় থাকেন, যদি ঠিকানাটা একটু বলেন…
— ঠিকানা! হাওড়া চিনিস? উদয়নারায়ণপুর? দামোদর নদ?
— না চিনলেও চিনে নেব, বলুন না… দরকারটা তো আমার…
সাধুবাবা বলেছিলেন, ওই দামোদর নদের কাছে একটা বড় রক্ষাকালীর মন্দির আছে। ওখানে গিয়ে আমার খোঁজ করবি। বলবি, আমি সাধুবাবার বাড়ি যাব, সবাই দেখিয়ে দেবে।
— কোনও পোস্টাল অ্যাড্রেস নেই, না?
— ও সব কিচ্ছু লাগবে না। ওখানে গিয়ে খোঁজ করলেই আমাকে পেয়ে যাবি।

সাধুবাবার কথা টুম্পার খুব বিশ্বাস হয়েছিল। তাই স্নানটান করে চুলটুল আঁচড়ে একটা সাদা ধুতি আটপৌড় ভাবে পরেছে। খাটের উপরে উঠে পদ্মাসন হয়ে গুরুগম্ভীর গলায় বারবার উচ্চারণ করে যাচ্ছে— ওঁ ঝাং ঝাং ঝাং হাং হাং হাং হেং হেং, ওঁ ঝাং ঝাং ঝাং হাং হাং হাং হেং হেং, ওঁ ঝাং ঝাং ঝাং হাং হাং হাং হেং হেং…

খবরটা এসে পৌঁছতেই গোটা পাড়া থ’। সবার মুখেই এক কথা, এ কী মা-বাবা রে! চারিদিকে এত কিছু ঘটছে, এ সব দেখেও ছেলের দিকে একটু নজর দেয়নি! ওরা কি খবরের কাগজটাগজ পড়ে না, না টিভি দেখে না… শেষে কিনা স্কুলের শিক্ষকমশাইদের এ সব দেখতে হবে… কালে কালে কী যে হল!
ওদের মালির বাগান অঞ্চলটা বেশ কিছু দিন আগে কলকাতা একশো পঞ্চাশ হিসেবে পিন কোড নম্বর পেলেও ওটা আদতে শহরতলিই। শুধু শহরতলিই নয়, গ্রাম বলতে চোখের সামনে যে ছবি ফুটে ওঠে, খানিকটা সে রকমই। সোনারপুর স্টেশন থেকে অটোতেই লেগে যায় আট-দশ মিনিট।
— মাধ্যমিক পরীক্ষায় যদি ফার্স্ট ডিভিশন পাস, তা হলে তুই যা চাইবি তাই দেব। রোকনের বাবা এ কথা বলতেই রোকন বলেছিল, ঠিক আছে, শুধু ফাস্ট ডিভিশন নয়, ফাস্ট ডিভিশনের সঙ্গে আমি তোমাকে অন্তত দুটো লেটারও এনে দেব।
না। শুধু দুটো লেটারই নয়, মাধ্যমিকে ও স্টার পেয়েছিল। বাবা এত খুশি হয়েছিলেন যে, সে দিনই ব্যাঙ্ক থেকে কড়কড়ে একগাদা টাকা তুলে ওকে সঙ্গে করে মোবাইলের দোকানে নিয়ে গিয়ে বলেছিলেন, নে, তোর যেটা পছন্দ হয়, নে।
রোকন নিয়েছিল। ফেরার সময় বাবা বলেছিলেন, এ বার আর এখানে নয়, ইলেভেন-টুয়েলভটা তোকে কলকাতার স্কুলে পড়াব। পরীক্ষায় শুধু স্টার পেলেই তো হবে না। একটু চালাক-চতুরও হতে হবে। সব কিছু জানতে হবে। শিখতে হবে। শহরমুখী হতে হবে। সেটা শহরে না গেলে হবে না।
রোকন বলেছিল, ঠিক আছে।
রোকনের বাবা রোকনকে ভর্তি করে দিয়েছিলেন কলকাতার গোলপার্কের কাছে একটি নামকরা স্কুলে। ওখানে ভর্তি করার আর একটা কারণ ছিল, ওই স্কুলের সামনেই রামকৃষ্ণ মিশন। ওখানে স্পোকেন ইংলিশ শেখায়। স্কুল ছুটি হয়ে গেলে ছেলে যাতে একটু হেঁটেই টুক করে ওখানে গিয়ে ওটা শিখতে পারে, সে জন্য।
বালিগঞ্জ পর্যন্ত ট্রেনের মান্থলি কেটে দিলেও একটা ছেলের দৈনিক হাতখরচা যতটা লাগার কথা, ওর বাবা হিসেব করে তার থেকেও অনেক অনেক বেশি টাকা দিতেন রোকনকে। ছেলেকে যাতে কখনও সমস্যায় পড়তে না হয়।
সেই টাকা বাঁচিয়ে রোকন যে মোবাইলে ইন্টারনেট ভরে, ওর বাবা সেটা অনেক পরে জেনেছিলেন। যখন দেখেছিলেন, ছেলে সারাক্ষণই ফোন নিয়ে হয় ঘাঁটাঘাঁটি করছে, নয়তো কানে হেডফোন গুঁজে এক মনে গান শুনছে।
আগে রাত এগারোটা বাজলেই যে ছেলে শুয়ে পড়ত, এমনকী মাধ্যমিক পরীক্ষার সময়ও এর অন্যথা করেনি— সে কিনা ইদানীং রাত দেড়টা-দুটোতেও মোবাইল নিয়ে বসে থাকে! বাথরুম করতে উঠে কত দিন ওর বাবা দেখেছেন। কোনও কোনও দিন হয়তো বলেছেন, কী রে, এখনও ঘুমোসনি? অনেক রাত হল যে। এ বার শুয়ে পড়। সকালে উঠতে হবে তো।
— হ্যাঁ, এই তো শুচ্ছি।
অনেক বেলা করে ঘুম থেকে উঠত রোকন। তবু ওকে ওর বাবা-মা কোনও বকাঝকা করতেন না। ছেলে বড় হয়েছে, কখন কোন কথায় মনে আঘাত পাবে, কখন কী করে বসবে, কিছু বলা যায়! এই তো ক’দিন আগেই, গায়ে হাতও তোলেননি, বাবা সামান্য একটু বকেছেন দেখে ওঁদের এলাকারই একটা ছেলে সোজা চিলেকোঠার ঘরে গিয়ে গলায় গামছা বেঁধে ঝুলে পড়েছিল।
ছেলে যাতে কোনও আঘাত না পায় সে জন্য যে বাবা-মা এত তটস্থ থাকেন, সেই বাবা-মাকেই কিনা শুনতে হল…
ক’দিন ধরেই ওদের ক্লাসের বায়োলজির শিক্ষক রোহনকে খেয়াল করছিলেন। কেমন যেন একটু মনমরা ভাব। আগের মতো পড়াশোনাতেও আর মন নেই। ক্লাসের মধ্যেই মোবাইল নিয়ে সারাক্ষণ কী যেন করে।
আসলে বেশ কিছু দিন যাবৎ ব্লু হোয়েল গেম নিয়ে গোটা পৃথিবী জুড়ে খুব হইচই হচ্ছে। রাশিয়ার এক মনস্তত্ত্বের ছাত্র ফিলিপ বুদেকিং নাকি এই আত্মঘাতী নীল তিমির খেলাটা তৈরি করেছিল। পঞ্চাশ পর্বের এই খেলাটা একেবারে নেশার মতো। একবার শুরু করলে ওটার কবল থেকে বেরিয়ে আসা খুব মুশকিল। মাঝপথে ছাড়াও যায় না। এবং প্রতিটি পদক্ষেপই শুধু যে ঝুঁকিপূর্ণ, তা নয়। এতটাই ঝুঁকিপূর্ণ যে, শেষ পর্বে যাওয়ার অনেক আগেই কেউ কেউ একেবারে পৃথিবী ছেড়ে চলে যায়। এই খেলায় যেমন আছে মধ্যরাতে উঠে ভয়ঙ্কর ভয়ের সিনেমা দেখা, তেমনই আছে বহুতল বাড়ির ছাদ থেকে ঝাঁপ দেওয়া, আছে হাতের উপরে ধারালো কিছু দিয়ে তিমি মাছ আঁকা।
এই খেলায় মেতে উঠে কত ছেলেমেয়ে যে বাবা-মায়ের কোল শূন্য করেছে, হিসেব নেই। তাই শুধু বাবা-মা কিংবা নিকট আত্মীয়স্বজনদের উপর ভরসা রাখতে পারছে না। মহামারির আকার নেওয়া এই খেলাটাকে বন্ধ করার জন্য সরকার নিজেই উঠেপড়ে লেগেছে। নতুন নতুন অনেকগুলো সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তারই একটা হল, স্কুলে স্কুলে সচেতনতা শিবির। ছাত্রছাত্রীদের উপরে শিক্ষকদেরও নজর রাখতে বলা হয়েছে। আর এটা হওয়ার ফলেই…
বায়োলজির সেই শিক্ষকের হঠাৎ কী মনে হল, তিনি সোজা রোকনের কাছে গিয়ে বললেন, এই তোর জামার হাতাটা একটু গোটা তো।
— কেন স্যার?
— গোটা না…
প্রথমে ইতস্তত করলেও শিক্ষকের চাপের কাছে নত হয়েছিল রোকন। এবং জামার ফুল হাতাটা আস্তে আস্তে উপর দিকে তুলতে শুরু করেছিল। আর তখনই শিক্ষকমশাই একেবারে চমকে উঠলেন, যা সন্দেহ করেছিলেন, তাই। ছাত্রের হাতে ধারালো ছুরি জাতীয় কোনও কিছু দিয়ে একটা তিমি মাছ আঁকা। সঙ্গে সঙ্গে খবর দেওয়া হল হেড মাস্টারের কাছে। স্কুল সেক্রেটারির কাছে। স্থানীয় থানায় এবং রোকনের বাড়িতে।
মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল সেই খবর। মুহুর্মুহু সম্প্রচারিত হতে লাগল নিউজ চ্যানেলগুলোতেও।
রোকনের আত্মীয়স্বজনেরা ফোন করে বারবার খোঁজখবর নিতে লাগলেন। কেউ কেউ সোজা বাড়িতে এসে হাজির হলেন। পাড়ার মেয়ে-বউরা গুজগুজ ফুসফুস শুরু করে দিল। থানা থেকে অনেক বুঝিয়ে-সুঝিয়ে রোহনকে জিপে করে বাবা-বাছা করে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে গেলেন। ওর বাবা-মাকে বলে গেলেন, ওর হাতের সামনে ছুরি, ব্লেড, এমনকী জ্যামিতি বক্সের কম্পাসও রাখবেন না। ও কিন্তু ওই কম্পাস দিয়েই খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হাতের মধ্যে ওটা এঁকেছে। ও নিজেই সেটা স্বীকার করেছে। বলেই, পকেট থেকে রোকনের মোবাইলটা বের করে ওর বাবার হাতে দিয়ে পুলিশ অফিসারটি বললেন, এটা আপনার কাছে ক’টা দিন রাখুন। ওকে দেবেন না। আর ওর দিকে একটু খেয়াল রাখবেন। ওর ল্যাপটপ বা ডেস্কটপ নেই তো?
রোকনের বাবা বলেছিলেন, না। ও সব নেই।
কিন্তু পুলিশের জিপ চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই চোখ-মুখ পাল্টে গেল রোকনের। মোবাইলের জন্য কেমন যেন মরিয়া হয়ে উঠল সে। বাপ-বেটায় শুরু হয়ে গেল তর্কাতর্কি। চিৎকার-চেঁচামেচি। মোবাইল নিয়ে কাড়াকাড়ি। ধাক্কাধাক্কি। যেন দক্ষযজ্ঞ বেঁধে গেছে বাড়িতে।
আশপাশের লোকজন ছুটে এল। খবর পেয়ে পাশের বাড়ি থেকে হাজির হল টুম্পা। এতক্ষণ ধরে গোটা বাড়িময় দাপাদাপি করলেও টুম্পাকে দেখামাত্রই রোকন যেন একটু কেমন হয়ে গেল। মনে হল, ওকে দেখেই একটু দমে গেছে। ধীরে ধীরে শান্ত হতে লাগল সে। ওটা দেখে কেউ কেউ মনে মনে বলল, শান্ত হবে না? ও রকম দশাসই চেহারা আর মাসল দেখলে আচ্ছা আচ্ছা উগ্রপন্থীরাও ঝটপট করে এসে সব অস্ত্র জমা দিয়ে আত্মসমর্পণ করবে। আর ও তো ও…
যে ছেলেটা কারও কথায় কর্ণপাত করছিল না, শুনছিল না কারও অনুরোধ-উপরোধও, কেউ কিছু বলতে গেলেই কেমন যেন মারমুখী হয়ে উঠছিল— সেই রোকনের চোখের দিকে তাকিয়ে টুম্পা মাত্র একবার বলতেই সুড়সুড় করে টুম্পার পিছু পিছু পাশের ঘরে চলে গেল রোকন।
মাত্র মিনিট পাঁচেক। দরজা বন্ধ করে টুম্পা ওকে কী বুঝিয়েছে কে জানে! যখন দরজা খুলল, সবাই দেখল— কোথায় সেই উগ্রচণ্ডী রোকন! এ তো শান্ত দিঘির চেয়েও শান্ত, শীতল। একেবারে টলটল করছে।
বাইরে বেরিয়ে রোহন নিজেই একটু আগে বাবার হাত থেকে জোর করে কেড়ে নেওয়া মোবাইলটা বাবার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, বাবা, এটা এখন তোমার কাছে থাক। আমি কয়েক দিন পরে নেব…
ছেলের কথা শুনে শুধু রোকনের বাবাই নন, এতক্ষণ ধরে উদ্বিগ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা পাড়া-প্রতিবেশীরাও অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল রোকন আর টুম্পার দিকে।

রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে টুম্পা যখন দেখল মোবাইলের চার্জ একদম তলানিতে এসে টিপ টিপ করছে, তখন মোবাইলটা অফ করে চার্জে বসিয়েছিল ও। যত সকালেই উঠুক না কেন, ঘুম থেকে উঠেই ও যাতে দেখতে পায় ফুল চার্জ হয়ে গেছে। কিন্তু এ কী! ফোন খুলেই ও দেখল, আটখানা মিসড্ কল! আর প্রত্যেকটা ফোনই মামির। মামি তো সাধারণত ওকে ফোন করে না। তা হলে কি কোনও গণ্ডগোল হয়েছে! কাল রাতে তো মামা বাড়ি ছিল! তা হলে! সঙ্গে সঙ্গে রিং ব্যাক করল টুম্পা। তিনটে রিং হতে না হতেই শেফালি ফোন ধরল, হ্যালো…
— ফোন করেছিলে?