শৈবাল আদিত্যের কবিতা
পা-হাড়ের আদিকাব্য
[…মথুরার মেদোনী-বার্গীপাল সোজমেঘ সাজুরি উরি যায়
জুনোপহরে ভিজে মোন হারেয্যেয়ে সুরনত কৃষ্ণার বুগ ভাজি থায়।
~কবি সুহৃদ চাকমা]
…সেইসব সুসুদূরে ফেলে আসা পদচিহ্ন…সহস্রীয়ান পা-য়ের ছাপ;
আজো দ্যাখো আমাদের হাড়-অস্থি-মজ্জা-রক্তগত উঠোনে
জলছবির মতন লেগে আছে! কী দাপটে চষে বেড়ায় নাগরিক মনঃস্তাপ
এবং আকাংখার অলি-গলি, আমি চুপিচুপি ‘আমাকে’ বলি; সেও শোনে।
কড়কড়ে কড় গুণে আবিষ্কার করতে থাকে প্রপিতামহের সাহসের দেনা
আর যা’ কিছু দৃশ্যমান; সহস্রাব্দের নিরেট প্রতিশিল্প; সুসবুজ পাহাড়…
তার বিশালত্বের কাছে এতটুকুন গোলমরিচের মতন সেই ‘আমি’ কত কী বোঝে; ক্ষুদ্রত্ব বোঝেনা!
আমার পা ও হাড়ের পেশী ও শিরায় সোঁদা সুঘ্রাণ ঢেলে দিয়ে গ্যাছে মহাকাল; বিস্তৃত অপার।
আমি-আমরা ও আমাদের ইতিহাস যতই অণু-পরমাণু ডিঙিয়ে শূণ্য হয়ে যাই; অসীম মহাশূণ্য!
স্বপ্নীল নীলমেঘ ধর্ষিতা পাহাড়ী বালিকার গগনবিদারী কান্না হয়ে টুপ-টাপ ঝরে পড়ে
সবুজের প্রান্তরে…যেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে প্রতিবাদের লাল ছোপ ছোপ অরণ্য!
‘পাহাড়ী’; ‘উপজাতি’; ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’…এরকম আরো আরো কটাক্ষ শব্দের মৌন ঠোঁটও নড়ে।
আমার পা ও হাড় আমাকে শুধায়, কিহে অহমবাজ সহজিয়া সনাতনী ডিঙিয়ে
কতটুকুন হয়েছ ভিন্ আরব্য সিন্দাবাদ? মনন-যুদ্ধ; মল্ল-যুদ্ধ শেষে চকচকে তরবারীর বীর!!
মহেনজোদারো-হরপ্পার পলিতে ঠিকই গাঁথা আছে ইতিহাস, সময়ের প্রলেপ দিয়ে
মুছে ফেলা যাবে কি চৌদ্দপুরুষের নাম? শেকড়ের পুণরুত্থান কখনো রয়না স্থির।
প্রস্তর-পর্ব
১.
পাথরে ফোটেনা ফুল…সবজি-ফল-বৃক্ষও বটে!
মানুষ পাথর হয় অতি দুঃখ-শোক-সন্তপে…
পাথর বিশালতা ও নিরেটের প্রতীক ভূ-তটে।
একদা স্বনাবিস্কৃত মানুষ বনে-বাদাড়ে-ঝোঁপে,
সংসার বানাতে শিখেছিলো পাথরের গুহায়…
পাথরে পাথর ঘষে জ্বেলেছিলো আশ্চর্য আগুন,
প্রথম অস্ত্র বানিয়েছিলো পাথুরে; আত্মরক্ষায়।
একে একে প্রকাশ করেছিলো মানুষ স্বীয় গুণ!
সে সকল প্রস্তর-যুগ ইতিহাস, বিস্তর যুগে
পাথর ছেড়ে নেমেছে মানুষ সুসবুজ ভূমিতে—
চিনেছে মূল্যবান রত্ন-পাথর সৌন্দর্য হুজুগে!
পাহাড়ের বুক চিরে বানিয়েছে পথ জনহিতে।।
২.
মানুষের কলা-শিল্প-পূর্বপুরুষের উপাখ্যান,
‘শিলালিপি’ তুলেছে মানুষ কত মাটি খুঁজে-খুঁড়ে…
সুউচ্চ পাথর চূঁড়া জয়ে বাজি ধরে স্বীয় প্রাণ
জয়ী হয়ে লেখাচ্ছে নাম ইতিহাসের পৃষ্ঠা জুড়ে!
ধর্মতে আরবদেশে শয়তানের গায়ে পাথর ছোঁড়া হয়—
কাবাঘরে ইব্রাহিম নবীর পা ছোঁয়ানো পাথরে;
হাজার বছরে কোটি কোটি চুম্বনে ধরেছে ক্ষয়।
সম্রাট শাহজাহান প্রিয়তমা বিহনে ব্যাকুল কাতরে
অমূল্য পাথরে গড়েছেন আশ্চর্য ‘তাজমহল’!
বিশ্ব শাসন করা মহারাণীর মুকুটে হীরক বড়;
ভূ-ভারতের ‘কোহিনুর’ কেড়ে নিয়ে গ্যাছে লুটেরার দল!!
বিনিময়ে আমাদের করে গ্যাছে দুই-তিন ভাগ…
আমাদের ভেতরের যে অস্তিত্বের প্রস্তর; জড়—
জাগুক প্রাণ তাতে, প্রতিবাদে ক্রীতদাস-পাথর জাগরে জাগ্।।
‘র’ কবিতা
দ্যাখো, সন ধান লাগিয়েছি আমাদের মাঠে।
এবার আনন্দের মৌসুম জুড়ে
মুখর বৃষ্টি নামুক,
সরু সরু প্রচল আলের রেখা ভেঙে
নেচে নেচে কৃষ্ণ-কৃষক;
গেয়ে যাবো ফসলের গান ফসিলের গান
চন্দ্রাহত দুঃখিনী নদীর গান
কচুরীফুলের ছলছলে ডাগর চোখে
ভেসে ভেসে বেজেছিলো বীণা,
উজানের সুর আর তাবৎ স্রোতের ইতিহাস।
ও আমার পাললিক ভূমি
ও আমার অন্তর্পাঠ…
আমায় ধ্যানস্থ কর অপার মৌনতায়
আমায় জলস্থ কর শেকড়ের গায়
আমায় নতজানু কর
সুসুন্দরের প্রতীক্ষায়।