মো. আরিফুল হাসান এর কবিতা
তীর্থমুনি
নীল জ্যোৎস্নার মতো একদিন লিয়েভ তলস্তয়
জলের উপর দৌঁড়ে এসে চোখেমুখে ভয়
ধরলেন আমার হাত
বললেন,
গিয়েছিলাম তীর্থ করতে, হলাম কুপুকাৎ
হারিয়ে এসেছি নিজের মন্ত্রপুত বীজ
নিজ হতে হয়ে গেছি নিজেই খারিজ
ভুলে গেছি নিজ নাম একদম একেবারে।
এমনই এক ভোরে
লিয়েভ তলস্তয় এসে দরজায় কড়া নাড়ে
ডাকছে বারে বারে
দার খুলে দিলাম আমি শীর্নদুটো হাতে
তলস্তয় বসলেন আমার সাক্ষাতে।
বললেন,
যাচ্ছিলাম সিদ্ধ হতে সিদ্ধিদাতার বাড়ি
পথিমধ্যে শুনতে পেলাম তোমার মহামারি
নিজের যা পথের সম্বল, গুরুর জন্য দান
সবই দিলাম
গ্রহণ করে করো পরিত্রাণ।
আমি বললাম,
সিদ্ধি আপনি পেয়ে গেছেন পৌঁছে যাবার আগে
মন ও মনুর সেবার সাথে আর কিছু কি লাগে?
মদভাষার সংলাপ
মাত্র ছ’ সেকেন্ড!
তোমার জন্মমৃত্যু
একটি সাকো
হীরের আর চুলের
মতো তার বিস্তার।
অতিক্রম অনস্বী
অথচ গামাযুগে
ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধি
দুজনের প্রেমচিঠি
পুড়িয়ে নিঃস্ব করে।
মাত্র ছ’ সেকেন্ড!
তুমি ছাইভষ্ম হলে
হলরুমে স্মরণসভা
অপেক্ষমান শব্দান্ত
জ্বলে উঠে –
পরিচিতির অনুবাদে।
কুমির কান্নায়
বিগলিত বিড়ম্বনা
বিদেহী পুরুষদের
মনোতাপের প্রহসন।
মেঘসন্ধ্যায়
মেঘের বাকলের ভেতর থেকে
মাছের চোখের ডিমের মতো একটি চাঁদ
ধোঁয়াশার মতো আলো দিচ্ছে
সে আলোতে রাত্রিটা যেনো চুল খোলে
দাঁড়িয়ে আছে বারান্দার গ্রীল ধরে।
কোনো তারা নেই আকাশে
জমাট অন্ধকারের দেহে শুধু মেঘের বাকল
জড়িয়ে রেখেছে নেশাতুর দৃষ্টিবৃক্ষকে।
বুকে জমা ব্যাথা
কী কথা লিখবো আমি এতোদিন পর
কার কাছে কে বলবে কিসের খবর
কাগজে মোড়ানো কিছু হরফের যাদু
প্রার্থনা করি আমি নিবেদন স্বাদু
স্বাদু কিংবা অসাধুতা কী আছে দোয়াতে
যে কথা লিখতে চাই নিজের বরাতে
করাতে শানাই করে কাঠুরিয়া এক
দ্রোহের বাতিচ্য ভুলে কালের বিবেক
যে কথা লিখবো আমি লিখবো পরমে
সেই কথা কাকে জানি মেরেছে মরমে
কার দিলে চোট-ব্যাথা গাঢ় হয়ে আছে
কার ঘরে দুঃখ কই কার কার কাছে
কে শুনিবে ইন্দ্রজাল কথার ধনুক
কে দেবে বুকের পাটা কার হেন বুক
উজবুক আমি তাই লিখে যাই মুঢ়
যে কথা আজাব হয়ে আছে সমারূঢ়
বিদিত কি অবিদিত যে কথা সবাই
জানা আছে তবু বলে জানা নাই, নাই
একেবারে ভুলে গেছি সকলে যে কথা
সেকথা বলবো আমি বুকে জমা ব্যাথা।
বাইরে বাদলধারা, ভেতরে আগুনের নদী
তুমি বলবে, মশাল। আমি দেখছি নিভন্ত জোনাকপোকা। কি তারাদের তিমির! অবাক অসহায়, হায়! কারুনের ধনসম্পদ।
নিজেকে নিস্পন্দ রেখে জীবনের, খেয়াঘাটে ভিড়িয়েছি জলজ জাহাজ। মানুষের আদিরূপ দেখে, মৃত্যুর ভয়ে আমি হয়েছি কাতর।
তারপর, কিছু বারুদের নেশা, কিছু ঈশ্বরের আগুন, নিজের মালসায় তুলে এনে বলেছি ডাহুক। হায় যাযাবর রাত, ঘুম নেই!
তবুও সম্মুখ থেকে সময়ের ত্রাসের লগন, চেরাইয়ের শব্দে শুনি নিজ নাম, নিজস্ব আগুন। রুগ্ন শিয়রের মতো একা স্থবির।
আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে তখন শুধুই বাদল। বাইরে রিনিকঝিনিক বাজে, ভেতরে পোড়ায়। আগুনের নদী এক নিভৃতে বয়ে যায়।
নদীর নামতা
জানালার কাঁচে জমে আছে কুয়াশা
মেঘের শরীরে লেগে আছে কাঁটাতার
পারাবার এ শূণ্য জগৎ শুধুই দুরাশা।
ঘোলা দু’টো চোখ দেখে না অগ্নি পথ
কর্ণিয়া জুড়ে মৃত আধারের চিৎকার
সৎকার করে দিতে হবে সে মনোরথ।
বিকেলদৃশ্যে ঝরে পড়ছে বরফদানা
নাগরিক ঘুমে মুমূর্ষু যুথ বন্দি শিবির
আবির-মিশ্র জন্মবন্ধা পাখির ডানা।
গাছের পাতারা ধরে আছে মরিচিকা
পতঙ্গভুক উদ্ভিদের বর্ণ চেহেল করে
থরেথরে প্রাণ ভরে আছে বিভীষীকা।
নদীর নামতা সাঙ্গ হয়েছে আজ এই
সঙ্গমে; তবু তুমি যেন নেই, আমি নেই।