গৌতম মণ্ডলের কবিতা

গৌতম মণ্ডলের কবিতা

কাচের দেওয়াল

আমাদের শেষ আকাশবার্তায় কোনো হাহাকার ছিল না,
হয়তো ছিল, যা থাকবার কথা ছিল না
একটা আতস কাচের কাছে এসে ও চুরমার করে দিতে চাইল তীক্ষ্ণ বিভেদের দেওয়াল,
আমি চাইলাম অন্য পথ,
সব আতস কাচ বিজ্ঞানের দান নয়
কিছু কিছু থাকে যা বিজ্ঞান ছাড়া কিংবা বিজ্ঞানের
শত্রুতা দিয়ে বানানো,
তার সিদ্ধান্তই ঠিক ছিল তাই,
তবে বড় কঠিন,
পাহাড় সরানোর মতো কালক্ষয়ী।
এখানে এই ক্রান্তিকালে এসে আমি তাকে ভালোবাসি প্রাণের মতো,
পূজা করি, দুব্বা ধানের মাঙ্গলিক চ্ছটায় ভোর রাতে
সমস্ত অবৈধতার সীমা অতিক্রম করে যাই অবহেলায়।
সে গালিবের উদ্ধৃতি রাখে দেওয়াল জুড়ে,
উৎসবের মরশুমে আকাশে আকাশে ছড়িয়ে দেয়
শুভেচ্ছাবার্তা,
বদ্ধ ঘরে বিছানার পাশে আলতা পরে দাঁড়িয়ে থাকে
ঈশ্বরীর মতো,

ভূ-কম্প হলে পাহাড়ও সচল হয়,
মানুষ সম্ভ্রমে দেখে
নদী গতিপথ পাল্টে চলে যায় ঢালমতো
ভূগোলের থিসিস লেখে পণ্ডিতেরা
অথচ, নিশ্চিত মৃত্যুই সব শেষ জেনেও
নিমগ্ন সৈকতে বসে দেশি মদ গেলার আগেই
চোখে ভাসে সেই আতস কাচ,
অবচেতনে লালন সাঁই হয়ে যায় দীর্ঘ পথ যাত্রী,
তবুও থমকে দাঁড়ায় আতস কাচের সম্মুখে।

প্রিয়, অন্ধকারের গা বেয়ে বৃষ্টির মতো ঘুম লেগেছে
দু’চোখ জুড়ে,
মায়াময় জ্যোৎস্নার জলে ভিজে যাচ্ছি দিনরাত,
প্রেতাত্মার মতো সমস্ত জ্যোৎস্না জুড়ে প্রাচীরের মতো
দাঁড়িয়ে আছে আদিম আতস কাচ,
আমি তাকে ভাঙতে পারিনি
আমার শৈশবের হালহীন নৌকা দিকচিহ্ণহীন,
আদিগন্ত আরত তার গলুই এর গতি,
তবুও আটকে যায় বার বার পরিচিত আতসকাচের
খুন খারাপি দেওয়ালে।

আমি ভাঙতে পারিনি প্রিয়,
ভাঙার সবচেয়ে বড় বিপদ নির্মম কাচে রক্তিম করা নিজেকে,
অসংখ্য টুকরো ফুলেল ছদ্মবেশে ছয়লাপ হয়ে থাকবে আমার পথে, তোমার পথে, আমাদের পথে।

আমি পারিনি প্রিয়, পারবোনা ভাঙতে কাচের দেওয়াল।

ছাতা

পথ চলবার জন্য কী কী দরকার হয়?
মা বলতো একটা ছাতা আর গামছার খুঁটে বাঁধা
এক সের মুড়ি।

আমার দাদুর সেগুলো কিছুই ছিল না
তাই নিজের মতো করে একটা রাস্তা বানিয়েছিল
সেই রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে অকস্মাৎ এক দিন দাদু অদৃশ্য হ’য়ে গেছিল।

আমার মা’র কাছে ছাতা ছিলনা,
এক খাবলা মুড়ি বাঁধা ছিল একটা পুরানো গামছার খুঁটে,
হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ স্টপেজবিহীন
মাঝ রাস্তায় থেমে গেছিল বিগড়ে যাওয়া বাসের মতো,
যদিও আমি কখনো ঘনিষ্ট কোনো বাস কে ছুঁতে দেখিনি শেষ স্টপেজ;

ছাতা ছাড়া পথ চলা সত্যিই বিপদের,
রক্তক্ষরণের মতো বৃষ্টির জলে মাঝে মধ্যে
তারা খসার মতো দৌড়ে আসে হাড় হিম করা শিল,
মা বলতো,পারলে কোনোদিন ছাতা হয়ে যাস,
বিশাল মিছিলের উপর আকাশের মতো পুরু একটা ছাতা;
মাথার উপর একটা শক্ত ছাতা থাকলে
গামছা আর মুড়ি জোগাড় করা অনেক সহজ হয়ে যায়।

দরজা

আমি কোনো মানুষ নই, একখানা ঘর
তার একটা নাম আছে, সাকিন আছে
বছর বছর জমা দিতে হয় সরকারি কর
ঝড়ে কাঁপে জলে ভেজে দহন হয় কত আঁচে।

জানলা আছে, দরজা গরাদ ও গ্রিল
সবাই জানে ঘরের ভিতর খাট আছে বিছানা
আরো কত কিছু আছে! মিল গরমিল
সব আছে পাশাপাশি অনেকেই জানে না।

আমি কোনো মানুষ নই, একখানা ঘর
ঘরের ভিতর দেওয়াল আছে, শূন্য কিছু শূন্য
ছোট্ট ক’টা বাক্স আছে এবং চরাচর
ঘরের ভিতর গোলাপ আছে এবং একটা তূণও।

বন্ধ ঘরের দরজা খানা কেমন করে খোলে?
ভাঙতে পারো অস্ত্র হাতে কিংবা গোলাপ ফুলে।