তমিজ উদ্দীন লোদী’র কবিতা
কোমা থেকে ফিরে এসে
দীর্ঘ কোমা থেকে বেরিয়ে সে দেখলো অচেনা আকাশ আর হাসপাতাল জুড়ে ওষুধ আর জীবাণুনাশকের গন্ধ । শুভ্রপোশাকের সেবিকা আর তাদের জুতোর খুটখাট। সে দেখলো
তার মৃত্যুর(!) পর কাগজ জুড়ে আবক্ষ ছবি । শোকবাণী ।
সে দেখলো পাখিরা গাইছে । নদীগুলো স্রোতোবাহী ।
রাস্তায় রাস্তায় শ্লোগান ,ব্যারিকেড । সঙ্গিন উঁচিয়ে শৃঙ্খলাবাহিনী ।
সভায় সভায় একইরকম চেঁচানো । একইরকম গলাবাজি ।
হুস শব্দে চলে যাওয়া রাজন্য ও তার হুইশেলবাহিনী ।
সে দেখলো
তিমিরে পড়ে থাকা প্রান্তিক মানুষেরা ,জনতার ঢল
ছিন্নমূল মানুষের হাহাকার ,অন্ধকারের সাতকাহন ।
একই সমান্তরালে আমলা ও পুলিশ
কলম ও ব্যাটন ।
তাকে ছাড়া থমকে গেল না তো কিছুই !
থেমে নেই কিছু । যথাযথ আছে সব ।
কিছুই আটকে নেই বরং চলছে সব ঠিকঠাক । কিন্তু সে তো শুনেছে ,বারবার শুনেছে
তাকে ছাড়া চলবে না এ রাজ্যের কিছুই ।
তাহলে চলে। কারো জন্য কিছুই আটকে থাকে না শেষতক !
আত্মহনন কিংবা কবির গল্প
তুমি যখন আত্মহননের পরিকল্পনা করছো কিন্তু ডিসিসন নিতে পারছ না কিভাবে করবে । তখন আকাশের এপার-ওপারে রঙধনু উঠেছে, গোধূলির ওপারে শুধু লাল ।
আমি তোমার এই ভয়ংকর পরিকল্পনা জেনে পালিয়ে এলাম গ্রামে । তখন ধানকাটা হয়ে গেছে । মাঠ ব্যেপে ন্যাড়াগুলো তখনো সটান। রাতে জ্যোৎস্নার হলুদের সাথে মাঠের হলুদের মাখামাখি ।
তখন মুনিশেরা বিড়ি ফুঁকছে। তামুকের গন্ধে ভারি হয়ে আছে বাতাস । রাত ব্যেপে ঝিঁঝিদের ক্রেংকার আর বাথানে জাবর কাটার শব্দ ।বাদুড় উড়ছে আর গর্ত থেকে বেরিয়ে এসেছে ইঁদুর । বাঁশঝাড় নুয়ে যাওয়া আর শেষরাতে ঝাঁকবেঁধে পাখি উড়ে যাবার শোঁ শোঁ আওয়াজ। এই সবের মধ্যেও আমি দেখেছিলাম তোমার মুখ বেঁকে যাওয়া একটি ট্রাপিজিয়ম যেন । সুন্দর বিকৃত হলে যেমন হয় ।
তখনই আমি অনেকদিন অবহেলায় পড়ে থাকা বইগুলো ঘাঁটি। পুরনো বইয়ের পাতার আড়ালে ভয় তাড়াতে থাকি । খুঁজে পাই রত্নরাজি । তখন আমার আর কোনো গন্ধ ছিল না পুরনো বইয়ের গন্ধ ছাড়া । মূলত সেই থেকেই আমার কবিতায় ভেসে যাওয়া ।
আমি যখন কবিতায় বুঁদ তখনই জেনে যাই তুমি আত্মহননে নয় বরং হননেই ভেসে গেছো ।
বোর্হেসের গল্পের মতো
বোর্হেসের গল্পের মতো বৌদ্ধিক জগৎ পেরিয়ে
আমরা যখন নৈর্ব্যক্তিক প্রতিবাদী, তখন শহর পুড়ছিল
জলের আগুনে । গ্রামে গ্রামে মড়ক । তবু ক্ষুধাতুর মানুষের
নিরব প্রস্তুতি , বিপ্লব । মানুষ নেমেছিল প্রকৃত আগুনে ।
জল ও কাদা হয়েছিল শিলা। স্তরে স্তরে মজ্জা এবং রক্ত ।
প্রান্তিকেরা জেগেছিল আড়ম্ভরহীন। কাস্তে তখন অস্ত্র ।
তখন শৃঙ্খলিত কবিতা গ্রন্থাগারগুলোতে তালা। মৌন মানুষেরা
হাঁটছে দমদেয়া পুতুলের মতো।
তবু গোলকধাঁধা আর জাদুবাস্তবতার দেয়াল পেরিয়ে আমরা শিলায় শিলায় বিদ্যুৎ ফলিয়েছিলাম ।
সেইসব কালোছায়া
তুমি খুঁজে বেড়াচ্ছো অন্ধকার
অথচ তোমার চারপাশে অন্ধকার ছড়িয়ে আছে
তুমি তো বটে তোমার ছায়াটিও হারিয়ে গেছে সেই অন্ধকারে
আর তোমার সেইসব কালোছায়া নৃত্য করছে
গোপী গাইন ও বাঘা বাইনের ভূতুড়ে বাক্সের ভেতর ।
যেসব নক্ষত্রের আলো ১,৮৬০০০ মাইল বেগে ধাবিত হয়ে আজও এসে পৌঁছায়নি পৃথিবীতে
সেসব নক্ষত্রের মতো তুমিও মুখ লুকিয়ে আছো আঁধারের আড়ালে
তবু ভূপৃষ্ঠের ধার করা আলোয় তোমার অস্পষ্ট মুখ ভাসছে
পারদখসা আয়নায়
তোমার ঝাপসা ও ভাঙাচুরা মুখ মুখব্যাদান করে বসে আছে যেন
কিংবা গড়ুরের মতো পাখা মেলে উড়ে যাচ্ছে অভিশপ্ত আকাশে ।
শহর থেকে বেরিয়ে
অবশেষে আমরা রাস্তাটি পেলাম। দুপাশে প্রচুর প্রপলার,আঙুরের ঝোপ আর বেরি গাছ। পাতা বেয়ে রোদ নেমেছে। রোদের রঙ হালকা সবুজ । টিয়ের গায়ের রঙের মতো ।দূরে দূরে মানুষ , হাঁটছে ছায়াসঙ্গীর ধরনে।
আস্তাবল থেকে ভেসে আসছে ক্ষুর ঠোকা আর হ্রেষার শব্দ। স্বাস্থ্যবান ঘোড়াগুলো লোমের জেল্লায় স্ফুরিত। কয়েকটি মোরগ শান্ত ভঙ্গিতে ঘাস খুঁটছে । খড়গুলো সাজানো । নান্দনিক কোনো শিল্পের ম্যুরাল যেন ।
শহর থেকে বেরিয়ে বহুদিন পর এই দৃশ্যে অভিভূত শ্বাস নেয়া গেল ।