তনিমা হাজরার কবিতা

তনিমা হাজরার কবিতা

বর্ষামঙ্গল

প্রথম কদম ফুলটি ছিল গাছের কাছের ডালে,
মন দিয়েছে মুখ্যু মেয়ে কিশোরী খেয়ালে,
কৈ সে ডাকে, কৈ ডাকে না,কৈ পাড়ে সে, কৈ পাড়ে না,
লোহার বাসরঘর,
মনসা গোঁজে খোঁপার কাঁটায় সাপের সাদিক বর, শাপজড়ানো বাপপেয়ারে
সহজ লখীন্দর,
বর নাকি সে অভিসম্পাত, শয্যা পুড়ে ছাই, সগগো কাঁপান নাচ দেখবেন
যমের সোদোর ভাই,
সোদোর নাকি অধর মাটি, সোনার কাঠি, রূপার কাঠি
ঘুম ধরেছে, খুব যেন সে, চোখ জুড়ানো, পাখ মেলা সে, স্বপ্ন কাঁচা খায়,
বেউলো সতী আত্মরতি স্বমৈথুনে বায়,
খায় সে জীবন, মনের মতন পলান্ন ভোগ চড়ে,
বর্ষা লেগে কদম স্তবক কাদায় ঝরে পড়ে,
প্রেম সে অবুঝ, হা কুচকুচ, কার সে চাবুক, কার বন্দুক,
বেউলো ক্যানে ভাসে, কলার মান্দাসে,
সাপের চুমুক, বিষকম্বুক, শালের পাতে ছলকানো দুধ,
লোহার বাসর, ঝাঁঝট কাঁসর, বিদ্রোহী আয়ুধ।।

চিন্ময়জীবন আর খাগের অক্ষর

কবে অকস্মাৎ মরে যাবো কে জানে,
সব্বাই টেনেটুনে সোজা চিতায় উঠিয়ে দিয়ে কাজ সেরে নিতে ব্যস্ত হয়ে পড়বে,
জ্বালিয়ে রাখ করে দেবে মুহূর্তে সব কিছু, মৃত ভেবে-

এই অচ্ছুৎ শরীর তামাদি মামলার মতো অমীমাংসিতই থেকে যাবে,
তার আগে চল দেখে নিই নিজেকে
আয়নায়,
এই জীর্ণ তন, এই জীর্ণ মন,
যতক্ষণ আছে, যতক্ষণ।।

এই জন্মদাগ, এই প্রিয় তিল,
এই পড়ন্ত নরম মাংসে লেখা গান গোধূলির,
শেষ রোদ্দুর মেখে
এখনো কি দারুণ করুণ অশ্লীল।।

এই উঠে যাওয়া নখ, এই ক্ষয়ে যাওয়া শোক, এই জ্বলে যাওয়া শেষ কাঠ,
এই হিম হয়ে নিভে যাওয়া অঙ্গার,
এই তো অলকানন্দা গতিপথ
একদার ।।

যাবার আগে তোকে আমার কানের লতির পাশে রাখা সেই তিলচিহ্ন দিয়ে যাবো, যদি ডাকিস যেখানেই থাকি
ঠিকই শুনতে পাবো।।

এই মায়া মাখিয়ে জারিয়ে রাখা কাঁচাতেঁতুলের মতো প্রৌঢ় প্রেম,
ছেড়ে যদি হঠাৎই চলে যাই,
তবে যেন তেষ্টা পাওয়া পেত্নী হয়ে রাতভর দিগন্তে চেঁচাই,
” ওগো, তালা খোলো, তালা খোলো, খুঁজে দাও চাবি”।
কানে ফিসফিস হয়ে কি তখন পার্শ্বে দাঁড়াবি,
যেন বিশ্বস্ত চিতাকাঠ,
নিজে পুড়ে পুড়ে কি আমাকে পোড়াবি,
মাংসজন্ম পার করে কি এগিয়ে দিবি ছাইজন্মের দিকে ।।

ছাই, ছাই, ছাই।
চল ছাই হয়ে উড়ে যাই।

বৈতরণী, বৈতরণী, এক সিকে বৈ কই কোনোদিনও অধিক তো দাওনি পারানি,
বটের পাতায় চড়ে ঘিয়ের প্রদীপ দুলে দুলে দুলে,
এখন কেজানে যাবে কোন কূলে,

কে সোহাগ করে নেবে খুলে
ব্যথিত স্তনের উপর রাখা বাদামী অঙ্কুর,
শিশুর পিপাসা হয়ে,

যে পারে এইসব কাজ,
তার হাতে দেব আজ,
এই চিন্ময় জীবন আর হলুদ পাতায় লেখা যত খাগের অক্ষর।।

আমি আর সময়

সময় যখন আমার চলমান পায়ে
আঘাত করল,
আমি হাঁটু মুড়ে বসে,
কান্নায় ভেঙে পড়ে
সময়ের কাছে
করজোড়ে প্রাণ ভিক্ষা চাইলাম।।

সে নিজেকে আমার প্রভু ভাবলো।।

তাই সে আরও শক্তিশালী হয়ে ,
আমার মাথায় আঘাত করল,
আমি তখন সংজ্ঞাহীন হয়ে
লুটিয়ে পড়লাম।।
আমাকে মৃত ভেবে
সে নিশ্চিন্ত হয়ে চলে গেল।।

ও বুঝতেই পারলো না যে,
আমি তখন সাষ্টাঙ্গ হয়ে
জীবনকে প্রণাম করছি।।

তুমি গন্ধ পাচ্ছো

তুমি কি মৃত্যুর গন্ধ পাচ্ছো,
জীবনের গন্ধ পাচ্ছো না কি
তারও চেয়ে অনেক বেশি?

কিভাবে ধর্মকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে
দাতার রক্ত গ্রহীতার দেহে কুলুকুলু স্রোতে মিশছে।।

কিভাবে হিংসাকে ব্যঙ্গ করে
ভালবাসা আজ দিকে দিগন্তে খিলখিল করে হাসছে।।

অরুণাংশু,
বোধহয় এমন মারীর
প্রয়োজন ছিল খুব,
জীবনের স্বাদ, জীবনের ঘ্রাণ হারিয়েছিলাম সবাই,
মাপতে পারিনি শরীরে, চেতনায়
দীর্ঘমেয়াদী প্রবল সে চোরাজ্বর,
জীবনের মুখোশ এঁটে শরীরে শরীরে
বাসা বেঁধেছিল মৃত্যু সে ভয়ংকর।।

সব রোগ, সব শোক, সব জ্বর সেরে গিয়ে
এখন সুস্থ হচ্ছে দুনিয়া,

পৃথিবী জুড়ে মানুষ এখন নূন্যতম সাধ বুঝছে।।

আবার ঘ্রাণেরা, আবার স্বাদেরা শরীরে চেতনায় মৃদুপায়ে ফিরে আসছে।।

রূপকথার জামা

মামীমার কথা বলতে গেলে
আমার জন্মদিনে তার বানানো হাজার রঙের কুঁচিদার ফ্রকটার কথা
মনে পড়ে।।

আমার ঊনত্রিশ বছরে বিধবা হওয়া তিন সন্তানের মা মামীমা,
আলুসেদ্ধ, লঙ্কাপোড়া আর এক তরকারী নিরামিষ ভাত খাওয়া মামীমা কি করে যে দেওর ননদ বা বোনেদের এতো উথলে পড়া দাম্পত্যসুখ
দেখে তার মধ্যে ডুবে থাকতে পারতো
এমন নির্মল প্রাণে,
সবাইকে ভালবাসতে পারতো এমন করে,
সেকথাটা আমার বড্ড মনে পড়ে।।

মামার তখন চাকরিতে লক আউট।
সংসারে ভাত নেই,
তাই,
নিরুপায় মামীমা যে রেলগাড়িটায় ছেলেমেয়ে নিয়ে ননদের বাড়ি কলকাতা যাচ্ছিল,
বিষ্ণুপুর ষ্টেশনের একটু আগে গাড়িটা হঠাৎই দাঁড়িয়ে গেল,
মামীমা জানালা দিয়ে গলা বাড়িয়ে জিজ্ঞাসা করেছিল, কী হয়েছে গো?

রেললাইনের পাশ থেকে একটা দেহাতি লোক বল্ল, একটা মদ্দলোক কাটা পড়েছে গো, সব সাফ হলে তবেই
টেরেন ছাইড়বেক।

সেইলোকটা আমার মামা ছিলো,
আমার দায়িত্ব এড়িয়ে পালিয়ে যাওয়া মামা।।

ছেলে-মেয়ে-স্ত্রী-মা সবার দায়িত্ব এড়িয়ে পালিয়ে যাওয়া মামাকে আমার একটুও মনে পড়ে না।

আমার ঘা খেতে খেতে সন্তানদের জন্য প্রতি পলে পলে প্রাণপাত করে ক