জয়তী দাসের কবিতা

জয়তী দাসের কবিতা

অভিন্ন রূপ

এভাবে আরো কিছুক্ষণ যদি জাগিয়ে রাখো,
তবে আমি রাত্রি খুঁড়ে খনন করি তোমার আমার চোখ।

দেখো কী নিস্পৃহ সেই ঢেউ, যেখানে জেগে আছে সাগরের আর্তনাদ,
জলবিম্বে নিঁখুত আত্মপ্রতিকৃতি এঁকে যাচ্ছে এই সময় –

অথচ কেউ জানেই না আমারই মতো –
আমাদের সেই অদৃশ্য রচনাকারকে কোনো জাদুকর আখ্যা দিইনি –

হয়তো প্রত্যাবর্তিত সবকিছু, আমরা জানতামই না –
হঠাৎ কোনো কিছু এসে যাওয়াও নয়..

নীল দু’হাতে ভরে ওঠা অমৃত কলসি পুঁতে রেখেছি ভালোবাসায়-
খরা ও বন্যার বলিরেখা পেরিয়ে মিলবো একই অক্ষরেখায় –

শুধু আরো কিছুক্ষণ জাগিয়ে রাখো..
প্রতিবিম্বের মুখোমুখি তুমি আমি ও সময়!

হাওয়ামহল

এই মুহূর্তে যেন কোথাও নেই আমি…
শুধু সেই গানটা আমাকে ওর রেণু ছড়ানো ভিজে বাতাসে
ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছে বারবার..

কেউ কী কখনও লুকিয়ে বাঁচে- প্রশ্ন অরণ্যের!
অরণ্যের ঘরবাড়িতে পাখিদের তৈরী জানলা কেমন দেখতে!

তানসেনের তানপুরাটা একবার ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে করছে,
কালিদাসের মতো হাত-পা বেঁধে জলে সাঁতার দিতে ইচ্ছে করছে –

অলৌকিক যদি হঠাৎ এসে আমার সেই লাল ফ্রকটা এনে দিতো-
ওর গায়ে আমার বাবার ছুঁয়ে যাওয়া কয়েকটা পশমি সকাল জড়িয়ে দিতাম..
দিতাম ঈষৎ লালচে শাসন, হলদে মিহি আদর-

আর কবে কোথাও আমাদের দেখা হবে কিনা জানি না-
ছোঁয়াচ জেনে গা বাঁচিয়ে বাঁচিয়ে, মৃত্যুকে যদিও ধার করছি না-

ইচ্ছেঘড়িটা শিয়রে রেখে কখনও যদি প্রদীপ জ্বেলে যেতাম পরমায়ুর আতুরে,
মৃত্যু নামক দস্যুটাকে একটা সুন্দর খাঁচাবাড়ি করে আটকে দিতাম চিলেকোঠায়-

যখন তখন পাখিরা হারিয়ে যায়- মানুষের জামা পড়ে!
অলৌকিক সেই বাঁশিটা নিজেও যদি জানতো- ফুল কেন দেহত্যাগ করে!

আমরা তো গুটিপোকা হয়ে জন্মান্তরের কাগজে বারবার হাতেখড়ি দেবো না…
হাওয়ামহলের সাতশো লক্ষ দরজা, বোকা জীবনকে রেখেছে নিজস্ব পুতুল করে-

মেঘ বৃষ্টি

সেদিন বৃষ্টির খোঁজে আমাদের বহুদূর ছিলো তৃষ্ণা
নদীমেঘ আমাদের খুব কাছাকাছি, ছুঁয়েছে গন্ডুষ
আমাদের তৃপ্তি হলো কই ?

তুই পেলি না বৃষ্টি, আর আমি মেঘ-

অন্ধকার ডুবে আছে সেই নিঃসীম জ্বলে থাকা লন্ঠন –
দূরের আকাশে কত তারা নক্ষত্রদের থেকেও ছোটো !
আমরা শুধু আলোর দিকেই চেয়ে রইলাম- আলো জ্বাললাম
বাতি নেভালাম—

তুই পেলি আলো ! না আমি অন্ধকার—

আসলে হয়তো আমাদের এই জন্মান্ধ তৃষ্ণা,
উনুনের গনগনে শিকের থেকেও তৃষ্ণার্ত—
ভয়ঙ্কর এক পতঙ্গের সাথে দিনরাত্রি লড়াই !

তুইও ছিলি দলে – সঙ্গে আমিও

আমি অন্ধকারে নেমে দেখি তুই এক কোমর বৃষ্টি ছুঁয়ে-
আমি কেমন করে মেঘকে ডেকে দিয়েছিলাম তোর’ই ঘরে !
তখন কি জেনেছিলাম আমরা আসলে আলোতেই আছি

শুধু সামনের মেঘটা তুই আর আমি বৃষ্টি

সে ও আমি

সে আমার সামনে এলেই
আমি যেন কেমন কাঠপুতুল হয়ে যাই..
বর্ণ মাত্রা ধ্বনিগুলো এর ওর গায়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ে!

একটা শব্দও সাজিয়ে গুছিয়ে উচ্চারণ হয় না
বই থেকে শেখা আজও পর্যন্ত যা, কণ্ঠনালির চারপাশে ঝুলতে থাকে –
আলগা করতে পারিনা, নিজস্ব কথা গুলো –

এক ভাষার মানুষ যেমন করে,
অন্য ভাষাভাষীকে হাত নাড়িয়ে বোঝায় তার কথা
ঠিক তেমন টাও নয়..

পাহাড় যেমন করে আওড়ায় বন্য ভাষা
আকাশ যেমন করে মাটির সাথে কথা বলে,
ঠিক সেভাবে কিনা ভেবেছি অনেকবার..

একসময় দেখি
সে হাজার শব্দ দিয়ে আমার মনের কথাগুলো
সাজিয়ে রেখে গেছে আমারই ঘরে…

মনে থাকে যেন

আমাকে ঘুমাতে বলে তুমি চলে যাবে অন্য কারোর গল্পে..
সে আমি কখনই মানবো না বলে দিলাম

তুমি অন্য কোনো ডাকবাক্সের ভেতরে গিয়ে, বর্ণমালা বেঁধে বেঁধে পাখির বাসা বানাবে!
এ আমি স্বপ্নেও ভাবতে পারবো না –

দূর পাহাড়ের মেঘ রাজ্যে ভেসে ভেসে তরুণী রোদের ঠোঁটে, বুনে যাবে অক্ষর বিতান!
কখনই তোমাকে ক্ষমা করবো না কিন্তু –

সেই যে গায়ে পড়া বৃষ্টি মেয়ে, ইলশেগুঁড়ির ঝুরো ঝুরো জুঁই ফুলে ভেজায় তোমায় দিনে রাতে –
ওকে ভীষণ ঈর্ষা করবো বলে দিলাম –

কফি হাউসের তন্বী মেয়েটির পড়ে থাকা রুমাল তুমি ভুলেও হাতে ধরিয়ে দিয়েছো –
এ জনমে তোমাকে কোনোদিন স্পর্শ করবো না, মনে রেখো..

মনে থাকে যেন, হাজার ঘুম আমাকে ঘুমের দেশে নিয়ে গেলেও এই গ্রহেই তোমার হাতে দিয়ে গেছি একমাত্র আমার ভালোবাসার স্মারক আংটি,

তাকে ফিরিয়ে দেওয়ার স্পর্ধা একবারও দেখিও না –
ঘুম কী কেবল অসুখ, লতায় ডালে ঘাসে তারায় জোনাকির কাজলে মুছে নেবো সেইসব অক্ষর চিরকুট –

কবিতার সিঁড়ি বেয়ে তোমাকে নিয়েই খুঁজে যাবো, স্নেহ মাতাল ছন্দে বোনা,
তোমার সেই আদরিনির মুখ..