গল্প: হৃদয়ের রক্ত ক্ষরণ

গল্প: হৃদয়ের রক্ত ক্ষরণ

হৃদয়ের রক্ত ক্ষরণ
অরূপ পালিত

দেবজানি আজকে অফিসে আসতে বেশ দেরী করে ফেলেছেন, অফিসে এসে মাত্র চেয়ারে বসলো,
পিওন এসে বললো ম্যাডাম,এমডি স্যার আপনাকে উনার রুমে ডেকেছেন।
দেবজানি মাথা নত করে স্যারের রুমে গিয়ে বললো
স্যার আমি কি আসতে পারি?
ঃ কেন নই মা, আর তোমাকে একদিন বলেছিলাম না, আমার রুমে আসতে তোমার ফরমালিটি করতে হবে না।
এইবার বলো তোমার আসতে এতো দেরী হলো কেন?
স্যার বাবার শরীরটা কয়েকদিন থেকে ভালো নয়, আর দুই একদিন দেখে বাবাকে হয়তো মেডিকেলে ভর্তি করাতে হবে।
ঃ ঠিক আছে মা, তোমার চেয়ারে যাও, কোন টাকা পয়সা লাগলে অফিস থেকে নিয়ে যেও, আর আজকে বৃহস্পতিবার না তাড়াতাড়ি চলে যেও।
ঠিক আছে বলে দেবজানি স্যারের রুম থেকে বেরিয়ে আসে।
পরের দিন শুক্রবার শীতের সকাল বেশ ঠান্ডা পরেছে, রাস্তাঘাট কুয়াশার জন্য কিছু দেখা যাচ্ছে না। খুব ভোরে উঠে তনয় চলে যায় দেবজানির বাড়িতে ওর বাবাকে দেখতে।
তনয়ের অনেকদিনের চেনা পথ চিনে নিতে কষ্ট হয়নি।
এমন শীতের সকালে কুয়াশা মাখা সবুজ গ্রামের রাস্তাঘাট সব ফাঁকা, গাড়ি থেকে নেমেই তনয় দেখেন দেবজানির মা সিগ্ধ সকালে উনুনের পাশে বসে চুলোতে মনে হয় চা বসায়েছেন। তনয়কে দেখে দেবজানির মা’র হাত পা অবশ হয়ে যাবার অবস্থা, তনয় দেবজানির মাকে বলেন।
ঃএইখানে আমার মা থাকেন নাম দেবজানি তাকে একটু ডেকে দেবেন। দেবজানি মা শীতল মনে মনে ভাবলেন, তনয় বোধহয় আমাকে চিনতে পারে নাই। শীতল তনয়ের চোখের দিখে তাকিয়ে রইলেন,তনয়ের চোখে ভারী চশমা চুলের কালো রং নেই।
তনয় দেবজানির মাকে তেমন পাত্তা দিলেন না, দেবজানি ভেতর থেকে দৌঁড়ে এসে পায়ে ধরে সালাম করে বললো,
স্যার আপনি এতো সকালে? কাল কেন বলেন নি আপনি আসবেন।
আরে পাগলি মা, ছেলে মার কাছে আসবে তাও কি বলে কয়ে আসতে হবে?
শিতল হা করে দেবজানি আর তনয়ের দিখে তাখিয়ে রইলো।
ঃ মা’রে তোর বাবা কোথায়?
স্যার আগে আপনি ঘরের ভেতরে আসেন।
তনয় ভেতওে গিয়ে ছোটএকটা রুমে বসে দেবজানির বাবার সাথে কথা বলেন, কিছুক্ষন পর দেবজানির বাবা দেবজানির মাকে ডেকে বলেন,শীতল এই দিখে এসো ভাইয়ের সাথে তুমি কথা বলো।
আমি একটু ছেলেকে নিয়ে ট্রেষ্ট গুলো করিয়ে আসি, ভাইজান আপনি আমি আসা পর্যন্ত্য থাকবেন, দুইভাই একসাথে বসে দুপুরে ডালভাত খাবো।
তনয় মনে মনে চিন্তা করতে লাগলো মেয়েটা কতো প্রতিভাবান।
হঠাৎ করে শীতল এসে দেবজানিকে বলে মা তোমার স্যারের জন্য তুমি দুটো ডালভাত বসিয়ে দাও, আজকে সবাই মিলে একসাথে খাব, আমি তোমার স্যারের সাথে কথা বলছি।
উনাকে আরেক কাপ চা করিয়ে দাও।
ঃ তনয় বলে মা দেবু কাল তোমার জাপান থেকে এস্কলারসিপ্টের সব কাগজ পত্র এসে গেছে, তুমি কবে যাবে বাবার সাথে কথা বলে ঠিক করে নিও।
স্যার এতো তাড়াতাড়ি আমি তো এতোগুলো টাকাপয়সা জোগাড় করে জমা দিতে পারবো না। তা ছাড়া বাবার শরীরের অবস্থা ও তেমন ভালো নেয়।
ঃ টাকা তুমি কেন দিবে, তোমার প্রতিষ্টান তোমাকে পাঠাচ্ছে, তবে একটা কন্ট্রাক হবে তোমার সাথে কোন পেপারের সই দিয়ে নয় মৌখিক ভাবে। তোমাকে তোমার মা’র সামনে কথা দিতে হবে, তুমি যেখানে থাকো না কেন,এই প্রতিষ্টানকে আরো শক্তিশালি করবে। বিদেশীদের কে বুঝিয়ে দিতে হবে আমরা ও পারি।
আর দেখো মা তুমি ছাড়া আমি আর কাউকে বিশ্বাস করতে পারছি না। এতো বড়ো একটি প্রতিষ্টান কার হাতে বুঝিয়ে দিব।
স্যার আপনার পরিবার, আমি বলতে চেয়েছি আপনার আত্মীয়স্বজন কেউ নেই?
ঃ মা তুমি ছোট, যদি পারো ছেলের জন্য আরেককাপ চা নিয়ে এসো।
তনয় দেবজানির কথা এড়িয়ে যায়।
তুমি কেন এসেছ?
তোমাকে দেখতে
সেই রাতে বিয়েতে আসবে বলে আসনি কেন, কিছু দিতে হবে বলেই?
তুমি ঠিক ধরেছ, তোমাকে দেবার মতো সাধ থাকলে ও সাধ্য ছিল না। আমি এসেছিলাম অনেক লোকের ভিড়ে
বিয়ের সাজে অপরূপ সৌন্দর্যে মুগ্ধ তোমার রুপ উপভোগ করলাম তোমার বিয়ের আয়োজনে। আসরে তোমার খুশি দেখে মনকে শান্তনা দিলাম ,আজকে তুমি তো অন্তত পরিতৃপ্ত । ইচ্ছে করছিল তোমাকে বলতে ,তুমি যে কারণে আজ আমাকে ছেড়ে যাচ্ছ , হইতো তুমি ভুল করেছো, আমিই আমার লক্ষ্যে ঠিক ছিলাম।
নিশ্চই তোমার মনে আছে নতুন চাকরি পেয়ে আবেগ আপ্লুত হয়ে পেছন থেকে এসে তোমাকে জড়িয়ে ধরেছিলাম, তুমি চট করে খারাপ মন্তব্য করেছিলে, ঠৌঁটের কোনে একটা অন্য রকম হাসিতে আমাকে বলেছিলে আমার শরীর গরম হয়ে় গেছে, তোমার এমন নোংরা ইঙ্গিতে সেই দিন আমার চোখ ছলছল করছিল, আমি লজ্জায় মাথা নিচু করে রইলাম। আমার ইচ্ছে হয়েছিল তোমাকে একটা ঠাসিয়ে থাপ্পর লাগিয়ে দিতে, কিন্তু পারি নাই আমি তোমাকে প্রচন্ড ভালোবাসতাম বলে।
ঃ আজকে তুমি কি আমাকে পুরোনো কথা মনে করে দিয়ে থাপ্পরটা মেরে দিলে।
তুমি যেটা ভেবে নাও, তোমার স্বামী দেখলাম খুবই ভালো মানুষ, জানো ভালো মানুষরা সবসময় খারাপ মানুষের হাতে পরে।
ঃ আমি কি তাহলে ..
তুমি জানো না তোমার গায়ের সাদা রং তোমাকে অহংকার শিখিয়েছে, ভালোবাসা শেখায় নি।
ভুল আমার ভালবাসার মাপকাঠি হিসেব করতে পারদর্শী ছিলাম না আমি।
তোমার কি মনে আছে তুমি আমাকে বলেছিলে, দোকানের চাকরিতে আমার বেতন কতো। কিছুক্ষন তোমার মুখের দিখে তাকিয়ে থেকে বলেছিলাম তোমাকে তো চিনতে পারছিনা শীতল।
তবু ও শেষ বারের মত তোমার হাত ধরে বলেছিলাম, তোমাকে আমি চালাতে পারব।
তুমি মুখে ভেংচি কেটে কি একটা মুখের ভেতর বিড়বিড় করে বলেছ, আমি বুঝেও না বোঝার ভান করলাম। অপমানে তখন থেকেই আমার বুকের ভেতরটা রক্তক্ষরণ শুরু হয়েছিল।
তুমি বলেছ মেয়েদের খরচের ব্যাপারে আমার কোন অভিজ্ঞতা নাই। তোমার পার্লারে চুল কাটতে গেলে আমার একমাসের বেতন সব চলে যাবে, আর সারা মাস কি বাতাস খেয়ে় থাকব কিনা।
কম্পিউটারের দোকানের চাকরিতে বউ চালাতে পারব না বলে, আমি আর বিয়ে করি নাই। বৌউয়ের যদি আবার পার্লারের যাবার নেশা থাকে, সংসার করব কি করে। সত্যি বলতে কি জানো , আজ ও পার্লারের টাকা যোগাড় করতে পারি না, কারন কতো টাকা হলে বৌউকে পালারে পাঠাতে পারবো জানি না তো।
তবে তোমার দেখা আমার সে-ই ছোট দোকানটা আর আগের মতো নেই, সেটা এখন ইন্ডাস্ট্রিতে পরিনত হয়েছে, সেখানে ২০০ জনের মতো আমার সন্তান আছে ,
আমি নিছ থেকে উঠে এসেছি, কোন সময় উনাদের স্টাফের মতো আচরণ করিনি, মনে হয় সে কারনে বড় ভাইয়ার মুকুটি আমার মাথায় পড়ে আছি।
আমার ইন্ডাস্ট্রির মধ্যে সবাই সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, আর পার্ট টাইম জব। ইন্টারনি করতে যারা আসেন সবাই ভার্সিটির ছাত্র ছাত্রী।
বিদেশে আমরা সফটওয়্যার রফতানি ,বাংলাদেশে আমি একজন সফল সফটওয়্যার রফতানি কারক হিসেবে পরিচিত।
তোমাকে সেই দিন বলেছিলাম না আমি সুশিক্ষিত তবে বেকার নয়।
তোমার মেয়ের সিভি দেখে বুঝলাম মেয়েটার মধ্যে কোয়ালিটি এবং কোয়ান্টিটি দুইটা আছে আমি সম্পর্কে বিশ্বাসি নয় মেধাকে মূল্যায়ন করি।
ওর মেধা বিকাশের জায়গা নির্বাচন করতে আজ নিশ্চই় তোমার ভুল হতে পারে ,মেয়ের কিন্তু ভুল হয়নি সঠিক জায়গায় এসে সে পা ফেলেছে।
মেয়েটাকে দেখার পর থেকে তোমাকেই দেখতে ইচ্ছে হলো আমার। শুনলাম তুমি গ্রামে থাক, গ্রামে থেকে যে মেয়েটাকে মানুষ করেছ, তোমাদের দুইজনকে ধন্যবাদ ।
মেয়েটার কাছ থেকে শুনলাম ছোট বেলা থেকে সে বাপের আদর পায়নি, ওর বাবার না কি ব্রেইন ষ্টোক করার পর ব্রেইনের সমস্যা হয়েছে ।
আমি মেয়েটার কথায় সেই সময় চোখের জল লুকিয়ে রাখতে পারি নাই, ইন্টারভিউ বোর্ডে বললাম তুমি চাকরি করে কি করবে মা।
মেয়েটার উত্তরে আমি আপ্লুত , সে বলল বাবাকে চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে নিয়ে যাব , বাবাই আমার সব ।
তুমি তো ঠিকানা দিয়ে় যাওনি আমাকে,
মেয়ের সিভির থেকে ঠিকানা বের করে তোমাকে দেখতে আসা।
এতো সকালে তুমি কেন এসেছ? আমাকে দেখতে নাকি কাঁটা গায়ে নুনের ছিটা দিতে।
ঃ তুমি যেটা ভেবে নাও, দেখ আজকে আসার সময় তেমন কষ্ট হয়নি আমার, অনেক দিন থেকে আমার ইচ্ছা করছিল,তোমার মুখটি একটু দেখতে, তুমি তো জানো ঠান্ডা আমার শরীরে বেশ ভালো লাগে।
কুয়াশায় রাস্তা ঘাট সব ভেজা, কনকনে শীতে সকালে ঘুম থেকে উঠে এসে দেখলাম তুমি সুখী না । তোমার লম্বা চুলের দেখি আর বাহারি নেই, হাতের নখ ও তো আর নেই নেলপলিশ দিবে কি করে?
নিজের উপর কেন জানি অপরাধ বোধ কাজ করছে, আমি কেন তোমার খবর রাখি নাই । আমি তো তোমাকে অনেক ভালোবেসেছি, আজকে মেয়েটার অন্তত পক্ষে এই কষ্টটা হতো না।তুমি হয়তো জান না, সেই দিন নিজের অজান্তেই সব কিছু ফেলে এসেছিলে, আর ফেলে আসা সেই সব স্মৃতি নিয়ে় আমার শেষ জীবনটা চলে যাবে ।
তোমার মেয়েটাকে পেয়ে নিজেকে অনেক হালকা লাগছে, আমার পরবর্তীতে সেই এই প্রতিষ্ঠানের উত্তরশুরি, প্রতিষ্ঠানের হাল ধরার মতো সব ক্ষমতা ওর আছে।
আমার এসেস এ বলে সে তোমার কোন স্বভাব পাই নি, অহংকারী লোককে আল্লাহ তায়ালা ও পছন্দ করেন না।
সব সম্পর্কেও প্রান প্রতিষ্টা করা যায় না, আমাদের সম্পর্কটা ঠিক সেই রকমের।
আমার সাথে তোমার কি সম্পর্কের কথা হয়তো বা কেউ জানবে না ,
কিন্তু এখানে আসা নিয়ে তোমাকে তোমার স্বামী প্রশ্ন করতে পারে, সেই উত্তর আমি দেব উনার কাছ থেকে মেয়েটাকে নিতে এসেছি আমার প্রতিষ্টানের জণ্য।
তুমি মেয়েটাকে কি উত্তর দিবে জানি না , আমি যাবার পর আজকে যখন জিজ্ঞেস করবে, আঙ্কেল টা আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে রাখলো কেন, কেনই বা সারাদিন মা মা করে আগলে রাখে।
আমি আসাতে মেয়েটার সামনে তুমি বা কেন চোখের জল লুকাতে পারনি, ধরে নিব কি তোমার কাছে তুমি হেরে গেলে। তোমার কখা তোমাকে ফিরিয়ে দিই,
অহংকার ভঙ্গিতে তুমি সেই দিন আমাকে বলেছিলে, তোমার অনুপস্থিতিতে যেন কোন সময় চোখের জল না ফেলতে ।
আমি ও জানি পুরুষের কোন সময় চোখের জল ফেলতে নেই , কারণ চোখের জলে সামনের চলার পথটা পিচ্ছিল হয়ে যায়।
চেষ্টা করছি এখনো তোমার কথা রাখতে। বিশ্বাস কর কিছু কিছু কষ্ট মানুষকে সাফল্য ভয়ে আনতে সাহায্য করে, ঠিক তেমনি তোমার দেয়া কষ্ট আমার জীবনে সাফল্যের চূড়ায় সিঁড়িতে উঠতে সহায়তা করেছে ।
আমার ভালোবাসায় কোন খাদ ছিল না, তুমি যে কি দামি ছিলে আমার কাছে আজকে আমাকে দেখে অন্তত বুঝতে পারলে তো। তোমাকে আমি কোন দিন ভুলতে পারিনি মনে হয় পারবো ও না আমার বুকের ভেতর শূন্যতা কেউ আসেনি পূরণ করতে। সুখের সন্ধান যে মেলেনি তোমার তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।