স্বপ্নীল ফিরোজের কবিতা

স্বপ্নীল ফিরোজের কবিতা

কাচময়ূর

কাচময়ূর পেখম তুলে নেচে উঠে আর ভেঙেপড়ে
স্মৃতিকাচঘর। আহা! কাচভাঙার ধ্বনি থেকে
প্রতিধ্বনি শেষ হয় না কখনও। টুংটাং শব্দ করে
হাতের চুড়ি ভেঙে পড়লো যে মেয়েটির তাঁর
ঠোঁটের কোণে একফোটা রক্ত। ধ্বিকধ্বিক
হৃদপিণ্ডের মতো পতাকার টুকটুকে লাল বৃত্তটি
কেঁপে ওঠে। কেপে উঠে সিঁথির সিঁদুর। পরিপাটি
করে সাজানো সুকেস থেকে পড়ে ভেঙে যায়
আরও আরও একটি কাচের থালা,কাপ-প্রিচ,
প্রিয় ফুলদানি। পায়ের গোড়ালির আঘাতে মাটি
কাঁপে থরথর, থরথর। জোনাকির মতো আলো
জ্বেলে দু’একটি বুলেট উড়ে যায় মিলিটারি
ক্যাম্পের দিকে। জলের মতো অন্ধকারে ডুবে
যেতে যেতে মেয়েটি ঢকঢক করে গিলে ফেললো
অনেকখানি অন্ধকার। সেইথেকে পৃথিবীর সমস্ত
স্বাধীন দেশের পতাকার একটুকরো গাঢ় অন্ধকার
ছায়া মাটিতে থরথর করে কাঁপে।

অশ্রু লেখা চিঠি

শরীর থেকে সমুদ্র খুলে রাখা কপাল থেকে
টিপ খুলে রাখার মতো সহজ বিষয় নয়।
আয়নায় যেখানে নিজেকে দেখা যায় সেখানে
খুলে রাখছো তোমার টিপ। আমার এ অন্ধ
সমুদ্র কোথায় রাখি বল! পথ চলতে কোথাও
নেই মায়ের বুকের মতো বিঘা-বিঘা জমি।
থাকো, বুকে ব্যথা হয়ে হৃদযন্ত্র বিকল করে
তবুও আমার বুকেই থাকো। দুঃখ দিয়ে
ক্ষত বিক্ষত করে বয়ে যাওয়ার মতো
দেহভূমি পৃথিবীতে নেই। তুমি অক্লেশে
বয়ে যাও, আমি নিরব পাথর হয়ে সয়ে
যাবো। তবুও স্বপ্ন দেখি, একটি চঞ্চল
সোনার হরিণ লাফিয়ে লাফিয়ে চলছে। তীর
থেকে শর নামিয়ে রাখছে যেকোন শিকারী।
আর আমার বুক থেকে একগাল হেসে
সমুদ্রটি শিশুর মতো হামাগুড়ি দিয়ে নেমে
যাচ্ছে মায়াময় একটি সবুজ গ্রহের দিকে।

অমিয় মর্মজ্বালা

তুমি চলে গেছ যাও, যেতেই পার। তুমি ফেলে গেছ একটি
নদী, একটি চাঁদ, কিছু স্বপ্নবীজ আর তোমার মৃত্যুহীন ছায়া।
এখন এই নদীতে আমি সাঁতারকাটি আর ঢেউগুলো পাঁজরের
হাড় ভেঙেচুড়ে ঢুকে পড়ে অলিন্দের শহরে। শহরের সমস্ত
আলো নিভে গেলে পথ চলতে চলতে আমি তোমাকে খুঁজি।
দেখি, এখনও তুমি চাঁদের মতো পিছু নিয়ে চলে আস আমার
বাড়ি। তারপর মনের জানালায় আলো হাতে দাঁড়িয়ে থাক
দুঃস্বপ্নের দীর্ঘ-দিঘল রাত। তাইতো আকনদের বেতঝার,
বাঁশবন, আর সেই অতিপ্রাকৃত রক্তশিমুলগাছ যার পাশ দিয়ে
হেঁটে গেলে শরীরের প্রতিটি লোমকূপ কাঁটা হয়ে যায়, সেই
পথে আমি আজ গুনগুনিয়ে গান গেয়ে চলে যেতে পারি।
তোমার ছায়া মায়া হয়ে আমার পাশে-পাশে হাঁটে, তা-কি তুমি
জান? চলে গেছ যাও, যেতেই পার।একজীবনে অনেক মানুষকে
আমি চলে যেতে দেখছি। দেখেছি, কেউ ফেলে যায় তাঁর ব্যবহৃত
হাতের লাঠি, পানের বাটা অথবা তাঁর অতিপ্রিয় সোনার বালা।
আর তুমি আমাকে দিয়ে গেলে নান্দনিক এক ফুলের মতোন অমিয় মর্মজ্বালা!