প্রবন্ধ: বাংলা সাহিত্যে অন্ত্যজদের স্থান

প্রবন্ধ: বাংলা সাহিত্যে অন্ত্যজদের স্থান

বাংলা সাহিত্যে অন্ত্যজদের স্থান
সৌম্য ঘোষ

‘অন্ত্যজ’ শব্দটির যথার্থ অর্থ উদ্ধার করতে বেশ বেগ পেতে হয়েছে। মোটামুটিভাবে, যেটা জানা গেল, ‘অন্ত্যজ’ সমাজের নিম্নস্তরের, অস্পৃশ্য, অবজ্ঞাত মূলতঃ দরিদ্র।
‘সবার পিছে সবার নিচে’ এদেরকেই বোঝানো হয়। কিন্তু ‘অন্ত্যজ’ শব্দের আক্ষরিক অর্থ গরিমাহীন ছিল না।
পরবর্তী সময়ে তার অর্থকে সংকীর্ণ ব্যঞ্জনায় পর্যবেশিত করা হয়েছে।
অর্থগতভাবে, অন্ত্য = অন্ত + জ , জন্মা ( যে জন্মে) = অন্ত্যজ । ব্রাহ্মণদি তিন বর্ণ বিরাট পুরুষের দেহ থেকে জন্মানোর পর, শেষজাত
চতুর্থ বর্ণ হল ‘শূদ্র’ । এই শূদ্র হল অন্ত্যজ (ঋগ্বেদ) । এই ‘শূদ্র’ অর্থে কোন ঘৃণা নেই । কারণ পবিত্র বিরাট পুরুষের অঙ্গ থেকেই জাত। সুতরাং সকল বর্ণ ই পবিত্র। সমস্যা সৃষ্টি হয় পরবর্তীকালে। ভাবনা বোধ ব্যাখ্যা সবই পরিবর্তিত হয়। অন্ত্য ( শূদ্র) থেকে জ ( জাত) অর্থাৎ শূদ্রের ঔরসে উচ্চবর্ণের রমণীর গর্ভে প্রতিলোমজ সন্তানদের বলা হতে লাগল — অন্ত্যজ। আর তখন থেকেই ‘অন্ত্যজ’ শব্দের প্রতি সমাজের অন্য তিন বর্ণের অবজ্ঞা তৈরি হলো। স্মৃতিশাস্ত্রে বিধান দেওয়া হলো যে, শাস্ত্রসম্মত সবর্ণ
এবং অসবর্ণ বিবাহের পর সামাজিক প্রথা লঙঘন করে, ভ্রষ্ট সংস্রবে জন্ম নেওয়া সন্তানেরা অন্ত্যজ ।
সমাজের তথাকথিত নিম্নবর্ণের অন্ত্যজদের ‘অন্তেবাসী’ বা
‘ব্রাত্য’ও বলা হয়ে থাকে। গ্রাম বা নগরের প্রান্তবাসী তাই ‘অন্তেবাসী’।
প্রাচীন বৈদিক ধারার আর্যভাষীরা সমাজের রীতির দিক দিয়ে দুইটি ভিন্ন দল তৈরি করেছিলেন। “প্রথম দল
যাযাবর ও প্রধান — নাম ‘গ্ৰাম্য’ এবং
দ্বিতীয় দল, যারা মর্যাদায় গ্রাম্যের তুলনায় কম ছিল, তাদের নাম হলো
— ‘ব্রাত্য’ । পরবর্তীকালে ব্রাত্য শব্দটির আসল অর্থ বিলুপ্ত হয়ে নিন্দার্থক রূপ পায়।”
ব্রত + য ( হীনার্থে) = ব্রাত্য ।
সংস্কারহীন যজ্ঞ। ‘ব্রাত্য’ অর্থাৎ সমূহ শব্দ থেকে মনু গায়ত্রীহীন। ডঃ রমেশচন্দ্র মজুমদার বলেছেন, “The Aryanization of Bengal may be said to have commenced in the right earnest the closing centuries of the first millennium B.C.” আর্য সমাজে যে দলের মর্যাদা কম ছিল সেই দলকে প্রথমে ‘ব্রাত্য’ বলা হতো। ব্যাপক অর্থে আর্য সংস্কৃতি থেকে চ্যুত।

আমার এই প্রবন্ধের আলোচ্য বিষয়বস্তু বাংলা সাহিত্যে অন্ত্যজদের স্থান। তাই আমি প্রথমে ‘অন্ত্যজ’ শব্দটির চর্চা সেরে রাখলাম।

ঠিক কোন সময় থেকে বাংলা সাহিত্যে অন্ত্যজ জীবনের স্বরূপ উদঘাটন হয়েছে, তা উল্লেখ না করলে প্রবন্ধটি অসম্পূর্ণ থেকে যায়। ‌ প্রাচীন বাংলা সাহিত্যে চর্যাগীতির রচনাকারগণ ছিলেন বেদ বহির্ভূত
সমাজের মানুষ। ডোম্বী, কামলী, শবর প্রভৃতি অধিকাংশই ছিলেন উচ্চবর্ণের চোখে অস্পৃশ্য ব্রাত্য। চর্যাপদ রচনায় ডোম-ডোমনী, চন্ডালি, শুন্ডিনী, শবর শর্বরী, ‌ ব্যাধ, জেলে, কাঠুরিয়া, ধুনুরি প্রভৃতি অস্পৃশ্যতা স্থান পেয়েছে। এদের জীবনের দিকে তাদের অনুরাগ মূলক দৃষ্টি লক্ষ্য করা যায়।

“নগর বাহিরেঁ ডোম্বি তোহেরি কুড়িআ
ছোই ছোই জাহ সো ব্রাহ্মণ নাড়িয়া।”
( কাহ্নপদ, ৩৩ নং পদ)

সমাজ জীবন যাতে এদের স্পর্শে কলুষিত না হয়, তারই জন্যে নগরের বাইরে ব্রাহ্মণেরা এদের বাসস্থান নির্দিষ্ট করে দিতেন। অথচ এই অন্ত্যজ শ্রেণীর মধ্যেই বিদ্যা, বুদ্ধি আধ্যাত্ম জীবনবোধ সবই আছে। এমনকি সিদ্ধাচার্য। এই শবর-শবরী সম্পর্কে প্রাচীন বাংলা সাহিত্যের এক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক বলেছিলেন, “রামায়ণে শবরী ধর্মপ্রাণ নারী, তন্ত্রে শবরী মহাশক্তি, বৌদ্ধমতে শবরী স্বয়ং বজ্রধর, শবরী নৈরাত্মা।”
“কৃষি নিপুন সৌন্দর্যভোগ প্রবণ অথচ আধ্যাত্ম অনুভূতিসম্পন্ন এই জনগোষ্ঠী একদিন ছিল আমাদের দেশের কর্ম, রুচি ও জ্ঞানের নিয়ন্তা।”
বর্তমান যুগে অন্ত্যজ মানুষদের প্রতি মুষ্টিমেয় উচ্চবর্ণের যে ধারণাই থাকুক না কেন, এই সময়ের সাধক সাহিত্যস্রষ্টাদের নিকট অন্ত্যজ শ্রেণী শ্রদ্ধা ও সম্ভ্রমই লাভ করেছে।
মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে তথাকথিত নিম্নশ্রেণীর মানুষদের কথা থাকলেও তাদের সুখ দুঃখ ও জীবনকথা সেভাবে উচ্চবর্ণীয় কবিগণ খুবই কমই বলেছেন। ব্রাহ্মণ্য-সংস্কৃতি ও সামাজিক বর্ণবিন্যাস মধ্যযুগের জনগোষ্ঠীকে যেভাবে শাসনকালে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছিল, তাতে তাদের মনুষত্ব স্বাধীন ভাবে বিকশিত হতে পারেনি।
পরবর্তীকালে দেখা গেল, “শ্রীকৃষ্ণকীর্তনে” কবিবর বড়ু চন্ডীদাস সহ বিভিন্ন মঙ্গলকাব্যের কবিগণ, মৈমনসিংহ গীতিকা ও পূর্ববঙ্গ গীতিকার রচয়িতারা অন্ত্যজ শ্রেণীর মানুষদের সাহিত্য থেকে নির্বাসিত করতে পারেননি। তুর্কি আক্রমণের পরবর্তীকালে সমাজের বৃহত্তর অন্ত্যজ শ্রেণীর মানুষদের সঙ্গে সমন্বয় সাধনের প্রয়োজন উচ্চবর্ণীয় সমাজ বিশেষভাবে উপলব্ধি করে। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘চন্ডী নিষাদ শবরদের দেবতা। যেহেতু আমাদের দেশটা আদিতে অন্ত্যজ শ্রেণীর, তাই ব্রাহ্মণ কবিদের ব্যাধের মত অন্ত্যজ জাতিকে দিয়ে দেবীর পূজা-প্রচারের গান করিয়েছেন।’
ব্যাধ-সন্তান কালকেতু যখন গুজরাট নগরীর পত্তন করে, সেখানে নানাজাতি বাস করতে এলেও তাদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক বিভেদের কথা কোথাও উল্লেখ পাওয়া যায় না। সমাজ ব্যবস্থায় কায়েমী স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী তখন মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে পারেনি। কবি বৃন্দাবন দাসের “চৈতন্য ভাগবত”-এ কবি ব্রাহ্মণদের বৃত্তিকেই হেয় করেছেন —

“প্রভু কহে সন্ধি কার্য জ্ঞান নাহি যার।
কলিযুগে ভট্টাচার্য পদবী তাহার।।”

মধ্যযুগে অন্ত্যজদের বৃত্তি গ্রহণে বর্ণ কোন বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। জীবনধারনের প্রয়োজনে বৃত্তি পরিবর্তনের স্বাধীনতা ছিল। একথা আমরা মুকুন্দরামের চন্ডীমঙ্গল কাব্যে পাই। মধ্যযুগের অন্ত্যজ শ্রেণীর ভূস্বামীদের কথাও পাওয়া যায়। অষ্টাদশ শতকে বাগদিরাজ শোভা সিংহ সামাজিক প্রতিষ্ঠা লাভের জন্য দেবালয় তৈরি করেছিলেন। শুধু শোভা সিংহই নয়
বিষ্ণুপুরের অন্ত্যজ শ্রেণী রাজারাও সগৌরবে সমাজ শাসন করে গেছেন—- উচ্চবর্ণের মানুষ তার বিরোধিতা করেনি। রামাই পন্ডিত ব্রাত্য হয়েও “শূণ্যপুরাণ” এবং রামদাস আদক “ধর্মমঙ্গল কাব্য” রচনা করেছিলেন। তবুও অন্ত্যজ শ্রেণীর মানুষেরা মধ্যযুগে নিজেদের সর্বক্ষেত্রে বিকশিত করে তোলার পূর্ণ স্বাধীনতা পায়নি একদল স্বার্থান্ধ ব্রাহ্মণদের চক্রান্তে। তাই মুকুন্দরামের চন্ডীমঙ্গল কাব্যে আমরা পাই ——
“অতিনীচ কুলে জম্ম জাতি গো চোয়াড় ।
কেহ না পরশে জল লোকে বলে রাড়।।
পুরোধা আমার হবে কেমনে ব্রাহ্মণ।
নিজ কি উত্তম হবে পাইলে বহু ধন।।”

আধুনিকযুগে অর্থাৎ ঊনবিংশ শতাব্দীতে ইংরেজি শিক্ষিত বাঙালি সমাজ সংস্কার মুক্তির আদর্শে উদ্বুদ্ধ হলো। যুক্তি ও বিচারবোধ দ্বারা চালিত হলো। পরাধীনতার নাগপাশ থেকে মুক্ত হতে, শক্তিশালী ঐক্যবদ্ধ জাতি গঠনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধ হলো। বাঙালির মনন-চেতনার জগৎ ভিত ধরে নাড়িয়ে দিলেন রামমোহন রায় (১৭৭২-১৮৩৩), বিদ্যাসাগর ( ১৮২০ -১৮৯১), শ্রীরামকৃষ্ণ(১৮৩৩-১৮৮৬), স্বামী বিবেকানন্দ (১৮৬১-১৯০২) প্রমূখ মনীষীর জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে মানুষের প্রতি ভালোবাসার প্রভাবে ব্রাত্যজন সম্পর্কে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ক্রমশঃ পরিবর্তিত হলো।
এর প্রতিফলন পরল ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে সাহিত্যে এবং ব্যাপকভাবে বিংশশতাব্দীর সাহিত্যে।

বাংলা নাটক, কাব্যে, উপন্যাসে অন্ত্যজ ও জীবনের রূপরেখা নানাভাবে অঙ্কিত হতে লাগলো। নাটকে, মাইকেল মধুসূদন দত্তের (১৮৩৪-১৮৭৩) “বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ” প্রহসন (১৮৬০), দীনবন্ধু মিত্রের (১৮৩০-১৮৭৩) “নীলদর্পণ”(১৮৬০), মীর মশারফ হোসেনের(১৮৭৪-১৯১২) “জমিদার দর্পণ”, গিরিশচন্দ্র ঘোষের (১৮৪৪-১৯১১) “বিল্বমঙ্গল”(১৮৮৮), বিজন ভট্টাচার্যের (১৯১৫-১৯৭৮)
“নবান্ন”(১৯৪৪), মন্মথ রায়ের (১৮১৯- ১৯৮৮) “রাজপুরী” নাটকে
অত্যাচারিত, অবহেলিত, ঘৃণ্য অন্ত্যজ শ্রেণীর মানুষের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ পেয়েছে।
কবিতার ক্ষেত্রে দেখি, রবীন্দ্রনাথের (১৮৬১-১৯৪১) “দুইবিঘা জমি”, “পুরাতন ভৃত্য” কবিতায় কবির গভীর সহানুভূতি।
রবীন্দ্রনাথের “পুনশ্চ” কাব্যের ‘মুক্তি’,
‘শুচি’, ‘স্নানযাত্রা’ কবিতায় অন্ত্যজ মানুষ ধর্মেরপথের দিশারী হয়েছে।
‘স্নানযাত্রা’ কবিতায় সাধক পন্ডিতের উক্তি —– “অব্রাহ্মণ নও তুমি তাত”–
অন্ত্যজ ও মানুষ সম্পর্কে সেই যুগের মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের উল্লেখযোগ্য সাক্ষ্য। ছন্দের জাদুকর সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের (১৮৮২-১৯২২)
“মেথর”, “শূদ্র” এবং কাজী নজরুল ইসলামের (১৮৯৭-১৯৭৬) “কুলি মজুর” কবিতায় অন্ত্যজ মানুষ মর্যাদায় আসীন।
বাংলা উপন্যাসের ক্ষেত্রে দেখি, আধুনিককালে অন্ত্যজ জীবন কেন্দ্রিক রচনায় যথেষ্ট মননশীলতার সঙ্গে ও বাস্তবতার সাথে সায়ূজ্য রেখেই চিত্রিত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের
“গোরা”(১৯১০) উপন্যাসে গোরার চড়ঘোষপুর ভ্রমণের অনুষঙ্গে অন্ত্যজ মানুষের চিত্র লিপিবদ্ধ হয়েছে। অবশ্যই শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৭৬-১৯৩৮)। শরৎচন্দ্রের “চরিত্রহীন” (১৯১৭), “অরক্ষণীয়া”(১৯৭৬) উপন্যাসের সমাজ অবহেলিত মানুষের প্রতি লেখকের সহৃদয়তা স্পষ্ট। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের (১৮৯৪-১৯৫০) “আরণ্যক” (১৯৩৯)
উপন্যাসে অসহায় গাঙ্গোতা-মাহাতো
জীবনের কথা সহানুভূতিশীলতার সঙ্গে চিত্রিত হয়েছে।
বাংলা ছোটগল্পের জন্মলগ্ন থেকে আজ পর্যন্ত প্রায় প্রত্যেক গল্পকারের গল্পেই অন্ত্যজ জীবনের কথা কম বেশি স্থান পেয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে শুরু করে একালের ভাগীরথী মিশ্র, অমর মিত্র, কিন্নর রায়, আফসার আমেদ পর্যন্ত সমস্ত লেখকই তাদের কোনো না কোনো গল্পের বিষয় হিসেবে অন্ত্যজ জীবনকে গ্রহণ করেছেন। প্রভাত কুমার মুখোপাধ্যায়ের (১৮৭৩-১৯৩২) “হীরালাল” গল্পে হীরালাল মনের সুন্দর সুকুমার বৃত্তি ও মানবিক সহানুভূতি প্রকাশিত। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় ( ১৮৯৮-১৯৭১) “ডাকহরকরা” য়
মেল রানার দীনু ডোমের চারিত্রিক সততা ও মহানুভবতার পরিচয় পাওয়া যায়। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের “বিলাসী” গল্পে মাল জাতের মেয়ে বিলাসী মালোর অনন্যসাধারণ মহিমামণ্ডিত প্রেম কাহিনী বর্ণিত।

আধুনিক বাংলা উপন্যাস ও ছোটগল্পে সাহিত্যশৈলী নিঃসন্দেহে বঙ্কিমচন্দ্র ও রবীন্দ্রনাথের হাতেই বিকাশ লাভ করে খুব স্বল্প সময়ের মধ্যেই বিষয় ও বৈচিত্রের ব্যাপকতায়, রীতি প্রকরণের অভিনব আঙ্গিকতায় সমৃদ্ধি লাভ করে।
বাংলা সাহিত্যের যথার্থ উপন্যাসের স্রষ্টা হলেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। তাঁকে “সব্যসাচী” বলে আখ্যায়িত করা হয়। ১৮৬৫ সালে “দুর্গেশনন্দিনী” উপন্যাস দিয়েই বাংলা সাহিত্যে উপন্যাসের জয়যাত্রা শুরু হয়। কিন্তু বঙ্কিমচন্দ্র অন্ত্যজ শ্রেণীর মানুষদের নিয়ে কোন উপন্যাস লেখেননি। তিনি ছোটগল্পও লেখেননি। বাংলা উপন্যাসের প্রথম শিল্পী যেমন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, তেমনি ছোট গল্পের ক্ষেত্রে প্রবর্তক ও প্রথম শিল্পী হলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
১৮৮৪ সালে রবীন্দ্রনাথের “ঘাটের কথা” ও “রাজপথের কথা” দিয়ে বাংলা ছোটগল্পের জয়যাত্রা শুরু হয়। বাংলা ছোটগল্পে অন্তত জীবনের উপস্থিতি প্রথম দেখতে পাওয়া যায় রবীন্দ্রনাথের “শাস্তি” গল্পে এবং তারপরে আমরা পেলাম
কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র “বিলাসী”, “অভাগীর স্বর্গ” গল্পদ্বয়। অতঃপর আমরা একে একে পেলাম —–
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘বাউল’, ‘ডাকহরকরা’, ‘জাদুকরী’, ‘নারী ও নাগিনী’, স্থলপদ্ম, ‘চৌকিদার’ প্রভৃতি। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘আমার ছাত্র’, ‘রাসু হাড়ি’ এবং ‘আরণ্যক’। বনফুলের
‘বুধনি’, ‘প্রমাণ’ প্রভৃতি। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘প্রাগৈতিহাসিক’, ‘পদ্মা নদীর মাঝি'( উপন্যাস) – এ
অন্ত্যজ শ্রেণীর মানুষের কথা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে চিত্রিত হয়েছে ‌।

রবীন্দ্র ছোটগল্পে সাধারণভাবে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষের জীবন রূপ পেলেও উচ্চবিত্ত ও অন্ত্যজ শ্রেণীর মানুষের জীবনের কথাও উপেক্ষিত নয়। বাংলা কথাসাহিত্যে তাঁর উন্মেষ পর্ব থেকেই সমাজের প্রায় সর্বশ্রেণীর মানুষের বহু বিচিত্র জীবনরূপকে উদ্ভাসিত করে তুলেছে বহুবিচিত্র ইন্দ্রধনুচ্ছটায়।
সমাজের নিম্নবিত্ত এবং অন্ত্যজ শ্রেণীর মানুষ রবীন্দ্রযুগ থেকেই যে বাংলা ছোটগল্পে স্থান করে নিয়েছে তার প্রমাণ রবীন্দ্রনাথের “শাস্তি”। ছিদাম রুই ও দুখিরাম রুই — দুই ভাইয়ের স্বাভাবিক জীবন, তাদের দুই বউয়ের দৈনন্দিন কলহ, ঘটনার আকস্মিকতায় বড়বউয়ের খুন হয়ে যাওয়া। ছোট বউ চন্দরার স্বামীর প্রতি ক্ষমাহীন প্রতিহিংসা গ্রহণ ইত্যাদি ইত্যাদি একেবারে সমাজের অন্ত্যজ শ্রেণীর মানুষের নিখুঁত জীবন চিত্র। “খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন” ছোট গল্পটি রাইচরণ চরিত্রটির কথাও এসে যায়। অন্ত্যজ শ্রেণীর মানুষটিকে মনুষ্যত্বের মহিমায় শ্রেষ্ঠত্বের আসনে অধিষ্ঠিত করেছেন গল্পকার। রবীন্দ্র ছোটগল্পে অন্ত্যজ শ্রেণী বা সমাজের দরিদ্র পীড়িত প্রতিনিধি হিসেবে অনেক চরিত্র চিত্রিত হয়েছে। “মাল্যদান” গল্পে কুড়ানি, “সুভা” গল্পের সুভা, “ক্ষুধিত পাষাণ” গল্পে মেহের আলী এমন অনেক উদাহরণ আছে। “কাবুলিওয়ালা” গল্পের রহমত চরিত্রটিও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
রবীন্দ্র যুগেই রবীন্দ্র শিষ্য প্রভাতকুমারের একাধিক ছোটগল্পে, শরৎচন্দ্রের “মহেশ” ও “অভাগীর স্বর্গ” বাংলার অন্ত্যজ শ্রেণীর লেখচিত্র মর্মস্পর্শী হয়ে ফুটে উঠেছে। মহেশকে কেন্দ্র করে দরিদ্র মুসলমান ভাগচাষী গফুরের জীবন যন্ত্রণাকে এক চিরন্তন রূপ দিয়েছেন শরৎচন্দ্র। “অভাগীর স্বর্গ” গল্পে কাঙালীর মা, রসিক বাঘের পরিত্যক্ত স্ত্রী অভাগীর মৃত্যুর পর আগুনে পুড়ে স্বর্গে যাবার ইচ্ছা পূরণে অন্তজ্য শ্রেণীর স্বাভাবিক মনোবাসনাকে তুলনাহীন চিত্রায়ন করা হয়েছে। ‌
শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের “নারীমেধ”, “নারীর মন” প্রভৃতি ছোটগল্পে কয়লা খনি অঞ্চলে আদিম আদিবাসী সাঁওতাল শ্রমিকদের জীবনযাত্রার একান্ত বাস্তব চিত্র পরিবেশিত হয়েছে।
‘কল্লোল গোষ্ঠী’র প্রেমেন্দ্র মিত্র, অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, বুদ্ধদেব বসু প্রভৃতি গল্পকারের বিচিত্রধর্মী ছোটগল্পের অনেকগুলিতে সমাজের উপেক্ষিত, হতশ্রী মানবগোষ্ঠীর জীবন চিত্ররূপ পেয়েছে। প্রেমেন্দ্র মিত্রের “মৃত্তিকা”, “ধূলি-ধূসর” গল্পগ্রন্থ দুইটির একাধিক গল্পের কথা বলা যেতে পারে। অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তের বিখ্যাত গল্পগ্রন্থ “টুটাফুটায়” জীবনের কুৎসিত দারিদ্র পিষ্ঠ, বিদ্রোহ-যুদ্ধ-পাপ-পিচ্ছিল পথের চিত্রণ অপূর্ব ফুটে উঠেছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ উত্তরকালে বাংলা উপন্যাস ও ছোটগল্প আরো অনেক বেশি সমাজ সচেতন হয়ে ওঠে। যুদ্ধের বিভীষিকা, খন্ডিত স্বাধীনতা, দেশভাগের কুফল, কঠোর বাস্তবের সংঘাত, সমাজের দ্রুত অবক্ষয় সাহিত্যে প্রভাব ফেলল। এই সময়ে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য
দুই বাঁড়ুজ্জে —- মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ও তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়। ফ্রয়েডীয় মনস্তত্ত্বের অনুসারী মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় জীবনের কুটিল বিকৃত দিকগুলিকে তার লেখায় ক্ষুদ্র পরিসরে তুলে ধরেছেন। তাঁর “প্রাগৈতিহাসিক”, “সরীসৃপ” ছোটগল্পগুলি এবং “পদ্মা নদীর মাঝি” উপন্যাসটি কথা ভাবা যেতে পারে। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় বহু গল্প-উপন্যাসে গ্রাম বাংলার অন্ত্যজ শ্রেণীর মানুষের বিচিত্র জীবনকে অপরূপ ভাবে রূপদান করেছেন। বৈষ্ণব-বৈষ্ণবী, বাউরী-বাগদী, কাহার-বেদে, সাপুড়ে প্রভৃতি অন্ত্যজ শ্রেণীর বিভিন্নগোষ্ঠী তাঁর কথাসাহিত্যে এসেছে।
পরবর্তীকালে আমরা বাংলা পাঠকবৃন্দ সমৃদ্ধ হই যাদের কাছ থেকে, যেমন — বনফুল, সমরেশ বসু, সুবোধ ঘোষ, মানবেন্দ্র পাল , নীহাররঞ্জন রায়, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, আশাপূর্ণা দেবী, প্রতিভা বসু, মহাশ্বেতা দেবী, বাণী রায় প্রভৃতি।
স্বাধীনোত্তরপর্বে কৃষি জমিতে গড়ে উঠেছে কলকারখানা, কৃষি কৌশলে এসেছে আধুনিকীকরণ। কৃষকরা কৃষি জমিতে পরিণত হলো। গ্রামের মানুষ তাদের বংশগত পেশা ত্যাগ করে দলে দলে কলকারখানা ও কয়লা খাদের শ্রমিকে পরিণত হলো।
অল্প কিঞ্চিৎ যারা গ্রামে থেকে গেল, তাদের উপর শুরু হলো নানা রকম জুলুম ও অত্যাচার। এই অত্যাচারের বিরুদ্ধে শুরু হয় কৃষক আন্দোলন। বহুকাঙ্খিত স্বাধীনতা সাধারণ মানুষের জীবনে কোন সুখের বার্তা বহন করে আনেনি। শুধু শাসকের পরিবর্তন ঘটেছে। স্বাধীনতার পড়বে প্রতিষ্ঠিত লেখক লেখিকাদের রচনা আমরা এই সময়ের চিত্ররূপের নিদর্শন পাই। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় “হাঁসুলী বাঁকের উপকথা” ও “নাগিনী কন্যার কাহিনী”,
বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়ের “ইছামতি”, সমরেশ বসু “উত্তরঙ্গ”, “গঙ্গা” ও “মহাকালের রথের ঘোড়া”,
মহাশ্বেতা দেবীর “অরণ্যের অধিকার” ও “কবি বন্দ্য ঘটি গাঞির জীবন ও মৃত্যু”, অদ্বৈত মল্লবর্মণের “তিতাস একটি নদীর নাম” এবং সতীনাথ ভাদুড়ীর “ঢোঁড়াই চরিত মানস”। এই উপন্যাসগুলিতে অন্ত্যজ জীবনের সুখ-দুঃখের, হাসি-কান্নার ছবি জীবন্তভাবে ফুটে উঠেছে।

রবীন্দ্রনাথ-প্রভাতকুমার- শরৎচন্দ্রের ছোটগল্প ধারায় ব্যতিক্রমী রূপে হাজির হল কল্লোল ও বিচিত্রা গোষ্ঠীর লেখকরা। বাংলা ছোটগল্পে পালাবদলের সূচনা হয়েছে এদের লেখায়। তেলেনাপোতা আবিষ্কার”(প্রেমেন্দ্র মিত্র), জলসাঘর
(তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়), দুইবার রাজা (অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত), প্রাগৈতিহাসিক (মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়) প্রমুখের লেখা গল্পে লেগেছিল পালাবদলের ঝড়ো হাওয়া। শান্ত-স্থির-নিরাপদ-মূল্যবোধ ও জীবন দৃষ্টির বন্ধন ছেড়ে অজানা বিক্ষুব্ধ জীবন সমুদ্রে বেরিয়ে পড়ার আহ্বান ছিল ওই সময়কার গল্পে।
১৯৩৯– ৪৭ এই কালখণ্ডে বাংলার সমাজে ও রাষ্ট্রে কালান্তর ঘটে। মন্বন্তর, ব্ল্যাক আউট, বিমান হানা, কন্ট্রোল, রেশনিং, মিলিটারি সাপ্লাই, যুদ্ধকালীন কলকাতার সমাজজীবনের অধোগতি, অর্থনৈতিক বিপর্যয়, নৈতিক মূল্যবোধের বিনষ্টি , দাঙ্গা, উদ্বাস্তু সমস্যা —- বাংলার সামাজিক মানসিক পরিমণ্ডলকে উথাল পাথাল করে দিয়েছিল। এই পর্বে যারা সাহিত্য রচনা করেছেন, সাহিত্য চেতনা উন্মেষের সঙ্গে সঙ্গে এই আলোড়িত বিপর্যস্ত সময়ের প্রত্যক্ষ পরিচয় তাদের ঘটেছিল।
এই অস্থির স্বৈরবৃত্ত কাল তার সমস্ত বিক্ষোভ সংশয় অশান্তি ও সুতীক্ষ্ণ জীবন-জিজ্ঞাসার স্বাক্ষর রেখেছে এই পর্বের ছোটগল্পে। এই কালখণ্ডের লেখকরা অন্ত্যজ সমাজ জীবনের চিত্র তাদের গল্পে সম্যকভাবে তুলে ধরেছিলেন। এদের মধ্যে —- তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, নরেন্দ্রনাথ মিত্র, কমলকুমার মজুমদার, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, নবেন্দু ঘোষ, সতীনাথ ভাদুড়ী, গজেন্দ্রকুমার মিত্র, মহাশ্বেতা দেবী, মনোজ বসু, রমাপদ চৌধুরী, সন্তোষ কুমার ঘোষ, বিমল কর, সমরেশ বসু, সমরেশ মজুমদার, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ, দিব্যেন্দু পালিত, সাধন চট্টোপাধ্যায়, ভগীরাথ মিশ্র, আবুল বাশার, স্বপ্নময় চক্রবর্তী, কিন্নর রায় প্রমূখ মহান সাহিত্যিকরা।
এই পর্যায়ের কিছু গল্পের উল্লেখ রাখছি—- সতীনাথ ভাদুড়ীর ‘ডাকাতের মা’, ‘আন্টা বাংলা’, এবং
‘রথের তলে’, অমিয়ভূষণ মজুমদারের ‘দুলা রহিনদের উপকথা’, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের
‘ফুল ও নারী’, ‘নাম নেই’, ‘মহাপৃথিবী’,
শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘পারাপার’,
লক্ষণ মিস্ত্রির ‘জীবন ও সময়’, ‘বোকা ডাক্তারের দুই রুগী’, ‘দখল’,
অসীম রায় ‘লখিয়ার বাপ’, আবুল বাশারের ‘সুখেন গুই ও মুথা ঘাস’,
প্রফুল্ল রায়ের ‘সাতঘরিয়া’ ও ‘বাঘ’
এবং অমর মিত্রের ‘মেলার দিকের
ঘর’ , ‘কোকিল’ ও ‘আত্মহনন’ প্রভৃতি গল্প।

ইতিহাসের সময় এবং বাংলা কথা সাহিত্যের সময় পরিপূর্ণভাবে এক খাতে বয়ের না গেলেও ,
তাদের প্রবহমানতা প্রায় এক। ইতিহাসে ঘটে যাওয়ার ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক বিবর্তন করতে বাধ্য।
আর অন্ত্যজদের জীবনের পালে লাগে সেই পরিবর্তনের হাওয়া।
রাজনীতি-অর্থনীতি-সমাজ-সংস্কৃতি কে কেন্দ্র করে ঘটে যায় নানা ঘটনার ধারা।
অন্ত্যজ জীবনাশ্রয়ী উপন্যাস ও ছোটগল্পগুলি বাংলা সাহিত্যের বিষয়-পরিধির বিস্তার ঘটিয়েছে এবং অজ্ঞাত পরিচিত বহুবিচিত্র মানব-মানবীর সঙ্গে আমাদের পরিচয় ঘটিয়েছে। বিচিত্র মতিগতির মানুষের রূপচিত্রণের মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যের চরিত্রশালা বহুল পরিমাণে
ঋদ্ধ রয়েছে।‌
বাংলা সাহিত্যে উপন্যাস ও ছোটগল্পে অন্ত্যজ সম্প্রদায়ের মানুষের যে চেহারা বেরিয়ে আসে, তা যেন সমাজ বিবর্তনের দমকা হাওয়ায় ভেসে যাওয়া ধূলিকণার মত। যেভাবে ভেসে যায় —- দাশু, ধানু, লাখাইরা, তিতাস পাড়ের মালো গোষ্ঠী বা কাহার পাড়ার কাহারেরা।
এদের নিজস্ব কোনো চিন্তা-ভাবনা যেন থাকতে পারে না, কোন অস্তিত্ব যেন এদের নেই। তারা তাদের স্বাভাবিক অধিকারগুলি থেকেও বঞ্চিত। যেন মহাকালের রথ টেনে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্বটুকুই এদের, কেন রথযাত্রা, কোথায় পৌঁছাবে সে রথ —- এসব জানার কোনও অধিকার তাদের নেই। এই আলোড়িত মনকে ছুঁয়ে যায় কথাসাহিত্যিকের অনুভূতি —– তুলে আনেন অন্ত্যজ মানুষের মনের টানাপোড়নের অভিব্যক্তিকে।
পথটি বোধহয় দেখিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘শাস্তি’ গল্পে ছিদাম
চন্দরার অসাধারণ মনোবিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে‌ । অন্ত্যজ ও মানুষের মনোবিশ্লেষণ আমরা পাই মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ উপন্যাসে কুবের ও কপিলার সম্পর্কের জটিলতার মধ্যে। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিতাই কবিয়াল শত অসম্ভব প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে নিজের অস্তিত্বকে প্রমাণ করেছে। মনে পড়ছে, তারাশঙ্করের তারিণী মাঝিকে , সমরেশ বসুর ‘মহাকালের রথের ঘোড়া’র রুহিতন
কুরমি রাজনীতির প্রত্যক্ষ যোদ্ধা হয়েও ব্যক্তি ‘আমি’কে বিসর্জন দিতে পারিনি। ‘ঢোঁড়াই চরিত মানস’ ভোরাই যখন অবহেলায় বেড়ে উঠেছিল তখন তার মনোজগতের পরিবর্তন অসাধারণ দক্ষতায় তুলে ধরেছেন ঔপন্যাসিক সতীনাথ ভাদুড়ী। তারাশঙ্করের ‘হাঁসুলী বাঁকের উপকথা’র বনোয়ারি কাহার সমাজে মাতব্বর হয়ে কাহার সমাজকে ভেঙ্গে যেতে দেখেছিল। দেখেছিল তার ঘর ভেঙে যেতে।
শরৎচন্দ্রের ‘অভাগীর স্বর্গ’ গল্পে দেখি উচ্চবর্ণের শোষণ। বাউরি মেয়ে কাঙালীর মা ব্রাহ্মণ জমিদার গৃহিণীর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার সমারোহ মুগ্ধ হয়ে নিজের জন্য ঐরূপ চিতা শয্যা কামনা করেছিল। কিন্তু দরিদ্রের এই ইচ্ছা সমাজের প্রতিকূলতায় ও জমিদারি ব্যবস্থার হৃদয়হীন যান্ত্রিকতায় সার্থক হতে পারে না —- প্রজ্বলিত চিতার ধূমকুন্ডলী তার কল্পনার জগত ছেড়ে বাস্তবে রূপ পায়নি।
‘তিতাস একটি নদীর নাম’ উপন্যাসে কিশোর ও তার স্ত্রী-কে ঘিরে এক জটিল সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
উজানিগরে ফলা বাইতে যাওয়া কিশোর ডাকাতের কবলে পড়ে হৃত-সর্বস্ব হয়ে পড়ে। পরিস্থিতির এই চাপ সহ্য করতে না পেরে সে উন্মাদ হয়ে যায়। ঘটনাচক্রে কিশোরের সন্তান অনন্তকে নিয়ে কিশোরের স্ত্রী শ্বশুরবাড়ির দেশে ফিরে আসে। প্রতিবেশী কর্তৃক সাদরে গৃহীত হয়।
একদিকে স্বামীর প্রতি তার সদা সতর্ক দৃষ্টি, অন্যদিকে পরিচয় গোপন রাখা। একদিকে এক উন্মাদ পুরুষ যে ভালবাসার তীব্রতার জন্যই স্ত্রীকে হারানোর আঘাত সহ্য করতে না পেরে সব স্মৃতি হারায়। একদিকে কিশোরের স্ত্রী যে সুস্থ স্বাভাবিক নারী, যিনি পরিচয় গোপন রেখেছেন। এ এক বিচিত্র সম্পর্ক।
এরপর সেই ভালবাসার টানে যেদিন কিশোরের স্মৃতি ফিরে এলো, স্ত্রীকে চিনতে পারল, সুস্থ হয়ে উঠলো, সেদিনও তাদের পরিচয় কেউ জানলো না, এক মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটলো দুজনের।
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘আরণ্যক’- এ রাজপুত দেবীসিংহ – এর স্ত্রী কুন্তা বাঈজীর মেয়ে বলে জাতিচ্যূত। দেবী সিং সর্বস্বান্ত হয়ে মারা যাওয়ার পর কুন্তার জীবনের করুণ পরিণতি নিপুণভাবে চিত্রিত।
প্রফুল্ল রায়ের ‘সাতঘরিয়া’ গল্পে অন্ত্যজ চাঁপিয়া চেয়েছিল ঘরবেঁধে সুখী জীবনযাপন করতে। কিন্তু তার সেই আশা কখনোই পূরণ হয়নি। সামান্য সুখ ও নির্ভরতার খোঁজে সে বারে বারে নানা মরদের সঙ্গে ঘর বেঁধেছে। বাড়ে বাড়ে তার ঘর ভেঙে গেছে। যতদিন তার দেহে লাবণ্য ছিল, ততদিন পুরুষ তাকে ঘরের রেখেছে। কিন্তু তার রুগ্নতার দিনে কেউ তাকে আর ঘরে নিতে চায়নি।
সবার কাছে বাতিল হয়ে সে চরম অবহেলায় হতাশার অতলান্তিক তলে হারিয়ে যায়। লেখক এখানে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের লালসার বিষাক্ত রূপ তুলে ধরেছেন।
বাংলা সাহিত্যে অন্ত্যজ সম্প্রদায়ের মানুষদের কথা সুনিপুণভাবে চিত্ররূপ হয়েছে। আত্মার সঙ্গে আত্মার মিলন যদি আত্মীয়তা হয়, তাহলে যে কোনো রচনাই স্নেহসিক্ত, রসোজ্জ্বল এবং গভীরতর হয়।
আর্থ-সামাজিক এই পটভূমির ওপর দাঁড়িয়ে বাংলা সাহিত্যে অন্ত্যজ জীবনের স্বরূপ উদঘাটিত হয় বাঙালির মনন চেতনার চৈতন্য লাভকে সূচিত করে।