প্রবন্ধ : পোস্টমডার্নিজম এবং সাহিত্যচিন্তা

প্রবন্ধ : পোস্টমডার্নিজম এবং সাহিত্যচিন্তা

পোস্টমডার্নিজম এবং সাহিত্যচিন্তা
রঞ্জন চক্রবর্ত্তী

পোস্টমডার্নিজমের কোনও সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা নেই। এর বাংলা প্রতিশব্দ খুঁজতে গিয়ে কেউ বলেন উত্তরাধুনিক, কেউ বলেন আধুনিকোত্তর, আবার কেউ বলেন অধুনান্তিক। বিংশ শতাব্দীর পাঁচের দশক থেকে পশ্চিমের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির দুনিয়ায় পোস্টমডার্নিজম কথাটি ঘুরে-ফিরে আসতে থাকে। ছয়ের দশকে এই ধারাটি প্রবল হয়ে ওঠে। বিভিন্ন মতবাদে বিশ্বাসীরা পরস্পরবিরোধী অর্থে এর ব্যবহার শুরু করেছিলেন, তা সত্ত্বেও কিছু কিছু বিষয় নির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা যায়। সাধারণভাবে বলতে গেলে পোস্টমডার্নিজম হল বিংশ শতাব্দীর শেষার্ধে চিন্তাজগতে একটি প্রবল উথ্থান যা নন্দনভাবনার কেন্দ্রে স্থাপন করেছে এক ধরণের আত্মাভিমুখতা, যাকে বলা যায় — ‘anti-representational self-reflexivity.’
মূলত ভাষাতাত্বিক বিশ্লেষণের জন্য ফ্রান্সে যে পোস্টস্ট্রাকচারালিস্ট ধারার উদ্ভব হয়েছিল, পোস্টমডার্নিজমের একটি প্রাথমিক রূপ তার সঙ্গে সমন্বিত হয়েছিল। স্ট্রাকচারালিস্ট ভাষা-দার্শনিক রোলাঁ বার্থ তাঁর শেষ পর্যায়ের লেখায় নিজের আদি ভাষাচিন্তার বিবর্তন ঘটিয়েছিলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল – ‘ভাষা বাস্তবজগতকে প্রতিফলিত করে না, বরং ভাষা বাস্তবতাকে গড়ে তোলে। এর ফলে ভাষা সর্বদা জ্ঞানকে বিকৃত করে।’ স্ট্রাকচারালিস্টদের গুরু ফার্দিনান্দ দ্য সেস্যুর বলেছিলেন ভাষা হল চিহ্নায়নের সিস্টেম। তাঁর মতে একটি চিহ্নায়ক ও একটি চিহ্নায়িতের মধ্যে প্রতিনিধিত্বমূলক সম্পর্ক রয়েছে। পোস্টস্ট্রাকচারালিস্টরা সেই তত্ত্বের বিরোধীতা করে বললেন চিহ্নায়ক ও চিহ্নায়িত কোনও সম্পর্কসূত্রে আবদ্ধ নয়। তাঁদের মতে চিহ্নায়ক কখনওই চিহ্নায়িতের প্রতিনিধিত্ব করে না (অর্থাৎ ‘a representative that does not represent’)। এই ধারণা অনুযায়ী একটি টেক্সট একই সঙ্গে বিবিধার্থ এবং পর্স্পরবিরোধী অর্থ বহন করে। কিছুদিন পরে জাক দেরিদা এই ধারণাকে তাঁর ডিকনস্ট্রাকশনিজমের ভিত্তি হিসাবে ব্যবহার করেছিলেন।
দেরিদার ভাবনার একটি বিশেষ দিক হল মেটাফিজিক্সের বিরোধীতা করা। যুগে যুগে দার্শনিক বা শিল্পী-কবি-সাহিত্যিকেরা এমন এক অধিবাস্তব জগতের কল্পনা করেছেন যার মধ্যে বাস্ত জগতের যাবতীয় সুখ-দুঃখ প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি লীন হয়ে যায়। এই অধিজগতের কেন্দ্রে থাকে কোনও আদর্শ বস্তুর ধারণা। প্লেটোর আইডিয়া, রবীন্দ্রনাথের জীবনদেবতা, দেকার্তের কজিতো, স্পিনোজার ঈশ্বর, লাইবনিজের মোনাড, হেগেসের অ্যাবসল্যুট এগুলি সবই অধিবিদ্যক ধারণা। দেরিদার মতে ভাষাই এই অধিবিদ্যাকে গড়ে তোলে। যেমন এডোয়ার্ড স্যাপির ও তাঁর শিষ্য বি. এল. হোর্ফ একদা তত্ত্ব দিয়েছিলেন কেবল ভাষার মাধ্যমেই চৈতন্যের অস্তিত্ব সম্ভব, আমরা চারপাশের জগতকে ভাষার মাধ্যমেই দেখি।
দেরিদা ভাষার বহিরঙ্গ থেকে অধিবিদ্যক খোলস ছাড়িয়ে নিয়ে ডিকনস্ট্রাক্ট করে (অর্থাৎ জোড় খুলে খুলে) এর ভেতরের দ্বন্দ্বসমূহকে দেখালেন। এ হল ভাষার ভেতরে নেমে ভাষাকে ভাঙা, যার ফলে এটা স্পষ্ট হয় যে শব্দের কোনও নির্দিষ্ট অর্থ নেই এবং ভাষার একমাত্র অর্থ অসম্ভব। একজন লেখক আসলে যা বলতে চাইছেন, হয়তো তার বিপরীত কিছু বলা হয়ে যাচ্ছে। একটি রচনার ভাষাকে খণ্ড-বিখণ্ড করে হয়তো দেখা গেল একটি বিশেষ অংশে একই শব্দের পরস্পরবিরোধী অর্থের চাপে কীভাবে লেখক সামাজিক, রাজনৈতিকবা ধর্মীয় মতের সঙ্গে আপোস করেছেন। হয়তো আরও দেখা গেল যে লেখক তাঁর রচনায় মানবতাবাদ, যুক্তিশীলতা বা শৃঙ্খলমুক্তির কথা বলেছেন তলে-তলে তিনি হয়তো মানবতাবিরোধী, প্রতিক্রিয়াশীল বা চূড়ান্ত রক্ষণশীল।
জাঁ ফ্রাঁসোয়া লিওতার মনে করেন পৃথিবীর সব বড়-বড় মতবাদই আসলে মেটাফিজিক্যাল, কারণ এরা মেটান্যারেটিভ গড়ে তোলে। এই মেটান্যারেটিভগুলো দিয়ে যুগে যুগে বিরাট অপরাধকেও (যেমন আউৎভিৎসজ-এর ইহুদি হত্যা) বৈধ করার চেষ্টা দেখা গেছে। এনলাইটেনমেন্ট পরবর্তীকালের ইউরোপ যুক্তির শৃঙ্খলাকে প্রবল বলে ভেবেছে। মানবমুক্তির নানা মেটান্যারেটিভের (বা পরাআখ্যান) ভিত্তি হল এই যুক্তিবাদ। কিন্তু এর নামে সংঘটিত পৃথিবীব্যাপী অপরাধগুলোকে কিছুতেই যুক্তিসঙ্গত বলা যায় না। লিওতার তাঁর ‘Postmodern Explained’ বইতে বলেছেন — “যা কিছু প্রামাণ্য সত্য তা-ই যুক্তিসঙ্গত এবং সব যুক্তিই প্রামাণ্য সত্য, আউসভিৎজ এই কষ্টকল্পিত মতবাদকে খণ্ডন করে। এই অমানবিক অপরাধ নিশ্চয়ই যুক্তিসঙ্গত নয়।” মিশেল ফুকোও ইতিহাসের দৃষ্টিকোণ থেকে যুক্তিবাদকে আক্রমণ করেছেন। তিনি ইতিহাসে মাকর্স যেমন দেখেছিলেন তেমন কোনও দ্বান্দ্বিক ক্রমোন্নতি বা যৌক্তিক শৃঙ্খলা খুঁজে পাননি। চিন্তার ইতিহাসে একটি এপিস্টেম (বা জ্ঞানকল্প) অন্য একটি এপিস্টেমকে জায়গা ছেড়ে দিয়েছে।
এই আলোচনা থেকে দেখা যাচ্ছে দেরিদা, ফুকো প্রভৃতি পোস্টস্ট্রাকচারালিস্টরা একটি উৎকেন্দ্রিক ও যুক্তিরহিত চিন্তনবিশ্বের কথা বলেন। তাঁদের চিন্তাধারার উপর দাঁড়িয়ে বিপ্লব, সমাজ-পরিবর্তন ইত্যাদি আকাঙ্খাকে অধিবিদ্যক বলে পরিহার করা হল। উদাহরণ হিসাবে বলা যায় এই তত্ত্ব অনুযায়ী যেহেতু দেশে নেই সুতরাং দেশপ্রেমেও নেই, আদর্শবাদ ভিত্তিহীন কথা। হেবারমাস মনে করেন এই ধরনের পোস্টমডার্নিজম আসলে মডার্নিজমের অতিনান্দনিকতাকেই ফিরিয়ে আনতে চাইছে। তাঁর মতে এর অনুসারীরা নব্য-রক্ষণশীল, তাঁরা সামাজিক বাস্তবতা থেকে নিজেদের বিশ্লিষ্ট করে অতিব্যক্তিগততার বিকাশ ঘটাতে চান। তাই তিনি দেরিদা ও ফুকো-কে প্রগতির বিরুদ্ধে অবস্থানকারী বলেছেন। আরও পরে জাক লাকাঁর ফ্রয়েড-বিষয়ক নব্য-উপনিষদের সঙ্গে পোস্টমডার্নিজম জড়িয়ে যায়। কালক্রমে জুলিয়া ক্রিস্তেভা প্রমুখের নারীবাদ, উত্তর-উপনিবেশবাদী তত্ত্ব, নব্য-মার্কসবাদ, প্রান্তিক তথা সাবঅল্টার্ন ইত্যাদি নানা রূপে পোস্টমডার্নিজম বিকশিত হতে থাকে।
জ্ঞান ও শিল্পের একেক শাখায় পোস্টমডার্নের লক্ষণ একেক রকম। যেমন কবিতায় পোস্টমডার্ন বলা হয়েছে ভাষাচিহ্নের প্রতি-প্রতিনিধিত্বমূলকতা এবং আত্মাভিমুখীতাকে। এর একটি অর্থ হল কবিতার ভাষা কোনও বস্তু বা বিষয়কে প্রতিফলিত করবে না। কবিতা হবে বিষয়হীন, ভাষা হবে অনির্দেশ্য এবং আপনাতে আপনি বিভোর (তথা self-reflexive)। কবিতা বহির্পৃথিবীর কোনও প্রপঞ্চকে বোঝানোর (বা represent করার) দায় নেবে না। তাই পোস্টমডার্ন কবিতা হল anti-representational, এর ভেতরে অর্থ খুঁজতে চাওয়া নিস্ফল। তাই বলে উত্তরআধুনিক কবিতা বলতে কেবল বিষয়হীনতা, আঙ্গিকসর্বস্বতা ও নিজের মধ্যে নিজেই ঘুরপাক খাওয়া শব্দের খেলা নয়। পোস্টমডার্ন কবিতার লক্ষণগুলির মধ্যে প্রথমেই আসবে বিষয়কেন্দ্রিকতার অভাব। উত্তরআধুনিক কবিতায় কোনও নির্দিষ্ট বিষয়, ভাবনাকেন্দ্র ও central theme থাকবে না। সেই সঙ্গে উত্তরআধুনিক কবিতায় যুক্তিকাঠামোর অনুক্রম উপস্থিত থাকবে না। কবিতা শেষ হলেও মনে হবে তা শেষ হয়নি। সেই অর্থে বলা যায় কবিতাটি close ended। পাশাপাশি পোস্টমডার্ন কবিতা বহুরৈখিক, বহুকৌণিক ও বহুত্ববাদী। যে কোনও দিকে তার ছড়িয়ে পড়ায় অভিমুখ খোলা। আধুনিক কবিতা অনেকটাই ব্যক্তিকেন্দ্রিক, কিন্তু অধুনান্তিক কবিতায় সেই ‘আমি’-র অনুপস্থিতি স্পষ্ট। জীবনের যে কোনও এলাকা থেকে অধুনান্তিক কবি তাঁর উপাদান সংগ্রহ করতে পারেন। এটা কবিতায় চলবে না বা ওটা কবিতায় সুপ্রযুক্ত হবে না এই সব কথা অধুনান্তিক কবি বা পাঠক গ্রাহ্য করেন না।
পোস্টমডার্ন কবি জানেন বাস্তবকে অনুকরণ করা যায় না। ফলে পোস্টমডার্ন কবিতা ক্রমাগত হাইপাররিয়ালিটি সৃষ্টি করে চলেছে। অনেকেই কবিতাকে এমনভাবে শেষ করেন যাতে বোঝা যায় রচনাটি অসমাপ্ত। জীবনের যে কোনও বাকফসলই ডিসকোর্স। উত্তরআধুনিক কবিতায় এই ডিসকোর্সের ডিকনস্ট্রাকশন বা অ-বিনির্মাণ করা হয়। এই ধরণের কবিতায় প্রতীক এড়িয়ে যাওয়া বা প্রতীক ভাঙার ঝোঁক চোখে পড়ে। আসলে অধুনান্তিক কবিতা পাঠক বা লেখকের সামনে কোনও আদর্শ খাড়া করতে চায় না। বরং সে নতুন কোনও পথে যাত্রার সংকেত দেয়। মনে রাখতে হবে অধুনান্তিকতা কোনও পূর্বনির্ধারিত তত্ত্ব নয়। জীবনকে দেখে-শুনে তার লক্ষণগুলোর যোগসূত্র অনুমান করে অধুনান্তিকতার যাত্রা। সেই যুক্তিতে এ কোনও আন্দোলন নয়, একটি কালখণ্ডের প্রবণতা। তাই অধুনান্তিক কবিতা সব রকমের সম্ভাবনার পরিসর খোলা রাখে, ইউরোটোপিয়ার কথা বলে।
পোস্টমডার্ন কবিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ হল লজিকাল ক্র্যাক বা লজিকাল ক্লেফটের (যুক্তির ফাটল) উপস্থিতি। এই ধারার কবিতায় ভাষার নিজস্ব গুরুত্বকে যেমন মান্য করা হয়, তেমনই ইমেজ তৈরি করাও সম্ভব হয়। আধুনিক কবিতায় ছিল হিউম্যানিস্ট চেতনার প্রতিফলন, যেখানে মানুষের জয়গান গাওয়া হয়েছিল। কিন্তু সবকিছু এবং যে কোনও কিছুই উত্তরআধুনিক কবিতায় বিষয় হতে পারে। সুতরাং একটিমাত্র দিকের উপর আলোকপাত করা তার লক্ষ্য নয়। পোস্টমডার্ন কবিতা যে কোনও সীমাকে ছাপিয়ে যেতে চায়, ফলে নির্দিষ্ট কোনও সংজ্ঞায় তাকে বেঁধে রাখা সম্ভব নয়। বস্তুত পোস্টমডার্ন কবিতা মূলগতভাবে অভেদ, অখণ্ডতা ও মহাসাম্যের দ্বারা প্রতিস্থাপিত। কোনও বৈপরীত্যবোধ (binary opposite) দিয়ে তাকে চিহ্নিত করা সম্ভব নয়।
পোস্টমডার্নিজম এক অর্থে বুদ্ধিবাদীতার বিপরীতে অবস্তান করে। পাশ্চাত্যে এনলাইটেনমেন্ট নামক আন্দোলনটি মানুষের চিন্তনবিশ্বে যুক্তিবাদকে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। বিংশ শতাব্দীতে এই যুক্তিনির্ভর বিশ্বটি নানা ভীতিজনক ঘটনা-দুর্ঘটনায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। যুক্তি, মানবতাবাদ ইত্যাদির ধ্বংসস্তুপের মধ্যেই পোস্টমডার্নিজমের ভিত্তি গড়ে উঠেছিল। বর্তমান বিশ্বে মানুষের জীবন থেকে সংযোগ, সংহতি ও অন্বয় হারিয়ে গেছে। আধুনিকতাবাদীরা এগুলিকে খুঁজেছে এবং পরিশেষে খুঁজে না পেয়ে হতাশ হয়ে বিচ্ছিন্নতার কথা বলেছে। কিন্তু উত্তরআধুনিকেরা সংযোগ-সংহতি-অন্বয়ের মোহ থেকে মুক্ত। শ্রেণীসংগ্রাম, দুনিয়া বদলের স্বপ্ন ইত্যাদি অভীপ্সা থেকেও তাঁরা মুক্ত। তাই উত্তরআধুনিক সাহিত্যের উপরোক্ত লক্ষণগুলিকে যথার্থ বলতেই হয়। নীৎসে বলেছিলেন ‘অবজেকটিভ ট্রুথ’ বলে কিছু নেই। তারই বিলম্বিত পুনর্জন্ম ফুকোর মধ্যে, তিনি মানুষের মৃত্যু ঘোষণা করেছেন। লিওতার বলেছেন গ্র্যান্ড ন্যারেটিভের দিন শেষ। সুতরাং আধুনিক কবি-সাহিত্যিকেরা যদি পোস্টমডার্ন তত্ত্বের দ্বারা প্রভাবিত হন তাহলে আশ্চর্যের কিছু নেই।
বিংশ শতাব্দীর সাতের দশকের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হল থিওরি নামক জ্ঞানশাখার আবির্ভাব। এর পিছনে অনেকগুলি ঐতিহাসিক ঘটনার অভিঘাত ক্রিয়াশীল ছিল। ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ, বিশ্বের নানা স্থানে ছাত্রদের প্রবল প্রতিবাদী উথ্থান (যেমন বাংলাদেশেও), ক্ষমতাশালী শাসকের সঙ্গে সংঘর্ষ ইত্যাদি ঘটনাবলী একটি বিশেষ বৌদ্ধিক বাতাবরণের সৃষ্টি করেছিল। তরুণ বুদ্ধিজীবীরা ক্ষমতার স্ট্রাকচারসমূহকে প্রশ্ন করেছিলেন। তাঁদের মনে হয়েছিল ইউরোপের রেনেসাঁস ও এনলাইটেনমেন্ট থেকে সৃষ্ট বুদ্ধিনির্ভর (rational) এবং অভিজ্ঞতাবাদী (empiricist) চিন্তাধারার মধ্যে কোথাও এক ধরনের স্বৈরতান্ত্রিক ক্ষমতার বীজ লুকিয়ে আছে। তাঁরা সিদ্ধান্তে এসেছিলেন সর্বাধিক ক্ষমতা আসলে বাহ্যিক কোনও প্রতিষ্ঠান যা রাষ্ট্রযন্ত্রের (যেমন পুলিশ, আইনসভা) মধ্যে নিহিত নয়, বরং তা নিহিত রয়েছে ভাষার মধ্যে। মনোসমীক্ষাবাদী লাকাঁ বললেন শৈশবে আমরা ‘symbolic order’-এর মধ্যে ঢুকে যাই এবং সেটিই আমাদের সমগ্র মন (psyche) গড়ে তোলে। অন্য দিকে ইতিহাসবিদ ফুকো বললেন ক্ষমতা হল ভাষা, বিপরীতক্রমে ভাষাই ক্ষমতা। এই সব তত্ত্ব বিশ্লেষণ করে ক্রিস বল্ডিক বলেছেন — “And language was not an innocent or neutral medium, but saturated with oppressive authority, classifying, labeling and defining the human being who can no longer be regarded as a window through which an external reality can be perceived; rather it is the very means by which that ‘reality’ itself is constructed. Hence its vital political importance.”
সাতের দশকে জন্ম নেওয়া থিয়োরির ভেতরে নানা রঙের স্রোতধারা এসে মিশেছিল। তবে থিওরীর প্রবক্তাদের মধ্যে তিনটি ব্যাপারে ঐক্য গড়ে উঠেছিল — প্রথমত ভাষার অগ্রগণ্যতা, দ্বিতীয়ত মানব-বিষয়কে (subject) গদিচ্যুত করা, তৃতীয়ত সাহিত্য রচনার মধ্যেকার তথাকথিত ‘ভাবনার ঐক্য’ বা ‘চেতনার ঐক্য’ প্রভৃতিকে নস্যাৎ করা। এই কারণে টেক্সট সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়াল এবং টেক্সটের ভাষাগত বিন্যাস প্রাধান্য পেল। আসলে মূল আঘাতটা করা হল অ্যারিস্টটলের মাইমেসিস্-কে, যাকে এতদিন মহামহিম ভাবা হত। সাহিত্য আর জীবনের অনুকরণ বলে বিবেচিত হল না, সাহিত্যের রিয়্যালিজমকে ভাবা হল প্রতিক্রিয়াশীল। এখানে প্রশ্ন ওঠে সাহিত্য কি বাস্তবতাকে প্রতিফলিত করে, নাকি সে নিজেই বাস্তবতাকে গড়ে তোলে? এর উত্তরে থিয়োরির প্রবক্তারা বললেন ভাষাই বাস্তবতাকে নির্মাণ করে। একটি টেক্সট অন্য টেক্সটের থেকে প্রাণরস গ্রহণ করে। এই প্রসঙ্গে ক্রিস বল্ডিক বলেন — “. . . thus all writing was a kind of rewriting, whether as parody, as pastiche, as revision, as antiphony, or as illusion”
এই থিয়োরির দ্বারা প্রথম আক্রান্ত হল মানুষ। কারণ রেনেসাঁস-এনলাইটেনমেন্ট রচিত মানবতাবাদকে ছদ্ম-মতবাদ হিসাবে দেখানো হল, যা কিনা স্বৈরতান্ত্রিক শাসকদের ক্ষমতার পেছনে মদত যুগিয়েছে। ইউরোপীয় সভ্যতার শুরু থেকেই ‘মানুষ’ নামক প্রপঞ্চটি গড়ে উঠেছিল। মহাকাব্যের যুগের ‘মহাবীর অভিযাত্রী’ মানব এবং এনলাইটেনমেন্টের ‘আলোকিত বুদ্ধি-নির্ভর’ মানব সকলেই থিয়োরির চ্যালেঞ্জের সামনে ধ্বসে পড়তে লাগল। এই ধারনার মূলে প্রথম কুঠারাঘাত করেছিলেন কার্ল মার্কস এবং সিগমু্ন্ড ফ্রয়েড। তাঁরা দুজনেই বলেছিলেন মানুষ স্বাধীন নয়, সে তার জ্ঞান দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, এমনকী জ্ঞানের বাইরের শক্তিসমূহ দ্বারাও নিয়ন্ত্রিত। কিন্তু দুজনের মতের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। মার্কসের মতে সেই শক্তি অর্থনৈতিক, আর ফ্রয়েডের মতে সেই শক্তি মনস্তাত্ত্বিক। ফার্দিনান্দ দ্য স্যেসুরের কাছ থেকে তাঁর শিষ্যরা আরেকটি তত্ত্বগত সমর্থন পেলেন – মানুষ নিয়ন্ত্রিত হয় শুধু অর্থনীতি বা যৌনতা দিয়ে নয়, বরং ভাষা দিয়ে। মানুষ স্বাধীনভাবে মানুষ স্বাধীনভাবে কিছু বলতে পারে না, ভাষা তাকে দিয়ে যা বলায় এবং যেভাবে বলায় সেভাবেই তাকে বলতে হয়। এর ফলে সাহিত্যকর্মের ক্ষেত্রে সর্বময় ক্ষমতাধারী মানুষ তার জায়গা হারিয়ে বিষয়ে (subject) রূপান্তরিত হল। আর ঐ সাবজেক্ট কোনও ব্যক্তির পরিবর্তে নৈর্ব্যক্তিক ও পরিচয়হীন সর্বনাম ‘I’ হতে পারে। ভাষা ও সংস্কৃতির সার্বভৌমতার নীচে মানব-বিষয়ের অস্তিত্ব গুরুত্বহীন ও করুণ। এতদিনে স্যেসুর কথিত langue (অর্থাৎ ভাষা-সিস্টেম – ভাষার অনড় নিয়মসমূহ) ও parole (ব্যক্তি-কথকের উচ্চারণ, যার অর্থ ও তাৎপর্য ঐ মহামহিম লাঙ এর অধীন ও তার নিয়ম দ্বারা নির্ধারিত) এই দুয়ের দ্বন্দ্ব পূর্ণ রূপ নিল।
রোলাঁ বার্থ এসে ঘোষণা করলেন লেখকের ইচ্ছে-অভিপ্রায়-দর্শন-মানস প্রভৃতি কিছুরই কোনও মূল্য নেই। শুধু মূল্যবান, প্রাণবান এবং উত্তাল যৌবন হচ্ছে টেক্সট। ১৯৬৮ সালে প্রকাশিত বার্থের ‘The Death of the Author’ সাহিত্য রচয়িতা মানুষকে সিংহাসনচ্যুত করল এই ভেবে যে এতে পাঠকের মুক্তি ঘটবে। লেখকের অভিপ্রায়ের বোঝা পাঠককে আর বইতে হবে না, বরং পাঠকই তার ইচ্ছা-মানসিকতা-বৌদ্ধিক ক্ষমতা প্রভৃতির অনুসারে টেক্সটের পাঠ গড়ে নেবে। আধুনিকতাবাদ বা মডার্নিজমও এক অর্থে তার নৈর্ব্যক্তিকতার তত্ত্ব দিয়ে লেখককে আঘাত করেছিল (প্রসঙ্গত এলিয়টের ‘Tradition and the Individual Talent’ প্রবন্ধের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করব)। কিন্তু সে আঘাত ছিল ব্যক্তি লেখকের অতিব্যক্তিগততার ও আবেগলিপ্ততার মোহনিদ্রা থেকে জাগিয়ে তোলার জন্য, তার ভেতরের সংবেদন ও সংহতির নিরপেক্ষ উদ্বোধন ঘটানোর জন্য। সেটি ছিল ব্যক্তি-লেখকের বা শিল্পীর পুনর্জাগরণ ও পুনঃপ্রতিষ্ঠা। কিন্তু পোস্ট-স্ট্রাকচারালিস্ট আঘাতটি ছিল পুরোপুরি ব্যক্তি-লেখকের প্রতি। এই বিপর্যয় ঘটানোর আগে একটি সাহিত্য রচনার ভেতরকার বিবিধ বৈপরীত্য, বিশৃঙ্খলা ও বৈচিত্র্যের মধ্যে সংগতি স্থাপনের মধ্যে সংগতি স্থাপনের কাজটি করত লেখকের চৈতন্য, তাঁর দর্শন বা চিন্তার ঐক্য। তিনি রচনার বিভিন্ন বিপরীতমুখী দিকগুলিকে চেতনার ভেতরে মেলাতেন। এর ফলে সমগ্র সৃষ্টিকর্মটি ‘organic unity’ পেত। এলিয়টের ‘The Waste Land’ কবিতাটির মতো ঝোড়ো বিশৃঙ্খল রচনা আর দুটি নেই। কিন্তু তার মধ্যেও সেই ‘organic unity’ রয়েছে, যা আবিষ্কার করতে পেরে এলিয়ট-অনুরাগীরা নান্দনিক তৃপ্তি বোধ করেন।
বর্তমানে উপরোক্ত পদ্ধতির বদলে ক্রিটিক্যাল হাতুড়ি নিয়ে টেক্সটের উপর ঝাঁপিয়ে পড়া শুরু হয়েছে, তার ভেতরের নানাবিধ দ্বন্দ্ব ও বৈপরীত্যকে খুলে দেখানোর প্রয়াস চলছে। এর অন্যতম উদ্দেশ্য হল কী করে টেক্সটের একটি অংশ অন্য অংশকে নস্যাৎ করছে তা দেখানো, কীভাবে শব্দের সাথে শব্দের এবং বাক্যের সাথে বাক্যের সংঘাত বেধেছে তা দেখানো। ফলে যে কোনও টেক্সটকে এখন দেখতে হবে বহুধামুখী (polyvalent), বহুস্বৈরিক (multivocal), বহুধ্বন্যাত্মক (polyphonic) ও dialogic ভাবে। তাহলে ব্যাপারটা দাঁড়াল এই যে ফোকাসটা সরে গেল লেখকের থেকে টেক্সটের অন্তঃপাতী সংগঠনের দিকে। কাঠামোবাদের মূল কথাটি অবশ্য তা-ই, সেই রুশ আঙ্গিকবাদের থেকে এর শুরু। তবে এখন যে বিপ্লবাত্মক পরিবর্তন ঘটল তা বেশ চিত্তাকর্ষক। জোনাথন কুলার নামক একজন উত্তর-কাঠামোবাদী তাত্ত্বিক জোর দিলেন পাঠকের উপর। তাঁর বক্তব্য হল পাঠকই টেক্সটের উপাত্ত থেকে অর্থ সৃজন করে। কোনও টেক্সট তার অন্তর্গত অর্থ বা তাৎপর্যের জন্য মূল্যবান নয়। টেক্সট মূল্যবান হয়ে ওঠে পাঠকের পঠন-স্ট্র্যাটেজির ফলে।
কুলার-এর যুক্তি মেনে নিয়ে একদল সমালোচক এগিয়ে এলেন। তাঁদের তত্ত্ব হল ‘Reader-Response Crticism’ বা পাঠক-প্রতিক্রিয়াবাদী সমালোচনা। টেক্সট একটি আয়না যাতে পাঠক তাঁর নিজেরই মুখ দেখেন। তাই যে কোনও টেক্সটের অর্থ বিভিন্ন পাঠকের কাছে আলাদা-আলাদা। একজন পাঠক একটি টেক্সট কীভাবে পাঠ করবেন তা নির্ভর করবে ঐ পাঠকের রুচি, অধ্যয়ন, সাংস্কৃতিক স্তর ইত্যাদির উপর। সুতরাং যত রকমের পাঠক, তত রকমের পাঠ। তাহলে টেক্সটের ব্যাখ্যা হবে পাঠকের পার্সোনালিটি টাইপ-নির্ভর। পাঠক-প্রতিক্রিয়া তত্ত্বের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ দুই গুরু জার্মানির ভোলফগ্যাঙ ইজের এবং আমেরিকার স্ট্যালনি ফিশ্। ইজের মনে করেন টেক্সটের অর্ধেক অর্থ নিজস্ব, বাকি অর্ধেক খালি — পাঠক তাঁর নিজের মতো করে খালি অংশটুকু ভরে নেন। এর থেকে একটু সরে গিয়ে ফিশ্ বলেন টেক্সট পুরোটাই শূন্যগর্ভ — পাঠকই তার প্রতিটি উপাদান রচনা করেন।
ফরাসী স্ট্রাকচারালিজম যে সব তত্ত্ব উপহার দিয়েছে তার মধ্যে সব থেকে বিধ্বংসী হল দেরিদার ‘ডিকনস্ট্রাকশন তত্ত্ব’। দেরিদার পিছনে দাঁড়িয় মদত যোগাচ্ছেন দুজন জার্মান দার্শনিক — নীৎসে এবং হাইডেগার। এই দুজনই দার্শনিক সংশয়বাদের প্রবক্তা। টেক্সটের অর্থ শুধু অনির্দিষ্ট ও অনিকেত নয়। এর মধ্যে যে সব দ্বন্দ্ব ও পরস্পরবিরোধী উপাদানগুলো রয়েছে নিবিড় পাঠের মাধ্যমে সেগুলো খুলে খুলে দেখাতে হবে। এর আগে চারের দশকের আমেরিকান নিও-ক্রিটিকরাও নিবিড় পাঠের প্রবক্তা ছিলেন। তবে তাঁরা টেক্সটের ভেতরকার দ্বন্দ্বগুলো চিহ্নিত করে প্রত্যাশিত ঐক্যসূত্রের সন্ধান করতেন। কিন্তু দেরিদাপন্থী বিনির্মাণবাদীরা কেবলই ধ্বংসের বার্তাবাহক। তাঁরা দেখাতে চান কী করে টেক্সটের বিভিন্ন পরস্পরবিরোধী উপাদানগুলো পরস্পরকে নস্যাৎ করছে এবং টেক্সট কী করে অর্থবোধকতার গতিকে রুদ্ধ করছে। ডিকনস্ট্রাকশন বা বিনির্মাণতত্ত্ব উর্বর জমি খুঁজে পায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে (বিশেষত জন হপকিন্স এবং ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে)। বিখ্যাত ইয়েল স্কুল বিনির্মাণবাদীদের মধ্যে আছেন পল দ্য মান, জেফ্রি হার্টম্যান, জে হিলিস মিলার এবং হ্যারল্ড ব্লুম।
বিংশ শতাব্দীর আটের দশকের শুরুতে এসে বিনির্মাণতত্ত্ব এত শক্তিশালী হয়ে উঠল যে প্রায় সব জ্ঞানশাস্ত্রই তাকে স্পর্শ না করে চলতে পারল না। এক অর্থে বিনির্মাণতত্ত্ব টেক্সট থেকে উত্তার্ণ হয়ে কনটেক্সট-এ পা রাখল। সামাজিক সমস্ত বিষয় থেকে বিযুক্ত হয়ে সাহিত্য-টেক্সটের গভীরে মুখ ডুবিয়ে থাকার দিন শেষ হল। একইভাবে ভাষার অগ্রগণ্যতাকে স্বীকার করে নিয়েও ভাষা-প্রসঙ্গকে মূল্যবান ভাবা শুরু হল। এখন বিনির্মাণবাদ বিভিন্ন শাখায় সদর্পে ঢুকে পড়ল। নারীবাদ, উত্তর-ঔপনিবেশিক ডিসকোর্স, নব্য-মার্কসবাদী সংস্কৃতি ব্যাখ্যা, মনোসমীক্ষণ ইত্যাদি ক্ষেত্রে বিনির্মাণবাদের মূল ধারণা ও কৌশলগুলি প্রযুক্ত হতে লাগল। এর ফলে টেক্সটভিত্তিক পোস্টমডার্নিজম থেকে সমাজ-ইতিহাস-মনস্তত্ত্ব ইত্যাদির আলোকে সাহিত্য বিশ্লেষণের নতুন পর্যায়ে উত্তরণ ঘটল। এই উত্তরণের পিছনে মিশেল ফুকোর প্রণোদনা অনেকটাই।
নব্য-বাম ধারার চিন্তা, নারীবাদ এইসব ছয়ের দশকের শেষ থেকেই ক্রিয়াশীল ছিল। এবার এগুলি প্রবল তাত্ত্বিক সমর্থন পেল। পোস্টমডার্ন পোস্টস্ট্রাকচারালিস্ট থিয়োরি নানা ধারায় বিকশিত হল। এর ফলে পরবর্তীকালে আটের দশকে ডিকনস্ট্রাকশন থেকে জোয়ার সরে গেল নানা রকম রাজনীতি ঘেঁষা সমালোচনার দিকে। টেরি ঈগলটন তাঁর ‘Literary Theory’ (১৯৮৩) বইতে সরাসরি রাজনৈতিক সমালোচনার কথা বললেন। পাশাপাশি এডওয়ার্ড সাঈদের ‘The World, the Text and the Critic’ (১৯৮৩) বইটি সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রশ্নসমূহের উপর দৃষ্টিপাত করল। এই বইয়ের শুরুতে তিনি যে কথাগুলো বলেছেন তা থেকেই বোঝা যায় আত্মভুক টেক্সটীয় উত্তরআধুনিকতার কাল ফুরিয়েছে। তিনি লিখেছেন – “My position is that texts are worldly, to some extent they are events, and even when they appear to deny it, they are nevertheless a part of the social world, human life and of course the historical movements in which they are located and interpreted literary theory, whether of the Left or the Right, has turned its back on these things.”
মার্কসবাদী চিন্তার নতুন রেনেসাঁসের সূচনা হয়েছিল গ্রামসি, গেয়র্গ লুকাচ, ওয়াল্টার বেঞ্জামিন প্রমুখের রচনাবলীর নব-অধ্যয়নের মধ্য দিয়ে। তার সঙ্গে যুক্ত হল জাঁ পল সার্ত্র, থিওডোর অ্যাডর্নো, মার্কিউস এবং লুইস আলথুসার-এর রচনাবলীর পাঠ ও বিশ্লেষণ। নয়া-মার্কসবাদী সাহিত্য সমালোচনার উদগাতা হলেন রেমণ্ড উইলিয়ামস, টেরি ঈগলটল এবং ফ্রেডারিক জেমসন। উইলিয়ামস মার্কসবাদী তত্ত্বের কাছে গিয়েছিলেন ত্রিশ-চল্লিশের দশকের আই. এ. রিচার্ডস এবং এফ. আর. লিভিসের সঙ্গে মতপার্থ্যকের সূত্রে। তাঁর উল্লেখযোগ্য বই ‘The Country and the City’ (১৯৭৪), ‘Marxism and Literature’ (১৯৭৭) এবং ‘Problems in Materialism and Culture’ (১৯৮০)। ইদানীং যাকে Cultural Studies বলা হয়, সেই নবশাস্ত্রের তিনিই জনক। অন্যদিকে ঈগলটন কিন্তু আলথুসারের কাঠামোবাদী মার্কসবাদের সূত্র ধরে সচেতনভাবে মার্কসীয় তত্ত্বের অনুসরণ করেছেন। জেমসন আবার মার্কসবাদের হেগেলীয় ধারার প্রতিনিধি গেয়র্গ লুকাচ, জাঁ পল সার্ত্র এবং থিওডোর অ্যাডর্নোকে নমস্য বলে মনে করেন।
গুরুত্বের দিক থেকে বিচার করলে নব্য-মার্কসবাদের থেকেও প্রবলতর আরেকটি তত্ত্বশাখা সত্তরের দশক থেকে গড়ে উঠেছিল – সেটি হল নারীবাদী সাহিত্যতত্ত্ব। মেরি এলমান তাঁর ‘Thinking about Women’ (১৯৭২) বইতে দেখালেন কীভাবে পুরুষ সমালোচকেরা নারী-সাহিত্যিকদের রচনার অবমূল্যায়ন করেছে। তিনি এর নাম দিলেন শৈশ্নিক সমালোচনা (Phallic Criticism)। অপর দিকে কেট মিলেট তাঁর গবেষণাভিত্তিক রচনা ‘Sexual Politics’-এ দেখালেন ডি. এইচ. লরেন্স, নর্ম্যান মেইলার, হেনরি মিলার, জাঁ জেনে ইত্যাদি বিখ্যাত আধুনিক লেখকেরা ছিলেন নারী বিদ্বেষী — এমনকী ফ্রয়েডও তাই। এলেইন শোওয়াল্টার-এর প্রতিপাদ্য ছিল নারীবাদী তত্ত্বের কাজ পুরুষতান্ত্রিক সমালোচনার অন্ধ শৈশ্নিকতার খপ্পর থেকে নারীদের রচিত সাহিত্যকর্মকে বাঁচাতে হবে। তাঁর ‘A Literature of their Own’ নারীবাদী তত্বের উপর একটি উল্লেখযোগ্য রচনা। এ ছাড়াও নারীবাদী তত্ত্বের দুটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হল এলেন মুর রচিত ‘Literary Women’ (১৯৭৬) এবং সান্দ্রা গিলবার্ট ও সুশান গিউবার রচিত ‘Madwomen in the Attic’ (১৯৭৯)।
এই সব মার্কিন নারীবাদীদের তত্ত্ব আটের দশকে এসে ধাক্কা খেয়ে গেল। তখন পোস্ট-স্ট্রাকচারালিস্ট এবং মনোসমীক্ষণবাদী আইডিয়াসমূহের আমদানী হল। এলেইন শোওয়াল্টার প্রমুখের মার্কিন শিবিরের বিরুদ্ধে দাঁড়াল জুলিয়া ক্রিস্তেভা প্রমুখের ফরাসী শিবির। নারীকে কেউ দেখালেন ‘linguistic and textual construction’ হিসাবে। আবার কেউ বা নারীকে জড়ালেন ইতিহাস, সমাজতত্ত্ব এবং সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদের জটিল বুননের মধ্যে – যেমনটি করেছেন গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পীভাক। শেষোক্ত জনের মধ্যে নারীবাদ ও উত্তর-ঔপনিবেশিকতার মিশ্রণ এই ধারণার উপর জোর দিয়েছিল যে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন ও পীড়ন, ভাষা ও সংস্কৃতির আন্তর্দূষণের ফলে উত্তর-ঔপনিবেশিক সমাজে মানব ‘subject’ আবশ্যিকভাবে অস্থির হয়ে পড়ছে।
উত্তর-ঔপনিবেশিক তত্ত্ব আরও জটিল হয়ে উঠেছিল হোমি ভাভার লেখায়। উপরোক্ত সমস্যাগুলিকে তিনি দুরূহ বিনির্মাণবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে দেখালেন। তবে এর তুলনায় অনেক সহজবোধ্য, ও আলোড়নসৃষ্টিকারী কাজ করেছেন এডওয়ার্ড সাইদ তাঁর ‘Orientalism’ গ্রন্থে। ফ্রানৎস ফ্যানন-এর তত্ত্বকে অনুসরণ করে সইদ দেখিয়েছেন পাশ্চাত্য কীভাবে প্রাচ্য সম্পর্কে এক অলীক ধারণা তৈরী করেছে। উত্তর-আধুনিকতাবাদী তত্ত্বের আরও একটি অ্যাকাডেমিক শাখা নব্য-ইতিহাসবাদ। এরও উৎস হল ফুকোর মিশেল ফুকোর ক্ষমতা, ভাষা এবং ডিসকোর্স সম্পর্কিত বিশ্লেষণ। টেক্সটকেন্দ্রিক সাহিত্য সমালোচনার ইতিহাস- নিরপেক্ষতার বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিবাদী এই তত্ত্ব। এতে সাহিত্যকর্মের সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং চলমান প্রসঙ্গকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয়েছে। নব্য-ইতিহাসবাদীদের প্রধান ব্যক্তি হলেন স্টিফেন গ্রীনব্লাট।
পাশ্চাত্য জগতে রেনেসাঁস-এনলাইটেনমেন্ট-আধুনিক যুগ পার হয়ে সাহিত্য আধুনিকোত্তর অঙ্গণে এসে দাঁড়িয়েছে। ইতিহাসের সমান্তরালতা নিয়ে কথা বলতে গেলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে — বাংলাতেও কি তা সমানভাবে ঘটেছে? বিংশ শতাব্দীর ত্রিশের দশকে যখন বাংলা কবিতায় মডার্নিজমের আবাহন করা হয়েছিল তখন অনেকেই তাকে অকালবোধন ভেবেছিলেন। সে ভাবনায় হয়তো কিছুটা সত্যতা ছিল। আমাদের সাহিত্যে সমাজবাস্তবতা বোধহয় এখনও উত্তর-ঔপনিবেশিকতার অন্তর্গত। পার্থপ্রতিম বন্দোপাধ্যায় তাঁর পোস্টমডার্ন ভাবনা ও অন্যান্য গ্রন্থে বলেছেন — “আধুনিক বলে যাকে গ্রহণ করেছি তা আমাদের আধুনিক নয়; ঐ ঔপনিবেশিক শক্তি পশ্চিমের। এমনকী, এই পশ্চিমী ঔপনিবেশিকতা, শক্তি, কর্তৃত্বের সব থেকে বিরোধী দর্শন মার্কসীয় প্রজ্ঞাকেও আমরা যেন ঔপনিবেশিক জ্ঞানকাণ্ডর ছাঁকনিতে ছেঁকে নিয়েছি। . . . ফলে আমাদের ‘আধুনিক’ই ঠিকমতো নির্মাণ হয়নি। . . . ফলে আধুনিক ঠিকমতো নির্মিত না হলে পোস্টমডার্ন আসবে কোথায়?”
পাশ্চাত্যে আধুনিকতার অবক্ষয় শুরু হয়েছিল মোটামুটিভাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে। পঞ্চাশের দশকের পশ্চিমবঙ্গের কবিদের রচনায় তার প্রভাব পড়েছিল। আশির দশকে পশ্চিমবঙ্গের একদল কবি বলতে শুরু করেছিলেন এই অবক্ষয়ী আধুনিকতার বিরুদ্ধে স্বদেশ ও স্বভূমির চেতনা সঞ্জাত নতুন ধারার কবিতা রচনা করতে হবে। সেটা হবে ইউরোপ-কেন্দ্রিকতার বিরুদ্ধে বাংলা কবিতার ঘরে ফেরা। এই নতুন ধারার কবিতার মুখ্য দুই পুরোহিত হলেন অঞ্জন সেন এবং অমিতাভ গুপ্ত। তাঁরা এর নাম দিলেন ‘উত্তর আধুনিক কবিতা’, পাশাপাশি এটাও বললেন একে যেন পশ্চিমের পোস্টমডার্নিজমের সঙ্গে গুলিযে ফেলা না হয়। তাঁরা ‘পোস্ট’ কথাটির বাংলা প্রতিশব্দ হিসাবে ‘উত্তর’ শব্দটি গ্রহণ না করে একে বললেন ‘উত্তরণ’। অর্থাৎ তাঁরা বলতে চাইলেন এ হল আধুনিকতা থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে উন্নততর আধুনিকতা এবং অবক্ষয়ী আধুনিকতার বদলে প্রকৃত আধুনিকতার আবাহন। এ সম্পর্কে পার্থপ্রতিম বন্দোপাধ্যায় বলেন — “উত্তর আধুনিকদের লেখা পড়ে মনে হয়, তাঁরা এক সুস্থ পরম্পরার অনুসন্ধানী; মঙ্গলকাব্য-বৈষ্ণবসংহিতা থেকে জীবনানন্দ-বিষ্ণু দে পর্যন্ত। পঞ্চাশের দশক থেকে যে শিকড়হীন ব্যক্তিগতর চর্চা বাংলা কবিতাকে বিপথগামী করেছে তার প্রতিবাদে উত্তরআধুনিকরা যখার্থ আধুনিককে খোঁজেন। অর্থাৎ পঞ্চাশ দশক থেকে যাকে আধুনিক বলে হাজির করা হয়, তাকে কাটিয়ে আমূল দেশজ উজ্জীবনের স্রোতধারার সঙ্গে যোগ সাধন করতে চান। আবার এক বৈশ্বিক সংহতিতে ঐক্যের জগতে।”
বাংলা কবিতার পোস্টমডার্নিস্টরা অনেকে ‘হাওয়া-৪৯’ নামক ছোটকাগজ এবং এর কাণ্ডারী সমীর রায়চৌধুরীর পিছনে সমবেত হয়েছেন। অন্যদিকে অঞ্জন সেন ও অমিতাভ গুপ্ত জুটির পক্ষে দাঁড়িয়েছেন বীতশোক ভট্টাচার্য, নিতাই জানা প্রমুখরা। দুটি দলের পক্ষ থেকেই কবিতা সংকলন বের করা হয়েছে। অমিতাভ গুপ্ত উত্তরআধুনিক কবিতা সংকলন সম্পাদনা করেছেন। নিতাই জানা ‘পোস্টমডার্ন ও উত্তর আধুনিক বাংলা কবিতা পরিচয়’ নামে গবেষণা-সন্দর্ভ প্রকাশ করেছেন। অন্যদিকে হাওয়া-৪৯ গ্রুপের পক্ষে প্রভাত চৌধুরী পোস্টমডার্ন বাংলা কবিতা সম্পাদনা করেছেন। এই সব সংকলন পড়তে গিয়ে মনে হয় পোস্টমডার্ন কবিতার সংজ্ঞাগুলিকে যথাসাধ্য স্থিতিস্থাপক করে নিয়ে প্রায় সব প্রথাগত কবিকেই এর এর অন্দরমহলে স্থান দেওয়া সম্ভব। তাই ভূমেন্দ্র গুহর প্রচণ্ডরকম ন্যারেটিভ কবিতাও (যেখানে গল্প বলা হয়েছে) পোস্টমডার্ন, আবার মানসকুমার চিনির ইমেজিস্টিক প্রতিস্থাপনার কৌশলও পোস্টমডার্ন। শুধুমাত্র আসবাব এবং পরিধেয়কে বিষয় করেও যে কবিতা লেখা যায় তার উদাহরণ হিসাবে ধীমান চক্রবর্তীর ‘আরোগ্য’ কবিতাটি থেকে একটি উদ্ধৃতি দিচ্ছি —
“মরচে পড়া জলাশয় থেকে উঠে এল
গ্যারেজ খোলা চাবি, ঠাণ্ডা কাঁটাচামচ
দিয়ে প্রাতঃরাশ – নক্সা কেটে ঢুকে যাও
নিষিদ্ধ পল্লীতে উড়তে থাকা মেঘদস্তানায় . . .
. . . হলুদ সঙ্গীত জ্যাকেট থেকে
ঝেড়ে দরজা খুলতে চেষ্টা করে আরোগ্য,
ক্লোরোফিল পাঠকক্ষে এক স্কুলপোশাক আভা।”
অনেক সমালোচক বলেন উত্তরআধুনিকে agony from the death wish of the modern world নেই, আছে humanist essence–এর উঁচু বেদীর উপর নির্মাণ। উত্তরআধুনিক কবিতার উদাহরণ হিসাবে অভিজিৎ চৌধুরীর ‘পাখিরালয়’ কবিতাটিকে নেওয়া যায়। এখানে ভাষা চিহ্নায়নের বোঝা নামিয়েছে এবং অর্থের দ্যোতনার দূরান্বিত কল্পনা-সম্ভবতাকে এড়িয়ে গিয়েছে। পরিশেষে তা স্থির হয়েছে অর্থহীনতায়, পাখির কিচির-মিচিরে। এই কবিতাটি থেকে কিছুটা অংশ উদ্ধৃত করছি —
“আবার যাদুকরের কাছে গেলাম, আমায় দেখে
সে বলল, ‘তোমায় এবার আমি সংকেতের ভাষা উপেক্ষা
করতে শেখাবো,’ কথোপকথন তখন থেকে আমায়
আর কষ্ট দেয় না, শব্দের ইশারা বুঝতে না পারায়
পৃথিবীকে পাতলা কুয়াশার মতন লাগে, মনে হয়
আমি যেন এক পাখিরালয়ে রয়েছি, সারাদিন
শুধু কিচির-মিচির, কিচির-মিচির . . . ”
বাংলা সাহিত্যের সৃজনশীলতার ধারাটি নিরন্তর বয়ে চলেছে। বাংলার মাটি ও মানুষের ঘাম-রক্ত, আশা, স্বপ্ন, প্রকৃতিচেতনা, লোকবিশ্বাস প্রভৃতি নিবিড় বুননে সাহিত্য বয়ন করছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত একটি মৌলিক প্রশ্ন থেকেই যায় — আমাদের সাহিত্য তা হলে কোন দিকে যাবে? উত্তরে বলা যায় আমাদের কবি-সাহিত্যিকদের সামনে যে পথটি খোলা রয়েছে তা হল সংশ্লেষণের পথ। বিশ্বসাহিত্যের নানা তরঙ্গ আমাদের চেতনার উপকূলে আছড়ে পড়বে। এক দেশের সাহিত্য-আন্দোলন অন্য দেশে অনুরণন তুলতেই পারে। তার প্রভাবে আমাদের সাহিত্যের আঙ্গিক ও প্রকাশভঙ্গি অবধারিতভাবেই পাল্টাবে। বিশ্বের নানা প্রান্তের সাহিত্যে প্রকাশভঙ্গী নিয়ে নানা রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। বাংলার কবি-সাহিত্যিকেরা সেইসব টেকনিক অনুকরণ করতে চাইতেই পারেন। আবার কোনও একটি পথ পরিত্যাগ করে বিকল্প পথের খোঁজও করতে পারেন। পোস্টমডার্নিজম একমুখী নয়, তার মধ্যেই সেই বিকল্প রয়েছে।

সহায়ক গ্রন্থাবলী ও পত্রপত্রিকা :
১. পোস্টমডার্ণ ভাবনা ও অন্যান্য — পার্থপ্রতিম বন্দোপাধ্যায়, কলকাতা, ১৯৯৭।
২. পোস্টমডার্ন লীলারহস্য ও বাংলা কবিতা — খোন্দকার আশরাফ হোসেন, দ্যোতনা, বর্ষা ১৪১৮।
৩. Criticism and Literary Theory : 1890 to the Present — Chris Baldick, Longman, 1996।