অনঞ্জনের কবিতা
পূর্ণিমা
নীলিমায় রেঙেছে ওই আশ্চর্য আকাশ, অনন্যোপায় নক্ষত্রের দল
আশ্রয় নেয় একরাশ জ্যোৎস্নার আড়ালে, অন্ধকার ফিসফিসিয়ে কথা বলে
পাছে শুনতে পায় চাঁদের সেপাই-সান্ত্রীরা;
ফুটফুটে চাঁদ মেলে ধরেছে তার কলঙ্ক, জ্বলে-পুড়ে যাচ্ছে সমস্ত পৃথিবী
সে অপরূপ কলঙ্কের মনমোহিনী রূপে; তুমি যত দেখতে চাইবে সে কালি
তত তীব্র হবে সে নরম জ্যোৎস্নার টান;
সমস্ত কন্দর্পকে স্রেফ অপেক্ষায় রেখে চাঁদ একে-একে সাজিয়ে তোলে
বেল যুঁই কামিনী গন্ধরাজের কুসুম, পরম মমতায় খেয়াল রাখে
কলঙ্কের ছোঁয়া যেন ফুলেদের না লাগে;
তারপর, খুলে দেয় তার বুক স্তন মুখমণ্ডল তার ভক্তদের জন্য,
ঝাঁপিয়ে পড়ে ভক্তের দল, আকুল পান করে সে অপূর্ব অমৃতরস,
ফিরতি পথে তারা মেতে ওঠে কলঙ্কের কেচ্ছায়।
আশ্চর্য অনুভূতি
হে ভৈরব
সুখ কেড়ে নিতে গিয়ে
তুমি এক আশ্চর্য বৈভবের সন্ধান দিলে,
এ-বিস্তৃত অনুভূতিকে আমি দেখি সারারাত জেগে
গায়ে মাখি, তার অসমাপ্ত কথা শুনি
গভীর থেকে গভীরতর- অন্তহীন এ-অনুভূতি!
বাতাসের দাঁড়ি কমায় যে নিস্তব্ধতার উৎসব
যে শরীরী মাধুর্য
যে অনন্ত আকাশ
দুঃখও বুঝি তাই,
আশ্চর্য অনুভূতি
হে ভৈরব, সন্ধান দিলে, সুখ কেড়ে নিতে গিয়ে!
আমি যে স্রোতস্বিনী
ভাটিয়ালি সাতটি সুরে ছলাৎ-ছলাৎ কুলে,
গুপ্তকথা লুকিয়ে রাখি বংশীবটের মূলে;
অচলপুরীর উৎস মুখে ঝোরা যে পয়স্বিনী,
অপাপবিদ্ধা স্বয়ংসিদ্ধা, আমি যে স্রোতস্বিনী!
গুপ্তকথা গোপন থাকে রাঙিয়ে দিয়ে মন,
নৌকোখানি উথালপাথাল দোলায় প্রভঞ্জন,
তবু হাহাকারের সুরে আলাপে তরঙ্গিণী,
সুপ্তসুখের ভেলা নিয়ে, আমি যে স্রোতস্বিনী!
স্রোতের টানে ভাবনা আসে, ভাবের টানে বুক,
ভুবনমাঝি রাত আগলায়, চাঁদেই বুঝি সুখ,
উদাসী ঢেউ জ্যোৎস্না বোনে, নদী যে চন্দ্রঋণী
ভাঁটার আলো মোক্ষ দেখে, আমি যে স্রোতস্বিনী!
ভুবনমাঝি, বুকের মাঝে, ঝর্না আলোয় রাত,
আমার লজ্জা কেড়ে নিয়ে মুখ ডোবাল চাঁদ,
ভাঁটা-মাঝে জোয়ার দেখি, আকুল বিরহিণী
আকাশজুড়ে তোমায় নিয়ে, আমি যে স্রোতস্বিনী!
সারা আকাশ সঙ্গে চলে রাঙিয়ে সারাদিন
মেঘের রাগে বাজতে থাকে ধ্রুবতারার বীণ,
তাথৈ তাথৈ ঝুমকো সুরে তটিনী চন্দ্রমণি,
নাচের তালে জলকে-চলে, আমি যে স্রোতস্বিনী!
বুকটি আমার চন্দ্রালোকে হয় যে এলোমেলো,
জোয়ার ভাঁটার ইন্দ্রক্ষণে কুল তো ভেঙ্গে গেল,
জোয়ার লুকোই সাধ্য কি? মাঝিও চূড়ামণি!
অমৃত-বিষ সবই বই, আমি যে স্রোতস্বিনী!
উদ্দামতা বাঁধতে আমার শিকল দিয়ে রাখে,
রুদ্ধ করে গতি আমার বাঁধের পাকে পাকে;
বন্দী হলাম দুর্বিপাকে, আটক বিকিকিনি,
থামতে আমি শিখিনি যে, আমি যে স্রোতস্বিনী!
বাঁচিয়ে রাখা কায়াটুকু যোগাড় করে মায়া,
সপ্তডিঙ্গা বহন করে বাঁচিয়ে রাখে হিয়া,
আকুলহিয়ায় কালবোশেখি, জীবন গরবিনী,
কাকে যে তুমি আটকে রাখো, আমি যে স্রোতস্বিনী!