সম্পাদকীয়

সম্পাদকীয়

সম্পাদকীয়

পৃথিবীর বাইরে যে সকল সম্পদ আছে, বিশেষ করে ‘চাঁদে’ যাতে একক কোনো দেশের মালিকানা না হয়; সেজন্য কয়েকটি দেশ মিলে একটি চুক্তি করেছিল অনেক পূর্বে। কিন্তু প্রযুক্তির এই অভাবনিয় এবং দ্রুত উন্নয়নের কারণে দেশগুলোর প্রতিনিধি চুক্তির প্রতি তীক্ষ্ন দৃষ্টি রাখছে। ফাঁকফোকর খুঁজছে কীভাবে নিজের ভাগে বেশি করে নিতে পারে। কীভাবে সেখানে নিজস্ব রাজনৈতিক,বাণিজ্যিক প্রভাব বিস্তার করতে পারে। আর আমরা আজও ডেঙ্গু মোকাবেলায় উডেন ফ্লোর ঝাড়ু দিচ্ছি। পুণ্য লাভের আশায় গণপিটুনি দিয়ে মানুষ মারছি। কতটুকু অসভ্য হলে এধরনের কাজ করা সম্ভব বলা মুশকিল। পারিবারিক কিংবা সামাজিকভাবে মূল্যবোধের অভাব এবং সেই সাথে অশিক্ষা,কুশিক্ষা, দরিদ্রতা আমাদেরকে যেভাবে গিলে খাচ্ছে এবং যেভাবে নৈতিক অধপতন হচ্ছে, তা থেকে বের হবার কোনও আলামত এই মুহূর্তে নেই ।

একটি দেশকে উন্নয়নের শিখরে পৌঁছাতে শুধু কোনো সরকারই যথেষ্ঠ নয়। সরকারের যেমন দায়িত্ব তেমনি নাগরিকেরও দায়িত্ব রয়েছে। সরকারের দায়িত্বশীলরা যেভাবে ব্যার্থ, নাগরিক হিসেবে আমরাও দায়িত্ব পালনেও ব্যার্থ। আমরা টংদোকানের বেঞ্চে বসে চা গিলতে গিলতে অ্যামেরিকার প্রেসিডেন্টকে গালি দিই। সালমান রুশদির জন্মরাশি চর্চা করি। আ্যাপেল গাছ কিংবা অশ্বত্থ গাছ, প্রিয়া সাহা, নোবেল কিছুই বাদ যায় না। এখানে বসে বসেও পৃথিবীর যেকোনো দেশের সরকারের সমালোচনা করি কিংবা কীভাবে দেশ পরিচালনা করতে হয় আকিজ বিড়ি টানতে টানতে জ্ঞান দিই।
অথচ একহাত দুরে কাঁঠালের ভুতি, আম, তরমুজের বাকল, কলার খোসা ছড়ানোর। পরিত্যক্ত বাল্টি, বোতল, ভাঙা কৌটা নর্দমায় জমা পানিতে মশা, মাছি বংশ বিস্তার করছে কোনো খেয়াল নেই। গোয়েন্দার মতো কার মেয়ে কার ছেলের সাথে পালিয়েছে তা চিবিয়ে চিবিয়ে বিকৃত মজা নিতে ব্যস্ত। বাসে ট্রেনে কোনো মেয়েকে বিকৃত স্পর্শে যেন অদ্ভুত আনন্দ মেলে। ধর্ষনের বিকৃত যৌন খেলা শেষে ভিডিও ফুটেজ জুম করে চোখের স্বাদ মিটাই।

পৃথিবী এখন যে সময়ের ভেতরে প্রবেশ করছে, আমরা যদি অন্তত একটি প্রজন্মকে সেই সময়ের মোকাবেলায় মান, গুন এবং দক্ষতায় প্রস্তুত করে যেতে না পারি, তাহলে একদিন আমরা হারিয়ে যাবো। সে দিকে আমাদের যেনো কোনো খেয়াল নেই। আমরা ব্যস্ত আছি সাদা পাঞ্জাবি পরে নেতা হতে। যোগ্যতা থাকুক বা না থাকুক। আজকাল যেন সাদা পাঞ্জাবি পরে আবুল তাবুল বলা কিংবা অপ্রয়োজনিয় কর্ম করা নেতা হবার মাপকাঠি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারপরও আসুন, অনেক দেরীতে হলেও সাদা পাঞ্জাবি পরা লোকদেখানো নির্লজ্জ ঝাড়ুদারদের পাশে বিভৎস ফটো তুলে নেতা হবার চেয়ে কিংবা একটি মাস্ক অথবা একটুকরো সাবান কাউকে দিয়ে ফটো সেশন করে নেতা না হয়ে, একটি শ্রেষ্ট প্রজন্ম তৈরিতে মনোযোগ দিই। মানবিক গুণাবলী, আবেগ এবং বিবেক সম্পন্ন নেতৃত্ব গড়ে তুলতে, আমাদের নতুন প্রজন্মকে একটি বিজ্ঞান নির্ভর সুশিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তুলি। তা না হলে প্রযুক্তি নির্ভর পৃথিবীতে আমাদের অস্থিত্ব ঠিকিয়ে রাখা কতটুকু কঠিন হবে, তা কেবল আগামি সময়-ই বলে দেবে।

আমাদের মনে রাখতে হবে; আমরা একটি কঠিন চ্যালেঞ্জিং সময় পার করছি। যদিও দেরী হয়ে গেছে— তবুও আমরা যদি এখনই সচেতন না হই; তাহলে আমাদের জন্য নিশ্চয়ই অপেক্ষা করছে আরও কঠিন পরিস্থিতি। আমারা একটু চোখ কান খুলে তাকালেই দেখতে পাই চারপাশে কী ভয়াবহ পরিস্থিতি। প্রাকৃতিক যে কঠিন বিপদসমূহ ধেয়ে আসছে পৃথিবীর দিকে— যে পৃথিবীতে আমাদের প্রিয় দেশ এবং দেশের মানুষও আছে থাকবে ; সে সমস্যা না হয় রেখে দিলাম আগামীকালের জন্য। কিন্তু এ মুহূর্তে যদি আমরা আমাদের চারপাশে চোখ খুলে তাকাই তাহলে দেখব, যুগযুগ ধরে চলে আসা সেই একই আতঙ্কিত চিত্র। চারদিকে হতাশা আর দীর্ঘশ্বাসের দীর্ঘ লাইন। আমরা এখনও দেখতে পাই সন্তানের ক্ষুধা মেটাতে না পারার জন্য মায়ের আত্মহত্যার দৃশ্য কিংবা অনেক মা-বাবার সন্তান বিক্রি কিংবা পিতা কর্তৃক মেয়েকে পতিতালয়ে বিক্রি করার দৃশ্য। শিক্ষক কর্তৃক ছাত্রী ধর্ষন। একে অন্যকে পিটিয়ে হত্যা করা, গুলি করে,পুড়িয়ে প্রকাশ্য হত্যা— এগুলো বলার মত ঘটনা আর রইল কই! ড্রাগের কথা এখানে না-ই বা বল্লাম। ঘুস থেকে শুরু করে সবধরনের দুর্নীতি সমাজের রন্দ্রে রন্দ্রে বাসা বেঁধেছে। আমাদের সমাজকে চারদিক থেকে ঘিরে ধরেছে মানবিক অবক্ষয়ের ভাইরাস। এর কারণ কী ? আমি বলব, অশিক্ষা,কুশিক্ষা, দারিদ্রতা,লোভ, অসৎ,অযোগ্য নেতৃত্ব। আমাদের সমাজে যে পচন শুরু হয়েছে সেটা কি দমন করা সম্ভব ? সমাজ এবং রাষ্ট্রের প্রতিটি গিঁটে যেভাবে দুর্নীতি,লোভ, হিংসা ঢুকেছে— আমার মনে হয় এত সহজে তা সম্ভব নয়। তবে আমরা সবাই যদি পরিকল্পিতভাবে সহযোগিতা করি, তা’হলে অসম্ভবও নয়। আর সেটা করতে হবে আমাদের পরিবার থেকে। আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান,সমাজ থেকে।

এখন আমাদের সমাজে কিংবা রাষ্ট্রের সব সেক্টরেই, অসৎ মানুষের ভিড়। এদের সংখ্যা বেশি হওয়ায়,ধীরে ধীরে আমাদের জীবনে যে পচন ধরেছে তা আজ সহজেই সবাই চর্মচোখে দেখতে পাই। এভাবে যদি চলে এবং চলতে থাকে— আর আমরা কয়েকটি মানববন্ধন করি, ফেইসবুকে মিছিল দেই— কিছুই হবে না। এতদিন থেকেই তো এসব করা হচ্ছে; ফল কী তা আমাদের সম্মুখে ভাসছে ! তাই আমাদের নতুন প্রজন্মের ভবিষ্যত সুখের জন্য এবং এসব থেকে উত্তরণে কিংবা একটি সুন্দর সমাজ, জাতি গঠনে সৎ-অভিভাবক ও সৎ-শিক্ষকদের সম্মিলিত প্রচেষ্ঠায় কঠিন এই চেলেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। অভিভাবক এবং শিক্ষকের সম্মিলিত প্রচেষ্ঠা-ই, আমাদের নতুন প্রজন্মকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তুলা সম্ভব।

সরকারের সাথে সাথে অল্টারনেটিভ কিছু আমাদেরকেই ভাবতে হবে। আমরা যদি এখনই পারিবারিক,সামাজিক, মানবিক মূল্যবোধে আমাদের নতুন প্রজন্মকে মানসিকভাবে তৈরী করে গড়ে তুলতে পারি, তাহলে এরা যখন সমাজ ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন সেক্টরে আসীন হবে,তখন সাধারণ মানুষ স্বস্থির শ্বাস নিতে পারবে। দেশ,জাতি এগিয়ে যাবে প্রকৃত গুনগত সফলতার দিকে। সঠিক নেতৃত্ব দিতে সেরকম একটি প্রজন্ম আমাদের তৈরী করে যেতে হবে। এভাবে নতুন প্রজন্মকে গড়ে তুলতে হলে অভিভাবক পরেই যাদের প্রয়োজন, তারা হলেন শিক্ষক। শিল্প- সাহিত্যের মনোরম পরিবেশ। তাই আবেগ একপাশে রেখে আমাদের নতুন প্রজন্মকে শুধু রাজনীতি নির্ভর করে গড়ে না তুলে, তাদেরকে একটি মানবতাবোধ সম্পন্ন মেধাসম্পদ হিসাবে ভবিষ্যতের জন্য তৈরী করতে এখনই উদ্যোগ নেয়ার সময়।

সুপ্রিয় লেখক, পাঠক— আবারও শুধু এপার আর ওপার বাংলা নয়— পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বসবাসরত বাংলাভাষীর লেখা নিয়ে প্রকাশিত হল, ড্যাশ— ০৭ বাংলা ও ইংলিশ। বাংলাভাষী ছাড়াও অন্য ভাষার কবিরা লিখেছেন ইংলিশ সংস্করণে। ড্যাশ-০৭ এ প্রকাশিত লেখা ক্লিক করে পড়ার আমন্ত্রণ রইল। লেখক পাঠক সবাইকে অনেক শুভেচ্ছা।

এ কে এম আব্দুল্লাহ
সম্পাদক, ড্যাশ—
আগস্ট ২০২১