ফাহমিনা নূরের কবিতা

ফাহমিনা নূরের কবিতা

কিউবিজম

রাত্রিভেঙে
স্ট্রিটল্যাম্পগুলো কেঁপে উঠলে
আমরা ধরেই নিই তড়িৎ প্রবাহে বিঘ্ন ঘটেছে,
একে ঠিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন বলা যায় না।

বিস্তৃত হতে থাকা তোমার অহংকারী জেদগুলো
থেকে জেসমিনের কড়া গন্ধ বেরুতো আমার
মাইগ্রেনকে উস্কে দেবে বলে।
ওগুলো ছিলো বোকার মত অবিচল থাকার
ছদ্ম প্রয়াস মাত্র
অথচ দেখো ছন্দপতন ঘটেই যাচ্ছিল।

এর কাছাকাছি সুরে একটি আবহ সঙ্গীত
বহুদিন হলো আমাদের কক্ষপথে ঘুরে বেড়াচ্ছে-
শনি গ্রহের মত আমরা নিরন্তর নিজ নিজ বলয়কে
মেরামত করে চলেছি, ভাঙার কথা মনেই আসেনি।

সাতাশটি সৌরবৎসরে চন্দ্র তোমাকে প্রদক্ষিণ করেছে
তিনশ পয়ষট্টিবার।
কখনও তোমার মনেই হয়নি এইসব কক্ষপথে
ইতস্তত ভেসে বেড়ানো কিউবিক জীবন অখন্ড থাকে না ;
এখন তবে আর অখন্ডতা দাবী করে বসো না।

মহাজগতেও ধূলিঝড় হয়, প্রচণ্ড বেগে ছুটে বেড়ায়
উল্কাপিণ্ড
সংঘর্ষ ঘটেনি বলে তাকে দৈব না ভেবে, ভেবে নিও কেউ একজন সাবধানী ছিলো।

জলচক্র

ছিদ্রসমেত কানাভাঙ্গা হাঁড়িগুলো সম্বলহীন
অসহায়।
জলভরা কলসগুলো ঈর্ষার ঝাঁপিতে কৃষ্ণচূড়া
ফোটায়।

তাদের সবাইকে বাঁচতে দাও
সমগোত্রীয়দের করতালি মুখর সন্ধ্যায়-

হাঁড়িদের ক্ষোভ, ছিদ্র নিঃসৃত গালি, অসূয়া দহন এই যদি সম্বল হয় তবে তাই নিয়ে বাঁচুক;
জলের টঙ্কার যদি শোরগোল তোলে বয়ে যেতে দাও উপচে পড়া ঢেউ, একটুখানি তারাও বাঁচুক।

দিনশেষে সব জল মাটি ছূঁয়ে পাতালে একাকার
কে এলো হাঁড়ি ভেঙে আর কে এলো কলস উপচে,
জানে নি তো কেউ, বলো, কে কবে খোঁজ রাখে তার!

তুমি বরং মেঘ নিয়ে ভাবো-
সমুদ্রজল কী বিপুল বিস্ময় জাগিয়ে আকাশে ওড়ে!
বৃষ্টি হয়ে যা এই মাটিতেই রিমঝিম ঝরে, পড়ে, মরে।
কিছুটা তার পাতালগামী, বাকিটা আটকে থাকে জলচক্রে।
তুমি বরং জলচক্র নিয়ে ভাবো।

দূরের গ্রাম

অন্তরের সলিলধারায় বয়ে যেতে যেতে
পৌঁছে যাই ইরেবাসের গুহায়, তার
নিচে বরফ চুইঁয়ে ঝরে নার্সিসাস জল,
নিজেকে ভালো না বাসলে বহন দুরূহ হয়
জীবনের ভার
ব্যর্থতার কিস্তি বানিয়ে তাই নিজেকে ভাসিয়ে দিই
নার্সিসাস জলে, বলি – দূর হও, দূরে গিয়ে মরো;
আমাকে হাতছানি দেয় দূরের কোনো গ্রাম।

সোলায়মানি যাদুতে পিঁপড়ার ভাষাও বুঝতে পারি
কেন যে! কেন যে! হয়তো গুঁড়িয়ে দিচ্ছি মাটিরকণা;
শ’য়ে শ’য়ে পিঁপড়া ছুটে চলে রানীর নির্দেশে, কাঁধে
তাদের শীতের সঞ্চয়,
আমার সঞ্চয়ে অবশিষ্ট নাই আর কোনো ঘৃণা।
বহু চিৎকার, আর ক্রন্দনসীমায়
ঘৃণার ছুরি শানাতে শানাতে কখন যেন জেনে গেছি
প্রেমের চেয়ে বড় শাস্তি আর মায়ার চেয়ে বড় অস্ত্র
বানাতে পারি নাই।

এখন কেবল
পিঁপড়েদের কাছে সাধনার মন্ত্র শিখে নিতে চাই,
আমাকে হাতছানি দিয়ে যাচ্ছে দূরের কোনো গ্রাম।