প্রবন্ধ: জীবনের ভাষ্যকার লিও তলস্তয়

জীবনের ভাষ্যকার লিও তলস্তয়
রঞ্জন চক্রবর্ত্তী
অভিজাত পরিবারের সন্তান লিও নিকোলায়েভিচ্ তলস্তয় (১৮২৮ – ১৯১০) জীবনের বেশীরভাগটাই প্রাচুর্যের মধ্যে কাটিয়েছিলেন। ভাবতে অবাক লাগে সমাজের উচ্চশ্রেণীতে ঘোরাফেরা করা এই মানুষটি পরবর্তীকালে অভিজাত সম্প্রদায়ের জীবনযাত্রার অন্তঃসারশূণ্যতা উপলব্ধি করে নিজেকে declass করতে প্রয়াসী হয়েছিলেন। শেষ জীবনে তিনি কায়িক শ্রমে দিনযাপন করতেন, এমনকী জুতো সেলাইয়ের কুশলী কারিগরও হয়ে উঠেছিলেন। তিনি যেমন একদিকে ভোগবিলাসে জীবনেরপ্রথমার্ধ কাটিয়েছেন, তেমনি জীবনের উত্তরার্ধে এসে তার একেবারে বিপরীত মেরুতে দাঁড়িয়ে মানুষের জাগতিক দুঃখ দেখে সহানুভূতিশীল হয়ে নিজের অর্থ-সম্পদ দান করেছেন।
মস্কোর দু’শ কিলোমিটার দক্ষিণে তুলা প্রদেশের অন্তর্গত ইয়াস্নায়া পলিয়ানা ছিল তলস্তয়ের মায়ের বংশানুক্রমে প্রাপ্ত জমিদারি। সেখানে ১৯২৮ সালের ২৮ আগস্ট তলস্তয়ের জন্ম, তাঁর শৈশবও সেখানেই কেটেছে। জন্মের বছর দুয়েক পরেই তিনি মাতৃ-হারা হন। যখন পিতা নিকলাই ইলিচের মৃত্যু ঘটে তখন তাঁর বয়সনয় বছর। প্রথমে পিতামহী তাঁর অভিভাবিকা ছিলেন, তাঁর মৃত্যুর পর বড়পিসি সেই দায়িত্ব নেন। সেই সময়ের অভিজাত পরিবারের রীতি অনুযায়ী গৃহশিক্ষকদের কাছে তাঁর প্রাথমিক শিক্ষালাভ হয়েছিল। বড় পিসির মৃত্যু হলে কাউন্ট পরিবারের রীতি অনুসারে বালক তলস্তয় কাজানে তাঁর মেজোপিসির কাছে বড় হয়ে উঠেছিলেন। ১৮৪৪ সালে তিনি কাজানে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাচ্য ভাষা বিভাগে ভর্তি হন। পরের বছর তিনি বিষয় পরিবর্তন আইনবিদ্যা পড়তে শুরু করেন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত শিক্ষাদানের পদ্ধতি তাঁর মোটেই চিত্তাকর্ষক মনে হয় নি।বছর তিনেক পর পড়াশোনা অসমাপ্ত রেখে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ইতি টানেন।
অভিজাত সমাজের লক্ষ্যহীন জীবনযাত্রা তোলস্তয়কে আকর্ষণ করতে পারে নি। এই সময় রুশো ও মন্তেস্ক-এর চিন্তাধারা তাঁকে প্রভাবিত করেছিল। ১৮৪৭ সালে ভাইদের মধ্যে সম্পত্তি ভাগ-বাঁটোয়ারা হলে তিনি ইয়াস্নায়া পলিয়ানার ভূসম্পত্তির মালিক হন এবং সেখানে বাস করতে আসেন। তাঁর জমিদারির এলাকায় বসবাসকারী কৃষকদের জীবনের মান উন্নয়ন করা তাঁর অন্যতম লক্ষ্য ছিল। তবে গোড়ার দিকে কৃষকরা তাঁর বিভিন্ন সংস্কারমূলক কাজগুলিকে সন্দেহের নজরে দেখেছিল, ফলে আন্তরিক চেষ্টা থাকা সত্বেও তখন তাঁর পরিকল্পনাগুলি সফল হয় নি। এই প্রচেষ্টা ও ব্যর্থতার কথা তিনি পরবর্তীকালে ‘জনৈক ভূস্বামীর প্রভাত’ শীর্ষক রচনায় লিখেছিলেন।
কাজানে থাকাকালীনই তিনি নিজের দিনলিপি লেখা শুরু করেছিলেন যা আমৃত্যু অব্যাহত ছিল। এই দিনলিপি কিন্তু মামুলী রোজনামচা নয়, এগুলি সাহিত্যচর্চার নিদর্শনরূপে গণ্যযার মাধ্যমে তাঁর সাহিত্যক্ষেত্রে উত্তরণ ঘটেছিল। ১৮৫২ সালে নেক্রাসভের সভ্রেম্যেন্নিক নামক সাহিত্য পত্রিকার সেপ্টেম্বর সংখ্যায় তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘Childhood’ প্রকাশিত হয়েছিল। এই উপন্যাসটি তাঁকে সাহিত্যখ্যাতি এনে দেয়। ১৮৫৪ সালে প্রকাশিত হয়েছিল পরবর্তী উপন্যাস ‘Boyhood’। এর পর ১৮৫৭ সালে প্রকাশিত হয় ‘Youth’। রুশ সাহিত্যের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখব এই ত্রয়ী উপন্যাসে প্রথম মানুষের চরিত্রগঠনের সমস্যা ভাষারূপ পেল। শৈশব থেকে কৈশোর এবং কৈশোর থেকে যৌবনে উত্তরণের পথে একজন মানুষের নৈতিক উৎকর্ষলাভের সমস্যা এর মূল উপজীব্য। এই ট্রিলজি কোন অর্থেই তলস্তয়ের আত্মজীবনী নয়, বস্তুত এই তিনটি কাহিনী হল আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস। ম্যাক্সিম গোর্কির ত্রয়ী উপন্যাস ‘My Childhood’, ‘In the World’, ‘My University’ ঠিক এই গোত্রের, যেমন বাংলা ভাষায় শরৎচন্দ্রের ‘শ্রীকান্ত’। এই দশকের শেষের দিকের রচনা ‘Three Deaths’ (১৮৫৯) ছোটগল্পটিতে সমাজের তথাকথিত বিত্তশালী শ্রেণীর সঙ্গে কৃষকদের জীবনের বৈষম্য প্রতিফলিত হয়েছে।
দাদার পরামর্শে তলস্তয় ককেশাসে সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন এবং তিন বছর কাজ করেছিলেন। তেরেক নদীর ধারে পাহাড়ি এলাকায় থাকা ও সংগ্রামের অভিজ্ঞতা তাঁর পরবর্তী জীবনে বিশেষ প্রভাব ফেলেছিল। এই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তিনি তিনি ঊনবিংশ শতাব্দীর সাতের দশকে শিশুদের জন্য ‘ককেশাসের বন্দি’ নামক উপাখ্যানটি লিখেছিলেন। বস্তুত ককেশাসের গ্রামাঞ্চলে থাকার সময় থেকেই তিনি সাহিত্যকর্মের প্রতি মনোযোগী হন। এই সময় স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রা ও যুদ্ধের ঘটনাবলীর উপর ভিত্তি করে তিনি ‘হানা’, ‘বনকাটা’, ‘বাহিনীতে সাক্ষাৎ’ প্রভৃতি গল্প লেখেন। যুদ্ধে সাহস দেখানোর জন্য তিনি সেন্ট জর্জ ক্রস পেয়েছিলেন। ১৮৫৪ সালে তিনি ক্রিমিয়ার সেভাস্তোপলে বদলি হন। তখন সেখানে রাশিয়ার সঙ্গে তুরস্কের লড়াই চলছিল। এখানকার যুদ্ধের ঘটনাই ‘সেভাস্তোপল’ গল্পগুলির (১৮৫৪ – ৫৫) উপকরণ। এই গল্পের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হল যুদ্ধের বাস্তবধর্মী দিকটিকে ভাষারূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে লেখকের সার্থকতা। এখানে যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের মনস্তস্ত্বের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জীবনদর্শন নিয়েও অনেকটা আলোচনা আছে যা সামগ্রিক ভাবে রুশ জাতিগোষ্ঠীর জীবনে যুদ্ধের ভূমিকা বিষয়ক বোধ জাগিয়ে তোলে। রুশ সাহিত্যের ইতিহাসে এরকম গল্প তাঁর আগে আর কেউ লেখেন নি। তাঁর রচনা তখনই তুর্গেনেভ প্রভৃতি সাহিত্যিকদের নজরে পড়েছিল।
১৮৫৬ সালেসেভাস্তোপলের পতনের পর তলস্তয় সেনাবাহিনীর কাজে ইস্তাফা দিয়ে বাড়ি ফিরে আসেন। পরে লেখালিখির সূত্রে চের্নিশ্যেভস্কি, নেক্রাসভ, গনচারভ, তুর্গ্যেনেভ্ প্রভৃতি সাহিত্যিকদের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি তিনি দুটি বিষয়ে উদ্যোগী হয়েছিলেন – প্রথমত ভূমিদাসদের মুক্তি এবং দ্বিতীয়ত কৃষকদের অবস্থার উন্নতিসাধন। ১৮৫৬ থেকে ১৮৬২ পর্যন্ত তিনি বিভিন্ন ধারার সাহিত্য রচনার পাশাপাশি কৃষক পরিবারের শিশুদের শিক্ষার ব্যাপারে আগ্রহী হন, শিক্ষা বিষয়ক পত্রিকা প্রকাশ করেন এবং পাঠ্যপুস্তক রচনা করেন। ১৮৫৭ সালে তিনি শিক্ষার ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য বিদেশে যান। পশ্চিম ইউরোপের বিভিন্ন দেশ পরিভ্রমণের অভিজ্ঞতা থেকে সেখানকার বস্তুবাদের প্রতি তাঁর অবিশ্বাস দৃঢ় হয় এবং পশ্চিমের অনুকরণে স্বদেশের সংস্কারে তাঁর মন সায় দেয় নি।
দেশভ্রমণ শেষ করে রাশিয়ায় প্রত্যাবর্তনের পর ১৮৬২ সালে তিনি মস্কোর এক চিকিৎসকের মেয়ে সোফিয়া আন্দ্রেইয়েভনার প্রতি অনুরক্ত হয়ে পড়েন যার পরিণতি হয় বিবাহে। এই মহিলা ছিলেন বয়সে তাঁর থেকে ষোল বছরের ছোট। তাঁর বিবাহিত জীবন সুখের হয়েছিল। বিবাহিত জীবনে তাঁদের তেরোটি সন্তানের জন্ম হয়। সোফিয়া বরাবরই স্বামীর সাহিত্যচর্চায় উৎসাহ দিয়েছেন। তিনি স্বামীর রচনা ফরাসী ভাষায় অনুবাদ করেছেন, ‘ওয়ার এণ্ড পীস’ উপন্যাসটি স্বহস্তে কপিও করে দিয়েছেন। সব অর্থেই তিনি স্বামীর সাহিত্যকর্মে প্রেরণা জুগিয়েছেন।
১৮৬৩-তে প্রকাশিত হয়েছিল তলস্তয়ের বিখ্যাত উপন্যাস ‘The Cossacs’। ১৮৫২ সালে তিনি উপন্যাসটি লেখার কাজ শুরু করেছিলেন, এগারো বছর পরে তা প্রকাশিত হয়।এই উপন্যাসে তাঁর সাহিত্যপ্রতিভার প্রথম স্ফূরণ ঘটেছে, সেদিক থেকে বিচার করলে এই রচনাটি তাঁর সৃজনশীলতার উত্তরণপর্ব সূচিত করে। এই উপন্যাসের প্রধান চরিত্র দমিত্রি অল্যেনিন যেন কতকটা লেখকের আত্মপ্রতিকৃতি। আমরা যদি উপন্যাসের কম্পোজিশন বিচার করি তাহলে দেখব এখানে কসাকজীবনের ভূমিকা রোমান্টিক। তা সত্বেও বলতেই হবে এই উপাখ্যানে সত্যিই যদিোরেমান্টিক কেউ থাকে সে হচ্ছে অল্যেনিন। কসাকদের জীবনযাত্রার যে ছবি তিনি এঁকেছেন তা অবশ্যই বাস্তবধর্মী। যে ধরণের দার্শনিকসুলভ মন্তব্যগুলি সামগ্রিকভাবে তলস্তয়ের সাহিত্যজীবনের বৈশিষ্ট্য এখানেও তার নমুনা মেলে – “I do not love my own life, there is something stronger than me which directs me. I suffer; but formerly I was dead and only now do I live.” এই উপন্যাসের সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর সাহিত্যজীবনের প্রথম পবের সমাপ্তি।
যুক্তির সাহায্যে ইতিহাসের ঘটনাবলী বিশ্লেষণ করতে গিয়ে ১৮১২ সালের পিতৃভূমির যুদ্ধের ঘটনাবলীর প্রতি তলস্তয় বিশেষভাবে আকৃষ্ট হন। বিবাহ পরবতী পর্বে (১৮৬৩ সালে) তিনি নেপোলিয়নের ফ্রান্সের সঙ্গে রাশিয়ার যুদ্ধেরঘটনা অবলম্বনে ‘War and Peace’নামক এপিক সাহিত্যটি রচনায় মনোনিবেশ করেন। ছয় খণ্ডে সমাপ্ত প্রায় দুহাজার পাতার এই উপন্যাস লিখতে তাঁর সময় লেগেছিল ছয় বছর। পৃথিবী জয় করার নেশায় উন্মত্ত নেপোলিয়নের আক্রমণে তৎকালীন রাশিয়া তথা ইউরোপের বিধ্বস্ত চেহারা এই বইয়ে ফুটে উঠেছে। সব অর্থেই উপন্যাসটির ব্যাপ্তি মহাকাব্যিক। প্রাথমিকভাবে উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্ররূপে যাদের কথা ভাবা হয়েছিল (অর্থাৎ আন্দ্রেই বলকোনস্কি, পিয়ের বেজুখভ) তাদের জীবনের গতিপথ ক্রমে জটিলতর হয়ে ওঠে, বিভিন্ন ঐতিহাসিক চরিত্রের আগমন ঘটে এবং জনগণ অন্যতম চরিত্র হয়ে দাঁড়ায়।তলস্তয়ের একটি মন্তব্য তো একেবারে স্বতঃসিদ্ধের মত – “The strongest of all warriors are these two – Time and Patience.”
বস্তুত ‘War and Peace’ উপন্যাসটি তলস্তয়কে যে উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে রাশিয়ার সাহিত্যিকদের মধ্যে একমাত্র পুশকিন তার কাছাকাছি যেতে পেরেছেন। এই সুবৃহৎ উপন্যাসে বীর ও সমরনায়ক হিসেবে পরিচিত নেপোলিয়নের বাহ্যিক রূপের নেপথ্যে যে স্বৈরাচারী মানুষটি লুকিয়ে আছে তাকে তিনি প্রকাশ্যে এনেছেন। পাশাপাশি সাম্রাজ্যবাদী শক্তির অবশ্যম্ভাবী পরাজয়ের ছবিও তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন।উপন্যাসটি পড়ার সময় নায়িকা নাটাশা, প্রিন্স অ্যান্ড্রু, পিয়ের ইত্যাদি চরিত্রগুলি চরিত্রগুলি যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে।আমরা যেন শুনতে পাই তাঁর সেই অমোঘ বাণী – “If everyone fought for his own conviction there would be no war.”
তলস্তয় যে রাশিয়ার মহাবিপ্লবের একনিষ্ঠ সমর্থক ছিলেন এমন নয়। তিনি বিপ্লবের তত্ত্বকে সমর্থনও করতেন না। তবুও একদা তিনি বলেছিলেন দরিদ্রকে শোষণ করে ধনী সম্প্রদায় শুধুমাত্র একটা দূষিত ও কৃত্রিম সভ্যতা গড়ে তোলেনি, নিজের স্বার্থে এমন মূল্যবোধের সৃষ্টি করেছে যার থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য এক আলোড়ন দরকার।রুশ বিপ্লবের নায়ক লেনিন ‘War and Peace’ গ্রন্থটিকে রুশ বিপ্লবের দর্পণ বলেছিলেন। এই মন্তব্যের কারণ উপন্যাসটিতে বাস্তবতার অসাধারণ সাহিত্যিক প্রকাশ ঘটেছে। জারের শাসনাধীন রাশিয়ার সমাজের উপরতলার অন্তঃসারশূণ্যতা এবং পাশাপাশি বলশালী প্রতিপক্ষের সামনে রাশিয়ার জনগণের সংগ্রামের ছবি এখানে সার্থকভাবেপ্রতিফলিত হয়েছে। লেনিনের এরকম মন্তব্য করার কারণ হল এই উপন্যাস পাঠ করলে ভবিষ্যতের রুশ বিপ্লবের সম্ভাবনা ও তার সাম্ভাব্য প্রকৃতি সম্পর্কে ধারণা করতে পারা যায়। মনে রাখতে হবে ‘War and Peace’ রচনা শেষ হওয়ার দশ বছর পরে লেনিন জন্মেছিলেন।
১৮৭১-৭২ সালে তলস্তয় বর্ণপরিচয় রচনা করেন। তিনি আশা করেছিলেন সমাজের সকল স্তরের পরিবারের ছেলেমেয়েরা তাঁর বর্ণপরিচয় পড়বে।সাধারণ মানুষের জগৎ তাঁকে অনেক বেশী করে আকষণ করতে থাকে এবং অসহায় দরিদ্র মানুষের সমস্যার প্রতি তিনি উত্তরোত্তর সহানুভূতিশীল হতে থাকেন। ১৮৭৩ সালে তিনি সামারা প্রদেশের গ্রামাঞ্চলের দুর্ভিক্ষপীড়িত এলাকা পরিদর্শন করেন। স্হানীয় কর্তৃপক্ষ প্রকৃত তথ্য জানাতে চাইছিল না, কিন্তু তিনি মস্কো বার্তা পত্রিকায় সেই অঞ্চলের মানুষদের দুর্দশার বিবরণ প্রকাশ করেন। এর ফলে সেখানে সাহায্য পৌঁছায়।
১৮৭৩ সালেই মধ্যবয়সী তলস্তয় লিখলেন তাঁর কালজয়ী উপন্যাস ‘Ana Karenina’। এটি একটি ত্রিকোণ প্রেমের কাহিনী যার কেন্দ্র রয়েছে নারী মনস্তত্ত্ব। এই মনস্তত্ত্বমূলক সামাজিক উপন্যাসটি অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়েছিল এবং তিনি খ্যাতির শীর্ষে উঠেছিলেন। কাহিনির ঠাসবুনোটের মধ্যে একদিকে যেমন আছে সমাজের উঁচুতলার ছবি, অন্যদিকে তেমনই আছে নীচুতলার ছবি। তলস্তয়ের রচনার একটা সাধারণ বৈশিষ্ট্য হল বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে প্রবৃত্তি দ্বারা পরিচালিত মানুষের উত্তরণকে দেখা, বিশ্লেষণ করা এবং সাহিত্যে প্রতিফলিত করার প্রয়াস। স্হিতধী দাশনিকের মত তিনি বলেছেন – “Rummaging in our souls, we often dig up something that ought to have lain there unnoticed.” এই উপন্যাসের মূল কাহিনী আনা ও ব্রুনস্কির সম্পর্কের উপর আধারিত হলেও লেখকের প্রিয় চরিত্র কিন্তু লেভিন। তার যুক্তি ও বিশ্লেষণের মধ্যে যেন লেখকের আত্মানুসন্ধানের ছায়া পড়েছে।
সত্তরের দশকের পুরোটাই তলস্তয় এক জটিল মানসিক সংকটের মাঝে কাটিয়েছিলেন। এই দশকের শেষের দিক থেকে তিনি সাহিত্যের শিল্পগত দিকের প্রতি মনযোগ দেওয়ার পরিবর্তে ধর্ম, সাহিত্য, শিল্প, সামাজিক সমস্যা প্রভৃতি বিষয়ে নিজের ধারণা প্রকাশ করতে অধিক আগ্রহী হন। অভিজাত সম্প্রদায়ের জীবনযাত্রার অন্তঃসারশূণ্যতা তিনি অন্তর থেকেই উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। ১৮৭৯ সালে স্বীকারোক্তিতে তলস্তয় লিখেছিলেন নিজের পরিমণ্ডলের জীবনযাত্রাকে তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন এই ভেবে যে সেটা কোন জীবনই নয়। তিনি আরও লিখেছিলেন জীবনকে উপলব্ধি করতে হলে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের জীবন এবং তার ভাবনাচিন্তা বুঝতে হবে। বস্তুত এই পর্বে তাঁর জীবনযাত্রা অতিশয় সরল হয়ে আসে। তিনি নিজের হাতে জ্বালানি কাঠ কাটতেন, জুতো সেলাই করতেন, স্লেজে করে জল নিয়ে আসতেন। প্রসঙ্গত জানাই তলস্তয় অপরিসীম শারীরিক ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন। সত্তরোর্ধ বয়সে তিনি স্কেটিং করতে পারতেন, পঁচাত্তর বছর বয়সে অনায়াসে সাইকেল চালাতেন এবং আশি বছর বয়সেও জোরে ঘোড়া ছোটাতে পারতেন।
১৮৮১ সাল নাগাদ সন্তানদের পড়াশুনার সুবিধার্থে তলস্তয় সপরিবারে মস্কোয় থাকতে শুরু করেন। মহানগরীর সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে পরিচিত হবার জন্য তিনি ১৮৮২ সালে আদমশুমারীতে অংশ নিয়ে দরিদ্রতম এলাকাগুলিকে কাজের জন্য বেছে নেন। দশ বছর পরে যখন ভয়াবহ অজন্মা দেখা দেয় তখন তিনি কৃষকদের জন্য সাহাষ্যের হাত বাড়িয়ে দেন। এই সময়ে তিনি লিখেছিলেন ধনাঢ্য ও জ্ঞানীগুণি সমাজের জীবনযাত্রা তাঁর কাছে অসহ্য লাগে এবং তার অর্থও খুঁজে পান না। এই মন্তব্য থেকেই তাঁর পরিবর্তিত মানসিকতা সম্পর্কে ধারণা করা যায়। প্রকৃতপক্ষে এইসব ভাবনাচিন্তার দ্বারা পরিচালিত হয়ে তিনি একপ্রকার মিস্টিক ধারণায় উদ্বুদ্ধ হন। মানুষের কর্মকেই তিনি সমধিক গুরুত্ব প্রদান করেন।
আশির দশকের শুরুতে তলস্তোয় লোককথার আদলে কয়েকটি নীতিমূলক রূপক কাহিনী লিখেছিলেন, যেমন – ‘How Much Land Does A Man Need’, ‘God Sees The Truth But Waits’ প্রভৃতি। এই দশকের গোড়ার দিক থেকেই তলস্তোয় ধীরে ধীরে সাহিত্যজগৎ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিতে থাকেন এবং নীতিপ্রচারে ও সামাজিক কাজে অনেক বেশী মনোযোগী হয়ে পড়েন। এইসব দিকে তিনি এত বেশী মগ্ন হয়ে পড়েছিলেন যে রাশিয়ার অপরদিকপাল সাহিত্যিক তুর্গ্যেনেভ তাঁকে সাহিত্যজগতে ফিরে আসার জন্য আবেদন জানিয়েছিলেন। সৌভাগ্যবশত সাহিত্যচেতনা ও শিল্পবোধ তলস্তোয়ের মধ্যে ক্রিয়াশীল ছিল। তিনি আবার নতুন ধারণা ও জীবনবোধ নিয়ে সাহিত্যক্ষেত্রে পদার্পণ করেছিলেন।
তলস্তয়ের একটা বড় বৈশিষ্ট্য হল যেখানেই তিনি অর্থবান বা সমাজের উঁচুতলার মানুষদের কথা বলেছেন, সেখানেই তাদের জীবনযাত্রার পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা দিতে চেষ্টা করেছেন। তাদের কথাবার্তা, খাদ্যাভ্যাস, চাল-চলন প্রভৃতির নিঁখুত বিবরণ রচনাকে তাৎপর্যপূণ করেছে। যেমন Resurrection উপন্যাসে নায়ক নেখলিউদভের শয্যাদৃশ্যের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। আসলে তিনি চেয়েছিলেন সমাজের উপরতলার বিলাসবহুল জীবনযাত্রা ও ভোগবিলাসের কথা সাধারণ মানুষের কাছে তুলে ধরতে। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল তথাকথিত উঁচুমহলের প্রকৃত রূপটি সকলকে দেখান।
অনেক সমালোচক অভিযোগ করেন তলস্তয়ের মনন ধর্মীয় চিন্তার দ্বারা অতিমাত্রায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল। জীবনের উত্তরার্ধে তিনি অহিংসা পথের পথিক ছিলেন এবং এই কারণেই মহাত্মা গান্ধী তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হন। কিন্তু তলস্তয়ের ধর্মের ধারণা অন্যদের থেকে একেবারে স্বতন্ত্র।তিনি যে খ্রীষ্টধর্মের কথা বলেছেন সেখানে গীর্জা, পুরোহিত বা আচার-অনুষ্ঠানের জায়গা নেই।ধর্মের আড়ালে স্বার্থসিদ্ধির প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে তিনি প্রতিবাদ করেছেন। এখানে একটা লক্ষ্যণীয় বিষয় হল তিনি যীশুখ্রীষ্টকে যেমন অস্বীকার করেন নি, তেমনই তাঁর দেবত্বকেও স্বীকার করেন নি।তাঁর মতে যে ব্যক্তি অপরের শ্রমের উপর জীবনধারণ করেন এবং রাষ্ট্রের নির্দেশ পালন করার জন্য নিজের বিবেকের বিরুদ্ধে গিয়ে হিংসাত্মক কাজ করতে দ্বিধা করেন না তিনি সত্যিকারের খ্রীষ্টধর্মাবলম্বী নন। তলস্তয়ের এই ধারণার কথা জেনে ক্রুব্ধ রাশিয়ার যাজকগোষ্ঠী তাঁকে ধর্মীয় সমাজ থেকে বিতাড়িত করেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর খ্রীষ্টান ধর্মযাজকরা তাঁর অন্তিম সংস্কার করতেও আসেননি।
তলস্তয়ের চরিত্রে অসাধারণ দৃঢ়তা ছিল, ঋজুতারও অভাব ছিল না। তবে এটাও মানতে হবে যে সমকালীন বেশ কয়েকজন প্রতিভাধর সাহিত্যিকের সম্বন্ধে তিনি যথাযথ মূল্যায়ণ করেন নি। মোপাসাঁ সম্পর্কে তিনি যে সমালোচনা করেছিলেন তার কঠোরতা মাত্রাতিরিক্ত। এমনকী শেক্সপীয়র সম্পর্কেও তিনি বিরক্তির ভাব পোষণ করতেন। এইসব ভ্রাম্ত সাহিত্য বিষয়ক ধারণার কারণে তলস্তয়ের বৃদ্ধাবস্থায় ম্যাক্সিম গোর্কী তাঁর কড়া সমালোচনা করেছিলেন। সত্যি কথা বলতে কী একমাত্র ঘনিষ্ঠ বন্ধু তুর্গেনিভের সঙ্গেই তিনি মেলামেশা ও সাহিত্য আলোচনা করতেন, তা ছাড়া অপরাপর সাহিত্যিকদের সঙ্গে তিনি বিশেষ কথাবার্তা বলতেন না।
এইসব সীমাবদ্ধতা থাকলেও বলতে হয় ব্যক্তি তলস্তয় কোনদিনই নিজের ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলিকে ধামাচাপা দিতে চান নি। বয়স যখন পঞ্চাশ, তখন নিজের চরিত্রের নানা দোষ-ত্রুটি নিয়ে তিনি ‘A Confession’ নামে একটি রচনা লিখেছিলেন। এটি প্রকৃতপক্ষে তাঁর আত্মসমালোচনামূলক নিবন্ধ যেখানে তিনি মন্তব্য করেছিলেন – “Wrong does not cease to be wrong because the majority share in it” একজন সত্যিকারের শিল্পী বা সাহিত্যিকের কাছে নিজের স্বীকারোক্তি ভীষণ প্রয়োজন। রচনাটি পাঠ করতে করতে মনে পড়ে কামুর সেই অমর উক্তি – “A guilty conscience needs to confess. A work of art is a confession.”
তলস্তয়ের নাটকগুলির মধ্যে ‘Fruits of Enlightenment’ এবং ‘The Living Corpse’ উল্লেখযোগ্য। তাঁর ছোটগল্পগুলির মধ্যে ‘Three Deaths’, ‘The Prisoner of the Caucasus’, ‘The Three Questions’, ‘Two Hussars’, ‘Three Deaths’, ‘The Forged Coupon’, ‘Master and Man’, ‘The Devil’, ‘Where Love Is, God Is’ প্রভৃতি আলাদাভাবে উল্লেখের দাবী রাখে। ১৮৮৪ সালে ‘What Is to Be Done?’ প্রবন্ধে তিনি অর্থের অশুভ শক্তির সমালোচনা করেন এবং সুবিধাভোগী অকর্মণ্য ধনী শ্রেণীকে সাধারণ মানুষের ঘাড় থেকে নামানোর কথা বলেন। ১৮৮৬ সালে লেখা নাটক ‘The Power of Darkness’বিশেষ গুরুত্ব দাবী করে। তাছাড়া ‘The Death of Ivan Ilyich’ ও ‘Father Sergius’ গল্পদুটি উল্লেখযোগ্য। পাশাপাশি ‘What I Believe’ গ্রন্থে তাঁর ধর্মীয় চিন্তার প্রকাশ ঘটেছে। ‘The Kingdom of God is Within You’ (১৮৯৪) গ্রন্থটিতে তাঁর অহিংস প্রতিরোধের ধারণা মহাত্মা গান্ধী ও মার্টিন লুথার কিং প্রভৃতি বিংশ শতাব্দীর অগ্রণী নেতাদের প্রভাবিত করেছিল।
তলস্তয় মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন যেসব শিল্পীরা কল্পনাবিলাসী বা ব্যবসায়িক মনোভাব পোষণ করেন তাদের শিল্প-সাহিত্যের জগৎ থেকে না তাড়াতে পারলে সার্থক শিল্প সৃষ্টি করা যাবে না। কর্মের দিক থেকে বিচার করলে সামনের দিনের শিল্পকে হতে হবে একেবারে আলাদা। আবার বিষয়বস্তুর দিক থেকে চিন্তা করলে তাকে এমন একটা অনুভূতির সৃষ্টি করতে হবে যা মানুষে-মানুষে ভেদাভেদ একেবারে দূর করতে পারবে।১৮৯৭ সালের ‘What Is Art’ গ্রন্থে তাঁর শিল্প-সাহিত্য বিষয়ক ধারণা প্রকাশ পেয়েছে। এই রচনাটিতে তিনি কলাকৈবল্যবাদকে পুরোপুরি পরিহার করে ধর্মীয় ও সামাজিক উদ্দেশ্যসাধনকে শিল্প ও সাহিত্যের মাপকাঠি বলে ঘোষণা করেন।
রবীন্দ্রনাথ ও তলস্তয়ের মধ্যে বেশ কয়েকটি সাদৃশ্য আছে। প্রথমত, উভয়েই অভিজাত পরিবারের সন্তান এবং প্রচুর জমিজমা ও স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির মালিক ছিলেন। কিন্তু দুজনের ক্ষেত্রেই দেখা যায় তাঁরা সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণের দিকে যেমন মনযোগী ছিলেন না তেমনই সম্পত্তির পরিমাণ বাড়ানোর দিকেও বিশেষ যত্নবান ছিলেন না। দ্বিতীয়ত, উভয়েই বয়স যত বেড়েছে তত বেশী করে সমাজের নিপীড়িত, অবহেলিত মানুষের কাছে আসতে চেয়েছেন। তৃতীয়ত, দুজনেই ধর্মীয় চিন্তার দ্বারা অনেকাংশে প্রভাবিত হয়েছেন। রবীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রে যদি উপনিষদের দার্শনিক চিন্তা ক্রিয়াশীল হয়ে থাকে তাহলে তলস্তয়ের ক্ষেত্রে সেই স্থানে ছিল বাইবেলে বর্ণিত ধ্যানধারণা। চতুর্থত, দুজনেই ধমচিন্তা দ্বারা প্রভাবিত হলেও ধর্মীয় সঙ্কীর্ণতাকে কোনদিন প্রশ্রয় দেননি। তাঁদের কাছে মানবধর্মই ছিল সব থেকে উপরে। পঞ্চমত, উভয়েই ভবিষ্যৎকালের সার্থক শিল্পসৃষ্টির মধ্যে সার্বিক মানবমুক্তির পথ খুঁজেছেন।
তলস্তয়ের ধারণাগুলি বেশ অভিনব, তা সে নীতিবোধই হোক, ধর্মচেতনাই হোক আর রাষ্ট্রচেতনাই হোক। তাঁর নিজস্ব ধারণার প্রকাশ সর্বাপেক্ষা বেশী ঘটেছে ১৯০০ সালের ‘Resurrection’ উপন্যাসে। সাহিত্যের মাণদণ্ডে বিচার করলে পরিণত বয়সে লেখা এই উপন্যাসটি তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ রচনা। এখানে তিনি যেন পাঠকদের বাইবেলের আপ্তবাক্য স্মরণ করিয়ে দিতে চেয়েছেন –“You will never succeed in life if you try to hide your sins. Confess them and give them up; then God will show mercy to you.” (Proverbs 28:13)। উপন্যাসের নামকরণে এবং উপসংহারে তিনি যেন নীতিপ্রচারকের ভূমিকা নিতে চেয়েছেন।
‘Resurrection’-এর কাহিনীর নায়ক নেখলিউদভ ধনীর সন্তান যে পরিচারিকা মাসলোভার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হওয়ার পর তার থেকে দূরে সরে যায়। পরিচারিকাটি অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ার পর মালকিন তাকে তাড়িয়ে দেয়। পেটের দায়ে সে গণিকালয়ে যেতে বাধ্য হয়। পরবর্তীকালে এক ধনী ব্যক্তিকে বিষ খাইয়ে মারার দায়ে সে অভিযুক্ত হয় এবং বিচারে দোষী প্রমাণিত হওয়ায় কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়। দেখা গেল নেখলিউদভই সেই বিচারক যিনি কারাদণ্ডের আদেশ দিয়েছিলেন। এই ঘটনায় নেখলিউদভের মনে তীব্র অন্তর্দ্বন্দ্ব উপস্থিত হয় এবং সে অনুতাপের অনলে নিরন্তর দগ্ধ হতে থাকে। পরিশেষে যন্ত্রণাদীর্ণ নায়কের আত্মশুদ্ধি মনে পড়ায় বাইবেলের বাণী –“Repent, then, and turn to God, so that he will forgive your sins.” (Acts 3:19)।অনুতাপ হল সেই আগুন যাতে পুড়ে সব পাপের শোধন হয়ে যায়।
তুল্যমূল্য বিচারে বলতেই হয় তলস্তয়ের সঙ্গে দস্তইয়েভস্কির রচনাশৈলীর একটি মূলগত পার্থক্য আছে। তাঁর উপন্যাসে সুনির্দিষ্ট প্লট অনুপস্থিত, ঘটনবলীর গ্রন্থিরচনা বা গ্রন্থিমোচনের কোন প্রচেষ্টাও দেখা যায় না। এখানেই দস্তইয়েভস্কির সঙ্গে তাঁর তফাৎ। দস্তইয়েভস্কি ব্যক্তিমানুষের জীবনের নানা সমস্যা নিয়ে নাড়াচাড়া করেছেন, আর তলস্তয় এঁকেছেন সামাজিক মানুষের জীবনের ছবি। আসলে আখ্যান রচনায় তলস্তয়ের কোনকালেই বিশেষ আস্থা ছিল না, নাটকীয় সংঘাত রচনায়ও তাঁর আগ্রহ সমানুপাতিকভাবে কম ছিল। তবে তলস্তয়ের পক্ষে এটাও বলতে হয় নিজের সমগ্র সাহিত্যসৃষ্টির মধ্যে কখনও কিছু ধামাচাপা দিতে চান নি। কখনও নিজের নামে, কখনও সৃষ্ট চরিত্র অল্যেনিন, ল্যেভিন বা নেখলিউদভের মাধ্যমে নিজের ব্যক্তিজীবন বা সমাজজীবন উভয়কেই তিনি পাঠকের সামনে উপস্থাপিত করেছেন। সেদিক থেকে ভাবলে দস্তইয়েভস্কির অনেক রচনাকেই আত্মজীবনীমূলক বলতে হয়।
ঊনবিংশ শতাব্দীর আট ও নয়ের দশকে রাশিয়ার সরকার জনরোষের ভয়ে তলস্তোয়ের বিরুদ্ধে বিশেষ কোন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেনি। দেশে ও বিদেশে তখন তাঁর খ্যাতি আকাশচুম্বী। ‘Resurrection’ প্রকাশিত হওয়ার পর ১৯০১ সালে রাশিয়ার যাজকদের বিচারসভা কাউন্ট তলস্তোয়ের ধর্ম সংক্রান্ত অপরাধের ফিরিস্তি তৈরী করে তাঁর গায়ে ধর্মে অবিশ্বাসী ও ইশ্বরবিরোধীর তকমা সেঁটে দিয়ে খ্রীষ্টান ধর্মীয় সমাজ থেকে বহিস্কারের সিদ্ধান্ত নেয়। এর ফলে অবশ্য তলস্তয়ের খ্যাতি আরও বৃদ্ধি পায়, তাঁর ধারণাগুলির জনপ্রিয়তাও বেড়ে যায়। বিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকে রাশিয়া তখন বিপ্লবের দিকে পায়ে পায়ে এগিয়ে চলেছে।এই সময়ে তিনি ‘The Slavery of Our Times’ এবং আরও কয়েকটি প্রবন্ধে সরকারের নীতির কঠোর সমালোচনা করেছিলেন।জীবনের শেষ দশকে রচিত ছোটগল্প After the Ball (১৯০৩), উপন্যাসিকা ‘Hadji Murat’ (১৯১২ সালে প্রকাশিত) এবং নাটক ‘The Living Corpse’-এ (১৯০০) স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা প্রকাশ পেয়েছে।
১৯০৭ সালে তলস্তয় দিনলিপিতে লিখেছিলেন চারিদিকের দারিদ্র্যের মাঝে এত বৈষম্য, সম্পদ ও প্রাচুর্য দেখে তিনি অত্যন্ত অসুস্থ বোধ করছেন, অথচ এই বৈষম্য তিনি ভুলতে পারছেন না। এখানেই তাঁর জীবনের ট্র্যাজেডি অন্তর্নিহিত আছে। তিনি এই ধারণায় উপনীত হন যে সম্পত্তি লোভ ও লালসাকে তৃপ্ত করে মানুষের ভিতরে কায়েমী স্বার্থের জন্ম দেয় তা শুধু খারাপই নয়, পাপও বটে। এখানেই শেষ নয়, তিনি এটাও মনে করতেন যারা ব্যক্তিগত সম্পত্তি তৈরী করে তারা সকলেই চৌর্যবৃত্তি অবলম্বনকারী এবং যারা উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সম্পত্তি ভোগ বা রক্ষা করে তারা সকলেই চৌর্যবৃত্তির সমর্থক। এই ধারণা তাঁর মনে এতটাই দৃঢ়প্রোথিত ছিল যে তার বশবর্তী হয়ে তিনি সম্পত্তির অধিকার ত্যাগ করবেন বলে ঠিক করেন। বস্তুত তিনি শেষ জীবনে নিজের সমুদয় বিষয়সম্পত্তি গরীব মানুষদের মধ্যে বিলিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। তিনি সিদ্ধান্তে এসেছিলেন যে তাঁর সারাজীবনে সৃষ্ট সাহিত্যকর্মগুলির কোনটিই প্রকৃত অর্থে জনগণের শিল্প হয়ে ওঠেনি বা গরীব মানুষদের মুক্তির সোপান হয়ে উঠতে পারেনি। এরকম ধারণা দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তিনি নিজের রচনাসমূহের জন্য রয়্যালটি বাবদ প্রাপ্য অর্থও জনসাধারণের মধ্যে বিলিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এখানে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ালেন তাঁর স্ত্রী ও পুত্রকন্যারা। মূলত স্ত্রী-সন্তানদের বাধায় তিনি নিজের সব সম্পত্তি বিলিয়ে দিতে সক্ষম হন নি। ফলত পরিবারের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক তিক্ত হয়ে ওঠে।
১৯১০ সালের ২৮ অক্টোবর চরম মনের দুঃখ ও হতাশায় ভুগতে থাকা ৮২ বছরের বৃদ্ধ তলস্তয় ভোররাতে ইয়াস্নায়া পলিয়ানার বাড়ি ছেড়ে চলে যান। স্ত্রীকে একটি চিঠিতে তিনি লিখে রেখে যান যে প্রাচুর্যের মধ্যে এতকাল জীবন কাটিয়েছেন তার মধ্যে থাকা তাঁর পক্ষে আর সম্ভব হচ্ছে না। তাই জীবনের শেষ কয়েকটা দিন নির্জনে, শান্তিতে কাটানোর জন্য তিনি গৃহ পরিত্যাগ করছেন।এ যেন কালান্তরের ভাষ্যকারের জীবননাট্যের শেষ অঙ্ক, তাঁর মহাভিনিস্ক্রমণ। অল্প কয়েকজন অতি ঘনিষ্ঠ মানুষ ব্যতীত আর কেউ তাঁর গৃহত্যাগের প্রকৃত কারণ জানতেন না। তাঁর এই অন্তর্ধানের খবরে সারা বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। এদিকে বৃষ্টির মধ্যে প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় আস্তাপোভো স্টেশনে পৌঁছানোর আগেই তিনি পথে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হন।গুরুতর অসুস্থ তলস্তোয়কে স্টেশনমাস্টার তাঁকে নিজের বাড়িতে নিয়ে আসেন। ১৯১০ খ্রীষ্টাব্দের ৭ নভেম্বর তাঁর জীবনাবসান হয়। তলস্তোয়ের মৃত্যুর পরে তাঁর ইচ্ছা অনুযায়ী ইয়াস্নায়া পলিয়ানার সেই নির্দেশিত জায়গাটিতে সমাহিত করা হয় যেখানে তিনি ছেলেবেলায় দাদা নিকলাইয়ের সঙ্গে খেলার ছলে সর্বসাধারণের সুখের রহস্য (সবুজ লাঠি) খুঁজতেন। তাঁর অন্তিম বাসনা অনুযায়ী গির্জার আনুষ্ঠানিক ক্রিয়াকর্ম ছাড়াই জনগণের উপস্থিতিতে একেবারে অনাড়ম্বরভাবে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়।