মজিদ মাহমুদের কবিতা

মজিদ মাহমুদের কবিতা

ধাত্রী ক্লিনিকের জন্ম

পৃথিবীতে আসার পথ পিচ্ছিল
নদীর পাড় থেকে শিশুরা যেভাবে পানিতে গড়িয়ে পড়ে
মাঝে মাঝে শামুকের আঁচড় লেগে পাছার নিচটা কেটে যায়
কিছুটা রক্তপাত হলেও শিশুদের কেউ থামাতে পারে না
শিশুদের দুর্দান্ত কৌতূহল
দাইমার হাতের স্পর্শেও তারা বিরক্ত হয়
তাদের পতন অনিবার্য
তবু নদীতে গড়িয়ে পড়া সন্তানদের
নিরাপত্তার কথা ভেবে মায়েরা কিছুটা উদ্বিগ্ন
এসব ভয় ও উদ্বেগ থেকে গড়ে উঠেছে
অসংখ্য ক্লিনিক ও মাতৃসদন
গাইনি ও নার্সদের কাজ
মা ও হবু বাবাদের ভয় আরো উসকে দেয়া
শিশুদের নদীতে গড়িয়ে পড়ার পথ
পানিবিহীন শুকিয়ে দেয়া
চিরাচরিত জলের প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করে
মরুভূমির মধ্য দিয়ে গঙ্গার ধারা প্রবাহিত করা
গঙ্গা কি তোমাদের মা নয়!
গাইনি ও নার্সদের জন্মের আগে মা কি তার সন্তানদের
​​একা ছেড়ে দিতে ব্যর্থ হয়েছিল
একটু ভেবো দেখ- শিশুদের আসার চেয়ে
বৃদ্ধদের যাওয়া কি আরো অনিবার্য নয়
তাদের মা নেই
গড়িয়ে পড়ার মতো পিচ্ছিল কোনো পথ নেই
এমনকি সবাই ধরাধরি করে শুইয়ে না দিলে
শেষ পর্যন্ত কবরেও নামতে পারে না
তখন ভাবি কোথায় নার্স কোথায় গাইনি
কবরের পাশে তো একটিও ক্লিনিক নেই
অথচ সংখ্যা ও অনিবার্যতা শিশুদের চেয়ে
ঢের প্রয়োজন ছিল।

ডাক্তার

আমি সারাজীবন যেসব স্বপ্ন দেখেছি তার প্রায় সবগুলো যৌনাঙ্গ বিষয়ক
দু-একটা অবশ্য-ছুরি-কাঁচি নিয়ে পিছন থেকে তাড়া করছে কেউ
দৌড়াতে পারছি না; কিংবা খুব উঁচু থেকে পড়ে যাচ্ছি
দমবন্ধ হয়ে মরার উপক্রম
এর মধ্যে দু-একবার আকাশে উড়া, দরবেশের আস্তানা
সম্মুখে সাপ ফণা তুলে আছে-সাপও নাকি সেক্সের সিম্বল
ফুল গম পশু পাখি-নিষিদ্ধ সম্পর্কের কি সব অজাচার
ঘুমাতে ভয় হয়, ঘুমকে পাপাগার ভাবি
বিছানায় যাওয়ার আগে আয়াতুল কুরসি পড়ে বুকে ফুঁ দিই
তবু আমাকে ঘুমিয়ে রেখে পাপের দেবতারা সক্রিয় হয়ে ওঠে
ফ্রয়েড বলেছেন- এসব অবদমিত কামনার ফল
ভাবতে ভয় হয়, আমার চেতনায় কি কেবল যৌনাঙ্গ
মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে যাই; তিনি বলেন, এসব কোনো অসুখ নয়
তিনি নিজেও নাকি এমনই স্বপ্ন দেখেন, আমি ভরসা পাই
তবু ভাবি এ কেমন যুক্তি হলো, ডাক্তার কি রোগী হতে পারে না?

কাক

এশিয়ার লোকেরা কাককে কুৎসিত আর চাঁদকে সুন্দর বলে
হয়তো তারা নিজেরা কালো আর চাঁদ অন্য কোনো উপনিবেশ
উপনিবেশ মানে পরান্নভোজী, যার নিজের আলো নেই
যার শরীর এবড়ো-থেবড়ো, দগদগে ঘা
তবু উপনিবেশ বেঁচে থাকে গল্পে; আর কাক
পরিশ্রমী, সংঘবদ্ধ; নোঙরা আবর্জনা দেখলেই খেয়ে ফেলে
কারণ, পৃথিবীকে তারা পরিচ্ছন্ন রাখতে চায়।

আগুন

আমরা মাটি থেকে এসেছি, আবার মাটিতে মিশে যাব
তাহলে তো সব শেষ; সূর্যের দাবি থাকলো না
পাতার স্টোমাক থেকে যে সব অক্সিজেন ঝরে পরে
সূর্য তার একমাত্র উৎস; ধরো মাটি আছে আলো নেই
তুমি কি একদিনও বেঁচে থাকতে পারবে
সত্য হলো মাটি নয়; তুমি আগুনের সন্তান
জিনদের ভাই, যে সব মানুষ মাটি থেকে এসেছিল
তারা আজ কেউ বেঁচে নেই।

অর্জুন

অর্জুন গাছ জড়িয়ে ধরলে ব্লাড-পেশার কমে
অর্জুনের ছাল হৃদরোগের মাহৌষধ
এমন একটা গাছকে আমি বিয়ে করতে চাই
বুকের ধুকপুকানি বেড়ে গেলে
রক্তের চঞ্চলতা বেড়ে গেলে
যে আমাকে আলিঙ্গন করবে
বল্কলের পোশাক খুলে বলবে
আমার রস শুষে নাও
তোমার হৃদপি- সচল করো
আমি সপ্রাণ-গাছ তবু ব্যথা নেই
অভিযোগ নেই
আমি সারাদিন সূর্যের আগুনে রান্না করি
রাত এলে অন্ধকারে একা দাঁড়িয়ে থাকি।

কবরে শুইয়ে দেয়ার পরে

এক সময় ভাবতাম মরে যাব বলে সবকিছু দ্রুত দেখে নিতে হবে
সময় ফুরিয়ে গেলে পারব না, ইচ্ছা থাকলেও সম্ভব হবে না
কী কষ্ট করেই না পাহাড়ে ওঠার কসরৎ করেছি
বোকার মতো হিমালয় শৃঙ্গেও উঠতে চেয়েছি
পোখরায় মহাদেবের কেভ, ডেভিস ফল
মেঘের মধ্য দিয়ে বিমানের লক্কর ঝক্কর উড়ে চলা
আর কিছুটা হলে তো পা হরকে জীবন কাবার
মানুষ সব সময় বড় কিছু দেখতে চায়
বড় পাহাড়, বড় সমুদ্র, এমনকি মরুভূমিও বড় হতে হবে
ক্ষুদ্র তো বড়কে ধারণ করতে পারে না-
সময় ফুরিয়ে যাবে বলে সন্তানকে জড়িয়ে ধরে চুমু খাওয়া
ললনাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হবার জন্য তড়িঘড়ি করা
আর কবিতা লিখতে না পারলে ভীষণ মন খারাপ হওয়া
এসব তড়িঘড়ির কারণ হয়তো মানুষ খুব কম দিন বাঁচে

কিন্তু আজ কবরে শুইয়ে দেয়ার পর সব নিরর্থ মনে হচ্ছে
কারণ এখানে শুইয়ে সব দেখতে পাচ্ছি
আগে যা দেখা হয়নি সেগুলোও
প্রথম কয়দিন অবশ্য নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত থাকতে হয়েছে
হাড় থেকে মাংস খসানো, একই সঙ্গে কোষগুলো বিচ্ছিন্ন করা
এসব করার কারণ অনেকদিন মন খুলে হাসব বলে
হাড্ডির সঙ্গে মাংস না থাকায় সারা শরীর দিয়েই হাসতে পারছি
জীবিতরা ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে সামান্যই হাসতে পারে

প্রথমে অনেক দিন হেসেছি বেঁচে থাকার বোকামির জন্য
সবকিছু দেখার তড়িঘড়ির জন্য
এখন হাসছি সব দেখার কি অফুরন্ত সময়!
জীবিতদের যদিও বড় কিছু দেখার প্রতি সর্বাধিক আগ্রহ
তবু তারা জানে না মৃত্যুর চেয়ে বড় কি ছিল!