গল্প: বৃষ্টিভেজা রাত
গল্প: বৃষ্টিভেজা রাত
মনোজিৎকুমার দাস
শ্রাবণের রাত। অবিশ্রান্ত ধারায় বারি বর্ষণ হচ্ছে । ব্যাঙের ঘ্যাংঘর ঘ্যাংঘর ডাকে কান ঝালাফালা! এক সময় লায়লার ভাল লাগতো টিনের চালের উপর বৃষ্টির পানি পড়ার ঝমঝম শব্দ! এক টানা ব্যাঙের ঘ্যাংঘর ঘ্যাংঘর শব্দে লায়লার ঘুম এসে যেত। এখন কিন্ত বৃষ্টির শব্দ, ব্যাঙের ডাক তেমনটা ভাল লাগে না। সে বুঝে উঠতে পারে না এখন কেন এমনটা হয়। তবে বর্ষা ও শরত এলে লায়লা এখন নস্টালজিয়ায় ভোগে। বিয়ের আগেই অনার্স শেষ করেছিল সে।বিয়ের পর মাস্টার্স পাশ করেছে। পাঁচ বছর হতে চললো বিয়ে হয়েছে তার।এখনো কিন্তু সন্তানের মুখ দেখেনি লায়লা।
বিয়ের আগ থেকেই লায়লার স্বামী নাহিদ বিদেশে, বছরে দুবার মাস দেড় দুয়েকের জন্য সে দেশে আসে। জলজঙ্গল, বাদলের দেশের ছেলে নাহিদ এখন মরুভূমির দেশের স্কাইক্রাপার বিল্ডিং তৈরির কাজের ডাকসাইটে প্রকৌশলী। তার কাজে খ্যাতি ও যশের জন্য রিয়েল গ্লোবাল ইন্টারপ্রাইজ তাকে বছরে তিন মাসের সবেতন ছুটি দিয়ে থাকে।
লায়লার শ্বশুরবাড়ি কুষ্টিয়ার শহরতলি মজমপুরে। এক সময় জায়গাটা শহরতলি থাকলে এখন আর ওখানটাকে শহরতলি বলা যায় না। বিট্রিশ আমলে ওখানটায় নাকি বাঘ, বন্য শুয়োর, শিয়াল আর সাপ খোকের বসত ছিল। তবে এখন আর সে সবের চিহ্ন নেই।মজমপুর এখন শহরের প্রাণকেন্দ্রে না হলেও দক্ষিণ অঞ্চল থেকে আসা দূরপাল্লার বাস ট্রাক মজমপুর হয়ে ঢোকে। বলতে হয় মজমপুর দক্ষিণাঞ্চলে গেটওয়ে।
নহিদ বিদেশে থাকলেও লায়লা শ্বশুর বাড়িতে থাকে বছরের অধিকাংশ সময়। তবে সে লায়লা আষাঢ় শ্রাবণ ও ভাদ্ররের আড়াই তিন মাস বাপের বাড়িতে কাটায়। লায়লার বাপের বাড়ি মাদারীপুরে। এক সময় নাকি মাদারীপুর দক্ষিণ সুন্দরবনের অংশ ছিল। রয়েল বেঙ্গল টাইগারের দেখা নাকি যেত অনেক অনেক দিন আগে এখানে। আড়িয়ালখাঁ নদীর পানিকে কুমীরের দাপটে লোকজনেরা তটস্থ থাকত। হাঙ্গরও এই নদীতে দেখা যেত। পানি নামলে হাঙ্গরের কবলে পড়লে আর রক্ষা থাকত না।
এক লোকে বলে এই জন্যই নাকি মাদারীপুরে বানরদের এখনো দেখা পাওয়া যায়।ওদের কোন ক্ষয়ক্ষতি করলে ওরা নাকি দল বেঁধে পাকাসড়কে ব্যারিকেট দেয়। সরকার নাকি বানরদের জন্য খয়রাতি চাল বরাদ্দ দেয়।
মাদারীপুর শহরে দোতলা টিনের ঘরের ছড়াছড়ি লায়লাদের ছোটবেলা থেকেই। এখনো টিনের দোতলা ঘর আছে, তবে সেগুলোতে আধুনিকাতার ছাপ আছে। লায়লার বিয়ের আগে তার বাবা তাদের পুরনো দোতলা টিনের ঘর ভেঙে আধুনিক ধাঁচে করেন । চারদিকে ঘুরানো ব্যালকোনীতে সারি সারি ফুলের টবে রঙবেরঙের ফুলের সমারোহ! দোতলায় উঠলে আড়িয়ালখাঁ নদীর দৃশ্য চোখে পড়ে। সারি সারি জেলেদের পাল তোলা নৌকার দৃশ্য দেখে লায়লার মনটা আনন্দে ভরে উঠে।
জলের দেশের মেয়ে লায়লার ছোটবেলার কথা ভাবলে এখন সঙ্গত কারণেই তার মনটা নস্টালজিক হয়ে উঠে। লায়লাদের বাড়ির পাশে তিনপহরের বিল। ছোটবেলায় সে , পারুল ,শোভন , বিথী আর অনামিকা তিনপহরের বিলে পদ্মফুল তুলতে যেত কলার ভেলায় চড়ে । অনামিকাকে সবাই অনা বলে । তারা চারটা মেয়ে আর একটা মাত্র ছেলে এক সঙ্গে চলাচল করত। সুন্দর শরীর স্বাস্থ্য চেহারার শোভনকে সবাই কাছে টানতে চাইত । রাশি রাশি পদ্ম ফুটে থাকত তিনপহরের বিলে । শোভন ছাড়া ওরা কেউই ভেলা চালাতে পারত না ।লায়লা এক সময় ভেলার চালানো শিখে নিল ।সে সময় ওরা ক্লাস ত্রিতে পড়ে ।
ক্লাস ফাইভে উঠার বছর প্রচন্ড বর্ষায় খালবিল একাকার । চারদিক জল থৈ থৈ! শোভন ওদেরকে নিয়ে কলার ভেলায় বিলে পদ্মফুল তুলতে যেতে সাহস দেখাল না । পরের বছর শোভন ক্লাস সিক্সে ভর্তি হল কীর্তিপাশায় মামাবাড়ির কাছের নামকরা এক হাইস্কুলে । আর লায়লা তাদের পাড়ায় নতুন গালর্স স্কুলে । অন্যদিকে , মাদারীপুর গালর্স স্কুলে পারুল ও অনামিকা ভর্তি হল ।
সে বছরই পূজোর ছুটিতে শোভন বাড়ি এল আশ্বিন মাসের মাঝামাঝি। লায়লারা শোভনকে মাস ছয়েক পরে দেখে ভাবল, এই কয় মাসে শোভন তো বেশ বড়সড় হয়ে গেছে।
শোভনদের বাড়িতে দুর্গা পুজো, কমপক্ষে ১০৮ টা পদ্মফুল চাই। পারুলদের বাড়িতে লায়লার সঙ্গে শোভনের দেখা হলে সে তাকে বলল , ‘ আমরা তো তিনপহরের বিলে পদ্মফুল তুলতে যাব পুজোর জন্য, তুই কি আমাদের সঙ্গে যাবি।’ লায়লা প্রথমে কী যেন ভেবে বলল, ‘ না , আমি যাচ্ছি নে, তোরাই যা। পারুল থাকলেই যথেষ্ট, তোদের পুজোর ফুলটুলে মধ্যে—–’ পারুল কাছেই ছিল সে লায়লার কথায় প্রতিবাদ করে বলল,‘তুই কী বললি লায়লা! আমরা পড়াশোনা করছি , আমাদের মধ্যে সেকেলে লোকের মত গোড়ামী নেই।’ লায়লা জানে পারুলের উপর শোভনের কেমন যেন একটা দুর্বলতা আছে।
পারুলের অনুরোধে শেষ পর্যন্ত লায়লা তাদের সঙ্গী হল।
তিনপহরের বিলে পদ্মফুল তুলতে গিয়ে যে বিপত্ত ঘটল সে কথা লায়লা আজও ভুলতে পারে না । ফুল তোলা শেষ হওয়ার পর গুনে দেখা গেল শ’দেড়েকের মত পদ্ম ফুল তোলা হয়েছে । লগি দিয়ে ভেলা ঘুরিয়ে শোভন সামনের স্বচ্ছ জলের দিকে আর একটু গেলেই ডাঙ্গা । হঠাৎ করে ভেলার কলাগাছগুলো দুখÐে ভাগ হয়ে দু’দিকে চলে যেতেই পারুল ও অনামিকা এক ঝটকায় পানির মধ্যে পড়ে গেল। একটা অংশে শোভন আর লায়লা। শোভনের হাতে লগি। ব্যাপারটা বুঝে উঠবার আগেই ঘটনা ঘটে গেল । লায়লা ভাবল, পারুল তো সাঁতার জানে না , পানি হয়ত বেশি না ! সাঁতার না জানলে হাঁটু জলেও পারুল ডুবে মরতে পারে , অনামিকাকে নিয়ে ভাবনা নেই, ও ভাল সাঁতারু , ও আন্ত:স্কুল সাঁতার প্রতিযোগিতায় এবারই ও ফার্স্ট হয়েছে আমাদের জোনে, লায়লা ভাবল ।
পারুলকে বিলের জলে হাবুডুবু খেতে দেখে লায়লা তিনপ্রহরের বিলের টলটলে জলে ঝাঁপিয়ে পড়ল। বয়সের তুলনায় পারুল হৃষ্টপুষ্ট ,তাকে জল থেকে ডাঙ্গায় নিয়ে আসতে লায়লাকে বড়ই বেগ পেতে হল ।জলে পড়ে গিয়েও পারুল সুস্থই আছে ,পারুলকে জল থেকে টেনে আনতে লায়লার বেশই কষ্ট হয়েছে । সে হাঁপাচ্ছে । তারা চারজন ছাড়া চারদিকে আর কোন লোকজনের নামগন্ধ নেই ।
তাদের চারজনের মধ্যে একমাত্র শোভনই জলে পড়েনি । শোভনের উপর লায়লার রাগ হয়। ওর জন্যই এই অবস্থা ,তারপরও আবার তাদের দিকে তাকিয়ে ও হাসছে। যদিও এখন শোভন জলে নেমে কলার ভেলা মেরামত করতে ব্যস্ত। ডাঙ্গা থেকে একটু দক্ষিণে এগোলেই হিজল গাছের বন। হিজল গাছের বনের মধ্যে গেলে বাইরে কেউই কাউকে দেখতে পায় না। অনামিকা বুদ্ধিসুদ্ধিতে পাকা। সে হিজল বনের মাঝে গিয়ে জামাা খুলে জল চিপে আবার সেগুলো পরে নিয়েছে । পারুল ও লায়লা হিজলবনের দিকে পা বাড়ায়। অনামিকার গায়ের জামাটাতে পানির চিহ্ন নেই। তবে পরনের পাজামা ভেজা তা বোঝা যাচ্ছে। লায়লা ভাবল, অনামিকা তার পোশাক খুলে পানি চিপে আবার পরেছে। লায়লা অনামিকাকে বলল,‘অনা, তোর পক্ষে গায়ের জামা খুলে শোভনের সামনে গেলেও লজ্জার কিছু নেই। তোর বুকে তো সমতল! তুই তো আজ পর্যন্ত ছোট্ট খুকিটিই আসিস্, তোর বুকে তো আজ পর্যন্ত রেখাই দেখা দেয়নি , তাই কেউকে তোর খোলা বুক দেখলে লজ্জার কিছু নেই।’
সবচেয়ে বেশি ভাবনায় পড়ল পারুল, তার শরীর বেশই বাড়ন্ত। পানিতে ভিজে গায়ের জামা পারুলের শরীরের সঙ্গে লেপ্টে যাওয়ায় তার ছোট ছোট স্তনদুটো দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে , এ অবস্থায় তারপক্ষে শোভনের সামনে যাওয়া সম্ভব না। লায়লারও একই অবস্থা। পারুল ও লায়লাকে ইতস্তত করতে দেখে অনামিকা বলল ওদেরকে বলল,‘ তোরা হিজলবনের ভেতরে গিয়ে গায়ের জামাটামা খুলে পানি চিপে আয়। বাইরে থেকে কেউ তোদেরকে দেখতে পাবে না । তোরা না ফেরা পর্যন্ত আমি এখানে দাঁড়িয়ে থাকছি।’
শেষতক লায়লা ও পারুল অনামিকার কথা মতো কাজ করল।তারা বিলের ধারে কলার ভেলার কাছে ফিরে এসে দেখল শোভন তখনো কলা গাছগুলোকে এক করে দড়ি দিয়ে শক্ত করে বাঁধছে। এক সময় কলার ভোলা ঠিক হলে শোভন তাদেরকে ভেলায় উঠবার জন্য ডাক দিল।
এ ঘটনার পর লায়লারা আর কোন দিন শোভনের সঙ্গে তিনপহরের বিলে পদ্মফুল তুলতে যায়নি।তবে শোভন মামাবাড়ি থেকে বাড়ি এলে তাদেও গ্রামের জমিদারের পদ্মদিঘির শান বাঁধানো ঘাটে বহুবার গিয়েছে। চোত বোশেখ মাসে ঘাটের পাশের স্বর্ণচাপা গাছে সোনালী রঙের ফুলে ফুলে ভরে উঠে। ফুলের মিঠেকড়া গন্ধে চারদিক মম করে। প্রত্যেকবারই শোভন প্রত্যেককে গোছা গোছা স্বর্ণচাপা পেড়ে সবার হাতে হাতে দিয়ে বলতো,‘ তোরা স্বর্ণচাপা মতো সুন্দরী হয়।’ তবে সে পারুলকে আরো একটু বেশি বলতো, ‘ পারুল , তোর গায়ের গন্ধ যেন স্বর্ণচাপা ফুলের গন্ধের মতো মিঠেকড়া হয়।’ লায়লা বুঝতে পারতো না শোভন কেন পারুলকে এই কথাটা অতিরিক্ত বলতো ।
সবে লায়লারা স্কুল ফাইনাল পরীক্ষা দিয়েছে । শোভন বাড়ি আসার খবরটা পারুলই প্রথমে লায়লাকে জানায়। পারুল লায়লাকে বলে,‘ শোভন বাড়ি এসেছে রে লায়লা! ওর সঙ্গে একটু আড্ডা মারার ইচ্ছে ছিল রে, কিন্তু ছোটমামার বিয়েতে কাল সকালেই মামাবাড়িতে যেতে হচ্ছে।’ শোভন বাড়ি আসায় পারুলের মনে উচ্ছ¡াস যেন ধরে না। লায়লা বুঝতে পারে শোভনের প্রতি পারুলের মনে একটুআধটুকু সফট কর্ণার আছে। পারুলের কথা শুনে লায়লা বলে,‘ শোভন তো আর চলে যাচ্ছে না।ও ফিরে এলে আমরা সবাই মিলে দিঘীর ঘাটে বসে একটু আধটুকু আড্ডাটাড্ডা দেওয়া যাবে।’ ‘আমি ফিরে আসতে না আসতে জ্যৈষ্ঠ মাস শেষ হয়ে যাবে, ততদিনে তো স্বর্ণচাপা ফোটা শেষ হয়ে যাবে।’ ‘ তাতে কী! সে সময় তো আড়িয়ালখাঁর খাড়ি পানিতে ভরে যাবে। বর্ষাকালটা আমার যেমন ভাল লাগে, তোরও ভাল লাগে, যতই তুই জলে সাঁতার কাটতে না পারিস্!’ লায়লার কথা থামিয়ে একটু সময় ধরে কী যেন ভেবে সে আবার বলল,‘ আমরা কিন্তু আজ তিনপহরের বিলে পদ্মফুল তুলতে যাবার সময়ের সেই ছোটটি নেই কিন্তু! তখন ছিলাম আমরা ছোট্ট কিশোরী মাত্র। সে সময়ের অনামিকার কথা তোর মনে পড়ে! সেই অনামিকা শরীর স্বাস্থ্যের গড়ন দেখলে মনে হয় আজ ও যেন যৌবনবতী এক তরুণী। আমাদের বাড়ন্ত শরীর স্বাস্থ্যে কথা নাই বা বললাম! এখন আমরা শোভনের সঙ্গে ওই ভাবে আড্ডা দিলে লোকে আমাদের বলবে,‘ দেখো ধিঙ্গি মেয়েগুলোর কাÐ দেখ !’ ‘পারুল, এখন থেকে শোভনের সঙ্গে আগের মতো মেলামেশা করা কথা বাদ দে।’ লায়লার কথা শুনে পারুলের মনটাতে বিষাদের চিহ্ন ফুটে উঠে।
তারপর দিনের পর দিন, মাসের পর মাস ,বছরের পর বছর কেটে যায়। লায়লারা এক সময় কে কোথায় চলে যায় তার ইতিবৃত্ত অন্যে না রাখলেও লায়লা কিন্তু রাখে।
অনামিকা স্কুল ফাইনাল পরীক্ষা পাশের পর তার আর পড়াশোনা হয়ে উঠে না।বাবা মা তার বিয়ের জন্যে উঠে পড়ে লাগে। অনামিকা মেধাবী , মুখশ্রী সুন্দর, সুঠাম শরীর স্বাস্থ্য কিন্তু গায়ের রঙ চাপা,শ্যামবর্ণা। বরপক্ষের কাছে মেধার কোন দাম নেই, তাদের দৃষ্টিতে অনামিকা গায়ের রঙ কালো। কালো মেয়েকে কে ঘরের বউ করে নেবে! অনামিকাকে পত্রপক্ষ দেখতে এলে লায়লা প্রত্যেকবারই থেকেছে। পারুল মামাবাড়ি না গেলে সেও থাকত। লায়লা অনামিকাকে পরামর্শ দিল সরকারী প্রাইমারী স্কুলে ইন্টারভিউ দিতে।
অনামিকার ভাগ্যের চাকা ঘুরতে দেরি হয় না। প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষিকা নিয়োগের প্রথম ব্যাচে পরীক্ষা দিয়ে জেলার মেয়েদের মধ্যে প্রথম হয়ে সরকারী প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষিকা হিসাবে নিয়োগ পাওয়ায় বরপক্ষের কাছে কালো মেয়েই উজ্জ্বল শ্যামবর্ণা হয়ে গেল রাতারাতি। চাকুরী পাওয়ার পর অনামিকা প্রথমেই লায়লার বাড়িতে মিষ্টি নিয়ে হাজির হল।
কত চাকুরে ছেলে অনামিকাকে বিয়ে করার জন্য ঘুরঘুর করতে লাগল। অনামিকা তার মাকে জানিয়ে দিল ভাল সরকারী চাকুরে ছেলে ছাড়া বেকার কিংবা বেসরকারী চাকুরে ছেলের সঙ্গে সে বিয়ে করবে না। অনামিকা চাকুরী পাবার আগে অখ্যাত এসজিওতে চাকুরী করা যে ছেলের বাবা অনামিকার মুখের সামনে বলেছিল,‘ কালো মেয়েকে আমি আমার বেটার বউ করে তুলতি পারবো না, হেতুটা হলো আমাগেরে বাড়ির সব বউয়েরই গায়ের রঙ গোলাপ ফুলের নাহালই ফর্সা, এমন কী সুদর্শনের মার চেখারাও—–
অনামিকা সরকারী প্রাইমারী স্কুলে চাকরী পাওয়ার পর সেই ছেলের বাবাকে অনামিকাদের বাড়িতে ঘুরঘুর করতে দেখে অনামিকা ভাবল, লোকটা হয়তো এবার চাকুরে বেটার বউকে ঘরে তোলার জন্য উৎসুক। সে মায়ের কাছে বিষয়টা জানতে চাইলে অনামিকার মা বলল, লোকটা আমাকে কী বলল তা তোকে হুবহু বলছি ‘ আফনার মিয়্যাকে বেটার বউ করে ঘরে তুলার বড় সাধ মুই’র। একটা মাস্টারনীকে বেটার বউ করে বাড়িতি তুলতি পারলি বাড়ির ছাওয়ালপলরা লেহাপড়া শিখতি পারবেনে। মুই’র বাড়িতি ল²ীর বসত আছে , কিন্তুক সরস্বতী নবডঙ্কা! বাড়ির গিন্নি আর অন্য বেটার বউরা ব কলম পাশ। মুইও লেহাপড়া জানিনে , তবে ছোট বেটাটাই আমারে নাম লেহা শিখাইছে। ওই বেটার জন্যিই আমি আপনাগেরে ল²ীমন্তি মেয়েটারে বেটার বউ করতি চাতিছি।’
অনামিকার স্কুলে সাপ্তাহিক ছুটি , তাই সে বাড়িতেই ছিল। মায়ের কাছ থেকে সব কথা শুনে অনামিকার শরীরে যেন আগুন জ্বলে উঠে। সে খুব শান্ত মেয়ে, কারো সঙ্গে উচু মুখে কথা বলে না। কিন্তু এবার রাগ চরমে উঠে গেল। কিন্তু পর মুহূর্তেই শান্ত হয়ে মাকে বলল,‘ ছেলের বাবাটিকে আপ্যায়ন করেছ?’
‘ মিষ্টিমিঠাই ঘরে যা ছিল তা দিয়ে—-’ ‘ তা বেশ।’
‘ লোকটা তোর বাবার মুখ থেকে ফাইনাল কথা শুনে যাবে। তোর বাবা তো বিকেলের আগে বাড়ি আসবেন না!’
মায়ের কথা শুনে অনামিকা মিটমিট করে হেসে মাকে কী যেন বলতে যাচ্ছে এমন সময় বড় বৌদিও কাপড়ের আঁচলে হাত মুছতে মুছতে সেখানে এসে হাজির। অনামিকার বড় বৌদি বি.এসসি পাশ। ঘরসংসার দেখা আর ছেলেমেয়ে মানুষ করার জন্য সে চাকরীতে যায়নি। তাদের পাড়ার মেয়েদের নতুন জুনিয়র হাইস্কুলে গণিতের শিক্ষক না থাকায় তাকে বর্তমানে সেখানে গণিতের ক্লাস নিতে হচ্ছে।
‘ কী গো রাইবাঘিনী ননদী! মুখে মিষ্টি হাসির কারণ কিন্তু আমি জানি। আমাদের হবু তাওই মশায় কিন্তু আবার ——’ বৌদির কথা শেষ হওয়ার আগেই অনামিকা তাকে বলল,‘ তোমার হবু তাওইকে যদি রাজসিক ভোজ না দেয় তবে কিন্তু তোমার সঙ্গে এক হাত দেখে নেবো।’ কথাটা বলে অনামিকা খিলখিল করে হেসে উঠল।
দুপুরের ভুরিভোজের পর লোকটা বৈঠকখানায় বসে একটা বিড়ি ধরিয়ে সুখটান দিতে দিতে ভাবল, মেয়েটির বৌদির সঙ্গে কথা বলতে পারলে মন্দ হতো না। অনামিকাদের বাড়ির কেউই বিড়ি তো দূরের কথা সিগারেটও খায় না। সারাবাড়িটাতে বিড়ির ধুয়োর কড়া গন্ধে ভরে উঠলে অনামিকার বৌদি বলল,‘ বিড়ির গন্ধ কোথা থেকে আসছে? বৈঠকখানার জানালার দিকে চোখ পড়তেই ভেতর থেকে ধুয়ো বের হতে দেখে অনামিকার বৌদি বলল,‘ মনে হয়, আমাদের হবু তাওই মশায় বৈঠকখানায় বসে ধুমপান করছেন।বৌদির কথা শুনে অনামিকা রেগে অস্থির হয়ে উঠল।
অনামিকার বিয়ের জন্য আবার কারা যেন এসেছে শুনে লায়লাও তাদের বাড়িতে এসে হাজির। বৌদির কাছ থেকে লায়লা সব কথা শুনে তারও রাগ যেন উথলে উঠল। সে কোন কথা না বলে একাই বৈঠকখানায় গিয়ে হাজির হয়ে দেখতে পেল লোকটা সোফায় হেলান দিয়ে চোখ বুঁজে নাক ডাকাচ্ছে। তার ইচ্ছে হল তার নাকের মধ্যে কিছু একটা ঢুকিয়ে দিতে, লায়লার পিছু পিছু বৌদিও এসে হাজির । ‘ হবু তাওই মাশায়, আমরা হয়তো আপনার ঘুমের ব্যাঘাত ঘটালাম।’ লায়লার কথা শুনে লোকটার তন্দ্রা ছুটে গেল। তার সামনে একটা সুন্দরী মেয়ে আর তার পেছনে এবাড়ির বউটাকে দেখতে পেয়ে সে অবাক ! ‘ আপনাকে কোথায় যেন দেখেছি এখন মনে করতে পারছি না।’ লায়লার কথার জবাবে লোকটা বলল,‘ আমি তো তোমারে দেহেই চিনতি পারিছি, মা। আগের বার তুমার সইকে দেখতি অ্যাসে তুমার লগে বাচ্ছিত হইছিল।’
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ আমার মনে পড়েছে।’ লায়লা মনে মনে কথা গুছিয়ে নিয়ে আবার বলল , ‘ সেবার তো অনামিকাকে কালো মেয়ে বলে তুচ্ছতাছিল্য করে চলে গিয়েছিলেন। তার এবার আবার কী মনে করে!’ অনিমার বৌদি মুখে আঁচল দিয়ে মিট মিট করে হাসছে। লোকটা আমতা আমতা করে বলল,‘ শিক্ষিত মিয়্যার কালা আর ধলা কী!’ এবার আর লায়লা নিজেকে শান্ত রাখতে পারল না। ‘ হবু তাওই মশায় আগের বারে যখন এসেছিলেন তখন অনামিকা শিক্ষিত ত ছিল না, ছিল কালো ! সরকারী প্রাইমারী স্কুলে চাকরী পেয়ে এখন আমার বান্ধবী শিক্ষিত হয়ে পড়েছে। আপনারা মেয়েদেরকে মানুষ মনে করেন না , তাই তো? ’ লোকটা লায়লার কথার জবাবে কী যেন বলতে গেলে অনামিকার বৌদি বুঝতে পারল লোকটা বেজায় নির্লজ্জ । নির্লজ্জ লোকের সঙ্গে কথা বলে নিজেকেই ছোট করা হয়। সে তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, ‘ আমার শ্বশুর মশায়ের বাড়ি ফিতে দেরি হবে, এখন আপনার বাড়ি ফিরে যাওয়াই ভাল।’
‘ ভাল কতা কইছ, মা । আমি এহন ফিরেই যাই, —–’
‘ তহলি কী! আপনার ছেলে সঙ্গে আমার বান্ধবীর বিয়ে কথা নিয়ে আবার এ মুখো হলে আমি আপনাকে কী করি তখন বুঝতে পারবেন।
‘ কী সাংঘাতিক মিয়্যা বাপরে! ’ অস্ফুট স্বরে বলতে বলতে লোকটা তার ছাতাটি সোফার ওপর থেকে তুলে নিয়ে বৈঠকখানা থেকে বের হয়ে গেল।
লোকটা চলে যাওয়ার পর অনামিকা ভেতরের ঘর থেকে বের হয়ে এলে লায়লা তাকে বলল,‘ এবারের মত তোর হবু শ্বশুরের হাত থেকে তোকে বাঁচিয়ে দিলাম।’ অনামিকার মুখে কোন কথা নেই। অনামিকাকে নীরব থাকতে দেখে লায়লা আবার বলল,‘ তোর গোমরা মুখ দেখে আমার মনে হচ্ছে, তোর আমি ক্ষতিই করে দিয়েছি। সুদর্শন নামের তোর হবু বরকে——’ লায়লা কথা শেষ করার আগেই অনামিকা খিলখিল করে হেসে উঠল। একটু পরেই শ্রাবণ মাসের আকাশে কালো ঘনিয়ে এলো, একটু পরেই অবিশ্রান্ত ধারায় বৃষ্টি নামবে মনে হচ্ছে। ‘ তোর হবু শ্বশুর বাড়ি যেতে ঠেলা বুঝতে পারবে। এখন আমি বাড়ি যাই, দুটো ভাত খেয়ে রিমঝিম বৃষ্টি নামলে বৃষ্টিভেজা রাতে এমন একটা ঘুম দেব , যাতে এক ঘুমে রাত কাবার হয়ে যায়।অনাবিকা তোকেও বৃষ্টিভেজা রাতে এক ঘুমে কাবার রাত করার ব্যবস্থা করে দিয়ে গেলাম।’ কথাটা বলেই এক দৌড়ে লায়লা বাড়ি চলে গেল।
সত্যি সত্যি একটু পরেই মুসলধারায় শ্রাবণের বৃষ্টি শুরু হল।
অনামিকার বিয়ে হল মাঘ মাসের প্রথম সপ্তাহে পটুয়াখালীর শহরের রঞ্জন অধিকারীর সঙ্গে। রঞ্জন বিসিএস ক্যাডার। অনামিকার বর রাজবাড়ির ম্যজিস্ট্রেট। লায়লা, পারুল ,শোভনরা অনামিকার বিয়েতে অনেক আমোদ করল।
পারুল আর শোভন এখন অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে ,ওদের এক ছেলে দেবজিৎ । পারুল ও শোভন দু’জনেই কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার। ওরা দু’জনেই একই আইটি ফার্মে চাকরী করে।পারুল, শোভন ও তার চার বছরের ছেলে দেবজিতের সঙ্গে প্রতি সপ্তাহেই স্কাইপে মুখোমুখি লায়লার কথা হয়। দেবজিৎ তার বাবা শোভনের চেহারা পেয়েছে। পারুলের শরীর স্বাস্থ্য আরো সুন্দর হয়েছে। পারুল লায়লাকে জিজ্ঞেস করে,‘ এখনো কি তুই শ্রাবণের বৃষ্টিভেজা রাতে অঘোরে ঘুমোস্।’
‘ না ভাই, এখন আমার বৃষ্টিভেজা রাতে আগের মত ঘুম আসে না। নাহিদের কথা ভেবে এখন শ্রাবণের বৃষ্টিভেজা রাতেও ঘুম আসতে চায় না। কাল রাতে ওর সঙ্গে স্কাইপে মুখেমুখি কথা হল , ওখানে তখন রাত দশটা আর আমাদের এখানে রাত বারটা। এয়ারকÐিশন রুমে বসে ও তখনো প্লানিং এর বুলু প্রিন্টে চোখ রেখে কাজের অগ্রগতি খতিয়ে দেখছিল।
‘মরুভূমিতে গত ছয় মাসেও এক ফোটা বৃষ্টি হয়নি। এ অবস্থায় কি আগের মত বৃষ্টিভেজা রাতে অঘোরে ঘুমানো যায়, তুই বল্!’ এবার পারুলের পরিবর্তে শোভন বলল,‘ তুই তোর বরকে বল মরুভূমির দেশ থেকে সিডনিতে চলে আসতে । চাকরীর ব্যবস্থা আমিই করে দেব।’ ‘ আচ্ছা , আচ্ছা বলব, ও রাজি হলে আমার বরের সঙ্গে আমিও যাব, কেমন?’ লায়লা কী যেন ভেবে আবার বলল,‘ তোদের ওখানে শ্রাবণের বৃষ্টিভেজা রাতে অবিশ্রান্ত ধারায় বৃষ্টি নামে।’ এবার উত্তর করল পারুল,‘ এখনে শ্রাবণ মাসটা বুঝি না, তবে প্রায় প্রায়ই এখানে রাতে অবিশ্রান্ত ধারায় বৃষ্টি নামে, বৃষ্টির সঙ্গে শীতটাও বেশই পড়ে।’
‘তাহলে জোর করে হলেও মরুভূমির দেশ থেকে নাহিদকে ফিরিয়ে এনে তোদের ওখানে দু’জনেই চলে যাব। আর যেতে পারলে ওখানেও বৃষ্টিভেজা রাতের ছোঁয়া আমরা আবার পাব।’