স্বপঞ্জয় চৌধুরী’র কবিতা
চেতনার ভাজপত্র
চেতনার ভেতর থেকে আলগা বাতাসে খসে পড়ছে কিছু পাতা
আমি পিপড়ের মতো আঁকড়ে বাঁচি তার বৃন্তমূল।
ঘুম ভেঙে গেলে দেখি ঘাড়ে লেগে আছে কামড়ের দাগ
বিষন্ন কুকুর এক ঘুমঘোরে চেপে বসেছিল ঘাড়ে।
আমার উদোর ফুলে আছে কালো জলে
নাভিমূল গড়িয়ে গড়িয়ে পড়ছে লাল সবুজ নিশানা
আমি তাকে বাশের ডগায় লাগিয়ে দৌড়াতে থাকি
বাতাসে নড়ে তার শৈল্পিক জমিন
সব কারুকাজ শেষ হলে ঘরে ফিরে আসি
মুখ থেকে মুছতে থাকি বিষ ফেনার দাগ
গতরাতে চেতনার ভেতর চেপে বসেছিল এক কালসাপ
তার দংশনের দাগ পকেটে ভরে নিয়ে
প্রতিদিন মুখ থেকে মুছি বিষফেনা
আর উল্টাতে থাকি চেতনার ভাজপত্র।
দূরত্ব
পাখিছানাটা জন্মের প্রথমদিন মায়ের বুকের ওমে
আঁটসাঁট হয়ে চুপটি করে ঘুমিয়ে ছিল।
পাতার খসখস শব্দ তার ঘুমকে ভাঙাতে পারেনি।
সে ভেবেছিল সে ভাসছে অবাক বিস্ময়ে এক অনন্ত মহাবিশ্বে।
তাকে অতিক্রম করে যাচ্ছে একদল গ্রহপুঞ্জি সমান দূরুত্ব নিয়ে।
পাখি ছানাটি উড়ার চেষ্টা করতে করতে একদিন উড়তে পারে।
তাকে ডাকে ঘন হলুদের বনে।
ডাসা ডাসা পেয়ারা ঝুলছে গাছে।
তার ঠোঁটেও ভর করে তীক্ষ্ণ ক্ষুধা।
তাই সে মায়ের ডেরা ছেড়ে নতুন গাছের ডালে বাসা বাঁধে।
শিমুল আর বট বৃক্ষের ভেতরে আজ অনেক দূরুত্ব।
ছানা আর মাকে অতিক্রম করে যাচ্ছে একদল গ্রহপুঞ্জি।
মায়ের চোখে ভাসে ছানার স্কেচ, আঁটসাঁট ওম।
মা পাখিটি উড়ে যায় ঘন কুয়াশার ভেতর যোজন যোজন দূরত্বে।
রাত্রির কাছে প্রার্থনা
আজন্ম অতৃপ্ত তৃষ্ণা নিয়ে
রাত্রির কাছে দু’হাত পেতেছিলাম
সহসা একখণ্ড আলো এসে
দুহাত ভরে দিল আমার
এর চেয়েও ঢের যদি কিছু চাও
তবে তোমায় দিতে পারি নিস্তব্ধতা
দিতে পারি আঁধারের মতো কিছুটা নিসংগতা
নদীর কাছে চেয়েছিলাম একটুকরো ঢেউ
আমার দুমুঠো ভরে দিল নদী নিবিড় শূন্যতায়
এর চেয়েও ঢের যদি কিছু চাও
তবে তোমায় দিতে পারি
আদিগন্ত নিরুদ্দেশ কল্পনা
তুমি ভেলা হতে পারো কিঞ্চিৎ
তোমার বুকের ভেতর জমে থাকা
লাভাকুন্ড শীতল হোকনা ক্ষনিক।
কবির কাছে চেয়েছিলাম হিম হিম কিছু বাণী
সে আমাকে দিল অবিচ্ছিন্ন অথচ এলোমেলো
কিছুটা অভাবিত শব্দমালার স্কেচ
তাকে শিল্প মনে হলো কবিতা নয়।
রাত্রির কাছে এ আমার প্রার্থনা
আজীবন এক অমর সত্তা করে
তোমার বুকে ঠাই করে নাও
আসুকনা কিছুটা নিসংগতা
আসুকনা কিছুটা শূন্যতা
হয়তো শিল্প, নয়তো কবিতা।