নাদিম সিদ্দিকীর কবিতা

নাদিম সিদ্দিকীর কবিতা

ধর্ষিত সভ্যতা

বিবেকের বোতাম খুলে যখন দ্যাখি বিবেক চোখে
আমাকে অপরাধী করে যায় আরও একটি ধর্ষণ
একটি অপমৃত্যু, একটি বেঁচে থাকার আর্তনাদ।

গতকাল অবধি যে বোনটি ভাই বলে সম্বোধন করতো আমাকে
বিপদে সবার আগে আমাকেই ভেবে নিতো নিরাপদ আশ্রয়
বিশ্বাসী হাতিয়ার হাতে আজ নিজেই যেন অবিশ্বাসী
ঘৃণা আর ধিক্কারে বলে গেল আজ-
দ্যাখো, এই যে যায় হিংস্র শাবক।

লজ্জায় ঘৃণায় নিজেকে আড়াল করে
যে বোনটি রাঙা প্রভাতে মৃত্যুকে করেছে আলিঙ্গন
তার শান্ত চোখের গভীরে দ্যাখেছি দ্রোহের দাবানল।
ক্রোধে আর আত্মচিৎকারে বলে গেল সে-
তুমি অপরাধী, তুমি বিকৃতমনা খুনি
তুমি একটি স্বপ্নের হত্যাকারী।

এ কোন সভ্যতায় জেগে আছে বাংলাদেশে?
এ কোন সভ্যতায় আজ আমাদের বসবাস?

রাত্রির বুকে নিদ্রাহীন জেগে থাকি নিদ্রার আশায়
দু’চোখে নিদ্রা আসে না
চোখ বুঝলেই দ্যাখি ফাঁসির মঞ্চে উদ্যত জল্লাদ
আমি ঘুমোতে পারি না
ঘুম আসে না।
যেন সভ্যতার মুখোশে আমিও অসভ্য
আমিও অশ্লীলতার পূজারি এক বিকৃতমনা খুনি।

মৃত্যুঞ্জয়ী

ভয় নেই প্রিয়তমা, ভয় নেই।
মৃত্যু আমাকে নিয়ে যাবে নিরাপত্তায়
যেমন করে নিয়ে যায় মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর গাড়ি
কিংবা রাষ্ট্রপতির সুসজ্জিত বহর
প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব
তেমন করে রাষ্ট্র নেবে না।

এই নৈঃশব্দের গভীরে বোবা ও বধিরের দেশে
লেখক সংঘের জানালা ভেঙে
প্রতিনিয়ত লাঞ্ছিত হবেন একজন উদীয়মান কবি
একজন সাংবাদিকে চোখ বেধে
নিয়ে যাবে পদাতিক বাহিনী।
আগুনের ফুলকির মতো এখানে ওখানে
পাড়ে থাকবে শয়ে শয়ে লাশ গণকবর
জননিরাপত্তার নামে তৈরি আইন
বাতিল হবে পার্লামেন্টে।
তবু রাষ্ট্র আমায় নেবে না
আমার সন্তানের নিরাপত্তা দেবে না।

এখানে গণতন্ত্রের নামে চলে ফ্যাসিস্ট শাসন
শৃঙ্খলা রক্ষার নামে চলে গণতন্ত্রীর উপর নির্যাতন
হত্যা, হুলিয়া, খুন, ধর্ষণ আর অগ্নিসংযোগ।

ভয় নেই প্রিয়তমা, ভয় নেই।
হয়তো আইন অমান্যের অভিযোগে কিংবা
রাষ্ট্রের তৈরি সাজানো বন্দুকযুদ্ধে আমার মৃত্যু হবে
যেমন করে মারা যায় একজন শ্রমিক নেতা তাজুল
একজন বিপ্লবী সিরাজ, একজন নূর হোসেন।
তবু ভয় নেই প্রিয়তমা, ভয় নেই।
রণাঙ্গনে যে মরতে জানে সেই তো মৃত্যুঞ্জয়ী।

আজ মৃত্যুকে সত্য জেনে
আসন্ন নিরাপত্তা পরিষদের অধিবেশনে
আমি ভিয়েতনাম যুদ্ধের মতো চলমান অনিয়ম ও
বিশ্বব্যবস্থার বিরুদ্ধে আঙুল তুলবোই তুলবো।

মনে রেখে প্রিয়তমা।
মৃত্যু আমাকে নিয়ে গেলে যাক
তবু পদাতিক বাহিনীর কাছে মাথা নত করবো না।

অস্ফুট পাঁচটি আঙুল

এখানে এই নিসর্গের বুক জুড়ে
আমারো তো ছিলো কিছু অব্যক্ত কথা
কিছু নীরব কান্নার তোপধ্বনি, ভালোবাসা।
বরষার শেষে আশ্বিনের কাশফুলে লুকনো প্রেম
মাতাল কিশোরীর অস্ফুট পাঁচটি আঙুল ধুসর চোখ
দখিনের জানালায় উৎকন্ঠার নীল অবয়ব আর্দ্র রজনী।

এক যুদ্ধের শেষে ধুসর পাণ্ডুলিপি খুড়ে
আমি তো তোমাকেই খুঁজেছি মেঘ বালিকা।
আজ স্মৃতির আরশি খুলে উড়ে যায় একগুচ্ছ শুভ্র মেঘ
ফাগুনের পূর্ণিমা আর চৈত্রের কাঠফাটা রোদ্দুর।
তুমি তো সুখেই আছো
নদীর জলের মতো বহমান প্রেমে
আমি উবু হয়ে বসে থাকি জৈষ্ঠের খাঁ খাঁ রোদে
মাঘের শীতে
আমায় ছুঁয়ে যায় কার্তিকের সাদা শিশিরের হাত।

এই নিসর্গের বুক জুড়ে আমারো তো ছিলো
বিনষ্ট ফসলের মাঠে লালিত বেদন
ক্লান্তিহীন প্রতীক্ষার নির্বোধ অমরাবতী
গাঁয়ের ভূমিহীন কৃষকের গান
কিছু তুমিহীন তোমার স্মৃতি।
আজ আছে কেবল অস্ফুট পাঁচটি আঙুল।