শাশ্বতী চ্যাটার্জির কবিতা

শাশ্বতী চ্যাটার্জির কবিতা

গেট টুগেদার

স্বপ্ন-জানলার ধারে ঘুম নেমে এলে
ভেসে ওঠে মুখের মিছিল
কারা যেন স্মৃতি ঠেলে এসে আলো জ্বালে
গাড়িবারান্দায় থামে সোনালী ফিটন
ঘরে ঘরে পাতা হয় কাশ্মীরী গালিচা
রাঙাজ্যেঠিমার খাটে রেশমি চাদর
পর্দার ঝোঁকে দোলে রজনীর মালা
মিতুদিদি, ছোটমামী, তথাগত সব এসে পড়ে।
জাফরান শাড়ি আর খয়েরি কুমকুমে
ব্যস্ত মায়ের গায়ে বিয়েবাড়ি ঘ্রাণ।

এখন বরং ওরা ঠাম্মার ঘরটায় পালঙ্কে বসে
জলটল খাক, বিনিপিসি! বরফির রেকাবিটা আনো!
ঐ তো হারিয়ে ফেলা সাবেক পানের বাটা
আঙুলে ঝিকমিক আজও রুপোলি তবক…

বুড়োদাদা মেজপিসে কাটিহার থেকে রূপামাসি
একে একে সিঁড়ি ভেঙে অগণিত ফেলে আসা মুখ
কি যেন মিলনমেলা এক
গোড়ের মালার থেকে ট্যালকম পাউডার
গুঁড়ো গুঁড়ো উড়ে আসে আদুরে আহ্লাদ
সব সব খুব খুব চেনা…

এইসব ঘুমে
টনটন ক’রে ওঠে চোখের চৌকাঠ
বন্ধ দেরাজ খোলে জং ধরা চাবির ঝালর
ভেতরবাড়িতে বেড়ে ওঠে প্রকাণ্ড গাছ এক
কি নিবিড় ডালপালা পাখিদের ঘনিষ্ঠ নীড়!

বছর দশেক প্রায় মেজপিসে বুকের অসুখে চলে গেছে
মিতুদিদিদের সাথে কি একটা তুচ্ছ কারণে
মুখ দেখাদেখি নেই বহুদিন হ’ল
বুড়োদারা তো প্রবাসী ন’বছর হ’ল
আসা যাওয়া নেই কারো সাথে
যোগাযোগ সৌজন্যমূলক।

দেখা হয় তবু,
ঘুম এলে, গাঢ় হয়ে আসে ওরা
এলোমেলো আলোর মানচিত্রে ভেসে ওঠে ঘরদোর, মোরামের পথ আর সোনালী ফিটন…
কাটাকুটি খেলে চলে ভাব আর আড়ি।

বিচ্ছেদ তো হ’তই, বলো,
তবু আরো কিছু দেখাশোনা, লুকোচুরি, লুডোখেলা, মিছে হাসাহাসি-
বাকি ছিল না কী?
দেওয়া-নেওয়া বকেয়া হিসেব সব চুকেবুকে গেছে;
তবু কিছু আলিঙ্গন বাকি র’য়ে গেছে
বাদবাকি আরো কিছু গেট টুগেদার…

অস্তিত্ব

নিজেকে মুঠোয় ভ’রে এসে বসি বারান্দার কোণে
নৈঋত, ঈশানের হাওয়া চরিত্র বদল ক’রে এলে চিনতে পারি না ইদানীং;
অনিবার্য শীত করে, গুটিয়ে নিই উড়ানের তুখোড় মাঞ্জা,
ক্ষয়িষ্ণু লাগে অসহায় রকম,
অরক্ষণীয়া বাতাসের চোরাস্রোতে
মনে হয় সমস্ত ক্ষত থেকে খুলে যাচ্ছে ব্যাণ্ডেজ,
বেরিয়ে পড়ছে অশনাক্ত জন্মচিহ্ন;
কারা যেন এসে দাগিয়ে দিয়ে যাচ্ছে আমার নির্মীয়মান সংগ্রহালয়,
বাতিল হয়ে যাচ্ছে অনুমোদন;
হিসেবের খাতা হাতে ধিক্কারদিবস পালন করছে অক্ষম জন্মের প্রতিবাদ মিছিল।

জ্বর আসে বেগনিয়া টবটির পাশে
কমে আসে আলো
সন্ধেমেঘের ট্যাটু এঁকে হতাশ আকাশ
সমস্ত পৃথিবীর দিকে অন্ধকার মুখে তাকিয়ে বলে চলে-
‘আজও এলেনা…’

দ্রিম দ্রিম গাঁইতি চলে গভীরের পাথরখাদানে
ভাঙনের শব্দে পা ফেলে
ঘুম ফেরে শরণার্থী শিবিরে।
হাতে তুলে নিই ক্রাচ,
শূন্য মেপে এগিয়ে চলি শূন্যের দিকে
আর জন্মে যেমন ছিলাম…
খুঁড়ে ওরা নিয়ে যায় পৃথিবীর গর্ভাধান
ওদের বর্ম গ’ড়ে দেয়
পাথুরে হৃদয়-আকরিক।

ভয় করে, সুরঞ্জন।
এতখানি শক্তপোক্ত আবহমানের ওপরেও
নিতান্ত ‘নেই’ হয়ে বেঁচে আছি আমরা !