ব্রতী মুখোপাধ্যায়ের কবিতা

ব্রতী মুখোপাধ্যায়ের কবিতা

তারপর বিসর্জন দিতেই হয় জলে, জল কিছু বলতে পারে না,
নড়ে ওঠে, দুলে ওঠে, পাক খেতে থাকে,
তার চোখে পড়ে কি পড়ে না পাড়ে দাঁড়িয়ে আমরা কে কে চোখের জল মুছি

এই প্রশ্ন জলের কানে যায়,
নড়তে নড়তে দুলতে দুলতে পাক খেতে খেতে
হাজার হাজার চোখ দিয়ে আমাদের দেখতে দেখতে
একসময় বলতেই হয়
উপায় নেই আমার, হাত পা বাঁধা,
নাহলে মাটির মূর্তি, খড় আর বাঁশের টুকরো, রঙ আর সুতো দিয়ে সাজানো

উপায় নেই আমার, জ্যান্ত মা জ্যান্ত বাচ্চা নিয়ে ঝাঁপ দেয় জলে, এক একদিন, গ্রহণ না করলেই নয়, পাড়ে তখন কাউকেই, কাউকেই দেখতে পাই না সত্যি বলছি আমি

শব্দ করে কেঁদে উঠল মা, ঠাকুমার দুচোখভরা জল,
দিদি যা কাঁদছে সেই কখন থেকে, পাশের বাড়ির জেঠিমারও আঁচল পুরো ভেজা

ভিড় বাড়ছিল

ঘরে একটা কুকুর, আমিই এনেছিলাম, বেচারা আমার পায়ে পায়ে ঘুরছে

বাপ ছিল যুদ্ধমজুর, আমি কাঁদছি না

অন্ধকার অস্ত্র হয়ে আড়াল গড়ছে, কোন দিক ঘায়েল করবে জানি না

রাত্রিচর পাখিদের ঠোঁটে সুর নেই,
নক্ষত্রও একটিদুটি, দেখা যায় দেখা যায় না

একটিমাত্র কথা, অন্ধকারের সুযোগ যে কেউ নিতে পারে

সারি সারি পাথর, শাদা

তাদের কথায়, নিমেষগুলি ব্যথার রঙে অবগাহন করে
যেসব বাতি জ্বলবেই না তার জন্যে শোকের শ্লোক লিখতে লিখতে দেখি
মাটি ফুঁড়ে নতুন নতুন শ্যামল, সূর্য তাদের মাথায় দুধ ঢালছে,
তাদের মাথায় মায়ের চোখের জল

এক একটি চোখ অন্ধ হয় না কখনও

স্বপ্নকাহিনি নিজের হাতে লেখা, নিমেষগুলি ব্যথার রঙে অবগাহন করে

শাঁখ নয়, বাঁশি নয়, রঙের কৌটোগুলো উল্টে দিলে ওইভাবে শব্দের সন্ত্রাস,
অসহায় ছেতরে পড়ে,
আনন্দে ছড়িয়ে পড়ে না, আলোও

তারপরে গুহান্ধকার ঘন অনড় অক্ষিপল্লীতে, তারপরে চাবুকচিহ্ন গালে,
কোথায় সে ঠোঁট বিখ্যাত তাম্বুলরাঙা!

সঙ্কেতবিলাস সরিয়ে নিয়েছি, মগজদামামা সরিয়ে নিয়েছি,
হেঁটে হেঁটে যাই ধুলোউড়ি পথ দিয়ে বাংলার কুমোরপাড়ায়,
মাটির প্রদীপ মুখের সামনে ধরি, ভাল দেখতে পাই, মাকে, আমার মা যেমন

ছিটকে গেছি ঘড়ির কাঁটা থেকে, ক্যালেন্ডারের পাতা থেকেও,
সূর্য নিয়মদাস

বাতাস চিবিয়ে সন্ধে, প্রাচীনদিনের অচেনা প্রাণী যেমন, বিকটাকার ডানা ছড়িয়ে নামে,
বাইসনের চোখেই যা আলো, আলতামারিদিন

ছেলেমেয়েরা আছে, আলাদা আলাদা রথ, বোমা ছোঁড়ে, গুলি,
একজনের লক্ষ্য অন্য একজন

ডিজেলের দাম বাড়ে, বীজের দাম সারের দাম বাড়ে, ওষুধের,
শিশুদুধের, কন্ডোমের

মিলের গেটে তালা ঝুলতেই আচ্ছে দিন আসে দুই বোনের লাশ
গাছের ডালে ঝুলিয়ে দিতে দিতে