ভবেশ বসু’র কবিতা

ভবেশ বসু’র কবিতা

হৃদয় পাখি

সুখাদ্য কুখাদ্য নৌকা নদী পাহাড়,এক টুকরো আকাশ উচ্চারণ হয়েছে সবদিন
খাদ্য নেই ভাবনা নেই,কোন সময় বলো এমন উষ্ণতার কথা তুমি আমি সে বলেছি
শব্দহীন রাত মাঝরাতের প্রকৃতি এবং মৃত্যু সাগর পেরিয়েও ভোরের কবি গান গাইছে
মহাযুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে এমন মনে করার কারণ নেই
জল বাদ দিয়ে দুধ খেয়ে নেবো,তবু নদীর বাঁকা পথ থেকে যায় অনেক অনেক বেশি।

যখন যেমন সময় এসে পড়ে সেইমতো পুষ্পিতা লতা,কখনো অবনত কখনো সূর্যমুখী
রাত্রির প্রথম প্রহরে বাঘ শিয়াল,চতুর্থ প্রহরে শুকতারা আলো মাঠ শস্য
সাগরের তীর ভাঙা নতুন কিছু নয়,মরণ তার দেহে কোনোদিন মুখোস রাখে না
তুমিও ভুলেছ তোমার অদৃশ্য হাত কি
হাত খুব চেনা তারই ভেতর ভালোবাসাহীন রক্তপুঁজ,তা ভুলে তুমি পৃথিবীর পথে পথে ভ্রমণে আছ মনে হয়নি ?

অনেক রক্তক্ষরণের ভেতরেও আশার আলো,চাষ-মাটি আছেই
তীর্থ পথেও জন্ম মৃত্যু,রূঢ কথা পরিবার পরিজন আবার হৃদয়ের পাখি।

নকশা-আসন

নকশাকাটা আসন বুনেছিলাম,কে বসবে এই আসনে !
সে লোকটা সকালে উঠেই বসতে গেল পারল না
সকলে বলল ঠাকুর সাজিয়ে রাখ,ঠাকুর এসে ফিরে গেছে
তোমাকে বলতে রোদ ঘনিয়ে এল মুখে,বললে আমার ভালোবাসা বসবে মরণ আটকে দেব।
দেখ কিছুই কি আটকে রাখা যায়
সেই জন্মে শঙ্খ বেজে উঠেছে,মৃতদেহে আগুন হাজির
হানাহানি সংঘর্ষ এড়ানো যায় নি,অবহেলা সকলেরই বাগদত্তা
হৃদয়ে মেঘ জমছে মনের বাহিরে সূর্য
আমার নকশাকাটা আসন পড়ে আছে অবহেলায়।

আসনে আমি বৃক্ষকে বলেছি বসতে,শিশিরের পায়ে ধরেছি
ছেলে মানুষের খেলা যেখানে সেখানেও হাজির
পাহাড় নদী পর্বত সমুদ্র অনেক উঁচু রাজি হয়নি
যারা ক্ষমতা দখল করে ভয়ে কাঁটা
এতদিন পর সকলের সাথে দেখা,কেউ আমন্ত্রণ নিল না।

শেষরাতে এক সন্ন‍্যাসী এসেছিল
আমাকে নাও সন্ন‍্যাসী, আমার উপর তুমি বসলেই বয়স কমবে
সন্ন‍্যাস সন্ন‍্যাসী দুই কাঁপছে,সংসার ফেরা সর্বত্যাগী মানুষ মাথা নত করে দাঁড়াল
তাহলে এ আসন কার ?
“আমাকে দাও”―এই শিশু অবলীলায় মাতৃক্রোড়ে উঠে বসল।

বুলবুলি

এক আকাশের ভেতর আমার ছোটো ঘর,নিজেই নিয়েছি ভূমি ছোটো করে মেপে
সবুজ মাঠ আলোয় মোহিনী,আমি শুধু নিলাম সাজবার সরঞ্জাম
সমুদ্র জল স্বপ্ন সাঁতার কাটে,ইচ্ছে হলো একঘটি রহস্য নিই
এত মাটি মহাকালেরও কবর হবে,ক্ষণকাল থেমে আড়াই হাত
আমাদের ইচ্ছেগুলি হৃদয় থেকে গৃহস্থালিতে এসেছে—
এক পৃথিবী আঁধারে আমার দু-চারটে ভয় সঙ্গী,সাহসও আবার !

ভালোবাসি কি করে,চোখের জল দিয়েছি তোমায় কতটুকু বল
আগমনি গান বাদ দিয়ে কাশফুলে নৃত্য করি
নারীর নদীতীরে দেখি পড়ে আছে গাছ নয় এক আঁচল বকুল
নুড়ি পাথরেই ভারী হয়ে গেল ঝোলা,কোথায় আর ধারণ করি মহামূল্যবান প্রবাল !

আকাশ এখনো আগের মতো,নদীও ঘর ভেঙে লক্ষ‍্যে যায় গতি শব্দ থাকে ঠিক
এক সবুজ হাঁটতে গিয়ে আলাদা পথের ধান খেয়ে আমি আদরের বুলবুলি,মন তুই কী করলি !

অশ্রুফোঁটা

সত্য উচ্চারণের কলসি কোথায়
অনেকগুলি ছাইগাদা,প্রতিটি হলুদ বয়স ও নকল পাতা পুড়েছে
আমি তোমাদের বলতে চাইছি যারা স্নান করে,আর যারা স্নানের ব্যবহার জানে না—
পৃথক পৃথক নেই কেন তাদের ভষ্মাধার !
এক ঝাঁক পাখি দুঃখ কুড়াল এক ঝাঁক কা কা ডেকে সুখ খায়
এদের দু দণ্ড কি কথা হতে পারে অথবা এক বিছানা
এ সময় দেখি সব কিছুকেই একনখে তোলে তাল ছন্দে মেলায়।

সকলেই শঙ্খে ফুঁ দিতে পারে না নিঃশ্বাসের জোর নেই
যারা দিতে পারে জননী বলে ডাক পায়
আমি সেই সকল শঙ্খচিলের একটা পৃথক শশ্মান চাইছি
ওজন দাড়িতে জানা যেত এখন পৃথিবীতে সোনা লোহার পরিমাণ।

এক নারী ও পুরুষ সেই কবে থেকে ছাইস্তুপে বসেছে
হাতড়ে হাতড়ে বার করে আনছে অশ্রু ফোঁটা—
এভাবে কি ঈশ্বর খোঁজা সম্ভব
মাঝে মাঝে মুঠিতে উঠে আসছে অন্ধকার ঘর অন্ধ পৃথিবী !

বৃত্তের মতো

তুমিও যেমন ঐক্যের খোঁজে হঠাৎ হঠাৎ বারান্দায় খেলা কর
মিথ্যা বলবো না,আমিও যাই এভাবে নির্ভেজাল মানুষ হতে
আমাদের দেখাদেখি গাছগুলিও চলে আসে ছায়া নিয়ে,প্রশ্বাসে কাটিয়ে যায় কিছুটা সময়
আসলে সবাই তো প্রতিবাদ করতে পারে না
এই বিভৎস ঝড়ে নিভৃতে মুখোমুখি যদি অশ্রু অশ্রু খেলা যায় !

প্রতিদিন প্রতিবার দেখি আমাদের মতো ভাঙা ভাঙা গলায় রোদ আসে অমল জ্যোৎস্নাও
অকারণ নিজেদের ভেঙেচুরে আলিঙ্গন,সবাই তাই মুগ্ধ সন্ধ‍্যায়
এই রোদ জড়ায় আমাকে,তোমারই মতো ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখে বদলেছি কতটা কথায়
আমিও জ্যোৎস্নার চোখে চোখ রাখি,কিশোরীর সাজে দুজন।
যেন আকাশ বৃত্ত,পরস্পর সকলে হাসির পরে বৃষ্টিতে মিলেছি
তুমি ও আমি দিন রাত যখন যেমন কেউ না কেউ বহুবার একে অন্য হয়েছি।

তুমি আমি মানুষ ছিলাম বা এই পৃথিবীর সকলে একরকম ?
ঐক্যের খোঁজে হঠাৎ হঠাৎ ঘর বারান্দায় তুমি আমি যেমন নদ-নদী রোদ মাটি জল
তেমনই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে দিতে সকলেই বদলেছে,কখনো পশুপাখি কখনো বা মাটি ও মানুষ হয়।