প্রবীর রঞ্জন মণ্ডলের কবিতা

প্রবীর রঞ্জন মণ্ডলের কবিতা

হাওয়ার ঘোড়া

একটা হাওয়ার ঘোড়া বিক্ষিপ্ত ক্ষুরের ধুলোয়
ঝিমিয়ে পড়েছে। দুপুরের গরম রোদ শুঁকতে শুঁকতে
ঘুম ওর চোখে কখনো কচিপাতা সন্ধ‍্যে হয়ে নেমে আসে না।
ওর টগবগে মন মহাসমুদ্রের জিম্মায় লাগাম দেওয়া
একটা ঘূর্ণন আবর্তের মাঝখানে গচ্ছিত আছে।
সময় আর সুযোগের অপেক্ষায় একটু নীরব যেন
ছুটবার সীমারেখা ঠিক করে দিলে
দুরন্ত তুরগবেগ নিয়ে দাপাতে দাপাতে চলে আসবে
মুহুর্তের মধ্যে পিছনের পায়ের লাথি সাঁটতে সাঁটতে।
তারপর কী হবে ভাববার সময় না দিয়ে
সব এসপার ওসপার করে দিয়ে
আবার ঝিমিয়ে পড়বে কয়েকদিন
ওর দুরন্ত গতির দাপট ইহজগত হতে
চিরতরে থামবে না কোনদিন
এরকম একটা হাওয়ার ঘোড়া
আমরা হতে পারিনা কী
কোনদিন এই লৌকিক জগতে?

হিসাবের অঙ্ক

সেইযে খোলা ঘর জানালা বিহীন পাঠশালা
অতঃপর এক ঘোলাটে চোখ লাঠিওয়ালা পণ্ডিত
কেমন যেন ঝিম মেরে আছে মাথার প্রকোষ্ঠ জুড়ে
ডাকের নামতার ডানা ওয়ালা ধুলোর উশখুশ
ব‍্যস্ততার বাড়ি ফিরে ভোঁকাট্টার সরু সুতোয় মাঞ্জার পালিশ
আমাকে কেমন যেন শৈশব ব‍্যস্ততার স্বপ্ন জাগায়।
এখন আমি বড়ো সওদাগরি অফিসের অর্থকোষের বড়বাবু
সেই আশৈশব শিখে আসা নামতার স্রোতে গা ভাসাই;
এক এক্কে এক,দুই এক্কে দুই হিসাব মিলাতে মিলাতে
ছুটির ঘন্টায় পাতাতাড়ি গুটিয়ে কেমন যে ভোঁকাট্টা হয়ে পড়ি!
ফিরতে ফিরতে বাসে,ট্রামে, ট্রেনে মাঞ্জা সুতোয় ঘষা খাই
আর ভাবি জীবনও তো একদিন হিসেবের অঙ্কের মিল খুঁজতে খুঁজতে
ভোঁকাট্টা হয়ে পাড়ি দেবে অনির্দেশের পথে।

তারুণ্যের পোষ্টমর্টেম

একটি গাছের বিকলাঙ্গ পাতা
পাখি পাখনার মতো উড়ে যাচ্ছে দমকা হাওয়ায়
ওর বুকে আঁকা এক একটা স্বপ্নভোর
অনেক আগেই সিঁদকাটা চোর ছিনিয়ে নিয়ে গেছে
আরাদ্ধ দেবতার পায়ে পুস্পাঞ্জলি দিয়ে।
ওর চোখেও ছিল নতুন ভোরজাগা রোদস্বপ্ন
পাঁচটা দশটা ফিটফাট সুবেশী ভালো পাতার মতো।
স্বপ্ন ছিল স্বপ্নেরই মতো
এখন সবার চোখ জাগা স্বপ্ন বিকলাঙ্গ হয়ে গেছে
সব জীবনের উপর খেলে যাচ্ছে দমকা বাতাস
দুমড়ে মুচড়ে ভেঙে দিয়ে স্বপ্নগুলো
ভোরের বাতাস শুঁকে পৌঁছে যাচ্ছে লাশকাটা ঘরে।
পোষ্টমর্টেমের রঙিন নকশায় ফুটে ওঠে
সকল তারুণ্যের বুকফাটা হাহাকার।

একটু ভেবে দেখুন

আগুন ডানায় ধেয়ে আসছে
কয়েকটা আলোর সপ্রতিভ ছবি
ঠিক ছবি নয়,ছবির মতো কয়েকটি যান
যান্ত্রিক কারুকাজে ভরপুর দেশরক্ষার সরঞ্জাম।
যন্ত্রবিদ‍্যায় সমৃদ্ধ একদল বৈদেশিক প্রতিবেশী রাষ্ট্র
তাদের সমঝে দেওয়ার যন্ত্র মাত্র।
যাকে ভর করে রক্ষা হবে দেশমাতার সম্ভ্রম,
রক্ষা হবে মানুষের অমূল্য জীবন!
কোন পৃথিবীর উন্নততম জীব আমরা!
আমাদের সহজ করে বাঁচতে চাই অজস্র মারণাস্ত্র
মানুষের মতো মানুষকে বাঁচতে চাই যুদ্ধাস্ত্র!
আমাদের কেমন এক সুসভ‍্য জগত
অথচ কে একজন দৃঢ় করে বলেগেছেন—
‘মানুষ হয়ে মানুষের উপর বিশ্বাস হারানো পাপ’
অন্য জীব হতে কত ধাপ এগোলে
তারপর আমরা মানুষ বলে বিবেচিত হবো?
একটু ভাবা দরকার,একটু ভেবে দেখবেন আপনারা।

দিগন্ত রেখায়

উড়ান ছন্দে একটা পাখি গেয়ে যাচ্ছে গান
ওর চোখের উপর দিয়ে ভেসে যাচ্ছে নীল আকাশ
মনে গভীর আলোর খিদে জমা হয়ে আছে
সূর্যটাকে তাই ডানায় বেঁধে রাখতে চায় এখন।
খিদের গহ্বর ধীরে ধীরে বড়ো হয়ে উঠলে
টুকরো টুকরো ভেঙে আলো খেয়ে নেবে তখন।
দুটি পাখনার দাপটে ছুঁতে চাইছিল আকাশটাকে
যতই সে হাওয়া কেটে কেটে এগিয়ে যায়
ততই নীল আকাশটা ঊর্ধ্বে উঠে হাতছানি দেয়
দিগন্তের দিকে নির্দেশ করে ক্ষিপ্রতায় উড়ে যেতে।
উড়েও যায়,তারপর ধীর পদক্ষেপে মিশে যায়
সূর্যের মতোই একেবারে স্তিমিত দিগন্ত রেখায়।