বই আলোচনাঃ আহমেদ জামিলের গল্পগ্রন্থ ‘আয়নার সংসার’

বই আলোচনা
আহমেদ জামিলের গল্পগ্রন্থ : আয়নার সংসার
॥মৃধা আলাউদ্দিন॥
সাহিত্যের ইতিহাসে ছোটগল্প কনিষ্ঠতম সংযোজন। বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে অমর ছোটগল্পকার মোপাসাঁকেই ছোটগল্পের জনক বলে সম্মান জানানো হয়। বাংলা ভাষায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এইরাধাকে রিষ্টপুষ্ট করে তোলেন। বাংলা সাহিত্যের আধুনিক যুগে সংযোজিত এই শিল্পমাধ্যমটি এখন অনেকটা পরিপক্বরূপ লাভ করেছে। খুব অসময়ের মধ্যে ঘর অবিশ্বাস্য সমৃদ্ধি প্রকৃতিই বাংলা সাহিত্যের প্রভূত গৌরব দিবে সৃজনশীল সাহিত্য ক্ষেত্রে যে সকল শাখা-প্রশাখা রয়েছে তার ভেতর ছোটগল্প হচ্ছে অন্যতম। ছোটগল্প-মূলত সাহিত্যের এক বিশেষ মিল্প প্রকরণ-যা বৈচিত্র্যময় জীবনের খ-চিত্র মাত্র।
জীবনের বৈচিত্র্যময় বিপুল ঘটনাবলি থেকে একটা বিশেষ মুহূর্তকে শিল্প নৈপুণ্যে তুলে এনে পাঠকে চমকে দেয়াই ছোটগল্পের বৈশিষ্ট্য। গল্প শেষ হলেও তার রেশ থেকে যায় পাঠকের অন্তর ভাবনায়। তার মনে হয় কী যেন নেই, আরও কী তাকলে আরও ভালো হতো। এমনই এক বোধ পাঠককে ভাবায়, অস্থির করে তোলে। আর কখনও কখনও পাঠক নিজেই গল্পের চরিত্র হয়ে গল্পকে এগিয়ে নিতে চায় অন্য কোনো সমাপ্তি রেখায়। কিংবা গল্পকারকেই মনে মনে বাতলে দেয় নতুন পথের খোঁজ- যেখানে গল্পের চরিত্ররা এখনও যায়নি। এমনি আরও অনেক প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয় ছোটগল্প পাঠের পাঠক মনে। বাংলা সাহিত্যে আধুনিকতম শিল্পকর্ম ছোটগল্পের এই চারিত্রই তাকে এনে দিয়েছে অনন্য বৈশিষ্ট্য আর এই বৈশিষ্ট্যের কারণেই ছোটগল্প শীর্ষে চলে এসেছে আনন্দপাঠের।
পাঠের এই আনন্দ নিয়েই এবার আমরা প্রবেশ করবো দেশ-বিদেশে খ্যাতিমান গল্পকার আহমেদ জামিল রচিত ‘আয়নার সংসার’-এ। আহমেদ জামিল বেড়ে উঠেছেন পুরান ঢাকায়। উচ্চশিক্ষার জন্য চলে যান আমেরিকা এবং শেষ পর্যন্ত সেখানেই বসবাস করেন সানন্দচিত্তে। লেখেন বাংলা এবং ইংরেজি দুই ভাষাতেই ভাষায়। কবিতা ও ছোটগল্পই তার চর্চার বিষয়Ñ কথশিল্পী হিসেবে ২০২১-এর অমর একুশেগ্রন্থমেলায় তিনি তার প্রিয় পাঠক পাঠিকাদের হাতে তুলে দিলেন ‘আয়নার সংসার’ শীর্ষক ছোটগল্পের বইটি। স্টুডেন্ড ওয়াজ কর্তৃক প্রকাশিত এবং বইটি নানন্দিক প্রচ্ছদ করেছেন শিল্পী হিমেল হক। ৩৮টি গল্পের ৮০ পৃষ্ঠার এ বইটি মূল্য রাখা হয়েছে মাত্র ২০০ টাকা।
কবি ও কথাশিল্পী আহমেদ জামিলের আয়নার সংসারে বর্ণিত হয়েছে স্মৃতিকারতা, নিঃশ্বচেতনা, সমাজবাস্তবতার টানাপড়েন, প্রেম ও প্রেমের নৈরাজ্য, অর্থনৈতিক মুক্তি ও প্রাপ্তির পরিসমাপ্তি। অতি স্বাধীনতার বিষফল, স্বপ্নঘোরের সংগ্রাম এবং ঐতিহ্যকে ধরে রাখার আকুলি-বিকুলি তার গল্পের পরতে পরতে। আহমেদ জামিলের নায়ক-নায়িকারা দেশ থেকে দেশান্তরে ছড়িয়ে পড়েন স্বপ্নের সোনালি সাম্পানে চড়ে এবং মুখোমুখি হন অন্তহীন যুগ যন্ত্রণার। কখনও কখনও তারা ভেঙে পড়েন আবার কখনও কখনও ঘুরে দাঁড়ান আত্মপ্রতিষ্ঠার দৃঢ়তা নিয়ে। আত্মপ্রতিষ্ঠার এই সংগ্রামে ক্ষত-বিক্ষত একজন রুকসি। লেখকের বর্ণনায় চিত্রিত রুকসির রূপÑ
রুকসি আমেরিকায় এসে এতো বদলে গেছে যে, নিজেকে ক্লাবের নগ্ন ড্যান্সার বানালেন এবং এখন তার কাজল কালো আঁখি নেই। লম্বা এলেকেশী চুল কেটে ফেলেছে। এখন সে চার ইঞ্চি চোখা হিল পরে। আর্টিফিসিয়াল দামি নখ লাগিয়েছে। লেদার স্কার্ট টপ ড্রেস ও বিগ বুট পড়ে লগ্ন ড্যান্সার হওয়ার জন্য চার-পাঁচ দিন যৌন আবেদনময়ী অঙ্গভঙ্গি করার ড্যান্স ক্লাস করতে হযেছে। এখন সে ম্যানহাটনের নুড ক্লাবে ড্যান্স করে রক মিউজিকের তালে তালে। ঘণ্টার চল্লিশ ডলার। তার কাস্টমারদের টিপস দুই তিনশ ডলার। আট ঘণ্টা কাজ করেÑ এক ঘণ্টা লাঞ্চ বিরতি। কিছু কাস্টমারের সাথে ড্রিংক করতে হয়, উপরি ইনকাম আছে ক্লাবের নিয়ম অনুসারে। মাঝে মাঝে কাস্টমারদের বাড়িতে যায়। শয্যাসঙ্গিনী হয়। কারো বড়িতে গেলে ডলার নিয়ে আসে। ক্লাব কমিশন পায়-
[রুকসির কথা, পৃষ্ঠা-৪৩]
সোনার হরিণের খোঁজে এ রকম ছোটাছুটি আজ পৃথিবীর সর্বত্রই দেখা যায়। এ কাহিনির সমাপ্তিতে দেখা যায় রুকসির প্রত্যাবর্তন-যেখানে অনেকদিন পর ভাইবোন, বাবা-মা সবাই আনন্দচিত্তে একত্র হয়। এমন আরো অনেক কাহিনির উপস্থাপন লক্ষ করা যায় গল্পকার আহমেদ জামিলের ‘আয়নার সংসারে।’ ‘কাজল আপা’, ‘লিমার গল্প’, ‘ঋতুর মুক্তির স্বাধীনতা,’ ‘পাশের বাড়ির মেয়ে,’ ‘অন্ধকারে টনি রিয়ান,’ ‘লাট সাহেব,’ ‘আমি নায়িকা হবো’Ñ ইত্যাদি গল্পে দেখা যায় মুক্তি নগ্ন উল্লম্ফন এসব কাহিনিতে ধরা পড়েছে অতিস্বাধীনচেতার বিষময় চিত্র- যা পাঠক-পাঠিকা চিন্তিত করে বিমর্ষ করে। নতুন ভাবতে বাধ্য করে, স্বাধীনতা ও মুক্তির সুফল লাভের পথ ও পাথেয় নির্ণয়ে।
মানুষ তার মূল্যবোধ নিয়ে বিশ্বাস নিয়ে, ইতিহাস-ঐতিহ্য নিয়ে বেঁচে থাকতে চায়। শান্তিতে-প্রশান্তিতে এগিয়ে যেতে চায় আহমেদ জামিলের গল্পে। চরিত্রও এগিয়ে যায় দেশ থেকে দেশান্তরে। স্বপ্নের সম্ভাবনাকে সফল করতে। কেউ কেউ ‘লাট সাহেব’ হয়ে ওঠেন। আবার কারো কারো ‘প্রেস্টিজ’ হয়ে ওঠে প্রশ্নবিদ্ধ। কিন্তু গল্পকার আহমেদ জামিল তার চারপাশের মানুষ এবং তাদের বেড়ে ওঠার প্রয়াসকে তুলে ধরেন আন্তরিকতার সঙ্গে। তার অভিজ্ঞতা তাকে উত্তর জোগায়। রসদ সরবরাহ করে নান্দনিক গল্প তৈরির। সৃষ্টি হয় ‘আয়নার সংসার’। গল্পের সহজিয়া ভাষা আনন্দময় পাঠের স্বপ্নীল জগতে নিয়ে যা পাঠকসহ এখানেই তার সৃষ্টির সার্থকতা। যেমন সত্তর বছরের পুরনো সংসার, বাড়িঘর স্বামীর কবর ছেড়ে নতুন বাড়িতে উঠে যেতে চায় না দাদি। লেখকের ভাষায় ‘প্রায় একঘণ্টা পর দাদিকে পাওয়া গেল দাদার কবরে মাথা বাড়ি মেরে মেরে বলছিল, ‘আমি তোমাকে ছেড়ে যাব না। তোমার ছেলেরা, ছেলের বউরা কেউ আর আমার কথা শুনছে না।’ শেষ পর্যন্ত দাদিকে তার দুই ছেলে দুদিক থেকে হাত ধরে গাড়িতে বসিয়ে নিয়ে এলো নতুন বাড়িতে।
সেই থেকে দাদি কেমন বদলে গেল। হাসি খুশি মাখা মিষ্টি দাদি। চুপচাপ হয়ে গেল চিরদিনের জন্য। টবে রাখা বাসী ফুলের মতো লাগত দাদিকে…’
দাদি, পৃষ্ঠা-২০]
হ্যাঁ, শেকড়ের টানে, ঐতিহ্যের ফ্রেমে এমন অনেক চরিত্র উঠে এসেছে আহমেদ জামিলের আয়নার সংসারে। যেমন ‘সানালি দিনগুলো দেখা যায়, লতা মঙ্গেশকারের কণ্ঠে যখন বেড়ে ওঠে, ‘সাত ভাই চম্পা জাগরে’ গান তখন ‘বাবা চিৎকার করে ডাকলো, তোর পড়াশোনা বাদ দে এখন। তোর গান বাজছে জলদি আয়…।’ কিংবা ‘স্মৃতির আড়ালে’ গল্পে দেখা যা লুঙ্গি-পাঞ্জাবি পরে অনুষ্ঠানে আগত জনসাধারণ মানুষের সঙ্গে অসাধারণ অন্তরঙ্গতার ছবি। যে চিত্র হাল জামানায় কল্পনাও করা যায় না। লেখকের সঙ্গে সঙ্গে আমরাও উজ্জীবিত হই, উদ্দীপ্ত হই।
আহমেদ জামিলের ‘আয়নার সংসারের একটা হৃদয়ছোঁয়া গল্পের নাম ‘মা’। এ গল্পের মাধ্যমে আবারও প্রমাণ হলো মা সমগ্র পৃথিবীতেই এক অনন্য সৃষ্টি। যার কোনো তুলনা হয় না, তেমনি আরেকটা গল্পের নাম ‘আমার বাবা গল্প’- যা সত্যি অসাধারণ, মা-বাবাকে নিয়ে পৃথিবীতে অনেক গল্প-কবিতা-গান রচিত হয়েছে। ভবিষ্যতে আরও হবে। কেউ সৃষ্টির প্রতি সকলের প্রেম ত্বকটা আলাদা বৈশিষ্ট্যের বাইরে নয়। তিনি বেশ আন্তরিক রসে মুন্সিয়ানার সঙ্গেই তুলে ধরতে পেরেছেন।
বাংলাদেশের পুরান ঢাকা থেকে আমেরিকার জীবনযাত্রা পর্যন্ত মানুষের সুখ-দুঃখ, প্রেম বিরহ, সমাজ-রাজনীতি সবই উঠে এসেছে আহমদ জামিলের কাহিনির ভাঁজে ভাঁজে। মানবিক স্বপ্ন, আকাক্সক্ষার যে চিত্র তিনি এঁকেছেন তা পাঠককে নিয়ে যাবে এক ঘোরলাগা জগতে।
এক মানচিত্র এঁকেছেন আহমেদ জমিল তার ‘আয়না রসংসার’ শীর্ষক গল্প গ্রন্থের মাধ্যমে। যদিও বিনির্মাণের ক্ষেত্রে লেখদের আরও একটু বেশি মনোযোগ দাবি করে আয়নার সংসার। আরও একটু একাগ্র সম্পাদনা পেলে গল্পটি আরও বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠতো নিঃসন্দেহে। আমরা বইটি বহুল প্রচার কামনা করছি। বইটি আপনার সংগ্রহকে আরো সমৃদ্ধ করবে বলেই আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস।