এলিজা খাতুনের কবিতা

এলিজা খাতুনের কবিতা

ঠোঁট ফাঁড়া হাসি

এ পাড়ায় পিঁপড়ের চলার মতো চলে “এরা”
আর এদের সাথে ছায়ার মতো নিঃশব্দে অভাব হেঁটে বেড়াচ্ছে
পোয়াল গাদার পাশে, ঘুঁটে মাচার নিচে
উইপোকার ঢিবির মতো বসে আছে অভাব
ঘরের খুঁটি, চালের বাতায় অভাব ঢুকে পড়ে
ঘুণপোকার মতো কুরে কুরে বের করে গুঁড়োনো জীবন
এরা লিফ্ট বেয়ে শপিংমলে ওঠে না
এরা ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, অনথন, থাই স্যুপ চেনে না
এরা জন্মদিনের পার্টিতে লাল জলের বোতলের খবর রাখে না
এমনকি এদের আনাচ-কানাচে ঘুরে বেড়ানো অভাবের খবরও
এরা রাখে না ; এরা মধ্যরাতে শলাপরামর্শে মাতে না !

এদের পাঁচ-ছ’টি ছেলেপুলের পর আরো কয়েকটি জন্মায়
এদের ঘরে তবু উপচে পড়ে আনন্দ-শরবত
চাক চাক ফাটা মাটির মতো ঠোঁট ফেড়ে হাসে এরা
এদের কালি পড়া কোটরের ভেতর চক চক করে মায়া জ্বলে

সমস্ত দিনের অতি বাস্তব সংহাতের পর
বেহালার তারের মতো জেগে থাকা বুকের হাড়ে এরা
হাসি বাজাতে পারে
উঁকি দিয়ে দিয়ে পাত্তা না পাওয়া অভাবেরা পাড়া-বিমুখ হয়

আরাধ্য পথের দিকে

শেষমেশ যে যার শূন্যতার কাছেই ফিরে যায়
শেষমেশ যে যার অভাবের কাছেই ফিরে যায়

‘তোয়াজ’ এর আধিক্য বর্ণনাতীত ;
তবু উচ্চপদস্থ চর্বিযুক্ত শাপ-শকুনেরা
ফিরে যায় টোপসমৃদ্ধ নিজস্ব কৌশলসমূহের কাছে
ফলে বেড়ে ওঠে আরও আরও তোষামোদ-কীর্তি

আর ওদের চারপাশে দেয়ালের লাল ইট থেকে
কী চমৎকার সুরভি ছড়ায় !
সেইসব ইট- পুড়া মাটির ভেতরে
আমাদের ঘাম ও রক্ত সাজানো থরে থরে

এ মাটি পুড়ে ওদের চকচকে দেয়াল হয়
এ মাটি-মানুষ নিজেকে নিংড়ে নিংড়ে
ভরে তোলে ওদের রঙিন গ্লাস
এ মাটিতে রাখেনি ওরা আর কোন সার
এ মাটির আরাধ্য লাঙ্গল ঢেলার কাছাকাছি নেই
এ মাটি এখন মুমূর্ষু

এখানে এম্বুলেন্স দরকার
এ মাটিতে সার-জল-বীজের শুশ্রুষা দরকার
এবং তোয়াজ নিঃসৃত আগাছা উপড়াতে নিড়ানী দরকার
এমন মুমূর্ষু বার্তা দিতে পারি কেবল জরুরীবিভাগে

অবশেষে নিজস্ব অভাবের কাছেই ফিরে আসি
অবশেষে রক্তচোষা-খাঁচার কষ্ট পুষে
আরাধ্য পথের দিকে তাকাই
এখন মৃতপ্রায় নদীর জল পিপাসা টুঁটিতে সেঁটে
খুঁজে চলি ফসল বোনার পাললিক তীর

জল জীবন

আজকাল হাসতে গেলে গলা শুকিয়ে যায়
গোধূলীবেলা রক্তিম আলোয় তোমাকে খুঁজতে গিয়ে
যেভাবে হঠাৎ সন্ধ্যা নেমে… তারপর রাত হয়ে যায়
তারপর অন্ধকার ঘন হয়ে আসে

গভীরে ওঁৎ পেতে থাকা বর্বরতা, রুক্ষ প্রাসাদ
ডাস্টবিনে শিশুর মুখ নর্দমার ক্বাথ, সভ্যতার মঞ্চ…
এসবকিছু গলাজড়াজড়ি করে তোমাকে আড়াল
করে রাখতে পারে ; এমন আশঙ্কায়
নিমজ্জিত হতে হতে অনুভব হয়-
যেন নিবিড় নিস্তব্ধ এ্যকুরামে কেউ আমাকে রেখেছে
যেখানে এক ফোঁটা জল নেই
আমার গলা আরও শুকিয়ে ফাটা কাঠ হয়

অথচ বুকের ভেতর অতল নদী আছে
সেখানে এক জীবনে কত নৌকাডুবি আছে
কখনও সেখানে শালুক জোটে, পদ্ম ফোটে
আবার কখনও স্থির জলে আলোড়ন ওঠে