রাজেশ কান্তি দাশের কবিতা
জলমন
তোমার মন জলাঙ্গীর মতো দীর্ঘ
সসীম যেন অসীমে মিশে গেছে।
এক নদী সাঁতরিয়েও কূল পাইনি আমি।
আমি শুধু চেয়ে থাকি এর দীর্ঘ ঢেউয়ের দিকে
যৌবনটা কেটে যায়
জলপাড়ের হাঁটা ফুরায় না।
কিনারেই পড়ে আছি।
তুমি সবই শিখালে—
জলে সাঁতরানো, জলের স্বাদ, জলের চোরাস্রোত, জলমনের বিষণ্ণতা…
কিন্তু অথৈ জলের মতো যে মন, তার গভীরতা
আর এর থৈথৈ করা দীর্ঘ ঢেউ পাড়ি দেওয়ার হিসেব
কিংবা মাপকাঠি শিখালে না হে কন্যে!
দেবী
সমুদ্র আমাকে একটু বোধ দাও—
তারাদের মতো আমার কোনো বোধ নেই, তাই কাউকে চিনতে খুব কষ্ট হয়!
একটি বালিকা,
যে হেঁটে গেল আমার পাশ দিয়ে সূর্যআলোর ভিড়ে
তাকে কি তুমি চিন?
কিংবা সাদা মেঘে উড়ছে যে পাখিরা, তারা…?
আনন্দ-অনুরাগের পুষ্পিত সুবাস তার চতুর্দিকে বেরোয়
টুপটাপ পদচ্ছাপে—
অরণ্য-অরণ্যানীর লতায় পাতায় ঘুরে ঘুরে
শীত-গ্রীষ্মের মহাসড়কে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে চিন্তা করেছি অনেক;
বোধহীন ঘাসের শিশিরে দাড়িয়ে চাঁদ দেখেছি
চিন্তাগুলো প্লাবন হয়েছে—
পৌষরাতে—
চাঁদের এক মুঠো জ্যোৎস্না তার কাছে পাঠিয়েছি
আমার চিন্তার প্লাবিত লাবণ্য —
সে দিগন্তের দিকে তর্জনী প্রসারিত করে দেখিয়েছে
সূর্যরাগের কমলা এক ফোঁটা বিন্দু…
জ্যোৎস্নাকে জঙ্ঘায় বসিয়ে তার কপালে এঁকেছিল চুম্বন
পরিচয়ের ডায়েরি বলে বলে, রাতশেষে
আকাশের নাভি, শস্যশ্রী মাঠ আর অনুরাগের চন্দনজল জড়িয়ে আছে মেয়েটিকে।
বালিকা, আমি তো তোমাকে চিনি না, আমার সেই বোধ নেই।
সমুদ্রকে বলেছি আমাকে একটু বোধ দেওয়ার জন্য!
নিছক, তোমার দৈনন্দিন উপন্যাসের পাতায় পাতায় হেঁটেছি শুধু রোজ!
এর একটি পাতারও পাঠোদ্ধার করতে পারিনি!
চাঁদের মতো সে-ই তো তোমাকে চিনে, যে জানে প্রদীপের খুঁজ।
বালিকা, তুমি আরও আরও দেবী হও!
আমার অস্থিসন্ধির গ্রন্থিতে গ্রন্থিতে জলরঙে আঁকবো তোমার ছবি,স্মৃতিবুননের।
প্রিজমের রঙ্গমঞ্চ
তোমার পৃথিবীটাই আমার পুরো পৃথিবী।
তোমার সম্মান, যশ, প্রতিপত্তি আর মেজাজেই লুকিয়ে আছে আমার সত্তা!
প্রিয়তমা—
তবু কেন তোমার রঙ্গমঞ্চের নৌকোয় হঠাৎ দেখলাম, কৃত্রিম রঙের সুড়ঙ্গ?
তুমি তার সাথে দৌড়াচ্ছ!
অনুরাগের রঙ্গমঞ্চটাই কি এরকম তাহলে?
তোমার রোদহীনতায় আমার সারাটা সত্তা বড় একা পড়ে আছে!
অলস দুপুরের মতো।
অথচ আমার বুকের ভিতর মল্লিকা আঁকছে তোমার সোহাগি মুখ!
অপার প্রসন্নতায় শুনছে তোমার কম্বুকণ্ঠী সুর।
মাঝে মাঝে খুব শুন্যতা অনুভব করি, ভীষণ শুন্যতা—
তোমার গল্পের, কবিতার, গানের; তোমার চিত্রকর্মের…
এই শূন্যতাগুলো আমার একাকীত্বকে বাড়িয়ে দেয়!
শূন্যতা যখন খুব বেশি অনুভূত হয়, তখন পাখিদের কাছে চলে যাই।
তাদের কাছে জানতে চাই শূন্যতার কারণ,তারা কোনো উত্তর দেয় না!
আমার এখন থাকার কোনো রকম নেই;
আছি ধূসর একরকম!
বিপ্রতীপ ঝড়ে ঝড়ে জীবনের স্রোতটাই বদলে গিয়েছে—
সকালের আলোবিধৌত রাঙা স্বপ্নগুলো বেমালুম লীন হয়েছে আঁধারে,
ড্রয়ারের নীল খামের চিঠিগুলো দিশেহারা নাবিকের মতো চেয়ে আছে আমার দিকে!
নির্জন দুপুরে আলো যখন উঠোনে রঙখেলে
তখন সাদা পায়রার দিকে তাকাই।
মনে হয় তারাও যেন আমার মতো ভুলপথে রঙ খেলছে!
টের পাই সারাঘরময় তোমার উপস্থিতি —
ঘরের ত্রিভুজাকৃতি কাচের প্রিজমটার দিকে তাকিয়ে তোমাকে অনুভব করি,
আলো ঢুকলে কতো বর্ণময় হত এটা!
অথচ এখন বর্ণহীন-রেখাহীন অন্ধের মতো পড়ে আছে!
আলোময় প্রিজমে যেমন তুমি—
তেমনি আলোহীন প্রিজমের ধবধবে কাচে নিজেকে খুঁজে পাই, অনেক-টা দুঃস্বপ্নের মতো!
বৃষ্টি-মেঘেরা, ঝরনা-নদীরাও কি ভুলে যায় পথ?
তোমার জীবনের-মনের বাঁক বদলের মতো
ঠাওর করতে পারিনি!!
আমার জীবনের গল্পে কখন যে সন্ধ্যা নামে…
শতক ও ভালোবাসা
তোমাকে আমি প্রেম দেবো
বুঝলে জবা—
গুচ্ছ গুচ্ছ ফুল দেবো, ফুলের সৌরভ দেবো, সোনায় মোড়া স্বপ্ন দেবো
পৃথিবীর সমস্ত মাতালকে বলবো তোমার জন্য গোলাপ নিয়ে আসতে।
তোমার চৌদিকে আদিম শব্দের কোনো জঞ্জাল থাকবে না
কলুষিত হৃদয় থাকবে না।
জং ধরা মন থাকবে না।
ফুলবতী গাছেরা শরতের ভোর পাখির মতো তোমার সামনে হাওয়ায় দুলবে।
কোনো অবগোলাপ থাকবে না
অবগোলাপ শুধু মায়াবী বৃত্তের জালে নক্ষত্রকে তটস্থ করে রাখে!
যখন-তখন নির্বান্ধব কর্পূরের মতো হাওয়ায় উড়ে
আবার নিমেষেই ঝরে পড়ে।
তোমাকে আমি প্রাণজ অনুভব দেবো
হলুদডোবা গোধূলি দেবো, কমলারঙা প্রত্যুষ দেবো, তমোহর রাত্রি দেবো
পৃথিবীর সমস্ত পলাতককে বলবো তোমার জন্য একটি পুষ্পিত পুকুর খনন করে দিতে।
যে সরোবরে তুমি স্নান করবে
পাড়ে বসে ড্যাবড্যাবে চোখে নবমীর চাঁদ দেখবে
এর সুবাসিত পুষ্পদল তোমাকে আমার সাথে প্রেমের বাহুডোরে বাঁধবে।
তোমার জন্য—
আমি বাতিল সব শব্দগুলোই ভুলে যাব।
অমেদুর, অসত্য, অশিষ্ট, অকল্যাণের শব্দমালা
তোমার পদ্মাবয়ব মুখের দিকে চেয়ে…
আমি তোমার ভালোবাসার পথিক হবো।
তোমার রূপ যৌবন, তোমার রূপে
আমার যাপিত আঁধার ভোর হবে।
আমি তোমার হৃদয়ে গড়বো অষ্টপ্রহরের একটি আনন্দসুন্দর গ্রাম।
তাকে সাজাবো রঙধনুর সাতরঙে পরতে পরতে গোলাপ দিয়ে
তার চতুর্দিকে থাকবে সুন্দরের বসতি,
ইচ্ছে, কল্পনা আর স্বপ্নের বসতি।
এর গোলাপি সুবাসে, আকাশে বাতাসে বইবে সত্যম-শুভমের হাতছানি।
শুধু তোমার একটি চুম্বন শতকের সাক্ষী হয়ে আমার কপোলে লেপটে থাক!