ফাহমিনা নূরের কবিতা
চোখ ভর্তি লবন
যদি মেলে ধরা হয়
পুরো শহর তখন দুলতে থাকে ;
বঙ্গোপসাগরের ঢেউয়ে আছড়ে পড়ে
দিনগত চিৎকার।
তার কি ক্ষোভ আছে?
অনাবাদী জমির মত চিরকালীন শোক?
উত্তরের হাওয়ার মত কনকনে ঠিকানা?
চোখজুড়ে ক্লান্তির ছাপ-
না আছে চাওয়া না বিভ্রমের ঘুম
তবু গণিত খাতা ভরে যায়।
অজস্র সংখ্যা নিয়ে একটা দ্বীপ জেগে ওঠে,
বলে-
জীবন শুধুই সংখ্যার সমষ্টি।
না যোগ না বিয়োগ,
সংখ্যা কেবল সংখ্যার ইতিবৃত্ত।
আলো শুধু আলোকায়ন নয়
আছে আঁধারের বাহানা,
বাহাই মন্দিরের মত নিশ্চুপ থাকা
ভেজা মুখ আয়নায় আরও ভিজে যায়।
একটা দরজা পেরিয়ে সাগরদাঁড়ি
ওপারে বিশাল মাঠ-
সকল কুশীলব খেলা শেষে
পালক শুকিয়ে নেবে বিকেলের রোদে।
কালো বাঘ
কালো বাঘ তুমি কালো বাঘ
পাতা মচমচ, ঘোর সঙ্কট;
বন কাঁপানো হুঙ্কার,
তুমি থাবার ভেতর হরিণ শাবকের
ত্রাহি ত্রাহি চিৎকার।
কালো বাঘ তুমি কালো বাঘ।
বুকের জমিনে শ্বাসমূল রোধী
মরা কটালের অভিশাপ
পাতা মরা গাছে আধেক কিরণ
চাঁদের ভেংচি, স্যাঁত স্যাঁতে নীল মেঘ।
মেঘের ভেতর কুন্ডুলি পাকানো
বনপোড়া অভিঘাত,
কালো বাঘ তুমি কালো বাঘ।
সাপের কোটরে
ঘুমিয়ে থাকা ধারালো মাঘ মাস,
তুমি ব্যাঙের সর্দি, অট্টহাসি,
মিথ্যা প্রেমের ইতিহাস।
পানিতে ভাসমান মৃত পানকৌড়ি
ছেঁড়া পালকের ফরিয়াদ
কালো বাঘ তুমি কালো বাঘ।
তুমি হাড়ের কাঁপন, ঘোলাটে পানি
ছাতি ফাটা পিপাসা
তুমি নৌকায় বেচা বেদে কিশোরীর
শোক,
ফসকে যাওয়া আশা।
তুমি শ্যালা নদীতে কুম্ভীরাশ্রু,
রাজগোখরার
নিউরোটক্সিক ফণা;
পদ্ম-পুকুরে হারিয়ে যাওয়া
হরিৎ পাখির ডিম, পাখির চোখেই
খুঁচিয়ে যাওয়া সূক্ষ্ম কাঁচের কণা।
তুমি নিষ্ঠুর, তুমি হিংস্র, তুমি করুণ
বিষাদময়
উতল হাওয়ায় দু’হাতে ওড়াও বিপুল
মৃত্যুভয়।
তুমি সংশয়,
তুমি মাধুকরী, সর্বহারা মউয়ালের গায়ে
বাঘের থাবার ছাপ।
তুমি অভিশাপ, তুমি অভিশাপ।
কালো বাঘ তুমি কালো বাঘ,
তুমি আঁধার কালো বাঘ।
জন্মবিরাগ
এক জন্মবিরাগ পকেটে নিয়ে
ঘুরছে কে এই কক্ষপথ ছেড়ে অজর বছর জুড়ে!
সুতীব্র ইচ্ছেগুলোর সাথে
মাঝে মাঝে ছূঁড়েছিলো বিরাগ কণা, অদূষ্য বাতাসে-
তারই একটা লুফে নিলো
সেই অলিক শিশু, জন্মের অধীনে যাকে গতকাল
খবরের পৃষ্ঠা সমেত, গোর দেবে না বলে রেখে গেল পথের ধারে-
কেঁদে ওঠে সে করুণ, ডেকে আনে কোন ব্রহ্মচারীকে!
আরেকটা কণা ছুঁড়ে দিয়েছিলো সেই কিশোরীকে-
সাততলা দালানের সফেদ ব্যালকনি থেকে
নেমে এলো যেন এক ভারহীন পাখি
লোফালুফিতে ছিলো তার অনীহা প্রবল
তাই সে ডানা মেলে
যেন মুক্ত বিহঙ্গম; ওড়না তার মলিন খলবল-
উড়ে গিয়ে জারুলের ডালে ফুল হয়ে ফুটে থাকে;
একটা কাঁচের গোলাপ
চৌচির হয়ে জমে ওঠে টলটলে মুমূর্ষু রক্তপুকুর-
যেন সেই পুকুরেই ডুবেছিলো সব ইচ্ছের ছায়ায়
তার মায়ার মুকুল!
বিরাগ ফিরে আসে তার চিরচেনা আপন ডেরায়
ধার করা বিষণ্ন দৃশ্যকে সাথী করে
বাতাসকে ডেকে নিলো বেহালার শোকার্ত সুর।
বিউগল বাজলে-
মনে হয় যাওয়ার সময় হয়েছে বুঝি, বোঝা যায় খুব
তাতে কিছু আসে যায় নাতো আর, কোনো অঙ্গীকার
বাজাবে না কেউ তূরীয় মাউথ অর্গান।
আসছে সময়গুলোতে নব নব ধারাপাতে-
নদীর পানি আরো নিটোল প্রবল স্রোতস্বিনী হবে কি!
বর্বূর গাছের ডালে ঝুলবে নাকি নিমের মত
সত্য কালের ফুল?
জন্মবিরাগ থেকে জন্ম নেবে কি
নব নব প্রশ্ন, কুশল হাকিকত অগণন ইতিহাস?
সফেদ পাখির ছানার মত হবে কি অন্তরে কোমল সংবেদন!
পাবে কি অপগম
ব্যথা ভোলানো জন্মস্বেদ, তৃষ্ণার জল ও রক্তপলাশ!