মজিদ মাহমুদের কবিতা
প্রমিথিউস
আমরা ছিলাম কবিতাতান্ত্রিক পরিবারের সন্তান
জলের যোনি থেকে উৎপন্ন হলেও
ক্যাসিওপিয়া আমার মা
ভূমিতে বিচরণশীল প্রাণীদের মধ্যে মানুষকেই
প্রথম বেছে নিয়েছিলাম
তখন হিমযুগ
পৃথিবীতে দারুণ শীত
মানুষ মাংসের ব্যবহার শেখেনি
সোনা মাছ তেরচা মাছ আর কাঁচা মাছ মাংস দিয়ে
উদর আর নাভিমূল পুরিয়েছে
মানুষ আজ যাকে সভ্যতা জানে
তার নাম আগুন
আমরা বাহাত্তর হাজার কোটি আলোকবর্ষ পেরিয়ে
যে অগ্নিতে সংস্থাপিত ঈশ্বর
যে আগুনে পুড়েছিল তুর
আমরা আমাদের সন্তানকে সেই আগুন চুরির
কৌশল শিখিয়েছিলাম
তিমির তেল থেকে নারী এস্কিমো এখনও যেভাবে
ধরে রাখে পিলসুজ
শরীরে শরীর ঘষে যে আগুন
সেসব তো অনেক পরের ঘটনা
আমরা মানুষের মধ্যে ঈশ্বর
ঈশ্বরের মধ্যে শয়তান
এবং শয়তানের মধ্যে যুক্তির
অবতারণা করেছি
হে বিশ্বকর্মা সয়ম্ভূ সেদিনের কথা স্মরণ কর
অলিম্পাস থেকে নেমে আসেন জিউস
হংসির উপর দেবতার আপতনকেও
আমরা লিপিবদ্ধ করেছি
তারপর একটি আ-াকে দু’ভাগ করে নিয়ে এসেছি
যুদ্ধের মোহন শরীর
মাংসের জন্য মানুষের যুদ্ধ
মাছের জন্য মানুষের যুদ্ধ
তার শরীরে আঁশ গন্ধ ছিল
আমরা শব্দকে কালো সুতা দিয়ে
তসবির দানার মতো গেঁথে তুলেছি
শব্দ মানে শব্দ-ব্রহ্ম সৃজন এবং ছেদন
যার একটি বৃহৎ রশি মানুষকে বাঁধতে বাঁধতে
গুহাঙ্কিত চিত্রলিপির মধ্যে পতিত হয়েছে
যখন বৃষ্টি ছিল
রামগিরি পর্বত ছিল
নির্বাসন দ- ছিল
কেবল ছিল না যক্ষের সর্বভুক বেদনার রূপ
আমরা জানতাম পাখির বিষ্ঠাপতনের শব্দ
মানুষকে আহ্লাদিত করে না
মাংস এবং গুহ্যের অধিক কিছু আবিষ্কার
করেছেন কবি।
সাব এডিটর
আমি কী তোমাকে চিনি!
যখন মাঝরাতে তোমার শরীর থেকে
খুলে পড়ে কোলাহল
তখন আমাদের অটোমোবাইল
খোড়া তৈমুরের অশ্বের মত
তোমার নাভিমূলে
রাজত্বের অধিকার করে পত্তন
দিবস আর রাত্রির মধ্যযামে তোমার শরীর ছেনে
জেগে ছিল যারা
তুমি এক মন্ত্রবলে তাদের ঘুমিয়ে দিয়ে
কেবল সম্রাটের প্রতীক্ষায়
জনশূন্য শরীর বিছিয়ে জেগে আছ
আর আমি ডায়ানার ছিনালি লীজ টেলরের
নিতম্বের অসুখ অনুবাদ করে কাহ্নের মত
তোমার শরীর স্পর্শ করে খটখট ছুটে চলেছি
এ কোন নিয়তির সঙ্গে আমাকে বেঁধেছ জোকাষ্ট
নাগকন্যার মত পুচ্ছে জড়াতে জড়াতে
তার চক্রের দিকে ঠেলে দিচ্ছ
তোমার আঁশটে শরীরে গলে পড়ছে চাঁদের মোম
আঠালো পদার্থে আটকে যাচোছ আমার পা
মাথার ওপর উড়ছে সাড়ে সাত’শ শকুন, তবু
তোমাকে পরিত্যাগ করার ব্যার্থ প্রচেষ্টার কথা ভাবি আমি
যে গ্রামে আমি জন্মেছিলাম
শরীরকে দু’ভাগ করে গোপনাঙ্গের মত
একটা নদী
আমাদের শৈশব করেছিল ধারণ
সেই নদীতে মুখ ধুয়ে চুল বাঁধত দেও কুমারী
জলের অভাবে কুমারীরা ধেয়ে আসছে তোমার দিকে
তুমি তাদের নীল দংশনে ঘুমিয়ে রেখে
কী মরণ খেলায় মেতেছ আমার সাথে
এই অসুখ এই রাত্রি
এক ঝাঁক কাকের কা কা ডেকে ওঠার আগে
আমার কোন পরিত্রাণ নেই
এখন আমার বিছানার ডানপাশে ঘুমায় কে বা
দরোজায় কড়া নাড়লেই একটি বিড়াল
সন্তর্পণে কার্নিশ বেয়ে উঠে আসে রোজ
আমি তার পরিত্যাক্ত লোমে ঘামের গন্ধে
দেহ রেখে তোমার পীড়নের ক্লান্তি ভুলি
আমাকে ঘুমিয়ে রেখে আবার কোলাহল তুলে নাও তুমি।
বনসাই
একে তুমি ভালোবাসা বলো
তোমার ভালোবাসার বিশাল হা এখনও
ধেয়ে আসছে আমার দিকে আর
আমি পশ্চাৎ হাঁটছি
পশ্চাৎ হেঁটে হেঁটে
পাইথনের গুহার মধ্যে পতিত হচ্ছি
দ্রুত নিচে নামছি
নিদান চিৎকারে বন্ধুদের দিকে বাড়িয়ে দিচ্ছি হাত
তবু তোমার ওই তৃষিত চোখ অজগরের নিঃশ্বাসের মতো
আমাকে টেনে নিচ্ছে
তুমি তাড়া করছ আমাকে এক অন্ধকার গহ্বরের দিকে কবিতা
আমি ছুটছি আমি ছুটছি লোকালয় থেকে লোকান্তরে
লোকে বলছে কবিতা তাড়িত যুবক
সম্ভবনাময় নষ্ট যুবক
তাহলে কি তুমি বেশ্যার সমান্তরালে হেঁটে যাও
আমাকে এমন অসহায় বিব্রত করে এ কেমন আনন্দ তোমার
অথচ তুমি বলছ, তুমি নাকি আমার শৈশব থেকে
আমার জননেন্দ্রিয়ের মধ্যে বেড়ে উঠেছ
আমার পতনে তাই তোমার মুক্তি
কিন্তু আমি জানি-সুদূর শৈশব থেকে আমার বর্ধিষ্ণু প্লাজমালেমা
তোমার মেয়োসিসের মধ্যে লুকিয়ে রেখেছ
আমার ত্রাণ নেই আমার পরিত্রাণ নেই
যমুনার ওপার থেকে পালিয়ে এসেছে যে যুবক
তুমি তার কতখানি জান
আমার কাছে তোমার কোন স্মৃতি নেই বিস্মৃতি নেই
তুমি অতীত ও ভবিষ্যৎহীন জন্মরহিত
তবু তুমি ষোলশ’ গোপিনীর মুখের অবয়ব নিয়ে
রাধার মতো আমাকে তাড়া করছ কবিতা
আমি ছুটছি আমি ছুটছি মানব থেকে মানবেতরে
১নং রাজউকের অন্ধকার সেরে
আমি যখন বেড়িয়ে পড়ি রাস্তায়
তুমি তখন নগর নটীর সঙ্গে হেঁটে আস আমার দিকে
আমি ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়াতে থাকি আমি পালাতে থাকি
তবু তোমাকে পীড়নের একটি মহৎ চিন্তা
আমার মস্তিষ্কে খেলতে থাকে
তোমার সঙ্গে সন্নিবিষ্ট হবার আগেই
তোমার সঙ্গে ঘনীভূত হবার আগেই
১৩৭ বাগান বাড়ির কোন এক বন্ধ দরোজার কপাট খুলে যায়
তুমি কপাটের পাশে দাঁড়িয়ে থাকো
এইভাবে তোমার দিন কাটে-প্রতিদিন কাটে
আমার শয়নকক্ষে অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয় না তোমার
তবু বারান্দার কোন এক টবের মধ্যে
বনসাই হয়ে
হনন বিরোধী হয়ে
তুমি আমার দৃষ্টির মধ্যে বেঁচে আছ কবিতা
আমি তোমার রেণুর মধ্যে জেগে আছি।
অব্যক্ত কান্নার গান
তোমরা কী সব কথা বলো!
আমার জানতে ইচ্ছে করে
তোমরা বলতে বলতে হাসো
হাসতে হাসতে পরস্পর কোলের পরে ঢলে পড়
তোমরা কী সব কথা বলো!
আমার কেবল জলপরী আর আকাশপরীর কথা মনে পড়ে
শুনেছি জোছনায় ভিজে ভিজে আকাশের পথে উড়ে আসে তারা
আসতে আসতে নিজেদের মধ্যে কী সব কথা বলে
কী সব কথা বলে তারা
জলের ঘাটলায় এসে খুলে ফেলে নিভাঁজ পোশাক
শুরু হয় ঝাপাই খেলা
তোমরাও খেল নাকি
একবার কোন এক ফাজিল যুবক নাকি করেছিল চুরি
পরীদের পরিত্যক্ত পোশাক
বুকের লজ্জা নিয়ে নিতম্বের লজ্জা নিয়ে তাই
জলের অপ্সরী রয়ে গেল জলে
আকাশপরীও উড়ল না আকাশে
এখনও রাত এলে জোছনায়
তাদের নগ্ন দেহের নৃত্যের ভাঁজে
কেঁপে ওঠে পুকুরের জল
দিন এলে পরীদের শব শাপলা হয়ে ফোটে
তোমরা কি সেই পরী-পুকুরের কথা বলো
বলতে বলতে হাস
হাসতে হাসতে কেঁদে ওঠো মানবিক ব্যথায়
আমার তো মনে হয় না তোমাদের সেই ব্যথা
কোনোদিন জানা হবে আমার!
জাতক
তোমাদের তো আগেই বলেছি, তখন আমি ছিলাম একটি পুচঁকে খরগোশ
আমার কান দু’টি কেবলই খাড়া হয়ে উঠছিল, আর
পেছনের পা মাটিতে সমান্তরাল রেখে আমার মা
শেখাচ্ছিলেন ছুটে চলার কৌশল
খরগোশদের সামনের পা ছোট হয় বলে তখন আমার কী যে আক্ষেপ
মা বলতেন মানুষের তো দু’টি পা-ই নেই
ওদের বাচ্চারা দু’পায়েই দেখ কেমন লাফিয়ে চলে
তারপর একদিন একটি শেয়াল সত্যিই আমাকে
তাড়াতে তাড়াতে লোকালয়ের মধ্য দিয়ে
একটি বেগুন ক্ষেত পার করে দিল
আমার পায়ের যন্ত্রণা মাংসের স্বাদ
সে সব এখন আর মনে নেই
কেবল মনে আছে
ঘাসের নরম ডগা নিয়ে ফিরে আসতেন মা, আর
মাটির বিছানায় শুয়ে আমার সহোদর মায়ের উদোরে
আদর ঘষে খুটে খেত ঘাসের ডগা।
অন্ধকার
সব পথ এক পথ হয়ে অন্ধকার রাত্রিতে গেছে মিশে
অন্ধকার এক সর্বগ্রাসী পথের নাম; যে পথ চলে গেছে সমুদ্রের দিকে
নীল জলের তুমুল আলোড়ন আমাকে ডাকে
আমি জলের নূপুর পরে তাতা থৈথৈ অন্ধকারের যোনির দিকে এগুতে থাকি
জানি, আজ আলো সব ভালো নয়, আলো শ্রেণী-বৈষম্যের প্রতীক
আলোর শরীর ধবল কুষ্ঠ, আলোর শরীর কৃষ্ণময়
আলোর মধ্যে অনেক পথ ও মতের সংঘাত
আমার পশ্চিম ডুবে গেছে অন্ধকারে, আমার বকুলতলায় কালো পাইথন
ভুলে গেছি সিনাগগ কোন দিকে ছিল
অভ্যাসবশত কিছুক্ষণ ছুটাছুটি করে অক্ষবিন্দুর মতো দাঁড়িয়ে থাকি
এইভাবে কতকাল দাঁড়িয়ে আছি বোধিকল্পদ্রুম
অন্ধকারের শিকড় আমাকে আঁকড়ে ধরেছে কেমন
মোসেজের ঈশ্বর ছিলেন আলোর প্রতীক আর
আমার কাছে ঈশ্বর এসেছেন অন্ধকারের কালো বিন্দুর মতো
আমাকে না হয় অন্ধকার নবী বলেই ডাকো।