প্রবীর রঞ্জন মণ্ডলের কবিতা
দুঃসময়
দুদণ্ড সময় কাটাই ঘরে বসে শুয়ে
লাঙলের তীক্ষ্ণফলা রাখি বালিশের নীচে,
এখনতো এসেগেছে ওস্তাদ মেশিন!
ভোর ভোর যাওয়া নেই মাঠ চেরার আনন্দে
বীজতলা সব সবুজ কার্পেটের মতো হাতের তালু
আলুথালু জলকাদা ঘুঘুচরা মাঠের বুকে।
শুঁকে শুঁকে গোয়ালগুলো হয়েছে খালি
চারিদিকে তালিমারা ছোট ছোট সংসার।
কার আল কোনদিকে বিষধর হয়ে বেঁকে আছে
ছোবলেও মাঝে মাঝে রক্ত বিষ ঝরে।
গুলান আর দাদনে কত হয় ঠাসাঠাসি
ফাঁসাফাঁসি হয়না যে তা এমন নয় ;
অবশেষে সোনার সন্তান পেতে
বিপুল খাদ্যের আয়োজন সারামাঠ জুড়ে।
কেউ কারও ভুরিভোজে নেয় না খোঁজ
কারও ডোজ কমবেশি হলে পগারপার ;
কেউবা এসপার ওসপার কপাল জিতে
করে বাজিমাত,হয় সুপ্রভাত
কারও কারও দীর্ঘশ্বাস পড়ে
পৌষের গোবর নিকান উঠোন জুড়ে
উড়ে আসে নবান্নের ধানক্ষেত বুভুক্ষু বুকে নিয়ে।
পরবাসে প্রতীক্ষায়
বিচ্ছিন্ন এক দ্বীপের উপর
খেলে যাচ্ছে অজস্র ঢেউ
মাঝে মাঝে খড়কুটোর মতো গুঁজে
দিয়ে যাচ্ছে প্রতিক্ষিত ঊর্মিমালা
সাম্রাজ্য লুন্ঠনকারীর লুন্ঠিত পড়ে যাওয়া বস্তুর মতোই
চিকচিক করছে তা।
আমিও পরবাসে পড়ে থাকা
লুন্ঠিত বস্তুর মতোই পড়ে আছি
আমার দেশ কাল বাবা মা স্বজন ভুলে।
আমার বুকের উপর বেদনার ঢেউ
স্মৃতিপথে ফেলে রাখছে টুকরো টুকরো অজস্র স্মৃতি।
বিস্মৃত প্রায় হয়ে বন্ধী আছি মৃতপ্রায়।
কবে যে কোন জাদুর ছোঁয়ায়
প্রলম্বিত ঢেউ এসে ভাসাবে আবার
সেই অপেক্ষায় অপেক্ষায় দিন গুনছি।
নাহলে নিরুপায় এক মণিমুক্তো হয়ে
মৃতবৎ ঝুলে থাকব
আপাত বিচ্ছিন্ন এই দ্বীপের গলায়।
আবার কোন প্রলয়ঙ্কর তুফানের
শব্দ শুনবো নীরব কান্নায়
তাই শঙ্কায় প্রহর গুনছি!
ঢেকুর
কয়েকফোটা রোদ্দুর গলে পড়ল
দক্ষিণের উঠোন টপকে আমার বারান্দায়
হ্যালহেলে চোখের বিড়ালটা সবে কুন্ডলী খুললো
রাতের অভুক্ততা ওর চোখে মুখে
উপোস হাঁড়ির তলায় কতকাল আগুন ছোঁয়নি!
আমি এক বারাঙ্গনা যেন
খাদ্যের বিনিময়ে দেহ দিতে পারি তোমার জিম্মায়;
সীমাহীন খিদের জ্বালায় একে অপরের শরীর গিলছিলাম।
দুজনের চোখও ছিল রোদের কণায়
চিকচিক করে ওঠে সজল চারটি চোখ
রোদ্দুর শুঁকতে শুঁকতে এগিয়ে গেলাম বারান্দায়।
ফ্যানঝরা ভাতের গন্ধে ভরে গেল বুক
আমি উন্মুখ হয়ে দেখলাম মাঠের ফসল
উপোস হাঁড়িকে নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে
আমাদের খাদ্য হয়ে ঊনানে চড়বে বলে।
ভাত,ওরে আমার গরম ভাত
আয় কাছে আয় একটু চেখে দেখি
গলাগলি করে উগরে তুলি ঢেকুর।