হরিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিতা
একান্নবর্তী পরিবার
আয়নার ভেতর চোখ পড়তেই দেখি
একটা চোখ পুড়ে গেল
আর একটা চোখের সঙ্গে গলা মেলালো
প্রায় এক হাজার মানুষের গলা
গত বর্ষায় যারা ছাদ হারিয়েছে
গাছের নিচে বছর কাটিয়ে তারা হাত তুলতে শিখেছে
সমুদ্রের হাওয়ার মতো ভেসে এলো একটা কোলাহল
কোথাও যেন কেউ ঘা খুঁটছে
ওপরের চামড়ার পর্দা সরে যেতেই
প্রবল বেগে বেরিয়ে এলো রক্ত
আমারই দেহের ভেতর থেকে উঠে আসা হাওয়া
তবুও তাদের উৎসপথ না চেনায় বড় অচেনা
বৃষ্টিফোঁটার মতো একে একে জড়ো হয়
হারানো সবুজ ফিরিয়ে আনা পাতার বন্ধু শাসক
সূর্য এখন প্রাত্যহিক পাঠশালার মাথার ওপর
গরম শুরু হয়ে গেছে শেকড়ে শেকড়ে
বিন্দু বিন্দু চাল সিন্ধুর ফুটন্ত জলে এসে পড়ে
একটু হাত পা নাড়াচাড়া করলেই দেখা যাবে
হাঁড়ির মুখে ভাতের ফ্যানের মিছিল
বটপাতার নিচে খেতে বসবে একান্নবর্তী পরিবার ।
বাসস্টপে বৃষ্টি
বাসস্টপে বৃষ্টি হলেই প্রতিটা ঘর আর্দ্র
রোদে জলে সারা ঘর ছাওয়া ছিল
মাটি থেকে উঠে এসেছিল একঘর নদী
এসবই তো দেখেছি চোখ খোলা থেকে
সময় দিলেই সারি সারি বসে থাকে মুখ
পুরোনো গাছের বৃষ্টির মতো ধরে আছে আলো
চোখ নেই হাত বেড়ে যায়
ছুঁয়ে ফেলে যার তার ঠোঁট
কে বোঝাবে তাকে আলো দিলেই গাওয়া যায় গান
বাকি সব কথা কথা শুয়ে থাকে একা পথে দূরে
স্বাধীন শিক্ষার মতো বেড়ে যায় ডালপালা
ধরতেই হয় কোনো পথ
না জড়ালে কবে হবে নদী…
এই পথে যারা হেঁটে যায় তারা সব চকচকে দেশ
মনে নয়, শরীরে শরীরে সব বেড়ে যায় মূল
ঘরের গুমোট কাটে
দুপুরের ছাদে এসে বিকেল গড়িয়ে সব পড়ে
গাছের চোখের মতো আকাশের পথে পথে পা
জানলার কাছে গিয়ে চোখে পড়ে
যোগের খাতায় আজ সংখ্যারা উঁকি ঝুঁকি দেয়
বোঝা যায় দূর দেশে ধরেছে আলাপ ফোঁটা ফোঁটা জল ।
গাছের ছায়ায়
গাছের ছায়ায় যতটুকু আলো হয়ে থাকে
ততটুকুই আমাদের পরিবার
আমরা ঘিরে থাকি ছায়ার শরীর
গতকাল অন্যমনস্কতায় যে বিকেল চলে গেছে
তার নাম আজ আর মনে নেই
গাছের পাতাকে ভুলিয়ে দিয়েছিল যে সময়
তাকে আর স্মরণে এনে
মনে হিজিবিজি রেখার দাগ টানবো না আর
মনে হয় আমাদের হাত শিথিল হয়ে এলে
ছায়ার শরীর আরও গভীর হবে
সবুজের গন্ধে নাক ডোবালে ভেসে আসবে
যাবতীয় অসমাপ্ত সমীকরণের তীক্ষ্ম নখাগ্র
দিগন্ত বিস্তৃত সবুজের ক্যানভাসে
সে সব মিলে যাবে এক বিন্দুতে এসে ।
মাটির দিনের গল্প
এইমুহূর্তে পৃথিবীর কোনো স্কুলে
মাটির দিনের গল্প হচ্ছে
ঘরের যত আরশোলা মাছি
দমবন্ধের পরিবেশের সমীকরণে
পা মেলাতে কেমন যেন অস্থির হয়ে ওঠে
জানলা দরজা বন্ধ হয়ে গেলে
মাটির দিনে বন্যা নামে
আজকের অপলকা পায়ের পৃথিবী
বন্যার জলে গুলে যায়
কেউ একজন হাত তুলতে নদী বাঁক নেয়
দাদুর গল্পের চরিত্ররা
মাটির দিনের গল্পে হেঁটে যায়
অনেকেরই মনে পড়ে যায়
কেউ যেন তাদের গল্পে
এইসব লোকেদের ঘর বানিয়ে দিয়েছিল
ডাকলেই তারা ফিরে চাইবে
কিন্তু কি হবে তাদের ডাকনাম—
এসব ভাবতে ভাবতে তারা
আরও অনেকটা এগিয়ে যায়
কেউ কেউ অন্য মুখে
অন্য গল্পের ঘরে ঢুকে পড়ে
আগুন ডাকতে জানে না বলে
পৃথিবীতে অন্ধকার নামে ।
বিষন্ন বিকেলে
মানুষের গন্ধ নিয়ে যে জাহাজটা
ভেসে গেছে গত মাসের এক বিষণ্ণ বিকেলে
সে জাহাজের ছায়া আছে লেগে
দুপুরের জানলা থেকে যার রোদ এখনও শুকিয়ে যায়নি
এই তো সেদিনও বন্দর জুড়ে দারুণ কোলাহল
মাথা গুনে যারা দেবে জাহাজেতে টান
তারা সব দাঁড়িয়ে থাকে হলুদ বিকেল খেতে
দুপুরের রোদে যারা চরতে বেড়িয়েছিল
তাদের বেশ কিছু মুখ গেয়ে উঠেছিল গান
দুপুরের নামতা মুখস্থ করে তারাও
হলুদ বিকেল গায়ে মাখতে পেরেছিল
ঠিক গান নয়
সুরের সূচ অনভ্যস্ত গলায় এসে বিঁধেছিল
তারাও সব দলবেঁধে উঠেছিল জাহাজে
বটপাতায় এখন সন্ধের ঘর
নক্ষত্রের প্রদীপ বাতির মতো একাকী দাঁড়িয়ে থাকে
হাতে গোনা দু’একজন আকাশে মুখ রাখে
পান করে নেবে জলময় মেঘ
এইভাবেই বটপাতা ভোর থেকে বাসা-গান গেয়ে নেবে
পৃথিবীর মাটিতে মাটিতে ।