মাহবুবা ফারুকের কবিতা
চাঁদ
তারা ভরা রাতে,মা আকাশের দিকে তাকিয়ে
আমাকে বলতো, দেখ এতো তারা থাকার পরও
আকাশের আঁধার কাটেনি—
একটা চাঁদ দরকার।
নাম
মাকে কখনো জিজ্ঞেস করিনি
কোনোদিন বাবা নাম ধরে
ডেকেছিল কিনা। কখনো বাবাকে
মায়ের নাম ধরে ডাকতে শুনিনি।
পাছে কেউ শুনে ফেলে।
‘ফাতেমা , ফাতেমা’ এভাবে ডাকলে
না জানি কত মিষ্টি শোনাতো বাবার কণ্ঠ।
না জানি কত সূর্যমুখী ফুটতো
আমার অল্পে সুখি মায়ের চেহারায়।
ঠিক এমনি আমার নানি, দাদিদের কোনো নাম ছিল না।
তাদের ডাকা হত ‘অমুকের মা’ নামে।
বিয়ের সাথে সাথেই এই মেয়েরা
তাদের নাম হারিয়ে ফেলেছিল।
সেই সময় অনেক মেয়েদেরই এভাবে নাম হারিয়ে যেতো।
কোনো সার্টিফিকেট, চাকুরি, নিজস্ব পরিচয় অর্জন হতো না।
যৎসামান্য বাংলা আর ধর্মীয় শিক্ষাই যথেষ্ট ছিল।
তারচেয়ে বেশি দরকার ঘরকন্যা, সহনশীলতা।
বিয়ের কাবিন নামা কিংবা তালাকের অধিকার—
তা-ও তাদের হতো না।
অন্তঃপুরে অন্তরীন সাম্রাজ্যটুকুই
তাদের ভাবনা চিন্তা ছিল, স্বপ্ন দেখারও ছিল না সাহস।
অথচ তারা বুনে যেত সূর্যের বীজ।
ভোরের জানালার গল্প বলতো সন্তানদের।
সুখ-দুঃখ সেলাই করতে করতে বারবার ছিঁড়ে যেত ধৈর্য সুতো,
তবু মা বুনে সন্তানের জন্যে সুখের আতশবাজি স্বপ্ন- পোশাক।
ভবিষ্যতের সিন্দুকে গচ্ছিত রাখে ইচ্ছে দলিল
নির্বাচিত উত্তরাধিকারীর সংগ্রামে।
মা সারাক্ষণ রানী ভবানী, বেগম রোকেয়া, প্রীতিলতা।
মায়ের আলাদা কোনো নাম লাগে না।
‘মা’ নামেই পৃথিবীর সকল সন্তানের কাছে
মা মশাল, ভোরের সূর্য, শান্তির দূত, হেরা পর্বত।
অনুচ্চারিত নাম হয়েও প্রবল প্রতাপশালী।
একবার বললে ধ্বনিত হতে থাকে কানের দেয়ালে দেয়ালে,
মনের হাজারদুয়ারি ঘরে, মুখ থেকে বের হয় কবিতার মতো।
মনে মনে বলি যখন ‘ফাতেমা’ আমার মায়ের নাম।
বেহেশতি শান্তি যেন আসে প্রানের বাগান জুড়ে।