ড. সেকেন্দার আলি সেখের কবিতা
চিরহরিৎ ভালোবাসা
নাটকের সংলাপ শুরুর আগে তার রূপে
মুগ্ধ দর্শকের মতো চোখ সরাতে পারিনি
মুখের উপর উড়ন্ত অগোছালো চুল
চুপি চুপি কথা বলেছিল মনের অজান্তে
হৃদয়ের সঙ্গে সেই-ই প্রথম পরিচয় l
পরিচয়ের সম্পর্ক ছিল না l তবুও বাঁধন ছিল দৃঢ়
শক্ত দেহলির আবরণ ছুঁয়ে…..
মুঠো মুঠো ফুল উড়িয়ে দিয়েছিলাম বাতাসে
এমন ভাবেই সাত-রঙে রাঙা হয়ে উঠেছিল সেদিন
কুমারী সূর্যের আলোয় নদীতে নেমেছিল তুফান l
সূর্য বন্দনার মন্ত্র ধ্বনিত হয়েছিল —
নির্জন বনানীর গোপন ছায়ায় নিবিড় নিঃশ্বাসে
সেই ভালোবাসা ছুঁয়ে —
অরণ্যের চিরহরিৎ রূপ দেখেছি
রাতভোর পাগল করে দিয়েছিল মূক অভিনয় l
সেই মায়াবী রূপ, সেই পাগল করা রঙ
মনেতে আগুন জ্বালিয়েছিল
নিস্তব্ধ সন্ধ্যাতারা হয়ে সারা রাত
অনুভব করেছিলাম হৃদয়ের বহমান রক্তশিরায়
নদীতে উঠেছিল নাম না জানা এক পাগলা স্রোত l
স্বপ্নের শেষ অঙ্কে
তার সোনালি চোখে ছিল আবৃত্তির ভাষা
দেহলির খাঁজে ছিল অজন্তার কারুকাজ
রাজহংসীর গ্রীবাতে ছিল বসন্ত বন্দনার ডাক
সেই নীল চোখের স্বপ্নে রাতের পলাতক ঘুম
হাজার চেষ্টা করেও সম্মানের ভয়ে…
বাড়ির চৌকাঠ কোনোদিনও পার হতে পারেনি l
ঘুমহীন চোখে সারাদিন অনুভব করতাম হাতছানি
ছুটে যেতাম স্কুলের কাছে —
এক মুঠো স্নিগ্ধ আলোয় স্নানটা সেরে ছুটন্ত ঘোড়া কে
বেঁধে রাখতে পারিনি বাড়ির পাশে শিমুল তলায়
পরাজয়ের গ্লানি মাখতে মাখতে…
দূর আকাশে তাকাতে – তাকাতে নেমে আসে সন্ধ্যা l
রাতে পাগল নদী নেমে যেত স্রোতমুখে
ভগীরথের মতো গঙ্গাকে মাটির বুকে নামাতে পারিনি
তরঙ্গের প্রবাহে সাঁতার কাটা হয়নি আজও
দীর্ঘ পরিক্রমার পর আকাশ পাখিটা
মুখ থুবড়ে বিষন্ন মনে আকাশের বুকে……
এঁকে দেয় দীর্ঘ পরাজয়ের পর যন্ত্রণার দিনলিপি l
প্রতীক্ষার দিনলিপি
তিল তিল করে পাহাড়ের সব শৌর্য জানিনা কবে মনের টানে
নেমে এসেছিল মাটির কাছে পাদদেশে l আমার উদোম বুকের খুব কাছে ডেকে উঠেছিল নাম না জানা সোহাগী পাখি l সেই ডাকে মানুষের ঘামে আর শক্ত প্রত্যয়ে ভিজেছিল সারা বুক l
ভিজেছিল উৎস -মুখ l জলের শব্দ কাছাকাছি নয় l সেই শব্দ ধ্বনিত হয়েছিল দূর চেরাপুঞ্জিতে l
জলের শব্দে ভেজেনি প্রাণ মন l সারা গায়ে মাখতে পারিনি ঠান্ডা প্রবাহ l আকাশে তাকিয়ে দেখি মেঘবালিকা আমার বুকের অনেক দূরে উড়ে গেছে l আমি বসে আছি নির্জনে একমনে l ভাঙা মন্দিরে বাজেনি কাঁসর ঘন্টা l আমি যেন মন্দিরের বিরাট লম্বা লাইনের প্রান্তে প্রসাদ প্রতাশায় দাঁড়িয়ে l
প্রতীক্ষার দিনলিপি মাড়াতে মাড়াতে চোখে নেমে আসে প্রবাহ l চোখের কোণ বেয়ে নেমে আসা ঠান্ডা বৃষ্টিতে সব ইচ্ছারা শিথিল হয়ে পড়ে l কোনদিন শুনতে পাইনি বাতাসের ডাক l শুনতে পাইনি হৃদয়ের ইচ্ছা l এক পলকের জন্য ভালোবাসার
ডাক l পাহাড় নুয়ে পড়ে মাটিতে l প্রকৃতি তবুও দাঁড়িয়ে থাকে গর্বিত পদক্ষেপে l বৃষ্টিহীন প্রদেশে পাথরটা আরও শক্ত পাথর হয়ে পড়ে থাকে l বিবাগী পাথরের মতো ধূসরপ্রান্তে বসে আমি লিখে যাই পাগল চাতকের ডাকে বিষন্নতার করুণ দিনলিপি l
রুক্ষ মাটির নির্জন ভালোবাসা
ভালোবাসা তবুও বেঁচে আছে বুকের কাছে
রুক্ষ মাটির তাল গাছটার মতো দাঁড়িয়ে আছে একা l
একাই বিজন প্রান্তরের নির্জনে মনের সাথে কথা বলাবলি করে l কেটে যায় প্রহর l কেটে যায় যৌবনের পল l ফলে বাতাসে শুকিয়ে যায়— ভালোবাসার কোমল পাপড়ি l অনেকদিন না চলা পথ অপরিচিতের মতো হারিয়ে যায় l ঠিক তখনই নতুন ফুলের হাসিতে সেজে ওঠে দিগন্ত l সেই দিগন্তের ডাকে কুমারী মাটির মতো কেঁদে ওঠে মন ও বিবাগী হৃদয় l
ভালোবাসা তবুও নাড়া দেয় হৃদয়ের ভাষাকে l চোখের বৃষ্টি যখন দু’চোখ ভাসিয়ে দেয়, ঠিক তখনই সুন্দরীর আবেগ বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ে দূর পাহাড়ে, বনে, সাগর পারের শহরে l বৃষ্টির আশায় চাষিরা যেভাবে প্রহর গোনে, ঠিক তেমনই আমি প্রহর গুনে গুনে ক্লান্ত চোখে বিষন্ন আকাশ দেখে অবাক হয়ে উঠি l রুক্ষ মাটির ভিতর যে প্রাণ আছে, রস আছে– তার খোঁজ রাখে না বসন্ত বাতাস l তালগাছ দাঁড়িয়ে থাকে বৃষ্টির জন্য l দিন গুনতে গুনতে আজও কেউ শোনায়নি বর্ষার পদধ্বনি l