সোমনাথ রায়ের কবিতা

সোমনাথ রায়ের কবিতা

খনি শহরের মুখ

খনি শহরের গর্ভে আমি পেয়ে গেলাম অদ্ভুত কিছু মুখ
খোলস ফাটিয়ে যারা প্রকৃতির মুখোমুখি করেছে নিজেকে।
নিজেও খেয়েছে আর খাবার হয়েছে লালসাকে কাছে ডেকে
যা সুপ্ত, নিষিদ্ধ বলে দূরে ঠেলে অন্ধকারে সখের ভিক্ষুক
হয়ে কাটাবে না, বরং দর্পণে মিলিয়ে নেবে, নিজের অসুখ
নির্ণয়ে নির্লজ্জ হতে পারার আনন্দে উচ্ছ্বসিত হতে দেখে
আমিও নিজের জামা খুলে ফেলে টাঙিয়েছি হ্যাঙারে পেরেকে।
সুরঙ্গের ঘষা খেয়ে যে বাতাস আসে, তাকে বুঝি সর্বভুক।

সীমান্তের ওপরে যখন উঠে একা একা ঘোরাঘুরি করি
কবন্ধের বিবর্ণ ছায়ারা পাশ দিয়ে যায় খোঁড়াতে খোঁড়াতে।
তখনই আশ্চর্য এক অস্তিময় আশ্বাসের ঝলসানো শর্বরী
আমাকে নিশানা করে, আমিও আজানু বিদ্ধ হতে চাই তাতে।
আমার আহত কিংবা মৃত খিদেগুলো নড়াচড়া করে ওঠে
বুঝি, খনি শহরের মুখে বাঁক পাবে আজ, যে পথ কর্কটে।

কবিতা

মৃত্যুর ওপিঠ থেকে বেঁচে ফিরে আসি কবিতায়।
এখানে দুঃখেরা ক্ষমা প্রার্থী হয় অক্ষরের কাছে
শব্দ বুনে বুনে পাপ স্খলনের অনুশোচনায়
নিজেকে আনত করি, দগ্ধ হই অনুতাপ-আঁচে।
আবার দ্বিচারিতাকে কষাঘাত করে গর্জে উঠি—
তোয়াক্কা করি না, কাটা যেতে দেখি তালিকায় নাম।
পাঁজরে গভীর গর্ত করে পুঁতি বিশ্বাসের খুঁটি
কবিতা লিখেই মুছি যাবতীয় দুর্বল দুর্নাম।

অসুখে ওষুধ আর পথ্য হয়ে চিত্রকল্প যত
আমাকে পুনর্জীবিত করে, শক্তি দেয় সাঁতারের
অসংখ্য শোকের মাঝে খুলে দেয় বিস্মৃতির পথও
কবিতা উড়িয়ে দেয় অবসাদ ভারি পাথরের।
প্রকৃত কবিতা হতে নারী কিংবা পুরুষ পারে না—
আমার পথের আগে পিছে থাকে সে, পথ ছাড়ে না।

অতিষ্ট সময়

ঘুম নেই, ভাঙনের শব্দে কাঁপে ঘুমের বিছানা
দুরন্ত ইতিহাসের পাতা একে একে খসে পড়ে।
অস্থির হৃদয়ে আমি তাদের কুড়িয়ে বদ্ধ ঘরে
জমা করি, কৌটোর ভেতরে বাজে দুআনা-চারআনা।
ষোলআনা ধ্বংসের আনন্দে ছোটে ইঁদুরের ছানা
বিড়ালের বাড়ান গলায় ঘন্টা বেঁধে উচ্চস্বরে
তালিবানি আত্মপ্রকাশের তীব্র মহড়ায়, ঝড়ে
লুটোচ্ছে স্থাপত্য-মূর্তি; উল্লসিত অন্ধের সীমানা।

অচেনা ভারতবর্ষ হারিয়েছে সহিষ্ণুতা বোধ।
অস্তিত্ব লুণ্ঠন কিংবা ধর্ষণ অথবা আত্মসাতে
নির্মম পতাকা ঢেকে দেয় ক্ষমতার ক্রুদ্ধ হাতে
শতপুষ্প বিকাশের যাবতীয় বাতাস ও রোদ।
অতিষ্ট সময়, তুমি আর কতদিন অন্ধকারে
প্রহর গোনাবে এই অসম্মানে, আতঙ্কে, ভাগাড়ে!

রূপান্তরকামী

বাবার ঔরসে, একই মাতৃগর্ভ থেকে জন্ম নেওয়া সন্তান
তিন প্রকৃতির। কেউ ভাই, কেউ বোন, কেউ নির্ধারিত নয়।
আদমের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য যে ইভের প্রয়োজন হয়
সে দ্বিতীয় প্রকৃতি। পুরুষ, জন্ম থেকেই প্রথম, অসমান।
আদিম অতীত থেকে প্রবাহিত— কে যন্ত্র! কে যন্ত্রী! যুযুধান
রহস্যের দুটি অস্ত্র থেকে রণক্ষেত্রে নামে নিরস্ত্র বিস্ময়
তৃতীয় প্রকৃতি, তার শরীর ও মনের বিচ্যুত সমন্বয়—
সে কী! সহদর নাকি সহদরা, জানে না কৃপণ অভিধান!

বয়স বেড়েছে এই পৃথিবীর, মেনে নিচ্ছে মেধার শাসন।
উন্নত প্রযুক্তি-পথে, বিত্তের প্রাচুর্যে হয়েছে রূপান্তরিত
কেউ কেউ মানবের শরীরে মানবী হতে। আর অশিক্ষিত
আলোনা পান্তায় যারা প্রান্তিক, পারিবারিক ঘৃণার আসন
যাদের, বসন্ত বর্ষা সমান, অন্ধের ইশারায় অনুগামী
কখনও জানে না তারা, খায় না মাথায় মাখে রূপান্তরকামী!