মামুন সুলতানের কবিতা

মামুন সুলতানের কবিতা

হে পৃথিবী মনে রেখো

এই পৃথিবী আমার এমন কথা বলিনি কখনও
পৃথিবী আমার নয় এমন দলিলও লেখেনি কেউ

হেঁটে যেতে যেতে যতদূর যাই পৃথিবী আমার সঙ্গী
নদী সাগর মোহনা পাহাড় অরণ্য যা কিছু দেখি
অপরূপ অবয়বে চোখে ভাসে নতুন ফটোগ্রাফ
ঝুলানো উপমায় তলিয়ে যাই নিজস্ব নিসর্গে

মরুচরের বালুকদানার মতো খুবই ক্ষুদ্র আমি
ওহ কী যে অসহায় কত বেমানান এই জগতে
পৃথিবীর ঘ্রাণ শোঁকে ভেসে যাই এপার ওপার
ক্ষুদ্র অতি তবু ভাবি আমি-ই রাজ মহারাজ!

মানুষ আর পৃথিবী তুমি আর আমি যেমন
ধরো বুকে বুক রেখে শুয়ে থাকি আপনে আপন
হে পৃথিবী মনে রেখো আমিও এসেছিলাম এখানে
তোমার গতরে গেঁথে গেলাম আক্ষরিক অলঙ্কার।

দখল

তোমার অন্তরে বুঝি এতটুকু গুহা নেই
যেখানে লাল অক্ষরে লেখা যাবে আমার নাম
গুহার দেয়ালে বুঝি এইটুকু শূন্যতা নেই
যেখানে ঝুলানো যাবে ছোট্ট এই নামলিপি

আজকাল সবকিছুই দখলে চলে গেছে
চাঁদের জোনাকি থেকে সমুদ্র ঢেউ
বাজারের কোলাহল অলিগলি বিপণীবিতান
দখলে নিয়েছে আজ তোমার হৃদয় ভাবনা

তোমার হৃদয়ে আমি
এতকাল চলমান স্রোত হয়ে ভেসেছি
সেই স্রোতে ভাসে আজ হানাদার প্রেমিক প্রবীর

তুমিও খুব শিখে গেছো এ যুগের ভাষা
চোখের চশম খুলে হয়ে গেছো হাইহিল অভিজাত নারী
বুকের ভেতরে তাই গেঁথে গেছে প্রেমের পেরেক

তোমার হদয়ে আমি নেই
পেরেকে বিক্ষত হলো নিদাগ মনের সরপুঁটি দেহ
এক্ষণে বুঝেছি হায় দখল হয়েছে তোমারও মন।

তালা

সকল দরোজা বন্ধ
স্বপ্ন দেখার চোখও অন্ধ হয়ে আছে
তালা ঝুলানো বাড়িতে দাঁড়িয়ে ভিক্ষা চাইবো কার কাছে?

বাড়ন্ত মেয়ের জন্য মায়ের দল শংকাশ্রমে বন্দি
পিতা পিতৃব্যের হাতে সঁপে দিয়েছে মেয়ের স্বপ্ন
মেয়ে তার স্বপ্নতারা বেণির বেদিতে বেঁধে রাখে
কবরের মতো ঘরে ঘড়ির কাঁটা কেবল ঘোরে…

বাড়ন্ত ছেলের হাতে স্বপ্নহীন ঘড়ি চলতে থাকে
মনের কাঁটা ঘোরে না কেবল নিকোটিনের দাগ
তার সামনে শুয়ে আছে অনিশ্চিত বাংলাদেশ
সগর্বে দাঁড়াবে সেই সাহস সেই সত্য সে জানে না।

বন্ধ্যা সময়ে দাঁড়িয়ে দেখি সব আন্ধা হয়ে গেছে
চুয়াল্লিশ ধারার যুগে সব কণ্ঠ নীল হয়ে গেছে

মেট্রোবাড়ির আঙ্গুর জিহ্বা পর্যন্ত আর পৌঁছে না
ডাকঘরে আর আসে না সুসংবাদের খাম

তালা ঝুলিয়ে দিয়েছি স্বপ্নদেখার ঘরে
যদি পারো খুলতে এসো সতেরো কোটির মন।

কোন পথ খোলা নেই

স্বজাতি স্বগোত্র কিংবা স্বদেশ স্বভূমি নিয়ে
রাতের নিশিতে ভাবি অন্ধকারে মিশে যাই
আমি আর অন্ধকার মিলে হয়ে যাই বৃক্ষচর

নিজেকে হারিয়ে ফেলি ফেলে আসা পথের মতোন
বুনোবৃষ্টির মতোন অনর্থক ঝরে পড়ি ভূয়সী বটে

কোন পথ খোলা নেই
দ্বারবান দাঁড়িয়ে থাকে ভেতরের পাহারায়
ভেতর বাড়িতে যারা-
তারাও আটকে আছে অদেখা অন্ধকারে

দাঁড়ায় না এখন কেউ তেতে ওঠা রোদের তেজে
গর্হিত গোহায় বসে তুমিও ঝিমাও বুঝি
যেমন আমি হারিয়ে ফেলেছি পথ
তুমিও হারাও যদি এই পথের দিশা

আমার স্বদেশ আহা স্বভূমে কাঁদবে কেবল
স্বজাতির চোখে দ্যাখো শুধু অমানিশা।

দুঃখবিধি

দুঃখ আছে বলেই তো ছুঁতে পারি দুঃখপরিসীমা
উকুনের মতো উহ্য হয়ে থাকে চোখের দুঃখকণা
কৃপণ কীটের মতো ক্রমাগত কেটে যায় মনোবৃক্ষ
উহ শব্দটি পর্যন্ত শোনা গেছে বলে কেউ জানে না

এমন নিদাগ দুঃখ দেখা দেয় না কখনো
গোপন রহস্য ঘোরে বেঁচে থাকে মন থেকে মনে
হাসির ভেতরে বাঁচে কান্নায় ককিয়ে ওঠে
তবু পরাভব মানে না ঠিক শয়তানের মতো

শাড়ি লুঙ্গি শার্টে কিংবা শোকেস আলমিরায়
অথবা ঘরের কোণে চুপচাপ লুকিয়ে থাকে
ঘরের মেঝেতে আচ্ছা কোথায় থাকে না দুঃখ
মানুষ যেখানে হাঁটে আর কেউ না থাকুক
মন খারাপের ছলে সেই মানুষের জীবনসঙ্গী

দুঃখকে তাড়ানো বড় কঠিন সাধনা
তাকে এড়াতে কিংবা তাড়াতে কোন কমরেড পারেনি
দুঃখকে জড়িয়ে তাই আমার সমস্ত জীবন যাপন
দুঃখবিধি মেনে নিয়ে দুঃখই আমার গৃহবধু।

স্বপ্নে আর নেশা জমে না

রোগা অনুভূতি নিয়ে সুখ স্বপ্ন সংগ্রাম দহন
আলাদা করা যায় না
মরা মাছের মতোন মনে হয় জাত প্রজাত ভেদ প্রভেদ
মাউথ অর্গানে কেউ স্বপ্ন দেখাতে এলে
কেন জানি মনে হয় মিথ্যা বলতে এসেছে
পদ্যের প্রহেলিকায় প্রহসন প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে

বাড়ি পুড়ে গেলে কিংবা ধর্ষিতার কাতর বাতাসে ওড়ে যায় সুখ স্বপ্ন আর আস্থার আবাবিল
তামায় ফোটে না ফুল সিসায় শিশির বেমানান
লোহার মতোন মনে স্বপ্নের নেশা জমে না

ঘরের গুমোট শ্বাস ভারি হয়ে গেলে
যদি খুলে যায় বন্ধ জানালা
শ্বাস ফেলে বাঁচতে পারি কিছুদিন
কিন্তু খোলা তো যায় না!

অবাধ্য কথার খই মনের ভেতর ছটফট করে
কথার ভেতরে কথা বলে হয়ে যাই বাকফোবিয়া
এভাবেই মরে যাচ্ছে হাজার কথার আহাজারি
বুকের দহন নিয়ে ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছি
সংগ্রামহীন পরাস্বপ্নের দরোজায়।