গল্প: সে, ও রহস্যময়ী

গল্প:  সে, ও রহস্যময়ী

সে, ও রহস্যময়ী
জাহ্নবী জাইমা

গতকাল রাত্রে প্রায় সাড়ে নয়টা নাগাদ নিতান্তই কথাচ্ছলে অন্তি খবরটা পেয়েছিলো স্বামী অর্নবের কাছে। অফিসের কাজে দু’দিনের জন্যে ব্রিসবেনে গিয়েছিলো অর্নব। গতকাল রাতে বাড়ি ফিরে খেতে বসে এ কথা সে কথা বলতে বলতে হঠাৎ বলে ফেলেছিলো ফারিয়ার ছেলের বিয়ে জুন মাসে। ফারিয়া আর ভাবী অনেকবার বললেন আমাদের বিয়েতে যেতে। বল কী? অন্তির খাওয়া থেমে গিয়েছিলো। ফারিয়ার ছেলে মানে ইফতি? ইফতির বিয়ে?
অর্নব বলেছিলো হ্যাঁ, ইফতির বিয়ে।
ফারিয়ার আর ক’টা ছেলে? ওই একটাই তো সবেধন নীলমণি।
ও মা! সে কী!
বাঃ তুমি তো আকাশ থেকে পড়লে!
অর্নবের সকৌতুক উক্তি। না, মানে শুনেছিলোম কিনা যে ইফতি হঠাৎ বিবাগী হয়ে গেছে। বিয়ের বিষয়ে নাকি তার আর আগ্রহ নেই। দুর অর্নব হেসে উত্তর দিয়েছিলো, ওরকম কথা অনেকেই বলে থাকে। কেন আমিও তো বলেছিলাম but that was before I met you! বরের রসিকতায় কান না দিয়ে অন্তি বলেছিলো সে সব বিশাল খবর আমার জানা নেই। অর্নব বলেছিলো তবে বিয়েতে আমাদের বোধ হয় যাওয়া উচিত, ফারিয়া আর ভাবী যখন এত করে বললেন। এরপর সারারাত ঘুম হয়নি অন্তির। ভোরের অপেক্ষায় বিছানায় এপাশ ওপাশ করে কেটে গেলো।
সকালে উঠেও মন উচাটন। আনমনে স্বামী ও দুই ছেলেকে জামা কাপড় এগিয়ে দিলো, সকালের নাস্তা গোছালো এবং টিফিন তৈরি করে ওদের ব্যাগে ব্যাগে ভরে দিলো। অবশেষে স্ত্রীকে গুডবাই জানিয়ে ছেলেদের নিয়ে রওনা দিলো অর্নব। তাদের স্কুলে নামিয়ে দিয়ে সে অফিস চলে যাবে।
এক কাপ চা কোনও রকমে শেষ করেই অন্তি ফোন করলো তার প্রিয় সখীকে। সে তখন সবে অফিস স্কুলগামী স্বামী পুত্র কন্যাকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বিদায় পর্ব শেষ করে এক কাপ চা নিয়ে বসেছে। ফোনটা বেজে ওঠায় চা তুলে নিয়ে ফোনের কাছে এসে বললো, হ্যালো? হায় অন্তি বলছি কী খবর? কী করছিস? দমকা হাওয়ার মতো। এক কাপ চা নিয়ে বসেছি ক্লান্তি সারাতে।
ও দিকে খবর শুনেছিস?
খবর? খবর একেবারে অভাবনীয়! আমাদের ফারিয়া ভাবীর ছেলের বিয়ে। ইফতির বিয়ে! ফাইনালি! বা! দারুণ খবর তো। ইভার গলায় আন্তরিক খুশির ছোঁয়া একটু যেন দমে গেলো অন্তি, নরম গলায় বললো, সে তো ঠিকই! খুশির খবর তো নিশ্চয়ই। কিন্তু বিয়ে করে সুখী হবে তো? ইভা অনিশ্চিত সুরে বললো, সুখী হবে কি না তা তো বলতে পারি না। ভবিষ্যতের কথা কি কেউ বলতে পারে?
না! ভবিষ্যতের কথা আর কেইবা বলতে পারে। অন্তি বেজার গলায় বললো, তবে ক’বছর আগে ওদের সংসারে যা কা- ঘটে গেলো ইফতিকে নিয়ে। ওফ! আজও ভুলতে পারি না। ইভা বললো সে সব তো বেশ কয়েক বছর আগের ঘটনা। সত্যিই খুব আনফরচুনেট তার পর তো তাঁরা অতীতকে পিছনে রেখে অ্যাডিলেডের মোহ ত্যাগ করে চলেও গেলেন ব্রিসবেনে।
না গিয়ে উপায় ছিলো? এখানে যা ঘটে গেলো, তারপর ওরা তো মুখ দেখাতে পারছিলো না! কী স্ক্যান্ডাল? বল তো বিয়ে হচ্ছে ইফতির আর যত দুশ্চিন্তা তোর? দুশ্চিন্তা না করেও তো পারি না। জানি না কার সঙ্গে বিয়ে। ও পক্ষ সব জেনেশুনে বিয়ে করছে তো? সে মেয়ের কপালেই বা কী নাচছে! কবে বিয়ে, ইভা কথা ঘোরালো, তোরা যাচ্ছিস নাকি?
যেতে তো হবেই, অবশ্য শেষ পর্যন্ত যদি বিয়েটা হয়, হু নোজ! অন্তি নরম গলায় বললো, যদিও আমার দূর সম্পর্কের ভাবী, এ দেশে এসে ঘনিষ্ঠতা তো আমাদের কম হয়নি। ইফতি তো আমার নিজের ছেলের মতোই ছিলো এককালে। কম ভালোবাসতাম ওকে।
বত্রিশ বছর বয়সে ডাঃ ইফাত চৌধুরী এখন সিড়নির প্রিন্স অ্যালফ্রেড হসপিটালে পার্টটাইম সার্জেন কনসালট্যান্ট। অথাৎ সপ্তাহে চারদিন ইফাত তার যন্ত্রপাতি নিয়ে ওটিতে ডিউটি দেয়। বাকি তিনদিন ইফাতের নিজস্ব। সম্প্রতি কয়েকটি আন্তর্জাতিক চ্যারিটি সংস্থার সঙ্গে যুক্ত সে। এই সংস্থাগুলির প্রতিনিধি হয়ে দেশে বিদেশে ভলান্টারি চিকিৎসা করে বেড়ায়। অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসী কম্যুনিটিগুলোর মধ্যে তার আনাগোনা অবারিত। ছবি তোলার নেশাও আছে। অস্ট্রেলিয়ার বিস্তৃত ভূমি পরিসরে নানা অঞ্চলে ঘুরে বেড়ায়।
এক শীতের অপরাহ্নে ক্যামেরা কাঁধে নিয়ে ইফাত ঘুরে বেড়াচ্ছিলো উলারুর আনাচে কানাচে। কিছুক্ষণ আগেই উলারুকে ঘিরে প্রায় নয় কিলোমিটার জঙ্গল পরিক্রমণ করেছে। এই এলাকায় ফুটে থাকা আশ্চর্য সুন্দর বন্য অর্কিড ও পাহাড়ী নাম না জানা ফুলের বেশ কিছু ছবিও তুলেছে। একটু ক্লান্ত হয়ে একটা বেঞ্চে বসে ব্যাক প্যাক থেকে বোতল বের করে পানি পান করলো সে। নীল স্বচ্ছ আকাশের নিচে একা বসে থাকতে থাকতে হঠাৎ দশ বছর আগে ফেলে আসা জীবনটা ভেসে উঠলো তার চোখের সামনে। এমনই হয় ইফাতের। হঠাৎ অত্যন্ত অপ্রাসঙ্গিক ভাবেই, বিনা ভূমিকায় অতীতে ফেলে আসা সেই দিনগুলো নতুন করে হানা দেয় ওর মস্তিষ্কের কোটরে, চোখের সামনে টিভি পর্দার মতো মেলে ধরে ওর জীবনে ঘটে যাওয়া ছোট ছোট এপিসোড। অতীতের সেই সব ঘটনার একটাও ইফাত বদলাতে পারে না, শুধু অসহায়ভাবে চেয়ে থাকে পুরনো ছবিগুলোর দিকে। নতুন করে আবার খুলে যায় ক্ষতস্থানগুলো। নীরবে রক্তক্ষরণ চলে কিছুক্ষণ। তার এই অনুভূতিকে ইফাত এক রকম মানসিক ক্যানসার বলে মনে করে। এর চিকিৎসা কোন মনো বিশ্লেষকের আওতায় ইফাতের জানা নেই। কিংবা হয়তো ইচ্ছে করেই ইফাত সে দিক মাড়ায় না। এই লুকোনো ক্যানসার মনের এক কোণে সন্তর্পণে আড়াল করে রাখতে চায়।
আজ তা এই স্বচ্ছ নির্জন দুপুরে লতাগুল্ম বেষ্টিত উলারুর এক কোণে বেঞ্চের উপর বসে কুকাবোরার ডাক শুনতে শুনতে ইফাতের চোখের সামনে আবার ভেসে উঠলো ওর দশ বছর আগের সেই দিনগুলো। বাইশ বছরের ইফাত তখন ডাক্তারির ফাইনাল ইয়ারের ছাত্র। তৃতীয় বছরের মেডিক্যাল ছাত্রী অ্যাংলো ইন্ডিয়ান মেয়ে ভিক্টোরিয়ার সঙ্গে বন্ধুত্বটা তখন বেশ গভীর হয়ে উঠেছে। প্রায়ই দেখা হয় দু’জনের ইউনির্ভাসিটির কফি শপে টিচিং হাসপাতালের ক্যাফেটেরিয়াতে বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে বা মেডিক্যাল ছাত্র-ছাত্রীদের ডিনারে। ইদানিং ভিক্টোরিয়ার মন খুব খারাপ। ওর বাবা মায়ের বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটেছে মাস খানেক আগে। উনিশ বছরের ভিক্টোরিয়ার কাস্টডি নিয়ে বাবা মায়ের মাঝে কোন দ্বন্দ্ব হওয়ার কথা নেই। ভিক্টোরিয়া নিজেই ঠিক করে নিয়েছে বাবার কাছে থাকবে। মাকেও খুব ভালোবাসে সে, কিন্তু বিচ্ছেদের পর মা গিয়ে উঠেছে নতুন বয়ফ্রেন্ডের ফ্ল্যাটে, বাবা একা তাই ভিক্টোরিয়া ঠাঁই নিয়েছে ওর বাবা কেভিনের অ্যাপার্টমেন্টে।
সেদিন কফি শপে দেখা ওদের, বাবা মায়ের লেটেস্ট খবর দিচ্ছিলো ভিক্টোরিয়া। ইফাত বললো, একটা সান্ত¦না যে তোমার বাবা মা একই শহরে থাকবেন। ভিক্টোরিয়া বললো তা সত্যি। কিন্তু তারা যে আলাদা আলাদা থাকবে সেটাই তো মর্মান্তিক আমার কাছে। তার উপর ভাবো মায়ের আবার নতুন বয়ফ্রেন্ড। দ্যাট স্টুপিড সাইমন। উঃ অবনাকশাস। ইফাত হেসে বললো মায়ের বয়ফ্রেন্ড বা বাবার গার্লফ্রেন্ড কখনই তোমার পছন্দ হবে না, জানা কথা। ডোন্ট লাফ। ভিক্টোরিয়া আপত্তি জানালো, ইট এজ নট ফানি। তোমার যদি এরকম হতো? আমার এরকম হবেই না। ইফাত মুচকি হেসে বললো। আমার মা ইজ টু লেজি টু ফাইন্ড হারসেলফ আ বয়ফ্রেন্ড আর আমার বাব ইজ টু স্কেয়ার্ড অফ মাই মম।
ওর কথা বলার ধরণ দেখে ভিক্টোরিয়া হেসে ফেললো। ইফাতের হঠাৎ মনে হলো, হাসলে সুন্দরী ভিক্টোরিয়ার দুই গালে গভীর দুটো টোল পড়ে আর তাতে তাকে আরও মনোরম দেখায়। ভিক্টোরিয়া বললো, তা নয় ইট ইজ ইন ইওর কালাচার। আমরাও ক্যাথলিক। আমার মা কামস ফ্রম আ বেঙ্গলি ক্রিশ্চিয়ান ফ্যামিলি অ্যাজ ওয়েল। স্টিল সি হ্যাজ নো ভ্যালুজ। তা নয় ভিকি! ইফাত প্রতিবাদ করলো, থিংক্স চেঞ্জ। সময়ের বিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ বদলায়। তার সঙ্গে বদলায় তাদের চিন্তা ধারা মূল্যবোধ। নাথিং ইজ ফর এভার। ভিক্টোরিয়া ভেংচি কেটে বললো, নাথিং ইজ ফর এভার। সো হোয়াই অ্যাবাউট আস? প্রশ্নটা এই প্রথম ইফাতকে ভাবিয়ে তুললো। বছর চারেক থেকে ভিক্টোরিয়ার সঙ্গে তার বন্ধুত্ব। সম্পর্কটা ঘনিষ্ঠ হয়েছে প্রায় আড়াই বছর। বাবা মায়ের ভিক্টোরিয়াকে ভালোই লাগে বলে মনে হয়। কিন্তু তাদের সম্পর্কটাকে বন্ধুত্বের বেশি বলে কেউই মনে করে না। এমনকি ইফাত নিজেও তাদের সম্বন্ধে তালিয়ে কিছু ভাবেনি। ইফাতকে চুপ করে থাকতে দেখে ভিক্টোরিয়া আবার বললো, ইফতি হোয়াট অ্যবাউট আস? ইফাত হালকাভাবে বললো আওয়ার ফেন্ডশিপ উইল নট চেঞ্জ, আই গেস। আই ডু বিলিভ দ্যাট আওয়ার ফ্রেন্ডশিপ উই রিমেন ফর এভার।
ভিক্টোরিয়া চোখ বড় বড় করে ওর দিকে চেয়ে বললো, আর উই জাস্ট ফ্রেন্ডস? নাথিং মোর? আর কিছুই না? ইফাত ভেবেচিন্তে বললো, সরি ভিকি! আমি তো তোমাকে আমরা সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু বলেই মনে করি। এমন একটা বন্ধু যে আমাকে বোঝে, আমার সুখ-দুঃখ শেয়ার করে নেয়, যাকে আমি চিরকাল ট্রাস্ট করতে পারি, যার উপর হয়তো মাঝে মাঝে কিছুটা জুলুমও করতে পারি। আমাদের সম্পর্কে বন্ধুত্বের বাইরে তো কখনও কিছু ভাবিনি। ওদের কফি খাওয়া শেষ। ধীরে সুস্থে উঠে চেয়ারের পিছনে ঝুলিয়ে রাখা কোটটা পরে নিল ভিক্টোরিয়া। বললো, ওয়েল! তোমার মনের কথা এতো স্পষ্ট করে আমাকে জানিয়ে দেওয়ার জন্যে অনেক ধন্যবাদ। আসি তাহলে, গুড বাই। কফি শপ থেকে একসঙ্গে বেরিয়ে এসে নিজ নিজ গন্তব্য পথে রওনা দিলো ওরা সপ্তাহ দু’য়েক কেটে গেলো। এর মধ্যে দেখা সাক্ষাৎ হয়নি ওদের। ফোন, ই-মেইল এমনকি ফেসবুকেও কোন কথাবার্তা হয় নি।
এক শনিবার রাতে খাওয়া দাওয়ার পর নিজের ঘরে বসে পড়াশোনা করছিলো ইফাত। রান্না ঘরের পাট চুকিয়ে এককাপ কফি নিয়ে দোতলায় উঠে এলো ফারিয়া। ইফাতের ঘরের দরজা আধাখোলা দেখে গুটিগুটি পায়ে ঘরে ঢুকে ইফাতের বিছানার উপর বসলো সে। ইফাত পড়ার চেয়ার থেকে ঘাড় ঘুরিয়ে ভুরু কুঁকচে তাকালো, হঠাৎ? ফারিয়া বললো আজ কোন দিকে সূর্য উঠেছিলো বাচা? তুই যে আড্ডা ছেড়ে গিটার না বাজিয়ে গান না শুনে বন্ধুদের সঙ্গে মুভি দেখতে না গিয়ে কান থেকে মোবাইল ফোন নামিয়ে রেখে বই খুলে বসেছিস? ছেলের সঙ্গে ফারিয়ার বেশ সখ্য। চলতি ভাষাও প্রচুর ব্যবহার করে ছেলের সঙ্গে কথাবার্তায়। ইফাত বললো হোয়াট আর মেস! একটা অ্যাসাইমেন্ট দিতে হবে বৃহস্পতিবার। তা ছাড়া পরীক্ষাও এসে গেলো! ফারিয়া হঠাৎ প্রশ্ন করলো, হাউ ইজ লাইফ? ভিক্টোরিয়াকে কিছুদিন যাবৎ দেখছি না তো? ইফাত হেসে বললো, ইউ আর রাইট! তোমার সব দিকে চোখ মাছির মতো। ভিক্টোরিয়ার সঙ্গে ব্রেক আপ হয়ে গেছে মম। ফারিয়া চমকে উঠে বললো, ও-মা! সে কী! ইফাত সুকৌতুকে বললো আই থট ইউ উইলবি প্লিজড টু হিয়ার দ্যা নিউজ। সে আবার প্রশ্ন করলো ডু ইউ লাইফ হার মম? তোমার ভিকিকে ভালোলাগে? একটু ভেবে নিয়ে ফারিয়া বললো আই ডোন্ট নো অ্যাবাউট দ্যাট। মেয়েটা দেখতে খুব সুন্দর স্বভাব বেশ মিষ্টি! কিন্তু … অধীরভাবে ঘাড় ঝাকিয়ে ইফাত বললো, ওকে, ওকে। উই উইল ডিসকাস দিস লেটার। এখন তুমি যাও মা। আমাকে কাজ করতে দাও। আচ্ছা বাবা আচ্ছা, ফারিয়া উঠে বেরিয়ে গেলো। রাতে শুয়ে শুয়ে ইফাতের হঠাৎ মনে হলো ভিক্টোরিয়া অসাধারণ, সুন্দরী, স্মার্ট, বুদ্ধিমতি, কথাবার্তায় চৌকস। মনে মনে বললো দারুণ মেয়ে ভিকি, অ্যাংলো ইন্ডিয়ান! সো হোয়াট! এ কদিন তাকে ফোন করেনি, কেন কে জানে! ইফাত নিজেও তো একবার ফোন করে দেখতে পারতো ভিক্টোরিয়া তার উপর রেগে আছে কি না। নাঃ! লাইফ হ্যাজ বিন টু বিজি ফর আস। ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়লো সে। বৃহস্পতিবার অ্যাসাইনমেন্ট জমা দিয়েই পরম নিশ্চিন্তে ভিক্টোরিয়াকে একটা এসএমএস পাঠায় ইফাত! কাম অ্যান্ড সি মি অ্যাট আওয়ার কফি শপ।
বিকেলে কফি শপে আবার দুজনে মুখোমুখি। ভিক্টোরিয়া বললো সো হাউ হ্যাভ ইউ বিন? ইফাত মাথা নাড়লো ভেরি ওয়েল থ্যাং ইউ। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে পকেট থেকে লাল কাগজে মোড়া ছোট্ট বক্স খুলে বের করলো একটা আংটি। হঠাৎ ভিক্টোরিয়ার সম্মুখে নাটকীয় ভঙ্গিতে হাঁটু গেড়ে মাটিতে বসে পড়ে বললো ভিক্টোরিয়া, ‘উইল ইউ ম্যারি মি?’ ইফাতের এরকম অভাবনীয় আচরণে চেয়ার থেকে প্রায় পড়ে যেতে যেতে সামলে নিলো ভিক্টোরিয়া। মুহূর্তে চোখমুখ আগুন বর্ণ। দৃশ্য দেখে কফি হাউস ভর্তি সকলেই হই হই করে উঠে হাততালি দিয়ে ইফাতকে সমর্থন জানালো। ইফাত আবার বললো ভিক্টোরিয়া মেরি উইলসন, ম্যরি মি। কিংকর্তব্যবিমূঢ় ভিক্টোরিয়া কফি শপের মতো একটা পাবলিক প্লেসে এরকম এক অভাবনীয় দৃশ্যের অবতারণা করবে ইফাত স্বপ্নেও ভাবেনি। ব্যস্ত হয়ে বললো, ‘ওকে ওকে, তুমি উঠো বলে তাকে ধরে চেয়ারে বসালো। এবার বললো ভিক্টোরিয়া ইয়েস। অবসরের অনেক সময়েই ওদের কথা ভাবে ইভা। ইফাত ও ভিক্টোরিয়ার কথা। পারিবারিক বন্ধু হিসেবে ইফাতদের বাড়িতে ইভার য়াতায়াত অনেক দিনের। এনগেজমেন্টের কয়েকদিন পরেই, ইভাকে সুখবরটা বাড়ি বয়ে দিতে এলো ওরা। ইফাত বললো, মা খুব একটা খুশি হন নি আন্টি। বাট সি উল বি অল রাইট। অর্থাৎ ইফাতের বিশ্বাস কিছুদিনের মধ্যেই মা ব্যাপারটিকে মেনে নিবে। এখন ঘটনার আকষ্মিকতায় একটু শক খেয়েছেন, এই যা। আর তোর বাবা? ইভার প্রশ্ন বাবা ওয়াজ সো টেকেন অ্যাবাক! ইফাতের সহাস্য উত্তর ‘একেবারে আকাশ থেকে পড়লো বাবা। অ্যান্ড দেন, বাবা ওয়াজ থ্রিলড। বাবার ভিক্টোরিয়াকে খুব পছন্দ, আমার পিঠ চাপড়ে বললো, ওয়েল ডান, মাই সন। এনগেজমেন্টের পরের দুটো বছর ওদের খুব আনন্দে কাটলো। ওর মধ্যে ইফাত ও ভিক্টোরিয়া দুজনেই গ্র্যাজুয়েশন করেছে। একসঙ্গে কত জায়গায় ঘুরলো দুজনে। ভবিষ্যতের পরিকল্পনা, হইচই পার্টি, নাইট ক্লাব সব কিছুর মাঝে যেন রূপকথার রাজপুত্রও রাজরাণী ওরা। ইভা খালা একদিন ইফাতকে একা পেয়ে জিজ্ঞেস করলো, এই তোরা কবে বিয়ে করছিস? আমরা আর কতদিন বসে থাকবো নিমন্ত্রণের অপেক্ষায়? আরো ছয়টা মাস। জাস্ট আফটার মাই ইন্টার্নশিপ, ইফাত বললো। এর মাস দুয়েক পরে এলো সেই ভয়ানক সন্ধ্যেটা। অফিস থেকে ফিরে এসে শাওয়ার শেষে সবে এক কাপ চা নিয়ে বসেছে ইভা, ফোনটা বেজে উঠলো। ওপার থেকে ভেসে এলো অন্তির কণ্ঠস্বর, ইভা খবরটা শুনেছিস? সর্বনাশ হয়ে গেছে। ইভা অতঙ্কিতকী হলো। ভিক্টোরিয়া আমাদের ইফাতের হবু বউ, কী হলো, কী হলো ভিক্টোরিয়ার? ভিক্টোরিয়া সুইসাইড করেছে। বলো কী! এর বেশি আর বলতে পারলো না ইভা, জানি না কী ব্যাপার। অন্তি বললো, আমি এখন ইফাতের বাসায় যাচ্ছি, ফুয়াদ ভাই আর ফারিয়া ভাবীকে শান্ত¦না দিতে পারলে তুইও চলে আয়। ইভার আর সেই সন্ধ্যেয় ওদের বাড়ি যাওয়া হয়নি।
মাসখানেক ধরে অ্যাডিলেডের বঙ্গ সমাজে চললো প্রচুর জল্পনা কল্পনা। সাঙ্ঘাতিক আলোড়ন নানা গুজব, নানা রটনা। একটা বিষয়ে অন্তি সকলের সঙ্গে একমত না হয়ে পারলো না যে ভিক্টোরিয়ার আত্মহত্যার সম্পূর্ণ দায়িত্ব ইফাতের। ঘটনার মাস খানেক আগে থেকে নাকি ইফাত পুরোপুরি উদাসীন হয়ে পড়েছিলো তার হবু বউ সম্পর্কে। মোহ তার কেটে গিয়েছিলো। আর একটা মেয়ের পিছনে ছোটাছুটিও নাকি আরম্ভ করেছিলো। সেই আঘাত সামলাতে পারেনি ভিক্টোরিয়া। ফুয়াদ চৌধুরী, ফারিয়া চৌধুরী ও ইফাত চৌধুরী কেউ কোন দিন এব্যাপারে কিছু বলেনি। বরং একদিন নীরবে শহর ছেড়ে তারা চলে গেলো। ফারিয়া ও ফুয়াদ ভাই চলে গেলো ব্রিসবেনে আর নতুন কাজ নিয়ে ইফাত সিডনিতে।
রাত আটটার ডিউটি সেরে অ্যাপার্টমেন্টে ফিরে এসে এক কাপ হট চকোলেট করে নিয়ে বসার ঘরে টিভি খুলে বসেছিলো আনমনে ইফাত। একাই থাকে সে। দিনের শেষে নিরবচ্ছিন্নœ শান্তি নেমে এসেছে এখন চারদিকে। ইফাত ভাবছিলো, সময় কত তাড়াতাড়ি কেটে যায়। আজকের দিনে গত বছর ঢাকায় ফাইজার সঙ্গে দেখা হয়েছিলো তার। ঢাকার এ্যাপোলো হাসপাতালে তখন কাজ করছে ইফাত। মাস ছয়ের জন্যে ট্রেনিং দিতে এসেছে, উঠেছে খালার বাড়ি গুলশানে, খালা খালুর একার সংসার, ছেলেমেয়ে ডানা মেলে উড়ে গিয়েছে যে যার নিজস্ব ঠিকানায়। ইফাতকে কাছে পেয়ে খুব খুশি তারা। ইফাতেরও ভালো লাগছে কোলাহল জনসমুদ্র সুখ দুঃখ আনন্দ বেদনা কলহ জীবন যাত্রার টেপেস্ট্রিতে অসংখ্য প্যাচওয়র্ক প্রত্যক্ষ করছে সে। দৈনিক বেঁচে থাকার শত স্পন্দন অহরহ অনুভব করছে তার চতুর্দিকে। অবসর পেলেই ক্যামেরা কাঁধে ঘুরে বেড়ায় এখানেও, মিশে যায় জনারণ্যে। এমনই একদিন ঠিক এক বছর আগে ইফাত বাজার ঘুরে দেখতে দেখতে দোকান পসরা পেরিয়ে হঠাৎ নজরে পড়লো একটি চায়ের দোকান। খোলা চত্বরে চেয়ার টেবিল পাতা খদ্দেরদের জন্যে। একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসে চায়ের অর্ডার করলো সে। চায়ে চুমুক দিতে দিতে নজর পড়লো, পাশের চেয়ারে বসা একটি মেয়ের। নির্নিমেঘ মেয়েটি তার দিকে চেয়ে আছে, কেমন যেন আগে দেখা চেনা মুখ। চোখাচোখি হতেই ইফাত হেসে হেসে বললো, হ্যালো। তোমাকে কী আগে দেখেছি কোথাও? দেখেছো হয়তো। মেয়েটি স্বাচ্ছন্দে উত্তর দিলো, তোমার খালার ফ্লাটের পাশের ফ্লাটেই আমরা থাকি। ও নো ওয়ান্ডার চেহারাটা তাই এতো চেনা লাগছিলো। মাছের দোকানে যেতে তোমাকে দেখেছি। ইফাত রসিকতা করতে চেষ্টা করলো, উড ইউ লাইফ টু জয়েন মি অন দিস টেবল? উহ! মেয়েটির সাফ উত্তর, ইউ ক্যান জয়েন মি হিয়ার ইফ ইউ উইশ।
আমি ফিওনা ফাইজা। আমি এখানে একটি মিশনারিজ স্কুলে পাড়াই। থাকি তোমার খালার বাসার পাশে, এখানে লাঞ্চ ব্রেকে এসেছি। ওয়াও হোয়াট এ স্কুল ওয়াল্ড ইফাত হাসলো। ফাইজার দিকে ভালো করে তাকালো সে। পরনে আকাশি নীল রঙের শাড়ি, মানানসই ব্লাউজ নিরাভরণ হাত দুটি, কানে ছোট দুটি ফুলের গহনা, শ্যামলা রং আর পাঁচটি বাঙালি মেয়ের মতোই হাইট। সাধারণ চেহারা কিন্তু অসাধারণ তার বড় বড় মায়াবী দুটি চোখ, জীবনানন্দ দাসের বনলতা সেনের মতো কাছে টানে। ফাইজাও হাসলো। বললো, আপনি কতদিন থাকবেন ঢাকায়? ইফাত আশ্চর্য হয়ে বললো, আরও কয়েক মাস। কিন্তু তুমি কী করে জানলে আমি ঢাকাতে বেড়াতে এসেছি, থাকতে নয়। ইফাতের অজ্ঞতায় ফাইজার মুখে তাচ্ছিল্যের হাসি, বেড়াতে এসেছেন। আপনি ছবি তুলতে ভালোবাসেন রিমি খালার কাছে সব গল্প শুনেছি আমরা। ইফাত একটু অস্বস্তিতে পড়ে গেলো। তার ব্যক্তিগত জীবনের অনেক কিছুই মেয়েটির জানা হয়ে গেছে খালার কারণে, সে চুপ করে রইলো। ফাইজা বললো এনি ওয়ে আশা করি এখানে আপনার ভালোই লাগছে। তা লাগছে, অস্বস্তি কাটিয়ে ইফাত বললো, এখানকার জীবন কার ভালো লাগবে না? আমার প্রিয় মাতৃভূমি কত সবুজ সুন্দর বৈচিত্র্যময় কত চাঞ্চল্য, কত স্পন্দন, কত স্বপ্ন, আশা নিরাশা জীবন যুদ্ধ।
আপনি তো দারুণ বাংলা বলেন, ফাইজা মুখ টিপে হাসলো আবার ভাবুকও বটে। এখানকার জীবনে যা যা বললেন সবই আছে। তবে সবই একটু বেশি মাত্রায়। তাই জীবন স্পন্দন নয়, জীবন বিকারে সবাই জর্জরিত বুঝলেন? এক মুহূর্ত ভেবে সে আবার বললো, অবশ্য বড় লোকদের এখানে খুব সুখ! কিন্তু বড়লোক আর কজন আছে বলুন, হাতে গোনা যায়। ইফাত নীরবে হাসলো। ফাইজা বললো, রিমি আন্টি সে দিন বলছিলেন, আপনি নাকি অনেক চ্যারিটির কাজ করেন। ইফাত ঘাড় নেড়ে সায় দিলো। ফাইজা বললো, আমাদের অনাথাশ্রমে একদিন আসুন, দেখবেন আমাদের ছেলেমেয়েদের। ইফাত বিস্মিত হয়ে বললো তোমাদের অনাথাশ্রম। ফাইজা বললো হ্যাঁ, আসলে এই অনাথ আশ্রমেই আমি লেখা পড়া শিখে বেড়ে উঠেছি, আমার অস্তিত্বে জড়িয়ে আছে এই অনাথ আশ্রম।
সেই দিনই ফাইজার সাথে ইফাত গেল তার সেই অনাথ আশ্রম। কয়েক মাস বয়স থেকে সতেরো আঠারো বছর অবধি ছেলে মেয়েদের সঙ্গে তার আলাপ হলো। রাতে গিয়ে রিমা খালামনিকে গল্প করতেই খালামনির মুখে শুনলো ফাইজার গল্প। জীবনের ছাব্বিশ বছরের প্রথম তেরো বছর ফাইজার কাটে সেই অনাথাশ্রমে। তারপর এক নিঃসন্তান দম্পতি তাকে দত্তক নেন, ফাইজা হয়ে উঠে ইসলাম পরিবারের মেয়ে। কয়েক বছর আগে এম.বি.এ পাশ করে শিক্ষকতা করছে এখন। বাবা মাকেও প্রাণ দিয়ে ভালোবাসে। কিন্তু তার পুরনো ঠিকানাকে সে একদিনের জন্যেও ভোলেনি। ফাইজা যথাসাধ্য চেষ্টা করে যে আদর যতœ ভালোবাসা ও আশ্রয় সে পেয়েছে তার অনাথাশ্রম থেকে অন্তত তার কিছুটা ফিরিয়ে দিতে চায়। মেয়েটি রতœ অথচ দেখে বোঝার উপায় নেই, ফাইজা বলে, সে আজীবন ওই সব অনাথ ছেলে মেয়েদেরকে দেখাশোনা করবে। ওদের জন্য শ্রম ও মেধা দিবে। খালামনিও তাই বলেছেন, ফাইজা এক কথায় অসাধারণ মেয়ে, কোটিতে মেলা ভার। নিজের অতীত জীবন সে লুকাতে চায় না কখনও। আবার যথাসাধ্য সাহায্যও সে করে চলেছে তারই মতো অনাথ ছেলেমেয়েদের, একটু সুখ সুবিধার জন্যে। খালামনি ইউ আর নট ট্রাইং টু সেল হার টু মি? আর ইউ? তিনি অপ্রস্তুত হয়ে বলেছিলেন যাঃ কী যে বলিস ইফাত। তোর মা আমাকে আস্ত রাখবে? তোর জন্য কত সুন্দরী উচ্চশিক্ষিতা সম্ভ্রান্ত ঘরের মেয়েরা লাইন লাগিয়েছে জানিস? তাই নাকি! আই নেভার নিউ আই ওয়াজ দ্যাট ইস্পট্যান্ট গ্রেট টু নো বিউটিফুল গার্লস আর ওয়েটিং ফর মি, আফটার অল! ঢাকা থেকে ফিরে আসার দুদিন আগে ইফাত আশ্রমের ছেলেমেয়েদের সাথে দেখা করতে গিয়েছিলো। এই কয়মাসে ওদের সাথে বেশ হৃদ্যতা হয়েছে, যেমন হয়েছে ফাইজার সঙ্গেও। ইফাত চলে যাবে বলে সকলেই মনোক্ষুণœ। ওর মিষ্টি স্বভাব, হাসিমুখ, সর্বদা তৎপর প্রকৃতির জন্য সকলেই তার ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়েছিলো। খুব শ্রীঘ্রই আবার ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ইফাত বিদায় নিলো। গেট থেকে বেড়িয়ে বাইরে এসে দাঁড়ালো ট্যাক্সির আশায় হঠাৎ পিছনে পায়ের শব্দ ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে ফাইজা এগিয়ে আসছে। কাছে আসতে ইফাত জিজ্ঞেস করলো, তুমি কি বাড়ি যাচ্ছ? কেন? ফাইজার সচকিত প্রশ্ন, এখনও ঠিক ভাবিনি কোথায় যাচ্ছি। ইফাত আশ্চর্য হয়ে বললো তাই। এখানে কিন্তু তোমার সঙ্গে আমার মিল আছে। আমিও টু দ্য লাস্ট মোমেন্ট অনেক সময়েই ঠিক জানি না হোয়ার মাই নেকস্ট স্টেপ ইজ গোয়িং টু বি। ফাইজার কাছে ইফাত কখন আপনি থেকে তুমিতে চলে এসেছে কেউ জানে না, তুমি কেন যে ডাক্তার হতে গেলে। তোমার হওয়া উচিৎ ছিলো দার্শনিক বা কবি, নিদেনপক্ষে সাহিত্যের ছাত্র। না ডাক্তার কুলে তুমি কলঙ্ক। ইফাত বললো আর তোমার কি হওয়া উচিত ছিলো আমার মতো ডাক্তার। চিরদিন মানুষের সেবা করবে। তুমিও তো মানুষের সেবা করে শান্তি পাও তাই না? ঠিক একই রকম। গন্তব্যহীন পথ চলা জানো না কোথায় যাচ্ছ। এখানেই তোমার আমার মনের মিল। আমি একজন ভূতপূর্ব অনাথিনী যার চালচুলো ছিলো না আনেকদিন আমি এক অতি সংবেদনশীল মা-বাবার একমাত্র সন্তান। এই আশ্রম আমার আপন আর আমি এই আশ্রমে সবার আপন। আমার সব স্বপ্ন এইখানকার সকল অনাথ ছেলেমেয়েদের ঘিরে। ট্যাক্সির কথা ভুলে গিয়ে ইফাত কিছুক্ষণ নির্বাক হয়ে ওর দিকে চেয়ে রইলো। তারপর বললো নিজের কথা কত পরিস্কার করে তুমি বললে। ইউ আর সো ক্লিয়ার অ্যাবাউট ইওর মিশন। আমিও তোমাকে আমার কয়েকটি কথা বলতে চাই। তোমার কি সময় আছে? তা আছে। ওই যে বললাম এখান থেকে কোথায় যাব এখনও ঠিক করিনি। ওরা দু’জনে রাস্তা বেয়ে বেশ কিছুটা হেঁটে গিয়ে একটা চায়ের দোকানে ঢুকলো। চা আর পিয়াজুর অর্ডার দিয়ে বসলো মুখোমুখি। ইফাত বললো এতোদিন কাউকে বলা হয়নি আমার কথা। এতোকাল ভেবেছি দশ বছর ধরে সন্তর্পণে মনে লুকিয়ে রাখা কথাগুলো কারও কাছে প্রকাশ করলে একজনের প্রতি বিশ্বাস ঘাতকতা করা হবে। আজ তা মনে হচ্ছে না।
ফাইজা সব কথা শুনলো ইফাতের। বাইশ বছরের ইফাত ও উনিশ বছরের ভিক্টোরিয়ার বন্ধুত্ব এনগেজমেন্ট, ভালোবাসা, বিয়ের স্বপ্ন, অবশেষে ইফাতের গল্পের শেষ অধ্যায়। ভিক্টোরিয়া থাকে তার বাবার কাছে। কেভিন সাদামাটা ভালো মানুষ। আটিস্ট ভালো ছবি আঁকে বলে কিছুটা আত্মভোলাও। ভিক্টোরিয়াই যেন মায়ের মতো তাকে দেখাশোনার দায়িত্ব তুলে নিয়েছিলো, ওর মা বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার পরে। ভালোই চলে যাচ্ছিলো তাদের জীবন। ছয় মাস পর ভিক্টোরিয়া বিয়ে করে বাবাকে ছেড়ে চলে যাবে বলে বাবা মেয়ে মাঝে মাঝে চিন্তিত হয়ে পড়ে। হঠাৎ একদিন অসময়ে ফ্লাটে ঢুকে ভিক্টোরিয়া প্রত্যক্ষ করলো এক অভাবনীয় দৃশ্য। কেভিন আর তার বন্ধু চার্লস আলিঙ্গাবদ্ধ হয়ে বিছানায় দুজইে ঘনিষ্ট… নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলো না ভিক্টোরিয়া। সে ছুটে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো। ঘোরগ্রস্থ হয়ে রাস্তায় হেঁটে বেড়ালো কিছুক্ষণ। তারপর ইফাতকে ফোন করে তক্ষুণি তাদের কফি শপে চলে আসতে বললো। গাড়ি নিয়ে প্রায় ছুটতে ছুটতে পনেরো মিনিটের মধ্যে ইফাত এসে হাজির। সব কথা শুনলো। ভিক্টোরিয়া অঝোরে কাঁদছে আর ঘন ঘন টিস্যু দিয়ে চোখ মুছছে। ইফাত বললো তুমি আর এখন বাড়ি ফিরে যেও না। ইট মে বি অকওয়ার্ড ফর ইউ বোথ। ট্রু ভিক্টোরিয়া সায় দিলো, বাট হোয়্যার ডু আই গো? আই উইল হেট টু বি লিভিং উইথ মাই মম এ্যান্ড সাইমন। তাই তো। ইফাত চিন্তিত। আই নো। হঠাৎ চোখমুখ উদ্ভাসিত হয়ে উঠলো ভিক্টোরিয়ার তোমাদের বাড়ি আমাকে নিয়ে চলো না। উহু ইফাত মুখ লাল করে বললো, বাবা মায়ের সেটা পছন্দ হবে না। নট বিফোর উই আর ম্যারেড! ও! ভিক্টোরিয়ার মুখ অন্ধাকার হয়ে গেলো। মুখ নিচু করে বসে রইলো। ইফাতের মাথায় সহসা একটা বুদ্ধি খেলে গেলো বললো আই নো হোয়াট! নেট মি টেক ইউ টু আন্টি ইভাজ, সি উইল বি ভেরি প্লিজড টু হ্যাভ ইউ। ভিক্টোরিয়া ইফাতের হাত ধরে মিনতি করে বললো মেক সিওর নো ওয়ান নোজ দিজ স্টোরি। ইট ইজ সো এমব্যারাসিং। লজ্জায় আমার মাথা কাটা যাচ্ছে। প্লিজ ডোন্ট টেল এনিওয়ান। সে দিন রাতে ইভা খালামনির বাড়িতেই ঠাঁই হলো ভিক্টোরিয়ার। ইভা আন্টি জানলো যে বাবার উপর রাগ করে মেয়ে বাড়ি ছেড়ে চলে এসেছে। একমাস ইভা আন্টির বাসাতেই রইলো ভিক্টোরিয়া। নির্মল প্রাণবন্ত স্বভাব ইভার। তার স্বামী ছেলে মেয়েরাও ভিক্টোরিয়াকে পরিবারের একজন বলে ধরে নিলো। ইফাত এসে প্রতিদিন দেখা করে খোঁজ খবর নিতো। কখনও এক সাথে আড্ডা দিতো বা কখনও দু’জনে বেরিয়ে পড়ে নিরিবিলিতে কিছুটা সময় কাটাতো একে অন্যের মনের কথা বলতো, ভিক্টোরিয়া বাবার কথা মনে করে কাঁদতো, গোপনেই ছিলো সবকিছু। একদিন সকালে হাসপাতাল যাওয়ার পথে ইফাতের মোবাইল বেজে উঠলো ভিক্টোরিয়ার গলা, আই ওয়ান্ট টু টক টু ইউ ইফতি, ইফতি আতঙ্কিত হয়ে বলে, হোয়াট ইজ আপ? ইট ইজ অ্যাবাউট আস। ক্যান উই গেট ম্যারেজ নাও? লাইক ইন-টু থ্রি উইকস? ভিক্টোরিয়ার কণ্ঠে মিনতি, নো উই কান্ট! হঠাৎ কী হলো তোমার? ইউ গো আই হ্যাভ টু গো টু এ কনফারেন্স ইন টু উইকস্। বাট আই ডোন্ট ওয়ান্ট টু স্টে হিয়ার এলোন। ভিক্টোরিয়া ব্যাকুল হয়ে বললো, আই ওয়ান্ট টু বি উইথ ইউ। আই ওয়ান্ট টু বিলং ইফতি।
জাস্ট ওয়েট এ লিটল বিট, হানি, ইট ওয়ান্ট বি লং নাও। আর মাত্র কটা মাস। জাস্ট বি আ লিটল সেন্সিবল। ডোন্ট বি সো ইমোশনাল ইফাত বুঝালো। ওপাশ থেকে ঠা-া গলা ভেসে এলো, ওকে। ফোনটা কেটে গেলো। একটা বিষাদের আস্তরণ ঘিরে রইলো ইফাতকে সারাদিন। রাতে ডিউটি সেরে গেলো ইভা আন্টির বাড়ি, শুনলো কিছুক্ষণ আগে ভিক্টোরিয়া হঠাৎ ওর বাবার কাছে ফিরে গিয়েছে। পরদিন সারাদিন কাজের ফাঁকে ফাঁকে বহুবার মোবাইলে কল দিয়ে পেল না ভিক্টোরিয়াকে। সন্ধ্যের দিকে ইফাত হাজির হলো ভিক্টোরিয়ার বাবার ফ্লাটে। বহুবার ডোর বেল টেপা সত্বেত্ত কেউ দরজায় এসে দাঁড়ালো না। নীরব নিস্তব্ধ অন্ধকার ফ্লাটে কোথাও কেউ নেই। পরদিনও ভিক্টোরিয়ার সাথে কিছুতেই যোগাযোগ করতে না পেরে অবশেষে ওর মাকে ফোন করলো ইফাত। তিনিও মেয়ের কোন সংবাদই রাখেন না। একেবারে আকাশ থেকে পড়ে বললেন ‘মে বি সি হ্যাজ গন টু স্টে উইথ আ ফ্রেন্ড। তৃতীয় দিন সন্ধেবেলা বাড়ি ফিরে এসে কুরিয়ারে ভিক্টোরিয়ার চিঠি পেল কুরিয়ারের ঠিকানায় সংক্ষিপ্ত চিঠি
ইফাত,
কিছু মনে করো না। বুঝতেই পারছি তোমাকে অনেক চিন্তা ভাবনায় ফেলেছি এ কদিন। আবার যখন এ চিঠি পাবে, আমি অনেক দূরে চলে গিয়েছি। সবার নাগালের বাইরে। এ জীবনের আর কোনও আকর্ষণ নেই আমার। ভালোবাসা, বিয়ে এ সব এখন আমার কাছে ইল্যুশন মাত্র। যেন বিকৃত মস্তিষ্কের অসংলগ্ন প্রলাপ। তুমি আমার হবু স্বামী আমাকে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলে। অথচ আমাকে তোমার বাড়িতে আশ্রয় দিতে পারলে না। ভালোবাসার চেয়েও কনফারেন্স, কেরিয়ার লোকভয় বাবা-মায়ের ভয় সমাজের ভয় জোরালো হলো তোমার? অবশেষে ইভা আন্টির বাড়িতে অনধিকার বাস করতে করতে একদিন ভাবলাম বাড়ি ফিরে গিয়ে আবার বাবার মুখোমুখি দাঁড়াই, গেলাম ফিরে। সেখানে গিয়ে দেখলাম আর এক তামাশা। বাবা আর চার্লস তাদের বিয়ে সম্পন্ন করে ফেলেছে আগের দিন, ভাবতে পারো? দরজা খুলে আমাকে দেখে বাবার সে কি উচ্ছ্বাস। আমাকে জড়িয়ে ধরে বললো ‘আই অ্যাম সো ডিলাইটেড টু সি ইউ ব্যাক হোম, মাই চাইল্ড। চার্লস অ্যান্ড আই আর গোয়িং এ্যাউয়ে ফর ফিউ উইকস। ইউ হ্যাভ দ্যা হাউস অল টু ইউর সেলফ। লুক আফটার দা হাউস। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ওরা বেরিয়ে গেলো। আমার মাথায় বাজ ভেঙ্গে পড়লো। কী করে তোমাদের সকলকে মুখ দেখাবো? কী করে বন্ধু বান্ধবদের কাছে বলবো আমার বাবা সমকামী আর এক সমকামীকে বিয়ে করে এখন হানিমুনে গেছে। তোমার বাবা মা সব শুনে হয়তো আমাদের এনগেজমেন্টটা ভেঙ্গে দিবেন। আই ডোন্ট ওয়ান্ট টু ফেস দিজ লাইফ এনি মোর। ইফাত প্লিজ প্রমিস মি, আমার শেষ অনুরোধ আমার বাবার ঘটনাটা আমাদের বন্ধু-বান্ধবদের কাছে গল্প করো না। তোমার বাবা ও পরিবারের আত্মীয় স্বজনকে ইভা আন্টিকে এই লজ্জার কথা বলে আমার স্মৃতিকে হেয় কোরো না। ইফাত স্তম্ভিত হয়ে বসে রইলো কিছুক্ষণ। তারপর গাড়ি নিয়ে ছুটলো ভিক্টেরিয়ার বাবার বাড়ি। সেখানে পৌঁছে দেখতে পেলো কয়েকজন পাড়া প্রতিবেশী জড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ওদের বাড়ির দরজায় অনেকগুলো পুলিশের গাড়ি আজ নাকি একটু আগেই ওর মা পুলিশকে ফোন করে মেয়ের নিখোঁজ হওয়ার রির্পোট করেছিলেন। পুলিশ দরজা ভেঙে ভিতরে ঢুকে তাকে আবিষ্কার করে ছিলো। অতিমাত্রায় ঘুমের ঔষধ খেয়ে পরম শান্তিতে তখন ঘুমিয়ে ছিলো ভিক্টোরিয়া।
ফাইজা ও ইফাত বসে রইলো মুখোমুখি। অনেকক্ষণ পর নিরবতা ভেঙে ফাইজা বললো, তুমি কি নিজেকে দোষি ভাব এই পরিণতির জন্যে? ইফাত বললো, আমি এতো বছর ধরে এই পরিণতির সমস্ত দায়িত্ব নিজের ঘাড়ে তুলে নিয়ে বসে আছি। জীবম্মৃত হয়ে আছি আমি। সে দিন আমার সাহসের অভাব ছিলো ঠিকই নিন্তু কেন সে আমাকে এত বড় শাস্তি দিয়ে গেলো। নিজেকে দায়ী মনে করো না ইফাত ফ্রি এজেন্ট হিসেবে আমরা প্রত্যেকেই আমাদের জীবনের গতি বেছে নেই। পারিপার্শ্বিকের রোল তাতে বড় একটা থাকে না।
সন্ধ্যের দিকে ফারিয়া রান্নাঘরে কাজ সারতে সারতে ভাবছিলো গত সপ্তাহে ইফাত সিডনি ফিরেছে। এর মধ্যে একটা ফোন তো করতে পারতো অন্তত। বুকের ভিতরটা মুচড়ে উঠলো তার। গত দশ বছরে ইফাত নিজেকে বড় বেশি গুটিয়ে নিয়েছে। বাবা মায়ের কাছ থেকেও অনেক দূরে সরে গিয়েছে। রাতারাতি বদলে গেলো ছেলেটা। কোথায় গেলো সেই প্রাণবন্ত উচ্ছ্বাস, খোলা মেলা স্বভাব। কীসের অভিমানে কে জানে? ভিক্টোরিয়াকে বিয়ে করতে তারা তো কেউ কোন দিনই বাধা দেইনি। তবু কেন হতভাগ্য গেয়েটা ওই কা- করে বসলো তা এখনও রহস্য ফারিয়া ও ফুয়াদের কাছে। এই প্রসঙ্গে ইফাত কোনদিন একটি কথাও বলেনি। ঠিক সেই সময়েই ফোনটা বেজে উঠলো। হ্যালো ইফাত কী আশ্চর্য, এক্ষণি তোর কথায় ভাবছিলাম যে অনেকদিন বাঁচবি। মা কেমন আছো, বাবা কেমন আছে? আমরা ভালো আছি। তোর বাংলাদেশ সফর কেমন হলো। পুরো ছয়মাস থেকে এলি? ভালো হলো মা, তোমাকে একটা খবর দেবো। যদিও তুমি হয়তো শুনে খুশি হবে না। ফারিয়া উদ্বিগ্ন হয়ে হললো, কী খবর কী হলো? মা আমি এবার সত্যিই বিয়ে করছি বাংলাদেশের মেয়ে ঢাকায় থাকে। বিয়ে করছিস ঢাকার মেয়ে, ফারিয়া তার উদ্বেগ সহসা বেড়ে ওঠা হৃৎস্পন্দনে টের পেলো, তোর খালামনি তো কই কিছু বললো না। কালইতো কথা হলো। কাকে বিয়ে করছিস? মা তুমি চিনবে না তাকে। একটা অনাথ আশ্রমে লেখাপাড়া করায়। শিক্ষিকা, দেখতে শ্যামলা অতি সাধারণ। থাক গে সুন্দর কী হয় বাবা? আসল হলো মানুষের মন ব্যক্তিত্ব, এমুবিএ করেছে হঠাৎ বিষম খেলো ফারিয়া, কাশতে কাশতে বললো শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি দিয়েই মানুষের শিক্ষা মাপা যায় না। মা ফাইজা জীবনের তের বছর বয়স পর্যন্ত অনাথ আশ্রমে ফাটিয়েছে। ও জানে না, ওর আসল বাবা মা কে। নাকি ও বাস্টার্ড। শুনেছি ডাস্টবিনের মধ্যে জীবন্ত কে যেন ফেলে দিয়েছিলো তাকে আশ্রমের পাশে। পরে আশ্রমের বাচ্চারা খেলতে গিয়ে তাকে দেখতে পেয়ে উদ্ধার করে নিয়ে আসে সেই থেকেই আশ্রমে বড় হয়। ফারিয়া মনে মনে চোখ বুজলো। কী আশ্চর্য ইফাত কী মায়ের ধৈর্য পরীক্ষা করছে। নাকি মায়ের প্রতি বহু বছর পুষে রাখা আক্রোশ এইভাবে ব্যক্ত করছে মাকে জব্দ করতে কিংবা হয়তো সেই ছোটবেলার মতো মাকে ঠাট্টা করে খেপাতে চেষ্টা করছে ছেলে। ইফাত বলেই চলেছে। তা সত্বেও জানো মা ওই মেয়ের কি তেজ! কোনও মতেই আমাকে বিয়ে করতে রাজি হচ্ছিলো না। কেন? ফারিয়া এবার রেগে উঠলো কেন? তোর কি নেই শুনি? ধন সম্পত্তি, সম্ভ্রান্ত বংশ সুন্দর চেহারা উচ্চশিক্ষা…
মা ফাইজার কাছে এসবের কিছুর মূল্য নেই সে পরোয়া করে না। আমার ধন সম্পদ আভিজাত্যের সুন্দর চেহারার। আশ্চর্য কি স্পর্ধা। স্পর্ধাই হয়তো ইফাত শান্ত স্বরে বললো ওর জীবনের সমগ্র সুখ স্বপ্ন, সম্পদ শিক্ষা মূল্যবোধ কতগুলো চাল চুলোহীন ছন্নছাড়া অনাথ ছেলেমেয়েদের ঘিরে। আমাকে স্পষ্টই জানিয়ে দিলো যদি কেউ ওর মিশন ভাগ করে নিয়ে ওর পাশে দাঁড়ায় ওর আশ্রমের বাচ্চাদের সুখ-দুঃখের সাথী হতে পারে তাকেই সে বিয়ে করার কথা ভেবে দেখবে। তা তুই তাকে বিয়ে করার আগে একটু ভেবে দেখিস। অনেক ভেবেছি মা। ভেবে চিন্তে বহু কষ্টে রাজি করিয়েছি। একটু থেমে আবার বললো ইফাত, ভিক্টোরিয়াকে হারিয়ে জীবনটা বড় ফাঁকা হয়ে গিয়েছেলো। কেবল মনে হতো কতগুলো তুচ্ছ সামাজিক কুসংস্কারের জন্যে একটা সুন্দর জীবন অকালেই হারিয়ে গেলো। আমিই হারিয়ে ফেললাম। নিজেকে কিছুতেই ক্ষমা করতে পারছিলাম না। ফাইজার সঙ্গে দেখা হওয়ার পর সেই অপরাধবোধ থেকে আমি মুক্তি পেয়েছি। এবার মনে হচ্ছে নতুন করে হয়তো আমার জীবনের মানে খুঁজে পাবো।
শীতের এক অলস দুপুরে একা বাড়িতে ইভা খবরের কাগজ নিয়ে গা এলিয়ে দিয়েছিলো বসার সোফায়। ঘুম জড়িয়ে এসেছিলো দুচোখে। হঠাৎ ডোর বেল টিপলো কে যেন, দরজা খুলে আকাশ থেকে পড়লো। আগন্তক সহাস্যে বললো, কী চিনতে পারো ? ইভা প্রায় শ্বাসরোধ করে বললো ইফাত, কী আশ্চর্য! মুচকি হেসে ইফাত বললো যাক চিনেছো তাহলে। ভিতরে আসতে পারি। একটু কথা ছিলো বেশিক্ষণ সময় নিব না। তোকে দেখছি কত বছর পরে, ধীরে সুস্থে বসে ইফাত বললো, ঠিক দশ বছর তিন মাস আর সতেরো দিনপর। সেই যে রাতে ভিক্টোরিয়া চলে গিয়েছিলো এখান থেকে, তারপর আর দেখা হয়নি। ঘরের চার পাশে চোখ বুলিয়ে নিয়ে সে আবার বললো খুব একটা চেঞ্জ হয়নিতো ঘরটা। তুমিও সেই রকমই সুন্দর আছো। টাইম হ্যাজ নট টাচড ইউ মাচ। কী যে বলিস ইভা লাজুক হাসলো কত বুড়ো হয়ে গেছি। কিন্তু তুই কী সুন্দর হয়েছিস ইফতি আর কি সাঙ্ঘাতিক বাংলা বলছিস। কুশল বিনিময় ও কিছুক্ষণ পোশাকি কথাবার্তার পর ইফাত বললো। এবার আমি যাই? জানি না তোমার সঙ্গে আর দেখা হয় কিনা হয়। ইভা আশ্চর্য হয়ে চেয়ে রইলো আন্টি আমি তোমার কাছে বিদায় নিতে এসেছি। বিয়ের পরেই আমি ও ফাইজা বাংলাদেশ চলে যাব। ফর গুড। সেখানেই এপোলো হাসপাতালে কাজ করবো আমি আর একটা অনাথাশ্রমে আমরা দুজনের একসঙ্গে। পকেট থেকে একটা খাম বের করে ইভার দিকে এগিয়ে দিলো সে, ভিক্টোরিয়ার শেষ চিঠি। আমাকে লেখা তোমাকে খুব ভালোবাসতো। জীবনের শেষ কটা দিন তোমার কাছেই তো কাটিয়ে গেলো। তাই ভাবলাম এই পৃথিবী থেকে চিরদিনের মতো চলে যাওয়ার আগে ওর মনে যে ঝড় উঠেছিলো তার উৎস ঠিক কোথায় ছিলো সে জানার অধিকার তোমারও আছে। চিঠিটা পড়ে পুড়িয়ে দিও প্লিজ আর কারও হাতে যেন না পড়ে এই চিঠি। দিনের শেষে খাওয়া দাওয়ার পরে বিছানায় আশ্রয় নিয়েছে সবাই। এলোমেলো অনেক স্মৃতির ভার মাথায় নিয়ে ইভাও শুয়ে পড়লো। সে রাতে অরফিউজকে স্বপ্ন দেখলো ইভা প্রেতলোক অতিক্রম করে এগিয়ে আসছে জীবন্ত মানুষের মাটিতে হার্প বাজাতে বাজাতে অপূর্ব সেই গানের মুর্ছনা। পিছনে তাকে অনুসরণ করে আসছে সর্বাঙ্গ মসলিনের ঢাকা এক তন্বী অরফিউজ। ইভা ঘুমের ঘোরে ব্যাকুলভাবে বলো উঠলো পিছনে তাকিও না, আবার তোমার প্রেয়সীকে হারিয়ে ফেলবে। সামনে তাকাও শুধু সামনের দিকে এগিয়ে এসো। প্রশান্ত হাসিতে উজ্জ্বল হয়ে এগিয়ে চলেছে অরফিউজ। অবগুণ্ঠিতা তন্বী এবার শক্ত করে চেপে ধরলো ওর সাদা উত্তরীয়। হার্প বাজাতে বাজাতে অরফিউজ আরও এগিয়ে এলো ইভার দিকে। অরফিউজ নয় ইভা দেখলো ইফাতের হাত ধরে রহস্যময়ী মন্থর গতিতে উঠে আসছে আবার জীবিতদের মাঝে।