গল্প:এক চোর ও নাস্তিকের গল্প

গল্প:এক চোর ও নাস্তিকের গল্প

এক চোর ও নাস্তিকের গল্প
স্বাতী চৌধুরী

এক গাঁয়ে এক মৎসজীবি বাস করতো। মূলত সে মৎসজীবিও ছিল না। সে ছিল একজন তস্কর। সে বড়শিতে পচা পুটিঁমাছের টোপ গেঁথে একটি কাঠির সাহায্যে নদীর মাঝখানে ছুড়ে মারতো। তারপর বড়শির সুতোটা নিজের হাতে প্যাঁচিয়ে সুর্যাস্তের বর্ণিল আভা ছড়িয়ে থাকা নদীর ঘাটে একটা চটের আসন পেতে বসে থাকতো। যে সময়ের কথা বলা হচ্ছে সেই সময়ে দৃশ্যটা এরকম ছিল যে,বড়শি নদীতে ফেলে সে বসে থাকে তো বসেই থাকে।অসীম ধৈর্য তার। সেই ধৈর্যের ফলে মাঝে মাঝে সেই পচা পুঁটির লোভে একেকটা দশাসই বোকা বোয়াল টোপ গিলতে এসে আটকে যায়। লোকজন দেখে ধন্য ধন্য করে। কিন্তু এসবই তার আই ওয়াশ। তবে মাছের টোপ ফেলে বসে থাকার ধৈর্যের মতো আরেকটা কাজেও সে ধৈর্যের পরীক্ষা দেয় এবং তাতেও তার সফলতা কম নয়। আসলে ভালো মন্দ সবকাজেই ধৈর্যের প্রয়োজন হয় কিন্তু নিজেকে চালাক মনে করা লোকগুলো মন্দকাজেই এর প্রয়োগ করে। সে কথা থাক।ঐ লোকটি সম্ভবত টোপ ফেলতেই ওস্তাদ এবং সবখানেই টোপ ফেলে কাজ করতে পছন্দ করে। সে করে কি সকাল দুপুর আচম্বিতে কারোর না কারোর বাড়িতে হাজির হয়। বলে-” যাচ্ছিলাম এদিকে। মনে হলো একটু দেখে যাই। ” আসলে দেখে যাওয়া মানে একথা সেকথার ছুতোনাতায় কার ঘরে কি আছে জেনে যাওয়া বা ইতিউতি চেয়ে সত্যি সত্যি দেখে যাওয়া।সে লোকজনের বাড়িতে বসে তাদের সুখদুঃখের খবর নেয়।তার মাছ ধরার গল্প বলে।সে বলে মস্ত বড় বোয়ালগুলোকে কি করে সে বাগে আনে।কখন কি ধরণের টোপ দিতে হয়,কি করে বোয়ালদেরকে টোপ গেলাতে হয় তারপর সেই এক একটা বোয়াল মাছ বেঁচে কত টাকা পায় তার গল্প এমনভাবে করে,যে শ্রোতা যারা,তাদের নেশা ধরে যায়।তারা প্রশ্নহীনভাবে তাকে সঙ্গ দেয়।তাদের সুখদুঃখের গল্পের পাশাপাশি কতগুলো ধান তুলেছিল,বছরের খোরাকী রেখে কতটাকার ধান বেঁচেছে বা কেউ তার বলদ বা বকরী বেঁচে কত টাকা পেয়েছে কিংবা ছেলের বিয়েতে সোনাদানা কী পেয়েছে সব বলে দেয়। এভাবে সব তথ্য জেনে নিয়ে লোকটি খুশিতে ডগমগ হয়ে চলে যায়। তারপর সেদিন বা তারপরদিন রাতের বেলা সেইসব বাড়িতে কে যেন সিঁদ কেটে ঘরে ঢুকে সব হাপিস করে দেয়।যাদের বাড়ি টাকা-পয়সা.সোনাদানা বা তৈজসপত্র নেই সেসব বাড়ির গাছের ফলপাকুড় বা সবজি লুটে নিয়ে যায়।অনেকদিন এভাবেই চলছিল। এমন সেয়ানা চোর যে কারো হাতে ধরা পড়েনি। কিন্তু নিত্ নি্‌ত্ চোরের আর একদিন সাউধের বলে এক কথা আছে না? সেই সাউদের একদিনে সে ধরা পড়ে। সেদিন সেই গেরস্থ বাড়ির লোকেরা তক্কে তক্কে ছিল। যেইনা ব্যাটা সিঁদ কাটা ফোঁকড় দিয়ে ঘরে ঢুকবার জন্য মাথা গলিয়েছে অমনি কপাত করে তারা তাকে ধরে ফেলে যেমন করে সে তার বড়শিতে আটকে পড়া বোয়াল মাছকে ধরে। ধরার পর ওকে উঠানে এনে বাতির আলোয় তারা দেখে যে- চোর সে আর কেউ না, তাদেরই গায়ের লোক বাজেস্টর।
আরে বাজেস্টর তুইই তবে এতদিন ধরে এই অপকর্ম করে আসছিস ! বলি এজন্যই বুঝি বাড়িতে বাড়িতে এসে এত খাতির জমাস তুই? ব্যাটা চোরের ঘরের চোর!তোর একদিন কি আজ আমাদের একদিন! চোর চোর চিৎকার শুনে ততক্ষণে রাতদুপুরে ও আশেপাশের বাড়ি থেকে অনেক লোক জড়ো হয়ে গেছে।
উপস্থিত লোকজনের কেউ বললো, ওরে কে আছিস দড়ি আন।কেউ বলে ওকে সারারাত এই গাছে বেঁধে রাখো। কাল সকাল হলে পুলিশে দিতে হবে।
পুলিশের কথা শুনে বাজেস্টর হাউমাউ করে কান্না জুড়ে দেয়।কাঁদদত কাঁদতেই নাক কান মুলে। আর কখনো কারো বাড়ি চুরি করবে না বলে অঙ্গীকারও করে।
সবাই বলে, বাবা তোরেও বিশ্বাস? তুই হলি বাজেস্টর। আহারে তোর মা যদি বেঁচে থাকতো আজ। কত সখ করে তোর নাম রাখছিল বাজেস্টর। তোর বাপ তোরে স্কুলে পড়তে দিল। পড়াশোনা করে বাজেস্টর হবি বলে। তা পড়াশোনা না করছিলি,বাজেস্টরও না হলি, তাই বলে চোর হলি?যা এখন পুলিশ এসে তোকে ধরে নিয়ে যাবে তারপর আসল বাজেস্টর তোর বিচার করবে।এমন কথা শুনে উপস্থিত ছেলে ছোকড়ারা হিহি করে হাসে। আর ইতোমধ্যে যাদের বাড়ি চুরি হয়েছিল তারা রাগে গজরায়। আমার ধান বিক্রির আড়াইহাজার টাকা ঐ হারামজাদা ‍চুরি করে নিল রে- একজন বলে আমার ছেলের বউএর সোনার কানের দুল, রূপার নেকলেস সব নিছে গো এই বাজেস্টর চোরে। ওরে তোমরা ছাড়বে না। ওরে জেলে দাও । ও জেলে বসে বোয়াল মাছ মারুক।
হ্যাঁ তাই করা উচিত। ওকে আমরা ছাড়বো না। ততক্ষণে জোয়ান ছেলেরা দড়ি দিয়ে শক্ত করে গাছের সাথে বেঁধে ফেলে তাকে। আর হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে সে সকলের হাতে পায়ে ধরার কথা বলে।
তার কান্না শুনে ঐ বাড়ির বৃদ্ধার খুব মায়া হয়। তিনি বলেন,তোমরা ওকে ছেড়ে দাও নারে বাপ ।
বলেন কি গো মুরুব্বি?একটা চোরকে হাতে নাতে ধরে ছেড়ে দেবো?তাহলে যে আরো কত লোকের সর্বনাশ করবে সে।
সে করতেও পারে তবু ভালো হওয়ার একটা সুযোগ তো কাউকে দেয়া যেতে পারেই। কি বলো ? এখনতো আমরা তাকে চিনে নিলাম যে সে চোর।তাই আমাদের এখানে চুরি করা তার জন্য আর সহজ হবে না।
বৃদ্ধার এমন প্রস্তাবে প্রায় সকলে ক্ষুব্দ হলেও ছেড়ে দেয়া হলো তাকে।
এরপর সত্যি নিজের গ্রামে চুরি করা ছেড়ে দেয় সে।তবে চুরি করা নাকি ছাড়ে না।ইদানীং প্রায়ই আশেপাশের গ্রামগুলোতে চোরের উপদ্রব বেড়েছে বলে খবর আসে। সেইসব গ্রামের কোনো এক গ্রামে এগ্রামের কারো একজনের আত্মীয়বাড়ি থাকার সুবাদে সেখানে গিয়ে সে বাজেস্টরকে দেখতে পায়।দেখে কি সে এক বাড়ির লোকের সাথে জমিয়ে গল্প করছে। কেন ঐসব গ্রামে চুরি বেড়েছে সেকথা বুঝতে আর বাকী থাকে না কারো। কারোর মুখে তো চুলবুল করে যে ঐসব গ্রামে গিয়ে সব বলে আসে। কিন্তু গায়ে যখন চুরি থেমে গেছে তো কাজ কি আর নাক গলিয়ে ? নিজেরা শান্তিতে থাকলেই হলো।

বাজেস্টরের পাশের বাড়িতে যার বাস সে একজন নাস্তিক।তার একটা নাম আছে ।পরশ। কিন্তু পরশকে গ্রামের লোক ঐ নামে না ডেকে নাস্তিক নামে ডাকে।অনেকদিন ধরে তারা তাকে একঘরে করে রেখেছে। কারনটা হলো সে উপাসনালয়ে টাকা দেয় না।সমবেত উপাসনায় যায় না।ওরা যখন বলে ব্যাটা অবিশ্বাসী!তার দয়ায় খেয়ে পরে আছিস অথচ তার নামে টাকা দিতে হিসাব করস ? তখন যুক্তি হিসেবে সে বলে,আমি যদি টাকাপয়সার জন্যই তার উপাসনা করবো তবে আর তার নামে টাকা দেবো কেন ? তার মানে কি তিনিও মানুষের মতো ঘুষ খান?তাকে ঘুষ দিলেই তবে তিনি আমাকে দয়া করবেন ? কিন্তু তোমরা বলো যার কাছে চাইলেই হাজার হাজার অনন্তকোটি টাকা, সোনাদানাসহ জাগতিক ভোগের উপকরণ পাওয়া যায় সেই তিনি কি তোমার আমার দুটো পাঁচটা টাকার জন্য বসে থাকেন?নাকি তার সুন্দর পরিপাটিী ভজনালয় আমরা নির্মাণ করে দেবো- সেই আশায়ও বসে থাকেন?আমি ভাইসব এসব বিশ্বাস করি না।সারা দুনিয়ার মালিক যদি তিনি হন তবে তাঁর দেয়া টাকা বা সম্পদ থেকে আবার আমি কেন তার নামে টাকা দেবো?আর সবচে বড় কথা তিনি আমাকে এমন কিছুই দেন,যা দিয়ে আমি আমার নিজের খাবারই জোটাতে পারি না !

এজন্যইতো পারো না হে।যে তুমি অবিশ্বাসী।তোমার পরিণতি তাইতো হবে।এজাতীয় কথা শুনে পরশ খুব করে হেসে নেয়।তারপর পাল্টা প্রশ্ন করে-আসলে তাই বুঝি?তা তোমাদের মাঝে কি এমন কেউ নেই,যাদের- -একবেলারও খাবার জোটেনা বলে,দুবেলা উপোস দিতে হয় বা মানুষের কাছেই হাত পাততে হয় কিংবা চুরি করতে হয় ?আছে তো ?তাহলে আর তোমাদের সাথে আমার কি তফাৎ বলো ?
তারা উত্তর দিতে পারে না। কিন্তু তারা চটে যায়। চটে লাল হয়ে যায় সদ্য নিভে যাওয়া চুলার ভেতরের দেয়ালগুলোর মতো।আর তার আগুনের গণগণে তাপে পরশকে দগ্ধ করতে গিয়ে তাদের চোখ মুখ গাল লাল হয়ে যায়।
পরশ তাও হাসে ।হাসতে হাসতে বলে,আরে চটো কেন?তোমরাই বললে আমি অবিশ্বাসী বলে খাবার জোটে না।অথচ আমি কখনো তোমাদের কাছে হাত পাতিনি বা কোথাও চুরি করতে যাইনি।কিন্তু তোমাদের বিশ্বাসীদের অনেকেই আমার থেকে খারাপ অবস্থায় থাকো বলে,হাত পাতো অন্যের কাছে।আর এই যে বাজেস্টর সেও বিশ্বাসী তাই না?পরশ আর কিছু বলে না।কিন্তু সে রাতে তার ছাগলটা চুরি হয়ে যায়।পরশের বউ ছেলেমেয়েদের কত স্বপ্ন পরিকল্পনা ছিল এই খাসী ছাগলটা নিয়ে।একজন খদ্দের বলেছিল দুদিন পর এসে ভালো একটা দাম দিয়ে কিনে নিয়ে যাবে।ওরা হিসেব করেছিল কমসে কম আড়াই তিনশ টাকা পাবেই পাবে।সেই টাকায় কি কি করা যায় আলোচনা পর্যালোচনা করে একটা তালিকাও তৈরি করেছিল তারা।
শেষপর্যন্ত পরশের বউবাচ্চাও তার প্রতি অভিযোগ আনলো যে, তার অবিশ্বাসের ফলে আজ এই ছাগল চুরি গেছে।তাদের বাড়া ভাতে ছাই পড়েছে।উঠতে বসতে পরশের উপর শাপ শাপান্ত করে তারা।আর আতংকে কাঁপে।আরো কত লানত যে আছে কপালে আর সে লানত নেমে এসে কখন যে আরো বড় বিপর্যয় ঘটিয়ে দিয়ে যাবে সেই অজানা আশংকা ও কল্পনায় সারাক্ষণ মরার আগেই মরে থাকে তারা।
দেখো তোমার পাপে আমাদের কত লানতের জীবন।বাচ্চাগুলোকে চাইলেও একটু ভালেমন্দ খাওয়াইতে পারি না পযর্ন্ত। তাতেও কি তোমার হেলদুল নাই?একদিন তার বউ রাগে দুঃখে এরকম অনেক বড় বড় কথা বলল তাকে। তাতেও সে হাসে।আর বলে কি মজা বলো তো দেখি!
কি মজা ?
বউ এর প্রশ্নের উত্তরে সে বলে দেখলে তো-তোমাদের বিশ্বাসের জোর থেকে আমার অবিশ্বাসের জোরই বেশী!
এমন উত্তরে পরশের বউ বড় বড় চোখ করে কেবল তার দিকে চেয়ে থাকে।সে চোখে রাগ,ভয় আর বিস্ময় যেন একসাথে থমকে আছে।
পরশ বলে এটা আমার কথা নয়তো!তোমাদের বিশ্বাস ও বাক্যের জোরে বলছি। আচ্ছা এবার তুমি আমার প্রশ্নের উত্তর দাওতো দেখি-যে অবিশ্বাসী আমার একার পাপে যদি তোমাদের উপর বা আমাদের সংসারের উপর লানত নেমে আসে তবে তোমাদের এতগুলো বিশ্বাসীর বিশ্বাসের কি মূল্য রইলো ?
রইলো না তো ? এবার আর একটা কথা বলি শোনো-যদি তোমাদের বিশ্বাসের জোর বেশী হতো তবেতো আমার একলার অবিশ্বাসের পাপ মুছে দিয়ে সংসারে নেমে আসা লানতকে তাড়িয়ে দিতে পারতো।তাই নয় কি?কিন্তু তাতো পারল না।বরং আমার অবিশ্বাসের জোর তোমাদের বিশ্বাসের শক্তিকে নিঃশেষ করে দিল।কথা শেষ করে পরশ হাহা করে হাসতে থাকে যেন তার হাসি দিয়ে সে সকলের মনের সব দূর্ভাবনা,দূর্যোগ উড়িয়ে দেবে।
তার বউবাচ্চা তবু মুখ ভার করে থাকে।তাই সুযোগ পেয়ে সে বলে,না হয় একটা ছাগল চুরি গেছে।ওটা বেচে কি কি যেন কেনার পরিকল্পনা তোমরা করেছিলে।তাইতো ?শোনো বাছারা,ওগুলো খুব দরকারি জিনিস নয়।দেখো আমাদের অভাব অনটন আছে;তবু যা খুব দরকারি,না থাকলে বাঁচা যায় না,চলা দায় হয়ে পড়ে সেসবতো আমরা কোনোরকমে জোগাড় করতে পারি।নাকি?তা আমাদের আরো দুটো ছাগলের বাচ্চা আছে না?ওগুলোকে খুব যত্ন করে লালন করো।মাত্র তিনচার মাসের কারবার।দেখবে ঠিক বিক্রয়যোগ্য হয়ে যাবে।আর বারবার নিশ্চয় চোর এসে নিয়ে যাবে না।আসলে সেদিন সকলের সাথে এক চোরকে বকা দিয়েছিলাম,তাইতো সেই চোরের খুব অপমান লেগেছে। তাতেই সে বদলা নিতে তোমাদের ছাগলটা চুরি করে নিয়েছে।ওটা ঈশ্বরের কাজ নয়রে বাবারা।তিনি নিশ্চয় এত পচা কাজ করবেন না যে,আমাকে শাস্তি দিতে গিয়ে তোমাদের মতো ছোট বাচ্চাদের কষ্ট দেবেন তাই না?আর ঈশ্বর যদি থাকেন সে আমি স্বীকার করলেও তিনি আছেন।না করলেও তিনি আছেন।আমার মতো তুচ্চাতিতুচ্চ কারো একজনের স্বীকার অস্বীকারে তার কিচ্ছু এসে যায় না যে তিনি আমাকে শাস্তি দিতে উঠে পড়ে লাগবেন।কারন ঈশ্বর নিশ্চয় থানার বড়বাবু নয় কিংবা গুন্ডাদের সর্দার নয় যে প্রতিহিংসার মন নিয়ে বসে থাকবে।
ছোট ছেলেটা বলে বাবা আমি কত শখ করেছিলামা যে-
বাবারে তোমার শখতো শখ,আমি বলেছি দরকারের কথা ভাবো।ভাবো যে,আমাদের পেছনের বাড়িতে যারা থাকে সে বাড়ির ছোট মেয়েটার কথা।যে তোমার বয়সী।অথচ শুধুমাত্র দুটো ভাত খাওয়ার জন্য কতদূরের ঢাকা শহরে লোকের বাড়িতে কাজ করবে বলে,মাবাবা ভাইবোন খেলার সাথী সকলকে ছেড়ে চলে যেতে হয়েছে।আর তোমরা ভাবো,পুকুরপাড়েরে ঐধারে যারা থাকে,তাদের বাড়ির ছেলেটা দুটো ভাতের জন্য রাস্তায় রাস্তায় বাদাম বেচে।তুমি কি তাদের থেকে ভালো আছো না? তাহলে যার যা আছে তা নিয়েই খুশি থাকা উচিত। কি বলো?
ঠিক আছে বাবা।আমি বুঝেছি। আমি আর মন খারাপ করবো না।

এইতো আমার লক্ষী ছেলে।ছেলেকে আদর করতে করতে পরশ এবার বউকে উদ্দেশ্য করে বলে,ঐ ছেলেমেয়ে দুটির মা বাপ কিন্তু বিশ্বাসী।সেটা জানোতো ?
বউ কোনো উত্তর দেয়না।চুপ করে থাকে। পরশ হাসতে হাসতে ঘর ছেড়ে নিজের কাজে বেরিয়ে যায়।

বাজেস্টর এখন আর সূর্যাস্তের রঙ্গীন আলোয় নদীর চরে বসে বোয়াল মাছ ধরার জন্য বড়শী ফেলে না।সেদিনের পাঁচটাকা দামের বোয়াল মাছ এখন বাজারে পাঁচ সাত হাজার টাকায় নীলামে ওঠে। জেলেরা এখন আর সে মাছ বিক্রি করেনা।যারা বেঁচে তারা ধরে না।তারা মধ্যসত্বভোগী।যে ধরে তার কাছে থেকে চার পাঁচ হাত বদল হতে হতে সে বোয়ালের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ে।তাতে বাজেস্টরের কপালে চোখ উঠে না।বাজারের মস্ত মুদি ব্যবসায়ী তার বড় ছেলে,মোবাইল তুললেই নীলামের বোয়াল তাদের কিচেনে চলে আসে।শুধুতো বোয়াল নয়,রুই,কাতলা,চিতলসহ যত বড় ছোট দামী মাছ আছে,সব আসে।
বাজেস্টরের ছেলেরা কেউ কন্ট্রাকটর,কেউ ভূষি মালের আড়তদার,কেউ মিলের মালিক।কেউ গাড়ীর মালিক।সকলে কানাঘুষা করে-বাজেস্টর মানুষের ঘরে সিঁদ কাটতো আর এখন তার ছেলেরা মানুষের ভাবের ঘরে সিঁদ কাটে।তার ছেলেদের কেউ বাটখারায় মারে,কেউ তেল মসলায় ভেজাল দেয়।কেউ সিমেন্ট এর বদলে বালি মিশায়।তাতেই তাদের ছোটবেলার ভাঙা ঘরের জায়গায় এখন তিনতলার সুসজ্জিত বাড়ি।মাঠ ভর্তি জমি।গোলা ভর্তি ধান।ধন সম্পদ উপচাইয়া পড়ে।তাদের মা প্রহরে প্রহরে ঈশ্বরের কাছে নতজানু হয় আর কৃতজ্ঞতা জানায়।যখনই তাদের পরিবারে কোনো একটা নতুন ব্যবসার পত্তন হয় বা জায়গা জমি কেনা হয়, তার মা বলে, ওরে তোরা আগে সেই উপরালার নামে কিছু কর-যার দয়ায়,তোদের এই বাড়বাড়ন্ত।ছেলেরা মায়ের কথা শোনে।তারা বাড়িতে উপসনালয় তৈরি করে।গ্রামে,শহরে,পাড়ায়,মহল্লার উপাসনালয়ে নতুন কিছু তৈরি করে দেয়।নাহয় উপসনালয়ের নামে টাকা পয়সা দান করে।অনাথদের বৎসরের কোনো একদিন ভালো মন্দ খেতে দেয়।লোকজন তাতেও ধন্যধন্য করে।
আরে গো যেমন করেই করুক,ইশ্বরের অসীম দয়া এদের ওপর।তা নাহলে কি এরকম ফুলে ফেপে ওঠে কেউ?যত যাই কও ঈশ্বরের দয়া না হলে কিছু হয় না।আমরা কি কম পরিশ্রম করি?নাকি বুদ্ধি কিছু কম আছে আমাদের ?
তাইতো ।তাইতো। কিন্তু শালার ইশ্বর কেনে যে আমাদের দয়া করে না ?কেন করে না ?
সেটাই তো বুঝি নাগো ?
বাজেস্টরও আজকাল সফেদ পাঞ্জাবী পড়ে ।হাতে জপের মালা।তার মুখ থেকে,কপাল থেকে,চুল থেকে কিসের যেন জ্যোতি নাকি জৌলুস ঠিকরে ঠিকরে পড়ে।কিছু মানুষ ভুলে যায় সেইসব দিনের কথা।তারা বাজেস্টরকে মুগ্ধ হয়ে দেখে। সমীহ করে।কেউ কেউ ভুলে না।কিন্তু তারাও বাজেস্টরের সৌভাগ্যে গোপন ঈর্ষায় কাতর হয় আর ঈশ্বরকে অভিশাপ দেয়।শুধু পরশ নামের অবিশ্বাসী লোকটা বাজেস্টরকে আগে যেরকম চোখে দেখতো এখনো তাই দেখে।কারন এতদিনেও তার দেখার চোখটা বদলায়নি।যেমন বদলায়নি তার নিজের সময়ের মতো ছেলেদের সংসারের টানাপোড়নেরও । একটা বদল হয়েছে অবশ্য।পরশের অবিশ্বাসের জন্যই সংসারের এই লানত একথা বলার জন্য তার বউ আজ আর বেঁচে নেই।