গল্প: আলোর খোঁজে

গল্প: আলোর খোঁজে

আলোর খোঁজে
সংঘমিত্রা রায়

( এক )

” বাবা বিনায়ক কাকা নাকি এখানে আসছেন !”

” কে বিনায়ক?”

” তুমি ভুলে গেলে ! তিনি তো শুনেছি তোমার ভালো বন্ধুছিলেন । ঔ অভীকের কাকু । যিনি দিল্লিতে থাকতেন । এরপরআমেরিকায় চলে গিয়েছিলাম ।”

” কিসের বন্ধু রে বাবা ! মানুষের সামাজিক অবস্থানের সঙ্গেবন্ধুত্ব শেষ হয়ে যায় । আমি প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক আর বিনায়কসরকারী অফিসের ইঞ্জিনিয়ার । একমাত্র ছেলে আমেরিকার বড়কোম্পানিতে চাকরি করে । এরকম লোকের সঙ্গে কি বন্ধুত্ব হয় ! একসময় আমার সঙ্গে পড়েছে প্রাইমারি স্কুলে । তোকে কে বললবিনায়ক এখানে আসছে ! ও তো গ্রাম একটুও ভালোবাসে না ।মনে হয় কুড়ি বছর পর আসছে ।”

“হ্যাঁ আমিও শুনলাম অনেক দিন পর উনি আসছেন। অভীকবলেছে আমায়।”

” আসুক আমার কি ! ওরা বড়লোক হয়তো কোন কাজেআসছে । কদিন থেকে চলে যাবে।এবার বল বৃদ্ধাশ্রমের সবাইকেমন আছেন । আর বাচ্চাগুলো কি করছে । ”

” সবাই ভালো আছে বাবা । ভাবছি সবাইকে একদিন পেট ভরেপিঠে খাওয়াব ।মা আর তানিয়া যদি বানিয়ে দেয় । আমি তোআর এসব পারি না ।”

” কেন দেবে না । তুই ওদের জন্য এতোকিছু করছিস আর ওরাপিঠে বানাতে পারবে না । কতো জনের জন্য বানাতে হবে বলে দিস।আমি ও ওদের সাহায্য করব ।”

” পিঠে বানাতে কি কি লাগবে ।”

” ওদের জিঞ্জেস করতে ওরা বলে দেবে ।”

” আচ্ছা আমি মায়ের কাছ থেকে জেনে নেব। এখন স্কুলেরসময় হয়ে গেছে, ভাত খেয়ে বের হই।”

” যা খেয়ে নে।”

” বাবা তোমার , মায়ের সব ঔষধ আছে তো!”

” ওসব নিয়ে তোকে চিন্তা করতে হবে না ।আমাদের বৌমাসবকিছু খেয়াল রাখে। তানিয়া একেবারে দশভুজা । ঘরে বাইরেসমান ভাবে সামলাচ্ছে । সত্যি কপাল খুব ভালো আমাদের ।নইলে শহরের একটা শিক্ষিত মেয়ে গ্রামে এসে সবার সঙ্গে এভাবেমানিয়ে চলে । ”

মলয়কুমার গাঙ্গুলি ছিলেন গদাধরপূরের প্রাইমারী স্কুলেরশিক্ষক ।এখন রিটায়ার । বিনায়ক মুখার্জি ওর সহপাঠী । হাইস্কুলঅবধি দুজনে একসঙ্গে পড়াশোনা করেছেন।বিনায়ক পড়াশোনায়খুব ভালো ছিলেন । মাধ্যমিকে ভালো রেজাল্ট করে সায়েন্স নিয়েপড়েন তারপর ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে কলকাতায় চলে যান । উনারপরিবারও বেশ সচ্ছল ছিল ।

আর মলয়বাবু উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে গ্রামের প্রাইমারি স্কুলেচাকরি পান । এরপর বিয়ে করে গ্রামেই থেকে যান। মৃন্ময় উনারএকমাত্র ছেলে । গ্রামের প্রাইমারি স্কুলে পড়াশোনা করে কলকাতারকলেজ থেকে ইংরেজীতে এম, এ পাশ করে গদাধরপুরের হাইস্কুলেচাকরি পায় সে। অন্য চাকরি পেয়েছে কিন্তু সে তা করেনি । গ্রামেরমানুষের পাশেই থাকতে চায় মৃন্ময় ।অনেক সামাজিক কাজ করেসে । মলয়বাবু ও করতেন কিন্তু মৃন্ময় উনার চাইতে অনেক বেশিকরছে । অসহায় বৃদ্ধ – বৃদ্ধাদের নিয়ে বৃদ্ধাশ্রম করেছে , অনাথবাচ্চাদের আশ্রম করেছে ওর চেষ্টাতেই । অবশ্য ওর এই মহানকাজে হাত বাড়িয়েছেন অনেকে । গ্রামের মানুষের বিপদে আপদেসবসময় এগিয়ে যায় মৃন্ময়। ওদের গ্রাম এখন অনেক উন্নত হয়েছে। এতে বাবা – ছেলে দুজনের অবদান আছে । গ্রামের মানুষ ওদেরখুব ভালোবাসে ।

মৃন্ময় কলকাতার মেয়ে তানিয়াকে ভালোবেসে বিয়ে করে ।তানিয়া খুব ভালো মেয়ে । এই গ্রামে এসে সবার সঙ্গে খুবমিলেমিশে থাকে । শ্বশুর শাশুড়িকেও খুব ভালোবাসে । মলয়বাবুবলেন, ” দুটিতে একেবারে শিব-পার্বতী। এমন বউ পাওয়া ভাগ্যেরব্যাপার ।”

বিনায়কবাবু গ্রামে এসেছেন সবাই উনার সঙ্গে দেখা করতেযাচ্ছে কিন্তু মলয়বাবু গেলেন না । উনার মনে অনেক অভিমান ।আগে যখন বিনায়কবাবু গ্রামে আসতেন নানা কথা শুনাতেনমলয়বাবুকে।

” কিরে মলয় তুই তো মানুষ হলি না ছেলেটাকে ভালো স্কুলেদিয়েছিস তো !”

” ঔ গ্রামের স্কুলেই পড়ছে । এখান থেকেই যা হবার হবে ।লেখাপড়া যতটুকু শিখবে আসলে আমার কাছে ভালো মানুষহওয়াটা আগে জরুরী।”

” ছাড় তোর ভালো মানুষ হওয়া ! তুই তো এত ভালো মানুষ কিকরেছিস জীবনে । বুড়ো মা -বাবা, গেঁয়ো বউ সাধনাকে নিয়েগ্রামেই পড়ে আছিস। গ্রামে ভদ্রলোকেরা কেউ থাকতে চায় এখননা ! আমাকে দেখ কোথা থেকে কোথায় চলে গিয়েছি। আমারছেলে আরও অনেক উপরে উঠবে । জলের মতো টাকা খরচ করছিওর পিছনে । ”

“ভালো এতে আমাদের গ্রামের নাম উজ্জ্বল হবে ।”

( দুই)

বৃদ্ধাশ্রমের সবার জন্য পিঠে বানিয়েছে তানিয়া আর সাধনা দেবী ।মৃন্ময় সেগুলো নিয়ে যাবে । মলয়বাবু বারান্দায় মোড়ায় বসে পিঠেখাচ্ছিলেন। হঠাৎ দেখলেন বিনায়ক বাবু সস্ত্রীক উনার বাড়িতেএসেছেন ।

বিনায়কবাবুর আগের চেহারা আর নেই ।বয়স হয়েছেঅনেকটা ঝলসে গেছে ।

” তুই হঠাৎ গরীবের বাড়িতে কি করে এলি? কোথায় তোকেবসতে দিই বলত !”

” কেন তোর পাশে যে মোড়াগুলো রাখা আছে ওখানেই আমরাবসব।”

” হাসালি আমাকে । এখানে তুই বসবি।”

“এই দেখ বসলাম । তুই কি খাচ্ছিস আমাদের দিবি না ।”

” ঠাট্টা করছিস নাকি বিনায়ক আমাদের গ্রামের লোকেরখাবার নিয়ে । তোরা কি এসব খাবি।”

” দিয়েই দেখ না ঠাকুরপো খাই কিনা । ”

মলয়বাবু অবাক হলেন বিনায়কবাবুর স্ত্রী বিমলাদেবীর কথাশুনে । ভদ্রমহিলা খুব অহংকারী বলেই তিনি জানেন । গ্রামেরকোন কিছু উনি পছন্দ করেন না ।

” আচ্ছা বসো। তোমরা আমার বাড়িতে এসেছ । খেতে চাইছদিই না কি করে । বৌমা এদের জন্য পিঠে নিয়ে এসো ।”

তানিয়া দুটো ডিস ভর্তি করে পিঠে নিয়ে এল । দুজনে খেতেলাগলেন । মলয়বাবু একটু অবাকই হলেন।

মৃন্ময় বৃদ্ধাশ্রমে পিঠে নিয়ে যাওয়ার জন্য বেরুচ্ছে । বিনায়কবাবু, বিমলাদেবীকে দেখে এসে প্রণাম করল ।

” তোর ছেলে বৌমা একেবারে লক্ষ্মী -নারায়ণ । ”

” তুই হঠাৎ আমাদের মতো কথা বলছিস যে !আমার বৌমাসত্যি খুব ভালো মেয়ে । ওকে আমরা মেয়ের মতো দেখি ।কলকাতার মেয়ে তবু কি সুন্দর আমাদের সঙ্গে মানিয়ে চলছে ।তবে এরা তোর ছেলে -বৌমার মতো এত উচ্চমানের মানুষ নয়।”

” উচ্চমানের দরকার কি রে । ওরা ভালো মানুষ এটাই বড় কথা।”

” আজ তোকে যত দেখছি অবাক হচ্ছি ।”

” অবাক হবার কিছু নেই ভাই । মানুষ তার জীবন থেকেইশেখে। বাবা মৃন্ময় তোমাদের বৃদ্ধাশ্রমে কতজন বৃদ্ধ – বৃদ্ধা আছেন।”

” তুই ওর নাম জানিস কি করে ।”

” তোর ছেলে এতো ভালো ভালো কাজ করছে ওকে তো সবাইচেনে । সেই আমেরিকা থেকে আমরা ওর নাম শুনেছি ।”

” আমাদের ওখানে ত্রিশ জনের মতো আছেন কাকাবাবু । এরাবিভিন্ন সম্প্রদায়ের, বিভিন্ন জায়গা থেকে এসেছেন। এদের কারোছেলেমেয়ে নেই । নইলে কি আর ওরা বৃদ্ধাশ্রমে আসতেন।”- মৃন্ময়বলল ।

বারান্দায় সাধনা দেবী, তানিয়া, মৃন্ময় সবাই এসে দাড়িয়েছেন ।এখনো এদের বাড়ির ঘরগুলো সাদামাটা । মলয়বাবুর বাড়িতেকেউ উচ্চাভিলাষী , বিলাসপ্রিয় নয়। তবে এরা সবার সঙ্গেমিলেমিশে বেশ শান্তিতে আছে ।তানিয়া কিছুদিন পর মা হবে ।এখন প্রথম স্টেজ চলছে ওর।

“তোমাদের বৃদ্ধাশ্রমে আরও দুজনের জায়গা হবে । তারা যেতোমার মতো মানুষের ছত্রছায়ায় বাকি জীবনটা কাটাতে চায়।তারা তোমাদের আশ্রমের জন্য অনেক টাকা দান করবেন । দেবেওদের একটু আশ্রয় ।”

” আপনি কাদের কথা বলছেন ।যাদের এতো টাকা আছে তারাএখানে আসবেন কেন।তাদের কি ছেলে মেয়ে নেই ।”

” আছে তবে ছেলেটাকে তারা মানুষ করতে পারেনি । তোমারবাবা ঠিকই বলতেন সবার আগে ভালো মানুষ হওয়া জরুরী ।উনি দেখ তোমাকে একজন আদর্শ মানুষ তৈরী করেছেন ।তোমাদের এতো প্রাচুর্য নেই কিন্তু আছে শান্তি , সুখ , ভালোবাসা , শ্রদ্ধা ।”

” তুই কাদের কথা বলছিস বিনায়ক । কি করেছে ওদের ছেলে ।”

” ছেলে বউমা ওদের সঙ্গে কথা বলে না । একবার খোঁজ ও নেয়না । ছেলের বাড়িতে ওদের পরিচয় কাজের লোক ।আমেরিকায়কাজের লোক পাওয়া যায় না । তাই আমরা ছেলের বাড়িতেকাজের লোক হয়েছিলাম ।একটু ভুল হলেই হাত উঠে গেছেআমাদের উপর। এমনটা তো হওয়ারই ছিল রে আমরা ছেলেকেশুধু উপরে উঠতে শিখিয়েছি। কিন্তু মানুষ করতে পারিনি ।”

চমকে উঠলেন সবাই । কি বলছেন বিনায়কবাবু । এতো বছরপর জীবনের শেষ প্রান্তে এসে এইসব কারণে কি এরা কেন এইগ্রামে এসেছেন ।

“বাবা মৃন্ময় তোমাদের বৃদ্ধাশ্রমে আমাদের দুজনের থাকারব্যবস্থা করে দাও না । আমরা কথা দিচ্ছি সবার সঙ্গে মিলেমিশেথাকব। ওরা যেভাবে থাকছে আমরা ও থাকব। আমরা আর ঔযান্ত্রিক শহরে ফিরে যেতে চাই না । আমাদের সব অহংকারধুলোয় মিশে গেছে ।”

সবার চোখে জল এসে গেল বিনায়কবাবুর কথা শুনে ।মলয়বাবু বললেন,” কি বলছিস বিনায়ক তোদের এত টাকা পয়সাতোরা কেন গ্রামে থাকতে যাবি। তোরা তো গ্রাম পছন্দ করিস না ।”

” একদিন নিজের শিকড়কে অস্বীকার করে

অহংকারে মরীচিকার পেছনে ছুটে গিয়েছিলাম রে। ওখানে অর্থ, সম্মান সব পেয়েছি কিন্তু ভালোবাসা , সুখ – শান্তি পাইনি । এখনজীবনের শেষ প্রান্তে এসে বুঝেছি প্রকৃত শান্তি এখানেই। তোরছেলেটাকে তুই যান্ত্রিকতার পিছনে ছুটতে দিসনি তাই ও এতোভালো হয়েছে । আমরা যে আলোর খোঁজ পেয়েছি । বাকিজীবনটা দিবি বাবা তোদের আশ্রমে আমাদের থাকতে।”

” অবশ্যই কাকাবাবু ।”

” বেঁচে থাক বাবা । তোর মতো ছেলে যেন সবার হয়।”

বিনায়কবাবু জড়িয়ে ধরলেন মলয়বাবু , মৃন্ময়কে। সবার চোখেজল এসে গেলো।