মজিদ মাহমুদের কবিতা
কবিতা
কবিতাকে কবিতা হতে দেখলেই আমি বিরক্ত হই
কবিতা কবিতার মতো হলে আর পড়তে ইচ্ছে করে না
মনে হয় সাজানো গোছানো
মনে হয় কেউ লিখতে চেয়েছিল
মনে হয় বিয়ের আগে পার্লারে গিয়ে সেজেছে অনেক
এসব সাজাটাজা তো একদিনের ব্যাপার
সবাইকে দেখানোর জন্য, চোখ ধাঁধিয়ে দেয়ার জন্য
গায়ের রঙ চড়ানোর পরে
দামি অলঙ্কার ও শাড়ির আড়ালে
পরচুলা ও ভ্রু প্লাক করার পরে
আসল কনে যেমন হারিয়ে যায়
এমনকি ঘরে ফিরে আসার পরেও তো
ফটো শেসনের অলঙ্কার খুলে আলিঙ্গন করতে হয়
কবিতা তো আলিঙ্গন করার জন্য
কবিতা তো খালিপায়ে ফুটপাতে হাঁটার জন্য
কবিতা তো সারিবদ্ধভাবে গার্মেন্টস কারখানায় যাওয়ার জন্য
পার্কে নেতিয়ে পড়া শিশুর সাথে ঘুমিয়ে থাকার জন্য
অবশ্য মাঝে মাঝে জিন্স পরলেও খারাপ লাগে না
বুকের ক্লিভস কিংবা মাথার স্কার্ফ সবই থাকতে পারে
কবিতাকে যেখানে খুশি সেখানে নিয়ে যেতে চাই
ঘরের লক্ষèীরা ঘরে থাক
যারা বেরিয়ে আসতে পারবে রাস্তায়
মাঠে ঘাটে মিছিলে সংগ্রামে
যারা লিঙ্গহীন বন্ধুর মতো চারপাশে
যারা মিলনে পারঙ্গম শয্যায়
যারা সহমরণে অগ্নিশিখার মতো জ্বলে উঠবে
তারাই আমার কবিতা
তাদের জাতপাত ধর্মাধর্ম বর্ণগোত্র
দেশকাল আমার বিবেচ্য নয়।
কবির বিষয়
একজন কবির কি রাজনৈতিক কবিতা লেখা উচিত
মোটেও না; বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড
খুন গুম এসব কবির বিষয় নয়
বাকস্বাধীনতা নিয়ে চিল্লাপাল্লার কি আছে
ধর্ষণ, শিশুহত্যা বস্তিতে আগুন
এ সব আগেও ছিল
পেট্রোল বোমা, ‘আগুন-সন্ত্রাসের নেত্রী’
ব্লগার কিংবা হেফাজত
যাহা ‘চুয়ান্ন’ তাহাই ‘সাতান্ন’
আমি এসব নিয়ে ভাবি না
সকালে ঘুম থেকে উঠে-
গরম রুটির সাথে এক মগ চা পেলে
বিগত প্রেমিকাদের স্মরণে কবিতা লিখতে বসি
কবির কাজ তো তা-ই, না কি!
রমণযোগ্য নারী, ফুল ও মদের উপমা
এ সবই কবির বিষয়
যেহেতু একদিন সবই শেষ হয়ে যাবে
প্রিয়ার কালো চোখ ঘোলাটে হয়ে যাবে
রুটি ও মদ ফুরিয়ে যাবে
তখন আর লেজের বাতাস দিয়ে মাছি তাড়ানোর
কি কোনো অর্থ আছে!
পুরস্কার
আমার প্রত্যাখানের তালিকায় নোবেল পুরস্কার শীর্ষে রয়েছে
তার আগে বুকার, ম্যাগসাইসাই, এমন কি বাংলা একাডেমিও
একুশ কিংবা স্বাধীনতা পুরস্কারও তার ব্যতিক্রম নয়
পাড়ার যে সব ছোট ভাই-এমপি মহোদয়ের সম্মানে, কিংবা
একজন শিল্পপতির সভাপতিত্বে দিয়ে থাকে যে সব পুরস্কার
সার্ত্রের মতো আমিও ভেবেছিলাম-অস্তিত্বই তোমার নিয়ন্তা
সকল প্রতিষ্ঠান নিতে চায় দখলি স্বত্ব-পুরস্কার তার প্রকাশ
তুমি কি পারবে না তোমার নিজ-আনন্দে কাব্য-রচিতে
যেভাবে নদী পর্বতগাত্র বেয়ে ছুটে চলে সাগরের পানে
তুমিও ধেই ধেই আনন্দে নেচে-কেঁদে প্রতিটি জীবনের সাথে
প্রতিটি অক্ষর ও বাক্য হয়ে লিখে যাও তাদের অব্যক্ত কান্না
যে সব কন্যা কীটদষ্ট ক্ষতের ভয়ে অপরিষ্ফুটিত চিরকাল
যে সব পুত্র মাতৃস্নেহের বদলে রাত্রি কাটায় পার্কের বেঞ্চে
অর্থাভাবে যাদের স্বজন মারা যায় মহাসড়কের ফুটপাতে
যদিও দুঃখময় পৃথিবীতে সকল গান আমাদের আনন্দের তরে
এই আনন্দই তোমার পুরস্কার; যখন প্রতিবাদে হয়ে থাক নুব্জ
পুলিশের বেদম প্রহার, মড়ক, আর ক্রসফায়ার অতিক্রম করে
তুমি নিজেই যখন প্রতিষ্ঠান, তখন তুমিও ক্ষুদ্রের পেষণ যন্ত্র
এই পুরস্কার নয় কি তখন তাদের অতিরিক্ত উপহাসের কারণ
অবশ্য পুরস্কার পেলেই তো থাকে প্রত্যাখানের অধিকার
যদিও সে প্রমাণ দিতে কোনোদিন হবে না তোমার!
এমন নয় এমন
আমার কবিতা তো এমন না হয়ে এমনও হতে পারতো
যে সব নম্র মেয়েদের জন্য আমি কবিতা লিখেছিলাম-
তারা না হয়ে তারাও তো হতে পারতো
যাকে আমি স্বদেশ বলছি
যে ভাষার জন্য আমার পূর্বপুরুষ করেছিলেন লড়াই
হয়তো অবলীলায় পাল্টে যেতে পারতো তার দৃশ্যপট
আমার পিতা ছিলেন ভারত বিভাগে একাট্টা
আর তার সন্তানেরা জয়বাংলার জন্য ঢেলে দিলেন রক্ত
কোনটি হবে আমার সন্তানের দেশ
কি হবে নাতিপুতিদের ভাষা
ছাপান্ন হাজার বর্গমাইল আঁকা পাসপোর্ট ফেলে দিয়ে
তারা কি ইয়াঙ্কিদের পাসপোর্টের জন্য করবে লড়াই
আমার নিবেশ কি হবে তাদের উপনিবেশ
দেশের ইনকাম পাঠাবে কি তারা অন্য দেশে
তারাও কি লিখবে কবিতা
শুনবে লালনের গান, নাকি নতুন বব ডিলান
তাদের বাহুতে থাকবে অন্য দেশের পিঙ্গল-শ্যামাঙ্গী
এ ভাবেই হয়তো বদলে যাবে রূপ
কেবল অর্ধেক অপরিবর্তনীয় আমি জিনের সুতা ধরে
সন্তানের সঙ্গে ঘুরে ঘুরে নতুন রূপ করব পরিগ্রহ
কখনো শাদা কখনো নিগার অন্ধকার
কখনো হাই আলাস্সালাহ বলে যাব মসজিদের পথে
কিংবা একটি রক্তজবার পাপড়ি তুলে দেব মা-উমার পদে
যারা একটি পথ নিয়েছ বেছে, তারা সে পথে চলে যাও
পথের প্রান্তে রয়েছে তোমাদের ট্যাক্স-কালেক্টর
আমি তো কেবল ভ্রমণ-পিয়াসু
সব পথেই একদিন আমাকে যেতে হতে পারে…
নৈঃশব্দ্যে বাঁচা
আমি এখন আগের মতো দেখতে পাই না
শ্রবণেও দেখা দিয়েছে মারাত্মক ত্রুটি
কিছুক্ষণ আগে শোনা কথাও মনে রাখতে পারি না
আমার এই প্রতিবন্ধকতা বন্ধুদের কাছেও নেই গোপন
অবশ্য বন্ধুরাও হারিয়ে ফেলেছে শব্দের অর্থ
যাকে অসুখ ভাবছি সেটিই হয়তো স্বাভাবিক
আর এ সব দুর্বল স্মৃতিশক্তি বিবেচনা করে
প্রত্যেকেই একই কথা পুনরপি উচ্চারণ করছে
কিংবা কথার বদলে ঘণ্টি বাজাচ্ছে
টেলিভিশনে টকাররা অনন্তকাল লাইভ করছে
নেতাদের বক্তৃতা একবারই রেকর্ড হয়েছে
পল্টন ময়দানে কিংবা নয়া-পল্টনে; ধানমণ্ডি কিংবা গুলশানে
ব্রিজ কিংবা কালভার্ট উদ্বোধনে; আনন্দ কিংবা শোক-সমাগমে
বাসের হেলপার কিংবা শিক্ষক ক্লাশ-রুমে
প্রেমিক প্রেমিকার কানে একই কথা উচ্চারিত হচ্ছে
তারিখ পাল্টে প্রতিদিন প্রকাশিত হচ্ছে একই দৈনিক
হয়তো আমি বুঝব না ভেবে
কবিরা উপহার দিচ্ছেন একটি কবিতার একাধিক বই
আর উপন্যাসের পাতা উল্টাতেই ভুলে যাচ্ছি অপর পৃষ্ঠা
এমন বিস্মৃতির অসুখ, দৃষ্টি-স্বল্পতা নিয়ে বেশ আছি
আমার চারপাশও নিয়েছে মেনে বধির ও মূক
সবাই অভ্যস্ত হয়ে গেছে বিষ্মরণ ও নৈঃশব্দ্যে বাঁচা!
হয়তো রবীন্দ্রনাথ থাকলে অহেতুক বলতেন-
‘এইসব মূঢ় ম্লান মূক মুখে দিতে হবে ভাষা’