গৌরী মৈত্রের কবিতা

গৌরী মৈত্রের কবিতা

আমাকে নদী বলো

আমাকে জননী বলো
ঘরনী বলো কিম্বা সহোদরা
কন্যা অথবা আত্মীয়া
পিঁড়ি পেতে বসবে কাছে যখন
গৃহস্থালি আমার; অথবা
উল্টো থলে সোজা করে দি বাড়িয়ে
        ব্যস্ত হাতে।  
যখন জামার বুকে বোতাম আঁটি
ওষুধ ঢালি মহিমাময়ী—
যখন চায়ের কাপটা বাড়িয়ে ধরি
সামাজিকতার কদর বুঝে—
আমাকে ব’লো জননী
স্ত্রী কিম্বা সহোদরা
কন্যা অথবা আত্মীয়া—
 
যখন পাখোয়াজ দুপায়ে খুলে রেখে
জ্যোৎস্না ছুটবে  কুলু- কুলু—
যখন নিঃশ্বাস দীর্ঘ গাছ হবে
বাতাস করবে হুহু হুহু—
যখন কমলা রঙের দুঃখ মিশে
সময়ের দিন যাবে খোয়া
যখন বুকের কাছে অরন্য এসে
হারানো হরিণ খুঁজতে আসে;
 
তখন আমাকে নারী বলো
ডেকো আমাকে নদী বলে,
আর সব ফুল ফেলে দিও স্রোতে
স্তুতি এনো শুধু নারীর জন্য।    
                   
         
সোনালী ঈগল
 
তোমার এই ওয়ার্কশ্যপে রয়েছে কত কিছুই না!
স্বপ্নে ডোবা ব্যালকনি এক,ঝাউবনের পেলিং নিয়ে,
দরজায় পড়ে থাকা হাজারও এস এম এস-এ
রঙিন সব রুমাল ওড়া,গাডার আর ম্যাটলিপ যে;
ঠিক পেয়ে যাও হাইওয়ে, প্রকল্পের নক্সা সব।
 
তোমার এই নজিরহীন বিস্ময়ের বাক্সটাতে
অথচ ছিল না কোনো ক্যাম্পাস বা ক্যালকুলাস,
থাকতো পড়ে খালিই সেটি,যদি না এক রূপালী পালক
তোমারই এই উস্কো-খুস্কো ডাইরির দুপায়ের ভাঁজে
পরাতো ম্যাপেল পাতা, ঝরনা রঙিন পাথর—
রঙচটা গুলতানিকেই খোরপোশ দিয়ে যেতে
যদিনা ঘাড় ঘুরাতে,রূপকথা থেকে সোনালী ঈগল!
 
সেই অলীক মাছটি
 
এই কঠিন দুপুরে জলের কাছে এসে দাঁড়াই,
দূরে দাঁড়ের মাথায় হেলান দিয়েছে রোদ;
নদীর বর্নালী মেয়ে হাতে নিয়ে লাফদড়ি
এদিক সেদিক দোলে চ্ছলাৎ চ্ছলাৎ চ্ছল–
ঢেউয়ের ভাঁজে ভাঁজে চলে এক অন্বেষণ,
বয়ে যায় চিতাভষ্ম, পোড়াকাঠ,ফুল বেলপাতা,
কার দীর্ঘশ্বাস নিয়ে জলের তলে পড়ে থাকে আধুলি ;
কার জন্য? কীসের কারণে এতসব আয়োজন?
এইসব প্রশ্নরাই সার সার মাথা নীচু করে থাকে,
কাঁকড়া আর বালির মধ্যে জলের কোন অতলে!
খোঁজে অলীক মাছটি, যার সোনালী পাখনা
রূপোলী আঁশের আলো–ধরা দেয়নি কখনো ;
শুধু টুক করে ডুবে যাওয়া দুঃখ, কী জানি কীসের,
খোঁজে কঠিন দুপুর ঠেলে সেই অলীক মাছ
           
 
সেই কাকটি
 
সেই কাকটিকে খুঁজি, কেবল  খুঁজে বেড়াই,
যে আমার সকালগুলিকে চিহ্নিত করতো!
আকাশের গায়ে খুলে দিত এক গোপন দেরাজ —
আর অভিজ্ঞান থেকে জালনা দরজা গুলো
চোখ মেলে তাকাতো তখন,
তখন স্বপ্নের করিডোর ধরে শুধু হ্রেষাধ্বনি ;
দীর্ঘক্ষন শুধু ভেসে যাওয়া— ভেসে যাওয়া—
আর এখন আমার স্ববিরোধ একাকিত্বে,
তার ডানার অন্ধকার ঘীরে যে বসতি,
তারা সব জবরদখলকারী!
প্রতিদিন তাদের আপ্যায়ন পর্বে
যে তেষ্টাটা ঘুরঘুর করে, তার জন্য এক জলসত্র,
কোন এক নাম না-জানা প্লাটফর্মে
একাকী দাঁড়িয়ে থাকে আজও।