চ্যাটার্জী অমলের কবিতা
দিশেহারা নাবিক
গভীর এক নিশীথে বিধর্মী কালবৈশাখীর উত্তাল আলিঙ্গনে
দিকভ্রষ্ট হলো এক নাবিক, এক পতিত হাওয়া তার জীবনের
সবকিছু গলাটিপে মুছে নাড়ি ছেঁড়া ব্যথার প্রেক্ষাপটে
রেখে গেল শেষ সাক্ষর ।
যদিও বহুকাল আগেই ভৈরবী ত্রিশূলে আগাপাশতলা তন্ন তন্ন করে
খুবলে চুরমার করেছ সম্পর্কের সেতুবন্ধন । অবহেলার জাল ছড়িয়ে
গোঁয়ার ঘুরির মতো ঘাড়ে পাক দিয়ে সাবলীলভাবে মনের মানুষকে
ঝুলিয়েছো রাফ খাতার মার্জিনে। হয়তো পর্দার আড়ালে ছিল
কোনো এক স্তাবকের বাঁকা ঠোঁটের হাসি
তবুও সে মৃত্যুগন্ধী অন্ধকারের প্রগাঢ় প্রহরে ভাঙা জাহাজের ডেকে
দুর্মর প্রত্যাশায় রেখে গেল লাল গোলাপের আমন্ত্রণ।
অধিকারী পাড়ার প্রচণ্ড পণ্ডিত হলেই সহজিয়া সুরের মেঘবিস্তারে
শব্দ-ভাষা-অক্ষরমালার রাজপাট পত্তন মোলায়েম হয় ।
তখন সারা রাজ্যময় বন্ধনহীন মুক্ত হাওয়ায় পতপত করে ওড়ে
পালিশ করা আভিজাত্যের ঝকঝকে অক্ষর। জীবনের রেখাগুলোও
কেতাদূরস্ত বিলাসিতায় বিষাক্ত বোধের দেমাক দেখায় অবলিলায়।
ডুগডুগি বাজিয়ে ফেরিওয়ালির কানকাড়ানি স্বরে ফেরি করতে
নিষেধ করেছিলো বলেই বিপুল আগ্ৰহে ত্যাগের কীর্তন গেয়ে
হেলায় বিশ্বাসের বিগ্ৰহকে চুরমার করলে তাচ্ছিল্যের প্রচন্ড আঘাতে ।
নুন আনতে পান্তা ফুরানো মধ্যবিত্ত বলেই কুলবতী আলোর অভাবে
দুঃখের পাঁচালি মাখা ফসলবিহীন তার ষোলোআনা জীবন
বুকের রক্ত বুকে ঝরিয়ে আগামীর পথে হেঁটে চলেছে দিশেহারা সেই নাবিক।
প্রথম প্রদীপ
সুচরিতাসু,
এই প্রথম পোষমানা কিছু স্মৃতি ও স্বপ্নের সংযোগে জীবনের একটা দিনের গল্প লিখতে টেনে নিলাম কাগজ কলম। যদিও বুড়ো বটের মতো স্থবির হয়ে দিনটারও আর প্রাণের উলালে তাপ নেই বহুকাল।
জানিনা তোমার মনে আছে কিনা অনেকদিন আগের এক গোধূলির কথা। সকাল থেকেই মেঘলা আকাশ আর ঝোড়ো বাতাসের সাথে রিমঝিম বৃষ্টি।
বাসষ্ট্যান্ডে তুমি ছিলে একা , উদাস চোখে কোন সুদূর লক্ষ্যে কারো অপেক্ষায়।
হ্যাঁ একাই তো –
যদিও কিছু পরে আমিও ছিলাম।
কিন্তু কে জানতো , পরিচয়হীন ওই মুহূর্তগুলোই জাগতিক ভাবনার
বেড়াজাল ভেঙে বুকের মাঝে অহর্নিশি ওড়াবে সুখের শঙ্খচিল ?
কে জানতো , ওই এক পলকে একটু দেখাই এলোমেলো ছন্দের হাত ধরে
সৃষ্টি করবে অসামান্য খন্ড খন্ড ছবির কোলাজ, স্বপ্নের নীল আলোয়
মন কুঠুরির জানালায় রাখবে অযুত হাতছানি ?
কে জানতো , অনন্তযৌবন বাসনার কুহুতানে আমার একাকীত্বের দেহলতায় তোমাকে জড়িয়ে লিখবো জীবনের কাব্য ?
যদিও নাভিমুলের স্বর ও সুরের শুদ্ধ ব্যাকরণে বা নির্জনে বসে তোমার
খোলা চুলে মন ডুবিয়ে যে কথা কখনো হয়নি বলা ,শাল মহুয়ার পথে হেঁটে উদাস বাউলের একতারার মেঠো সুরের ছন্দেও যে কথা কখনো হয়নি বলা ।
তবুও শাসন না মানা প্রণয়কাতর ফুলগুলো সকাল সন্ধ্যায় শবরীর বিশ্বাসে অনুরাগের ঘুঙুর বাজায় মনের দরজায় ।
মনের মন্দিরে প্রথম প্রেমের গ্ৰন্থিত সম্পর্কে চেয়েছিলাম পৃথিবীর
অন্ত-হীন সুখের মদির আলিঙ্গন । জীবন ও জীবিকায় চাল ডাল নুনের মাঝে বেঁচে থেকেও হৃদয়ের অবচেতনে ডুব দিয়ে এখনো বারংবার খুঁজে বেড়াই
সেই ক্রান্তিকাল দিনের সুখ ও স্বপ্নের হারানো প্রথম প্রদীপ।
দাগ
অদৃষ্টবাদী পথিকের মতো আকুল হয়ে আয়নায় দেখছো
কতটা গভীর মুখের দাগ ।
বুকের অপার খেয়াঘাটে কৃষ্ণপক্ষের থ্যাঁতলানো নিদর্শন রেখে
নীল অবসাদের প্রহর ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইছে বীতরাগের করুণ প্লাবন ।
স্বপ্নের শস্যদানা রাতের প্রকান্ড চোয়ালে উজাড় করা হাহাকারে
অনুসন্ধান করে হারিয়ে যাওয়া জীবনপঞ্জি।
হৃদয় চিরে ঘাঁটি গেড়ে যে দাগটা গেঁথে চলেছে স্বপ্নের মালা.
নিজের সর্বোচ্চ গভীর হতে গোপন ভাঁড়ারের ঢাকনা খুলে
মেপেছো কি তার নির্ভরতার গভীরতা ?
সাবলীল হলে নিশ্চয় শুনতে পেতে অনুভবের তানপুরায়
কেমন চুঁয়ে পরছে ফাগুন সন্ধ্যার তুমুল সুরলহরী।
মর্যাদাপূর্ণ জীবনে বিচ্ছিন্ন দাগের পরমায়ু অতি সহজেই
মুছে দিতে পারে বয়সের বলিরেখার জহুরি চোখ।
নরকবিশ্বাসীরা নিভাঁজ উল্লাসে কাঁচ ভেঙে টুকরো করলেও
হাতের মুঠোয় এতটুকু রক্তের দাগ লাগায় না,কে তাদের খবর রাখে ?